home ই-বুক, উপন্যাস ধারাবাহিক উপন্যাস — ‘তারাদের ঘরবাড়ি’ ।। অলোকপর্ণা ।। ৬ষ্ঠ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস — ‘তারাদের ঘরবাড়ি’ ।। অলোকপর্ণা ।। ৬ষ্ঠ পর্ব

                                                            ৬

 

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় ইন্দিরার। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর সে বোঝে সেলফোনটা বাজছে। অন্ধকার হাতড়িয়ে ফোন খুঁজে পেলে ইন্দিরা দেখে জ্বল জ্বল করছে বাড়ির নম্বর… “এত রাতে…”

“হ্যালো”

ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ আসে না।

“হ্যালো, জ্যেঠু?”

কারোর সাড়া পাওয়া যায় না।

“দাদা!”

ইন্দিরা অধৈর্য হয়ে ওঠে জবাব না পেয়ে, “জয়তী?! কথা বলো!”

ফোন কেটে যায়।

… কারোর কিছু হল না তো! ইন্দিরা বাড়ির নম্বর ডায়াল করে, ফোন বেজে বেজে কেটে যায়। আরেকবার ফোন করে দেখবে কিনা ভেবেও ইন্দিরা থেমে যায়। হয়তো জয়তী এমনিই ফোন করেছে নিজের খেয়ালে। এখন ফোনের আওয়াজে বাকীদের ঘুম ভাঙিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। ইন্দিরা সকাল হওয়ার অপেক্ষা করে, তার ঘুম আসে না। কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করার পর অস্বস্তি হয় তার। ধীর পায়ে উঠে ইন্দিরা বারান্দায় চলে আসে।

বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া ঘুরে যাচ্ছে বারান্দা দিয়ে। সামনের বহুতলের হোর্ডিং- এর শিশুটা সে হাওয়ায় বেপরোয়া দুলছে। ইন্দিরা ভাবে কিসের টানে শিশুটা এখনও এখানে আটকে আছে, কিসের টানে সে এখনও আকাশে উড়ে যায়নি? ইন্দিরা তো বেশ সহজে কোলকাতা ছেড়ে দিতে পেরেছে। রঞ্জনা বলত… রঞ্জনা।… বলত… একবার কোনো কিছু ছেড়ে গেলে যদি ফিরে আসা হয় আবার তার কাছে, জিনিসটা আর এক থাকেনা। বস্তুত যা ফেলে যাওয়া হয় তার কাছে আর কোনোদিনই ফিরে আসা যায় না,- সে শহর হোক, বা জায়গা, বা মানুষ। মানুষ,- ইন্দিরা বুঝতে পারে না কে কাকে ছেড়ে গেছে, ফেলে গেছে… “a for abandoned”… একা একাই বলে ওঠে ইন্দিরা। নিজেকে বন্ধ কারখানার মত লাগে তার। সারা শরীর লক আউট হয়ে পড়ে আছে। “a for abandoned”, আওড়ে চলে ইন্দিরা। তার বলতে ভালো লাগে। ধীরে ধীরে কাটা কাটা স্বরে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইন্দিরা একটানা বলে যায়, “a for abandoned”

একটা সময় পর ক্লান্তি নেমে আসে ইন্দিরার সারা শরীরে। চোখ ঝাপসা করে নিজে থেকেই জলে ভরে যায়। আবছা দৃষ্টিতে ইন্দিরা দেখতে পায় বহুতলের পিছন দিয়ে আস্তে আস্তে গজিয়ে উঠছে একটা গোটা হাওড়া ব্রিজ। ইন্দিরা চোখ বোজে, আর নিঃশব্দে গাল বেয়ে জল নেমে যায়।

“কি করছো এত রাতে এখানে?!”

চমকে উঠে সে দেখে আনন্দী এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে। বারান্দায় অন্ধকার থাকায় ইন্দিরার নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে হয় না।

“সব ঠিক আছে তো?”

যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় ইন্দিরা উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, এমনিই এলাম, ঘুম আসছিল না”

“বাড়ির কথা মনে পড়ছে বুঝি?”

“না তা নয়”

“তাহলে ঘুম আসছে না কেন?”

