দশটি কবিতা | নাদিয়া জান্নাত

বিপ্লবস্মৃতি


অনেক বিপ্লব জমা পড়ে আছে মনে।

হাত ধরে হাটে গিয়ে মাছ কিনে ঘরে ফেরা রাত
ফিরে যদি পাই, মনে হবে
তরতাজা ছাতিমের মতো শুয়ে থাকা
                                        ও-শয়ন ভঙ্গি

স্বর-ছন্দে যতবার হয়েছে সাক্ষাৎ
পালিত পাখির মতো যতদিন তার
বুক জুড়ে থেকেছি গোপন
                 মধু মধু ছিলো সেইসব

যৌথতার দিনগুলো রান্নার আনন্দে মেতে ছিলো
ভাবলেই মনে হয়, তেল নুন ঝালে কতকাল দেখা নেই তার

বন্যা কবলিত গ্রামে কচুফুল হয়ে ফুটে ছিলাম আমরা
যেনও ছিলাম কাদামাখা বোরো ধানের আইলে
মাথা বের করা টাকি মাছ

বহুবার নিষেধ না মেনে দুইজন
                                খেয়েছি গন্দম
দুনিয়ার দুই মেরু প্রান্তে
                                হয়েছি নিক্ষিপ্ত

ঠিকঠাক ফুটে উঠবার আগে আমাদের মন
নিশিদিন হয়েছে অঙ্গার।

 


বসন্তদিনে


বসন্ততে ফূর্তি লাগে মনে
অফিসগামী পাখিরা সব
উড়তে গিয়ে, অতর্কিতে থামে।
হন্যে হয়ে যোজন হাঁটা হলে
ধিনতা তালে কোকিল দেবে ডাক
কুহক কুহু মন ভোলানো ভোরে
বাতাসে আজ বহু রকম বাঁক।
আজ বাতাসে সর্বত্যাগী রোদ

এমন রোদে, ঝড়ের পেলে দেখা
দেহের শাখা দস্যু হতে রাজি,
নিকট ঠেলে দূরের ধূলা এসে
আজ সমীরে পাঠালো তার ধ্বনি!
অনেকখানি বাতাস হলো ফলে
হৃদয় হলো ঘাপটি মারা বাঘ!
খুচরো কথা জঙ্গলে থাক পড়ে
মাথার নিচে থাকুক শুধু কাঁধ।

থাকাথাকির উদাহরণ জেনে
আমরা থাকি যোজন কিলো শেষে
শিল্পগীত বসুন্ধরা তবু,
তোমার পথ, কেন্দ্র করে হাসে।
ধ্বংস ধসে মেলানকলি ফিরে
সৌরজগত উল্টে যদি যায়
মাতাল বুনো, তুরীয় ঝাঁ ঝাঁ গায়ে
ফাগুন ধূলা আটকে রাখা দায়।

 


পর সামাচার এই যে


পলায়ে যাবা তো ট্যাক্সি ক্যাবে
আমি জানতাম, যাবা দূর মধুপুর।
যাবা তুমি এক খলনায়িকার সাথে। নায়িকার ঠোঁটে রোজ ময়ূর ঘুমায়
আর কোল তার ভরে যায়
রঙ্গিলা কাবিনে

শান দেয়া চোখ,
তোমার মায়ারে আমি
কোরবানী করিয়াছি ঋণে।
বিকারে বিকারে খাঁখাঁ, তবু
বিরহে দিয়েছি বিষ ঝাঁপ।
হেমলকে তুমি সখা কোকিলেরো ডাক,
তোমারে শুনিয়া ভালো কেন
বাসি, ওই যমুনার জল
আয়নাতে দেখি হূর, ভাবি
খলনায়িকার বুকে কেন বাঁকা
বাঁকা চাঁদ ওঠে!
পাখিটি পালায়ে কেন যায়
হলুদ রঙের ট্যাক্সি ক্যাবে

ওগো কালো যমুনার জল,
রাত এলে তুমি বোবা হয়ে যাও যেন।
দিবস রজনী খিলখিল বাঁশি
ভালো লাগে না যে,
মহামিলনের হাসি ফালিফালি
করে দেয় দেখো!
দেখো তো জল্লাদ কেন আয় আয় ডাকে

কোন দূরে গিয়েছ তুমি যে,
আমি এক গেঁয়োভূত খুঁজে পাই
না তোমারে আজ।
ফিরে এসো, ঐ তরী যায় ভেসে
ফিরে এসো আমবনে।
ফিরে ফিরে জুঁইশাখে, এসো


ফেরিঘাট


ডাবল কেবিনে কেন পুড়ে যায়, বলো প্রিয় কামনার রঙ?
বজ্রাহত হতে হতে তুমি কন্ধকাটা
নদীকে ডিঙ্গিয়ে চলো শিখে নেই সরল গণিত।

প্রণয়ের কিছু কথা জানতে থাকুক  বাউফল ফেরিঘাট।
ছোট্ট গ্রাম, ধীরে ধীরে আলোহীন হোক
অবাধ কামনা ভেসে উঠুক ও চরে

