রিয়াবানু সিরিজ | লাবিব ওয়াহিদ

ভালবাসতে পারি না


ভালবাসতে বাসতেই পথ হারায়া ফেলি
আমার খাসলতের দোষে আমি
ভালবাসতে পারি না

ভালবাসার আগে আগে
ভালবাসা পাইবার সাধ

ভালবাসার আগে আগে
আমার ইগো

দেখতে দেখতেই অন্ধ হয়া পড়ি
শুঁকতে শুঁকতেই নিজেরি জাগে
ফুল হইবার সাধ

ভালবাসতে বাসতেই পথ হারায়া ফেলি
আমার খাসলতের দোষে আমি
ভালবাসতে পারি না

 


ভিন্ন কোনও কনটেক্সটে


তুমি আসতে পারতা জীবনের ভিন্ন কোনও কনটেক্সটে
একটা ডিফারেন্ট এইজ গ্যাপ নিয়ে তুমি আসতে পারতা
ধরো একুশ বছরের তোমার সাথে
চব্বিশ বছরের আমার দেখা হইলো
তুমি আসতে পারতা ভিন্ন কোনও মিডিয়ামে
ধরো কোনও একটা কাজের উসিলায়
আমাদের বারবার দেখা হয়
তুমি আসতে পারতা সেই প্যারেলাল ইউনিভার্সে—
যেখানে আমার খুঁত আরেকটু কম
যেখানে আমার মাইনাস পয়েন্ট
বেশি না প্লাস পয়েন্টের চেয়ে
তুমি কতভাবেই তো আসতে পারতা
তার বদলে তুমি আসলা
সাইক্লোনের পরদিন
যখন আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি
আমার উড়ে যাওয়া টিনের চাল

 


সফিস্টিকেশনের চুড়ান্ত


তুমি নিচা বেঞ্চিতে বইসা
উঁচা বেঞ্চিতে রাখসো তোমার হাত,
তোমার সফিস্টিকেটেড
আংগুল ‘গুলা দিয়া
নাড়ানাড়ি করতেছো
হ্যান্ড-ব্যাগের চেইন

বাহিরে একটা পরিত্যক্ত টেবিলে
একটা সবুজ পাখি বইসা আছে,
যাতে ফ্রেম’টা এক কোনায়
খালি খালি না লাগে তাই

তুমি ঘাড়’টা হালকা কাত কইরা আছো।
আমি যখন যাবো, যখন ডাক দিয়া ফেলবো
রিয়াবানু নাম ধইরা, অপ্রস্তুত হয়া যাবা,
সেটা বুঝা যাবে তোমার কাঁধের ঝাঁকি দেইখা,
টুইটা যাবে বেদনার ধ্যান তোমার,
দেইখা ফেলবো চোখগুলা টলটল করতেছে—

জগতের সফিস্টিকেটেড অনুভূতি’গুলা তোমারই
এবং এগুলা কখনো বুঝা যায় না, যেন বুঝাইলেও
আমি বুঝবো না তাই তুমি বলো না কখনো

আর আমি মাথায় ক্যাপ পরা
সারাক্ষন ব্যাডমিন্টন ব্যাট হাতে ধরা
হাফপ্যান্ট পরা ওই এনার্জেটিক ভুদাই চরিত্র
যার কোনো সফিস্টিকেশন নাই, যে আসবে
শুধুই না বুইঝা ভাইঙা দিতে বেদনার ধ্যান

 


কুটুশি 


তোমার মুখের একেকটা সেনটেন্স
এক থালা বেবি সুইটসের মতো

উইন্ডোজ এক্সপির দিনগুলার মতো
সরল ও সুখকর তোমার সাথে বইসা থাকার
একেকটা বিশুদবার সকাল

লাগে যে হাফ ডে ইসকুল শেষে
আমড়ার বাটি কোলে নিয়ে
বইসা পড়লাম ডেক্সটপের সামনে

 