প্রায় চার মাস আগের কথা মনে পড়ে ইন্দিরার, সে বলে, “আমার মাঝে মাঝে এরকম হয়”

আনন্দী চুপ করে ইন্দিরার দিকে তাকিয়ে থাকে, অন্ধকারে।
“তুমি কাঁদছো?!”, হঠাৎ করে তার খুব কাছে চলে আসে আনন্দী। দ্রুত নিজেকে লুকিয়ে নিতে ইন্দিরা কয়েক পা পিছিয়ে যায়, “না, কাঁদবো কেন?”

“কে জানে, বাড়ি থেকে প্রথমবার এত দূরে আছো, মন খারাপ করাটাই স্বাভাবিক…”

“কি করে জানলে যে প্রথমবার?”

“it’s easy, you don’t know how to cook and all…”

“and all?!”

“নিজেকে হ্যান্ডেল করতে এবং ইত্যাদি ইত্যাদি”

ইন্দিরার রাগ হয় হঠাৎ, “কে বলেছে আমি নিজেকে সামলাতে পারি না?”

“যদি পারতে তাহলে এভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে “a for abandoned” আওড়াতে না”

ইন্দিরা গুঁটিয়ে আসে, “কতক্ষণ ধরে দেখছিলে তুমি আমায়?” সাথে সাথে তার গলা চড়ে যায়, “আর কেনই বা দেখছিলে? না জানিয়ে কাউকে এইভাবে… কারোর পার্সোনাল ব্যাপারে…” রাগ চড়ে যেতে বরাবরের মতো আবার ইন্দিরা কথা হারিয়ে ফেলে।

আনন্দী বলে, “অনেক রাত হয়েছে, আমাদের ঘুমোতে যাওয়া উচিত এখন। চলো”

অদ্ভুত আদেশের সুরে কথাগুলো ইন্দিরার কানে এসে পৌঁছোয়, বিনাবাক্যে আনন্দীর কথা মতো সে হলঘরে ঢুকে নিজের ঘরে চলে আসে।

দরজায় উঁকি দিয়ে আনন্দী বলে, “ঘুমিয়ে পড়ো”

সাথে সাথে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে যেন। নিজেকে ছোটবেলার চোখ পিটপিট করা পুতুলগুলোর মত মনে হয়, প্রচন্ড ক্লান্ত লাগে। বিছানায় শুয়ে পড়তেই গভীর ঘুম নেমে আসে ইন্দিরার চোখে। সে আর কিছু টের পায় না, আনন্দী তার গায়ে চাদর টেনে দিয়ে খুব আস্তে দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরে চলে যায়।

 

ঘুম ভাঙতে চারদিক চকচক করে ওঠে। বহুযুগ পর যেন এমন গভীর ঘুম হল ইন্দিরার। ঘুম এত গভীর হতে পারে?! কাল রাতে কি হয়েছিল? বুঝতে পারে না ইন্দিরা। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সে দেখে রান্নাঘর থেকে অমলেটের গন্ধ আসছে।

ধীরে ধীরে রান্না ঘরে এসে দাঁড়াতে ইন্দিরা দেখে আনন্দী ডিম আর পাউরুটি তৈরিতে ব্যস্ত।

ঘুম জড়ানো গলায় ইন্দিরা বলে, “আমায় ডাকলে না কেন?”

ঘাড় ঘুরিয়ে আনন্দী ইন্দিরাকে দেখে নিয়ে বলল, “ডাকতে গেছিলাম, কিন্তু তোমায় দেখে মনে হল এক যুগ পর ঘুমাচ্ছো তুমি, তাই আর ডাকিনি”

এক যুগ… “কালকে রাতে…” বিরতি নেয় ইন্দিরা, “আমি একটু রুক্ষ হয়ে পড়েছিলাম, সরি”

“কটা পাউরুটি খাবে?”

“তিনটে।”

খাবার নিয়ে হলঘরের টেবিলে মুখোমুখি বসে তারা।

পাউরুটিতে কামড় বসিয়ে ইন্দিরা মুখ তুলে দেখে আনন্দী তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ ভরা পাউরুটি নিয়েই সে জিজ্ঞাসা করে, “কি হল?”