বিচ্ছেদের মতো করে লঞ্চ পার হলো অন্ধকার,
স্রোতস্বিনী ফুল খুলে ফেললো মত্ততা।
আরো আলোহীনতায়
যে নামবে প্যারাসুট হাতে
সে যেন নদীতে ডুবে মরে

দুলে দুলে  তুমি তবে ডুবে যাও, নদী
শরীরের ভাঁজ থেকে খুলে আনো চাকা
তাপমাত্রা কমে গেলে সেবিকার পায়ে
রেখে দাও চরণ তোমার

দাপুটে নদীরা চিরকাল মহিষের পিঠে চড়ে চক্রাকারে ঘোরে। আর
যেভাবে চক্রিয় ভাবে ঘোরে বাস, দূর হাতিঝিলে
সেভাবে তুমিও কেন ঘুরে ঘুরে আসো
ডাবল কেবিনে

গরিবের মন নিয়ে আমি
তোমাদের ডাবল কেবিন
স্বপ্নে দেখি। ছন্দে ছন্দে আমি দুলি
এ-পিঠে ও-পিঠে, কেবিনের বারান্দায়।

প্রাসঙ্গিক নয়,
তবুও স্বপ্নই দেখি প্রতি রাতে। দেখি, ডাবল কেবিন বুড়িগঙ্গা
নদীতে মরছে একা একা।

 


জখম


কোমল চুমুর ধাঁধা আর
নখের আঁচড় দিয়ে নারী শুধু
শল্যবিশারদ হয়ে আসে।
এ কথা আমাকে তুমি বলেছিলে, বলেছিলে সোনাঝুরি গাছে
আচমকা, যে পাখি ডাকতে থাকে
তার পাশে নিয়তি হয়েছে ডুবু ডুবু

নারীরা টোটকা ভালো জানে।
ভরা বুক, তিলের ভেতরে পোষে
ছোট বড় শিশু।
আয়নার বিপরীতে
হাওয়ার ফাল্গন তার বেহিসেবি খুব।

আদমের নিঃসঙ্গতা নিয়ে
তোমার জখম পিঠে ধীর হয়ে
                     আছে বাঁকা চাঁদ।
রুপার চুড়ির মতো
সে যে শুধু কালো হয়ে আছে

একটু হ্যাঁচকা টানে মেলে দিতে
পারো তুমি চাহনি ছোবল।
যে নদী পূর্ব দিকে বেঁকে গেছে, তার
শিল্পকলা পূর্ণ করে দিতে পারো
                       কানায় কানায়

নারীর বিকল্প রুপে
স্থির হয়ে রয়েছে আপেল,
যেন আলোচনাহীন চলে যাচ্ছে
                         বসন্ত চৌচির!

যে মফস্বলের মতো আধো অন্ধকার আজ
মানুষের মন!

 


মাতৃ জঠর


দেহমিলনের দূই কূল
ভাসিয়ে রেখেছে চর, শুধু দুই দিকে।
আসমান থেকে পরীশিশু নিয়ে এসে
আমি হবো তার দুগ্ধবতী মাতা।

কূলহারা নারী আমি, শিশু পেলে ভুলে যেতে পারি সবকিছু।

স্নেহরাজ এইটুকু শিশু,
যাহার নোনতা ডাক আলো ভরা আধো।
হাড়গোড় পিষে ফেলে দুধের নহর
আনবে সে যে, বুকের সবটুকু ক্ষয়ে

দৌড়বিদ হবে শিশু। সে শিশু হবেই যেন গার্গী।
মরে যাওয়া বাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে শিশু আদরে ভাসবে রোজ রোজ।
শিশু তবে কি বাঁচাতে পারবে প্রণয় নদীমাতৃক এই বুকটুকু জুড়ে!
সে কি তবে ভাঙ্গবে ভাঙ্গন, অধঃপতনের সীমা!

রাত্রিদিন কলরোল হবে শুধু তার?
ঘুম ভেঙ্গে তার ঘুমঘুম মেটে মুখ!
রক্তে বীর্যে শিশু আসবে যে, তার
ঘ্রাণে নেব কোন অনুভব!

হাঁসের ডানাতে আমাদের শিশুছেলে আসমান থেকে আসতেছে ফুলে ফেঁপে!