স্বপ্নে বর্ণিত বকুল ফুলের মালা


একটা বকুল ফুলের মালা নিয়ে
টাউন হলের মোড়ে
কেওসের ভিতরে আমি দাঁড়ানো।
ব্যাটারি রিকশাগুলা একটা আরেকটাকে
ঠুশ মারতেছে। ছাদ থেকে ইট ভেঙে পড়তেছে
চশমার দোকানের সামনে। আর তুমিও আছো।
যেই রাস্তা দিয়ে শহিদ মিনার যায় ওই রাস্তাটায়
একটা কনস্ট্রাকশনের বিল্ডিং-এর নিচে
তুমি দাঁড়ায়ে আছো।

তুমি দাঁড়ায়ে আছো একটা
বকুল ফুলের মালার অপেক্ষায়।

আমার হাতেই আছে সেই মালা।
কালকে সারারাত ধরে আমি এটা বানাইছি।
কিন্তু যখন তোমার সামনেই হাজির হয়
তোমার স্বপ্নে বর্ণিত বকুল ফুলের মালা,
তুমি তাকে চিনতে পারো না।
চোখের সামনেই জলজ্যান্ত মিরাকেল,
অথচ তুমি আলাদা করতে পারো না।
তুমি অন্ধ। একটা বাঁশের মই বেয়ে
তুমি কোথায় উঠে যাইতেছো।
সারাজীবন ধরে তোমার ওঠা শেষ হইতেছে না।

 


আমি ওরে কিছুই বললাম না


আমি ওরে কিছুই বললাম না
বলতে গিয়ে ব্যাক-স্পেস মেরে দিলাম
জানালার গিরিলে শুকাইতে রাখা রুমাল
তুলে নিয়ে ভাঁজ করলাম

দেয়ালের
লম্বা লম্বা মাশরুম থেকে
চোখ কান ঠোঁট আর টুপি তুলে নিয়ে
আবারও রঙের ডাব্বায় ভরে ফেললাম

আমি ওরে কিছুই বললাম না
শুধু জানলা খুলে পাখাওয়ালা মাছগুলাকে
বাতাসে ছেড়ে দিলাম

 


মন খারাপ হইলে


মন খারাপ হইলে
আমার দোকানে আসো
যেখানে যত্নের সাথে
মনের সার্ভিসিং করা হয়
নতুন পার্টস লাগিয়ে দেয়া হয়
স্বল্প মূল্যে

মন খারাপ হইলে
আমার নৌকায় ওঠো
যা তোমাকে নিয়ে যাবে
নদীর ঐ পাড়ে
যেখানে পৃথিবির সকল সুখ
তোমার বিশ্বাস

মন খারাপ হইলে
আমার বাগিচায় আসো
যেখানে পাকা পাকা আম নিচে পড়ে আছে
পাখিরা ঘুমায়া গেছে
মাছেরা রেস্ট নিতেছে ফিড খাওয়ার পর

মন খারাপ হইলে রে সখি
এইদিকে দিইয়ো নজর

 


তুমি থাকো 


কেউ শান্তিতে নাই

আমাদের থেকে
আল্লাহ তাঁর দয়া
তুলে নিচ্ছেন কিনা

এই প্রশ্ন সবার

এমন কঠিন সময়ে
তুমি হাত ছাইড়ো না

ছোট হয়ে আসতেছে
সবার বাড়ির উঠান
ভুগর্ভস্থ পানির লেয়ার
নিচে নেমে যাইতেছে

সবাই সবার মাংস খাইতে
আসবে একটু পরে

এমন কঠিন সময়ে
তুমি অন্য কোথাও যাইও না

রাস্তা ফুরানোর আগে তোমার
ফুরাবে ফোনের চার্জ
তুমি গাড়িও পাইবা না
এই রাইতে

এই রাইতে তুমি
গাড়িও পাইবা না
পৃথিবিতে রাক্ষস
আর মলম পার্টি
ঘাপটি মাইরা আছে

তুমি থাকো তারচেয়ে
এই খানেই থাকো

বাহিরে
বন্ধু ভেবে ভেবে তোমার
শুধু ভুল হয়ে যাবে

 