“there is something about you, যেটা আমি ঠিক ধরতে পারছি না”

ইন্দিরা সতর্ক হয়, মুখে হাসি টেনে এনে বলে, “সেটা wrong, না right?”

ইন্দিরার চোখে চোখ রেখে আনন্দী বলে, “সেটা বোঝার সময় হয়তো এখনও আসেনি”

কলিং বেল বেজে ওঠে, “আমি দেখছি”, বলে আনন্দী উঠে যায়। ইন্দিরার ফোন ভাইব্রেট করে ওঠে।

ইন্দিরা দেখে একটা হোয়াটস্‌অ্যাপ নোটিফিকেশান… সমিত দে।

“কি রে, এটা তোর হোয়াটস্‌অ্যাপ নম্বর? কি করছিস?”

ইন্দিরা টাইপ করে, “পাউরুটি আর ডিম খাচ্ছি”

“খালি খেয়েই যা, প্রোফাইল ফটো ব্ল্যাঙ্ক কেন রে? না আমায় ব্লক করে রেখেছিস?”

“ব্লক করবো কেন, এমনিই দিইনি”

“এমনি এমনি তো লোকে হরলিক্স খায়, এমনি এমনি প্রোফাইল ফটো ব্ল্যাঙ্ক রাখে নাকি কেউ?”

ইন্দিরা একটু ভেবে টাইপ করে, “আমার কোনো ছবি নেই এখনকার, যা আছে সব পুরোনো”

“কেন, যে ছবি তুলে দিত তার হলো কি?”

“সে নেই…”, বিরতি নিয়ে ইন্দিরা টাইপ করে, “আছে, প্রায় ১৭০০ কিমি দূরে”

মেসেজটা পাঠিয়ে ইন্দিরা চুপ করে বসে থাকে। ১৭০০ কিমি, ঠিক কতটা দূর? বিমানপথে দুই ঘন্টা পঁচিশ মিনিট, রেলপথে ছত্রিশ ঘন্টা, সড়ক পথে ত্রিশ ঘন্টা আর হাঁটা পথে কুড়ি দিন,- গতকালই গুগল ম্যাপে দেখেছে ইন্দিরা। যে ছবি তুলে দিত তার কাছে যদি এই মুহূর্তে প্রায় ১৭০০ কিমি পার করে ইন্দিরা পৌঁছে যায়, তবে ঠিক কত আলোকবর্ষ দূরত্ব বাকি থেকে যাবে তাদের দুজনের মধ্যে? সমিত দের উত্তর পড়া হয় না, দরজা বন্ধ করে আনন্দী ফিরে এসেছে।

“কে এসেছিল?”

“আমার দাদার এক বন্ধু আমাদের বিল্ডিংয়েই থাকে, ফার্স্ট ফ্লোরে, আজকে রাতে আমাদের দুজনকে ওর ফ্ল্যাটে যেতে বলেছে, বার্থ ডে পার্টি আছে”

“আমাকেও বলেছে?”

“হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম ওকে তোমার কথা”

“কি বলেছিলে?” ইন্দিরা অবাক হয়।

“একজন খুবই অন্যমনস্ক মানুষ আমার সাথে থাকে”, আনন্দী হেসে বলে।

“অন্যমনস্ক…”

“নও?”, আনন্দীর মুখ গম্ভীর হয়ে যায় হঠাৎ। ইন্দিরা গুঁটিয়ে আসে। আনন্দী ইন্দিরার দিকে আরো একটু এগিয়ে আসে, “কিসের এত অন্যমনস্কতা? কি ভাবো তুমি সারাক্ষণ?”

রঞ্জনার গলা কানে বেজে ওঠে ইন্দিরার, “কারোর সামনে নগ্ন হওয়া চলবে না।”

ইন্দিরা উঠে দাঁড়ায়, “স্নানে যেতে হবে আমায়, নয়তো দেরি হয়ে যাবে”, কাঁপতে থাকা গলায় কথাগুলো বলেই ইন্দিরা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

আধখাওয়া ডিম পাউরুটির সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকে আনন্দী।

 

বাসে উঠে ইন্দিরা আনন্দীর পাশে না বসে পিছনের দিকে চলে আসে, রুবাঈয়ের ঠিক পাশেই একটা জায়গা খালি পড়ে আছে। সে সীটে বসতে না বসতেই রুবাঈ বলে, “সব কিছু ঠিক আছে তো?”