ইবাদত


শীতের রাতে পাহারা দেবে জলের ধারা?
দেখাও তবে শরীরখানি ক্ষেতের পাশে
কোমল পিঠে হাতের জাদু ভাসবে নাকি
সাহস করে চুলের বেণী টানবে খুলে
ইচ্ছে হলে নাইতে নামা মরণ ঘাটে
মন্ত্র পাঠে সাঁতরে যাবে অল্প পানি
তৃষ্ণা থেকে জন্ম নেবে বিরুপ হাওয়া
কীর্তিনাশা শীর্ণ নদী শান্ত হলে
কানের পাশে ক্লান্ত কথা বলবে শুধু
প্রেম যখনি সেজদারত তোমার পাশে

জগত জুড়ে মুক্তি নাকি এই এখানে
অন্ধ হলে শরীর থেকে বংশ বাড়ে
নেতিয়ে পড়া এমন প্রেমে, ক্লান্ত তুমি!
ঐ উড়ে এক শীতের পাখি যাচ্ছে দূরে
ক্ষেতের পাশে কুন্দ ফুলে গাঁথছে মালা
লেপ্টে রাখো তোমার চুমু মালার পাশে
কল্লোলিত এই নদীটা হাঁটতে থাকো
হাঁটতে থাকো চলাচলের উল্টো পথে
এমন শীতে আমিষভোজে মন মানে না
প্রেম যখনি সেজদারত আমার পাশে

 


কাটা পাহাড়ের রাস্তায়


সমস্ত সম্ভবে তুমি আমি
পর্যায়ক্রমিকভাবে বিরহ কাতর।

রাত্রিভর বৃষ্টি হলে তাল তলোয়ারহীন
হিজল, শৃঙ্ক্ষলা মেনে
ভিজতেই থাকে কাটা পাহাড়ের পথে।

মাতৃস্তনের রূপ নিয়ে
মিনার দাঁড়িয়ে থাকে
যেরূপে, স্মৃতির দাহ
সেভাবেই চূড়া থেকে
চূড়ান্ত হল্লায় খসে পড়ে।

আচমকা সাক্ষাতের সম্ভাবনা
আমাদের নাই।
তাই বুঝি, কাটা পাহাড়ের পথ বেয়ে
নেমে আসে বরষা তুমুল!

 


মন্দাক্রান্তা দিনে


মেঘময় বরষার অরূপরেখা তুমি
নারীর মতো, ডু্ব দিয়েছ জলে।

স্যাঁতাধরা নদীটার নবীনজলে যেন
কুসুম তুমি, তাই শরীরে দোলো।

তুমি এক বালিহাঁস, শৈলিকলা তুমি,
রঙিন ঘুড়ি লাল শঙ্কা গানে

ব্যাঙেদের ডাকগুলো নটরাজন যেন,
ঘূর্ণি বাতাসের প্রবাহঘন।

দূর থেকে ভেসে আসা তানপুরাতে, তুমি
বর্ষা যেন, ওই শীতল দিনে

মন্দাক্রান্তার শেষটুকুতে তুমি
সবুজ ছোঁয়া নদী, বৃষ্টিবেলা

 


জন্মমৃত্যুচক্র


ফুলে ফুলকো লুচি, যদি নাইবা খাবো
তবে সকালবেলা, যাবো হাঁটতে নদী

যত শুকনো গাঙে, তরী ভচকে থাকা
দ্রুত সমাগত শীত, সাদা কুয়াশা মাখা

দূরে মাঠের ঘাসে, যারা চড়ালো গরু
তারা দাঁড়িয়ে থাকে, শীতে রোদের দিকে

যেন পথের শুরু! যেন অবাক হয়ে
পথ তাদের পায়ে, ফের রচিত হলো

তাই রোদের সাথে, নয়া নবীন পথে
বাধাপ্রাপ্ত হলে, উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়া

শ্বাস কার্যরত, ফলে দাঁড়াতে হবে
যদি মৃত্যু আসে, দাবি অন্য কিছু

ফলে মৃত্যু এলে, কাঁদে কোলের শিশু
সে কি কান্না বোঝে? বোঝে বাবার পিছু

সব শাণিত বুকে তাই শিশুর ভাষা
নেই সহজ কোনো, দেহে মৃত্যুও নাই

তারা মারবে রাতে, কালো অস্ত্র ঠেসে
তারা মারবে দিনে, দামি মেট্রো ধসে

দূরে মাঠের ঘাসে, যেই কবর আছে,
তাকে দেখতে গিয়ে, দেখি নামছে শিশির

লাগে ধাঁধার মতো, লাগে ছন্নছাড়া
ভরা দুপুরবেলা, দূরে মাঠের ঘাসে

বাধাপ্রাপ্ত হলে, উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়া
শ্বাস কার্যরত, ফলে দাঁড়াতে হবে

 

 




নাদিয়া জান্নাত

নাদিয়া জান্নাতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুড়িগ্রামে, পড়াশোনা রংপুরে। পেশায় দন্তচিকিৎসক। আরণ্যকের জননী, ধ্যান কবিতা লেখা। ভালোবাসেন নদীতে, পথে-প্রান্তরে ঘুরতে।

শেয়ার

Facebook
WhatsApp
X
Telegram
Threads

আরো পড়ুন

সুলাইম মাহমুদ
তাসনুভা তাজিন তুবা
শুভ্র সরকার
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
হুসাইন হানিফ
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
মেহেদি হাসান তন্ময়
তাহমিদ রহমান
মাহীন হক
দ্বিতীয় দশকের কবিতা
কাজল শাহনেওয়াজ
দ্বিতীয় দশকের কবিতা
অনুপম মণ্ডল
দ্বিতীয় দশকের কবিতা