অদভুত ফিলিংসের কোলাজ


তুমি ভয় পাইছো
যখন আমি তোমারে
দেখাইছি আমার
অদভুত ফিলিংসের কোলাজ

তুমি ভয় পাইছো
আমার পেন্টাগোনাল শেইপের হার্ট,
ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রি না মানা
আমার কথামালা

আমার মুড সুইং

আমার দিন ও রাইতের
মধ্যেকার অ্যাসিমেট্রি

আমার খুনসুঁটির উঁচানিচা পথ
আমার আদরের পাঁচটা ডাইমেনশন

তুমি ভয় পাইছো

তুমি ভয় পাইছো
ছাবন মাসের তুমুল বিষ্টির
মতো আমার হঠাত কান্নার ঢল

তুমি দৌড়ায়েও খুঁইজা পাও নাই
কোনও শেইড

তোমার জ্বর হইছে
তোমার জ্বর হইছে
আমার পাগলা পিরিতির
জালা জন্তনায়

 


এইভাবেই


এইভাবেই তো আমি বড় হইছি
লাথিগুতা খাইয়া আর দুক্ষ পাইয়া

আর এমনেই বুইড়া হবো
তোমার দেয়া জ্বালায় পুইড়া পুইড়া

আর এই জ্বলন্ত আমার সামনে
তুমি বিসকুট খাইতে খাইতে
হেসে হেসে গইলা পড়বা

আমি বলবো, দেখো আমি জ্বলতেছি
দাউ দাউ করতেছে আমার সারা গা

তুমি হাসতে থাকবা যেন এটাও
আমার কোনো সারকাজম

মানুশ আমার ডাল কাইটা নিছে
মানুশ আমার ফল পাইড়া খাইছে
মনমতো কলম করছে আমারে
একই গাছ থেকে বিচিত্র রকম
ফল খাইবার লাইগা

শেষে আমারে গোড়াসুদ্ধা
ফালায় দিছে ধড়াম কইরা, ও মাগো
এটাই ছিল আমার সর্বশেষ চিৎকার

তারপরে খালি বয়স বাড়ছে
আর কখনো স্বর বাইরয় নাই

এইভাবেই তো আমি কাঠ হইছি
কখনো টিভি রাখার এস্ট্যান্ড
কখনো ডাইনিং রুমের চেয়ার
আর শেষমেশ তোমার ডেসিং টেবিল

এইভাবেই তো আমি কয়লা হবো
তোমার টিপ পরা দেখতে দেখতে
তোমার লাল নীল টিপ গায়ে নিয়ে
তোমার অনেক হাসিকান্নার নদী
বুকের মধ্যে নিয়ে এইভাবেই

 


রিয়াবানু, আহারে


আমি তারে এমন কইরা ফিল করি

সে যখন খুট খুট কইরা মেসেজ লিখে
ইংরেজি লেটারে বাংলা কথা

আর, একটাও ফুলএস্টপ না দিয়া
লম্বা লম্বা কথা লিখে যায়

আমার কি যে ভাল্লাগে

আমি তারে এমন কইরা ফিল করি
তার প্রতিটা মেসেজ ইমাজিন করি
যেন সে বলতেছে এভাবেই
অনেকক্ষণ কথা বলার পর থামতেছে
যেন হাঁপাইয়া উঠতেছে

তারপর আরও কথা
আরও কথা
ঝরনার মতো আমি ভিজে যাই
তার মেসেজে

আমি তারে এমন কইরা ফিল করি

তার কথাগুলা দিয়া
তৃষ্ণার্ত কাকের মতো তৃষ্ণা মিটাই

আমার কানে আমি বাজাই
তার কথাগুলাই

চোখের সামনে টিভির মতো দেখি
মুমিনুন্নেসা কলেজের ঘাসে ঘাসে
তার হাসির লহর বয়ে যাওয়া

দিনে দিনে সে যে আমার
কতো কাছের হইতেছে—

খুশিতে আমি রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াই
সোনালি বিরি ধানের মাঠে ঘুড়ি উড়াই

খুশিতে আমি পাকা ধানের গন্ধ শুকি
পাকা আমের দিন গুনি
ছোট ফেনি নদীর জলে
গামছা পরে নেমে যাই