ইন্দিরা জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

“কি হল? শরীর ঠিক আছে?”

“হ্যাঁ”

“তাহলে এত উতলা দেখাচ্ছে কেন তোমায়?”

“আমি মনে হয়… ধরা পড়ে যাচ্ছি…”

রুবাঈ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ইন্দিরার দিকে, তারপর হেসে ওঠে।

“হাসছো?”

হাসতে হাসতেই রুবাঈ বলে, “বারণ আছে ধরা পড়ায়?”

“না, কিন্তু…”

“তাহলে কি যায় আসে? দাও ধরা”

“যদি আবার…”

“রঞ্জিশই তো, ক্ষতি কি!”, ইন্দিরার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে রুবাঈ।

“ক্ষতি নেই।”, ইন্দিরা রুবাঈয়ের দিকে তাকায়, দেখে রুবাঈয়ের চোখে একটা অদ্ভুত আশ্বাস ভেসে আছে। ইন্দিরা চোখ বুজে ফেলে। আনন্দী, রুবাঈ সমেত ইন্দিরাকে নিয়ে বাস গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলে।

 

 

“হ্যালো”, ফোনটা ধীরেশই তোলেন।

“কাল মাঝরাতে তোমরা কেউ ফোন করেছিলে আমায়?”

“না তো, মাঝরাতে কে করবে ফোন!”

“আমি অনেকবার হ্যালো বললাম, কোনো সাড়া নেই… জয়তী করেনি তো?”

“জয়তী… ও তোর ফোন নম্বর পাবে কোথা থেকে?”

ইন্দিরা ভাবে, ঠিকই, জয়তীর পক্ষে তার ফোন নম্বর জোগাড় করে তাকে ফোন করা একটু অলীক ব্যাপারই, “তাহলে? দাদা?”

“হতে পারে, কিন্তু সে চুপই বা করে থাকবে কেন?”

ইন্দিরা একটু ভাবে, তারপর বলে, “তুমি জিজ্ঞেস কোরো দাদাকে, যদি কোনো কিছু বলার দরকার থাকে বোলো আমায় বলতে”

“আচ্ছা। কেমন আছিস তুই?”

“ভালোই, তোমরা?”

“একই রকম, জয়তী এখন ঠিক আছে”

পাশ থেকে জয়তীর গলা শুনতে পায় ইন্দিরা, ধীরেশ বলেন, “এই শোন, জয়তী কথা বলবে তোর…” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই জয়তীর গলা শুনতে পায় ইন্দিরা, “চিঠি এসেছে, বুঝলি!”

“আচ্ছা, ফুলটা দেখলে?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব সুন্দর ফুল, খুব সুন্দর ফুল!”

“জয়তী… তুমি জানলে কি করে এখানে গোলাপি ফুল ফুটে থাকে গাছে গাছে?!”

“আমি? কই জানতাম না তো?”

“তাহলে আমায় বলেছিলে যে গোলাপি ফুলের কথা?”

“বলেছিলাম বুঝি? কই না তো… আমি তো আয়নার কথা বলেছিলাম তোকে…”

ইন্দিরা বোঝে জয়তীর মনে নেই ফুলের কথা। এরকম অনেক কিছুই জয়তী ভুলে ভুলে যায়। আবার হঠাৎ হঠাৎ মনেও করে ফেলে। জয়তীর মাথাটা জাগতিক নিয়ম খুব বেশি মেনে চলে না। ফোন করা হলে ইন্দিরা ট্রেনিং রুমে ফিরে আসে কফি ব্রেক সেরে। ট্রেনিং শেষ হতে হিরণ, আনন্দী আর রুবাঈয়ের সাথে বেরিয়ে পড়ে ইন্দিরা। হিরণ আর আনন্দীকে একটু আগে এগিয়ে যেতে দিয়ে সে রুবাঈয়ের সাথে হাঁটতে থাকে।

হাঁটতে হাঁটতে রুবাঈ হঠাৎ বলে ওঠে, “এবারে তো আর ভয় হওয়ার কথা নয় তোমার ইন্দিরা…”

ইন্দিরা কিছু বলে না।

“ধরা দেওয়ার মধ্যে একটা ঐশ্বরিক অর্গাজম আছে বোঝো সেটা?”