 


শোনো লাবিব


যেই জিনিশ ছাড়া তুমি থাকতে পারো
কেবল সেটারেই তুমি ভালবাসতে পারবা

যেটা ছাড়া থাকতে পারো না
সেটাকে ধরে রাখার চেষ্টা
তোমার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখবে

কিন্তু এভাবে ধরে রাখা-ও যায় না

দেখবা তুমি নিজেই ভেঙে ফেলবা;
সবচেয়ে প্রিয় পুতুলের ঘাড়
নিজের হাতেই মটকে দিবা

কারণ তুমি ভেঙে ফেলতে চাও
তোমার অবসেশনটাকে

আর, যদি ভেঙে ফেলার পর
সুপার গ্লু নিয়ে আবার ছুটে যাও
হয়তো সেটাই হবে সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়

শোনো লাবিব,
ছোট মানুষ কখনো ভালবাসতে পারে না
অস্থির চিত্ত শুধুই ঘৃণা কুড়ায়

সবচাইতে কঠিন তালার পিছনে
লাগে সবচাইতে বড় ধৈর্য

ধৈর্যহারা কখনো তালা খুলতে পারে না
সঠিক চাবি হাতেও সে ব্যর্থ হয়

সে চাবি থেকে চাবিতে যায়
তার কপালে ঘাম জমে
পালস রেট বেড়ে যায়

যত ঘাবড়ায় ততই ভুল করে

শোনো লাবিব,
উপসংহারের পিছে দৌড়িও না
সবচেয়ে দামী মুক্তা কেবল ধৈর্যেরই উপহার

তাই প্রতিদিন মাটি কাটতে হয়
প্রতিদিন জাগতে হয় ভোরবেলায়
সমান সমান দরদ প্রতিদিন জোগাইতে হয়

শোনো লাবিব,
এ এক সুনিপুণ কৃষিকাজ
অস্থির চিত্তে হয় না চিকন সুতা

একটা নরম কাঁথার লাগি হইতে হয়
একটা শান্ত দিঘীর পরান

সাগরের ঢেউরে বান্ধা লাগে
মাম পানির বোতলে

 


প্রত্যেকদিন সকালে


প্রত্যেকদিন সকালে
মাথা তুলে দাঁড়ায় বেদনার কালো হাঁস

বৃষ্টির পানি জমা নরম উঠানে
ছলাৎ ছলাৎ করে হেঁটে যায়

আমি কুঁচকে থাকি
স্পর্শকাতরতায়

প্রত্যেকদিন সকালে
বাকবাকুম শব্দ করে বেদনার কবুতর

বেদনার শাদা বক
বেদনার নিঃসঙ্গ গাছের উপর
দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে উড়তে থাকে

আমি ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দিই

এ মাটি উর্বর, এ মাটি রসে ভরা,
এখানে যেকোনও হঠকারিতা
হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়

সভ্যতার যাবতীয় হঠকারিতার ফাঁক গলে
এখানে প্রকৃতি ফিরে আসে

একটা এরোপ্লেনকে ঘিরে ফেলে
দুইদিন আগে জন্মানো ঘাস

একটা ট্রাকের ড্রাইভিং সিটে ফুল ফুটে

চেষ্টা কইরো না লাবিব
চেষ্টায় সব নষ্ট হয় আরও
কষ্ট আরও বেড়ে যায়
রক্তের ফোটায় উঠান ভিজে ওঠে

 


ফিরবো কি ফিরবো না?


কতবার যে আমার মনে কইছে
আবার ফিরা যাইতে

হঠাত বুকের মধ্যে কামড়াইয়া উঠছে
রাস্তার দিকে চাইয়া

পিচঢালা দীর্ঘ হাইওয়ে
দুইপাশে অপরিচিত গাছের লাইন
ডিভাইডারে বড়লোকের মাইয়াদের মতো
অজানা বেরহম ফুল