ইন্দিরা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে, বলে, “তবে সবাই কি তেমন গৌরী, রুবাঈ?”

রুবাঈ হাসে অল্প। রুবাঈয়ের এই সব হাসিমুখ দেখলে আজকাল কেমন যেন অসহায় বোধ হয় ইন্দিরার, কে জানে এরপর রুবাঈ হয়তো বলে উঠবে, “ধরা যদি না দাও, জানবে কি করে?”

কিন্তু রুবাঈ কিছুই বলে না, তারা বাস স্টপে অপেক্ষা করতে থাকা আনন্দী আর হিরণের দিকে হেঁটে যায়।

 

একটা চকোলেট বার হাতে ইন্দিরা ফার্স্ট ফ্লোরের ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজায়। আনন্দী দরজা খোলে, “এত দেরি করলে! আমি কখন চলে এসেছি!” কিছু না বলে ইন্দিরা অ্যাপার্টমেন্টটায় ঢোকে। ইন্দিরাদের মতোই যমজ দুটো ঘর নিয়ে তৈরি অ্যাপার্টমেন্টে অনেক আসবাব থাকায় শূন্যতা অনেক কম। তার সাথে দশ-বারো জন মানুষ মেলায় শূন্যতার জায়গা প্রায় নেই এই ঘরে। ইন্দিরাকে নিয়ে ঘরের মাঝামাঝি এসে আনন্দী বাকীদের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে থাকে। একে একে সবার সাথে আলাপ করিয়ে একসময় তার দাদার বন্ধুর কাছে ইন্দিরাকে নিয়ে আসে আনন্দী, আলাপ করিয়ে দেয়, “এই যে, যার কথা বলেছিলাম”

ইন্দিরা দেখে সেদিন ছাদ থেকে যার সাথে আনন্দীকে বাজারের ব্যাগ হাতে ফিরতে দেখেছিল তারা, সে-ই আনন্দীর দাদার বন্ধু। সমীক। আলাপ পর্ব শেষ হতে সমীক জিজ্ঞেস করে, “ভদকা না হুইস্কি?”

কি যেন ভেবে ইন্দিরা বলে “ভদকা”

ইন্দিরার হাতে একটা গ্লাস তুলে দেয় সমীক। আনন্দী বলে ওঠে, “তুমি অ্যালকোহল নাও?!”

“দু একবার নিয়েছি অনেক আগে”, ইন্দিরার মনে পড়ে ছ’ বছর আগের একটা রাতের কথা, টেবিলের ওপারে বিয়ারের গ্লাস হাতে বসে থাকা পিকলু সেদিন শান্তস্বরে বলেছিল, “তুই না বললেও আমি জানতাম।” দাদার শান্ত চোখ দুটো দেখতে দেখতে ইন্দিরা বুকের ভিতর গরম পানীয় পুরে দিয়েছিল। যেন অ্যালকোহল নয়, দাদার আশ্বাসটাই তার মধ্যে ঢুকে আসছিল, এমন উষ্ণতা। কিন্তু তার ঠিক পরেই যে কি হয়ে গেল…

গ্লাসে চুমুক দেয় ইন্দিরা। এ পানীয়টাও উষ্ণ, তবে তাতে আশ্বাসের আঁচ নেই, যেন কেউ কোনো বেঞ্চে কিছুক্ষণ বসেই উঠে গেছে এমন উত্তাপ তাতে,- ক্ষণস্থায়ী।

হালকা সুরে ইংলিশ গান বাজছে হলঘরটায়। ইন্দিরা ঘরের বাকীদের দিকে তাকায়। এখানেও ভীড়টা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষদের নিয়ে তৈরি। একদিকে কার্ডগেম বেশ জমে উঠেছে, আরেক দিকে কয়েকজন গোল হয়ে বসে ডাম্ব শরাডস্‌ খেলছে। তাদের মধ্যে ইন্দিরা আনন্দীকে দেখতে পায়। দলটার দিকে এগিয়ে গিয়ে এক কোণায় দাঁড়ায় ইন্দিরা। গোল হয়ে বসা ছেলেমেয়েদের মাঝে দাঁড়িয়ে একজন অনেকক্ষণ ধরে কোনো এক সিনেমার নাম আকারে ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করছে যা কেউই ধরতে পারছে না। ইন্দিরার হাতের গ্লাস প্রায় শেষ হয়ে আসে। সে দেখে একের পর এক বিভিন্ন তিন শব্দের সিনেমার নাম বলে চলেছে দলের সবাই। কিন্তু কোনোটাই মেলে না। হঠাৎ কি মনে হতে ইন্দিরা বলে ওঠে, “দ্য জাঙ্গল বুক?” মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, বলে, “এতক্ষণে!” সবাই ইন্দিরার দিকে তাকায়। আনন্দী বলে, “আমাদের নিয়ম হল যে ঠিক উত্তর দেবে তাকে পরের সিনেমার নাম অভিনয় করে দেখাতে হবে।” ইন্দিরাকে চলে আসতে হয় দলটার মাঝখানে। একজন কানে কানে সিনেমার নাম বলে দিয়ে যায় ইন্দিরাকে।

একটা শব্দের নাম।

হিন্দি।

খানিক পুরোনো।

অভিনেতাদের চেনানো সহজ নয় বলে ইন্দিরা ভাবতে থাকে কিভাবে সিনেমার নামটা সবাইকে বোঝানো সম্ভব। ইন্দিরা দুই হাত দিয়ে বিস্ফোরণ বোঝানোর চেষ্টা করে। আর তার সাথে সাগর বা জল বোঝানোর চেষ্টা করে। অল্প সময়ের মধ্যেই দু তিনজন একসাথে বলে ওঠে, “বোম্বে!” ইন্দিরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ওই দুই তিনজনের মধ্যে একটা মেয়ে পরের সিনেমার নাম বোঝানোর জন্য উঠে আসতে ইন্দিরা দলটার মধ্যে একটা চেয়ারে বসে পড়ে। অল্প অল্প অস্বস্তি হতে থাকে ইন্দিরার, কেন সে বুঝতে পারে না। ইতিমধ্যে সমীক এসে অরেক রাউন্ড পানীয় দিয়ে গেছে সবাইকে। গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ইন্দিরা মেয়েটার মূকাভিনয় দেখতে থাকে।

দুই শব্দের নাম।

প্রথম শব্দের মধ্যে কুকুর আছে, মেয়েটা আকারে ইঙ্গিতে কুকুর বোঝানোর চেষ্টা করতে পুরোটা খুব হাস্যকর দেখায়। সবাই হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে হঠাৎ আনন্দীর উপর চোখ চলে যায় ইন্দিরার। সে দেখে আনন্দী তার দিকে নিস্পলক তাকিয়ে আছে। ইন্দিরা বুঝতে পারে কেন এতক্ষণ অস্বস্তি হচ্ছিল তার। সে স্থির হয়ে যায়। চেষ্টা করে চোখ সরিয়ে নিয়ে। পারে না। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আনন্দী যেন তার চোখ আঠা দিয়ে নিজের চোখের ওপর আটকে রেখে দিয়েছে। ইন্দিরার সারা শরীর ঠান্ডা জলে ভরে যায় যেন। শীত করতে থাকে। দলের বাকীরা টের পায় না কিছুই। আনন্দীর চোখে আটকা পড়ে থাকা ইন্দিরা চিৎকার করে উঠতে চায়। কোনো স্বর বেরোয় না তার মুখ থেকে। একটু পরে আনন্দী নিজের চোখ সরিয়ে নেয়। বাকিরা ততক্ষণে বলে ফেলেছে সিনেমার নাম। খেলা ভেঙে যায়, সবাই আরো একবার পানীয় নিতে ওঠে। আনন্দীও উঠে যায়। চেয়ারে বসে ইন্দিরার একা একা শীত করতে থাকে। উষ্ণতার জন্য ইন্দিরা একবারে তার গ্লাস খালি করে ফেলে।

অস্বস্তি কমে না।

রুবাঈকে দরকার এই মুহূর্তে। ইন্দিরা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। সমীক আরো এক গ্লাস পানীয় দিয়ে যায় তাকে। ইন্দিরা গ্লাস হাতে চারদিকে তাকায়। আনন্দী একটু দূরে বসে অচেনা দুজন মানুষের সাথে গল্প করছে। ইন্দিরার দিকে তাকাচ্ছে না আর। তবু যেন আনন্দীর দৃষ্টি ইন্দিরার সারা শরীরে ছেয়ে আছে। অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতায় ইন্দিরা গ্লাসের পুরো পানীয় ঢেলে দেয় গলায়। মাথা টলে ওঠে তার। গা গুলিয়ে ওঠে। সমীককে জিজ্ঞেস করে কোনো রকমে বাথরুমে চলে আসে ইন্দিরা। বাথরুমের দেওয়ালগুলো অল্প অল্প কাঁপছে। সে কমোডের পাশে মেঝেতে বসে পড়ে। এক হাতে বাথরুমের দরজা লক করার চেষ্টা করে। হাতের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ যেন নেই আর। ইন্দিরা হাল ছেড়ে দেয়। কমোডের জলটাও যেন হালকা কাঁপছে তার চোখের সামনে। তার প্রবল বমি পায়। কিন্তু সে বমি করতে পারে না, সারা শরীর থেকে জলের মতো ঘাম বেরিয়ে আসে। অথচ একটা আওয়াজও গলা দিয়ে বেরোয় না। আর তখনই বাথরুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে আসে আনন্দী। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে সে বলে, “যখন পারো না তখন চেষ্টা করো কেন?”

মুখ তুলে, অনেক কষ্টে, জড়ানো গলায় ইন্দিরা বলে, “বুঝতে পারিনি”, ঘামে তার কপালে চুলগুলো লেপ্টে যায়।

আনন্দী ইন্দিরার পাশে বসে পড়ে, কল খুলে অল্প জল দিয়ে ইন্দিরার মুখ, ঘাড় মুছিয়ে দিতে থাকে। ইন্দিরা অবাক হয়ে আনন্দীকে অনুভব করে। পশ্চিমভারতীয় একটা মেয়ে! কেন… কেন?! কেন সে ইন্দিরার কাছে এসে পড়ছে! যদি জ্বলে যায়, যদি আবার জ্বলে ছাড়খার হয়ে যায় ইন্দিরা! ভয় হয় ইন্দিরার খুব। রুবাঈয়ের গলা শুনতে পায় সে, বিকেলে যে কথাটা না বলে রুবাঈ হেসেছিল শুধু, তা এখন শুনতে পায় ইন্দিরা, “সমর্পন করো ইন্দিরা,- যেভাবে মৃত্যুর কাছে করতে হয়। বারো হাজার ফুট উপর থেকে স্কাই ডাইভ করার মতো, নিজেকে ছেড়ে দাও। মাটিতে আছড়ে পড়তে তো হবেই, কিন্তু তার আগে যে উড়ান… সে উড়ান রাজকীয়। সেদিনের ওই বাজপাখিটাকে মনে পড়ে? দুই হাত মেলে ভেসে পড়ো। জানো কি… ভয়ানক হলেও আছড়ে পড়াতে একরকমের কাব্য আছে!”

আর মুখ ভরে বমি উঠে আসে ইন্দিরার। কমোডের মধ্যে নিজেকে ছেড়ে দেয় সে।
গলা চিড়ে ভিতর থেকে আগুন বেরিয়ে আসছে যেন।

জান্তব আওয়াজের প্রতিধ্বনি হচ্ছে বাথরুমে।

কাঁপতে কাঁপতে ইন্দিরা নিজেকে ছেড়ে দিচ্ছে, বমির দমকে দমকে ইন্দিরা সমর্পন করছে।

বারো হাজার ফুট উচ্চতা থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ছে ইন্দিরা, পালকের বেগে।

আর তাকে আস্তে আস্তে লুফে নিচ্ছে আনন্দী। (চলবে)



পঞ্চম পর্ব

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য