গাড়িঘোড়া একটাও নাই আর
শুধু আমারটা ছাড়া

কতো দূরে আমি চইলা আইলাম
সন্ধাও ঘনাইতেছে এখন
ইঞ্জিনটাও তো খুব ভালা না

এখানে কোথায় মেকানিক পাবো আমি
বাইচান্স যদি লাগে

কেন আমি নিজেরে এতিমের মতো
ছাইড়া দিলাম এই একলা সফরে

কেন আমি নিজেরে ট্রিট করলাম
একটা দলছুট মার্বেলের মতো

কেন আমি নিজেরে ছুড়ে ফেলে দিলাম
এই বিরান রাস্তায় হারাইয়া যাবার জন্য

যেখানে একটা টং দোকানও নাই
এমন জায়গায়—

কেন আমার তখন লাগতেছিলো
এটাই মোক্ষ এটাই আমি চাই

কতবার যে আমার মনে হইতেছে
আবার ফিরা যাই

মনে হইতেছে সে তো এতটাও
পাষাণ ছিলো না

যতটা লাগতেছিলো তখন অভিমানের সময়ে

 


যাবো তোমার


যাবো তোমার গোপন এলাকার ভিতর
যেখানে ঘোমটা খুলে বসে আছো
যাবো বৃন্দাবনে ঘোর বরষার দিন

ও রাধে, রাধে, রাধে
দুয়ারটা খুলে দাও
বাহারি পাখির ঝাঁক হয়ে আসো রঙিন

ও রাধে তুমি শরৎকালের দুপুর হয়ে
আমার কপালে দিয়ো বিন্দু বিন্দু ঘাম

একটা কাশবনের মতো
আমার সামনে বসে থাকিয়ো
গুণগুনিয়ো প্রিয় ফুলেদের নাম

গুণগুনিয়ো তোমার প্রিয় গানের কলি
জানাইয়ো অনেক মজার ঘটনাবলি
হইয়ো এক বিকেলের সাথী আমার

ও রাধে, রাধে, রাধে
লাবিবের তোর আশাতেই দিনগুজার

 


আমার কবিতার নামে


আমি কবিতায় কতকিছু হইছি
যেমন তার কানের লম্বা দুল
তার হাতভর্তি জারবেরা ফুল
তার সাজতে বসার আয়না

কতকিছু সাজলাম আমি কবিতায়
আর কতরকম সুরে আমি কানলাম
কতবার শ্যাম হয়ে বাজাইলাম বাঁশি
কতবার কলশি কাংখে নিলাম রাই সেজে
ছুটে গেলাম যমুনায়

সে এসবের কিছুই বুঝলো না
কোনোদিন মুখ ফুটে কইলো না
দুইটা ভালোমন্দ কথা আমার
কবিতার নামে

 


এমন গোঁয়ারের মতো


এমন গোঁয়ারের মতো
খুঁটি ধরে থাকো কেন

বানের তোড়ে একবার
ভেসে যাও না

বুঝি না কেন রে বন্ধু
ভালো পাও না

কতদূর আমি চইলা গেলাম
ভুল রাস্তায়

উল্টা দিকের অটো চইড়া
গেলাম চাষাড়ায়

পিছন থেকে চাইয়া দেখলা
কেন ডাক দিলা না

জানি না কেন রে বন্ধু
ঘর চিনাইলা না

বেখেয়ালেই আমারে মুছে দিয়ে
বেখেয়ালেই আবার আঁকো

এমন বেড়ালের মতো
কেন সংশয় ধরে থাকো

ভুলেই যদি যাবা তবে
গন্ধ কেন শুঁকো এসে

ডাকু যদি মনে হয়
কাছেই কেন আসো

 


শেয়ানা বেপারি হইও


কুলুকুলু নদী হয়ে বহিয়া চলিলাম
তার পাশে পাশে

কে বুঝে রে দাঁতের দাম দাঁত থাকিতে

যেমনে চলে তেমনি চলিলাম
তার বাঁকেতে বাঁক লইলাম
থামলাম আমি সে থামিলে

পোড়া লাবিব কয় লোক ডেকে ডেকে,
মনের মাংশ বিলাইয়ো না বিনে পয়শাতে

নিও নিও, দাম নিও, আনায় আনায় গুনিয়া,
ধরিয়া রাখিও ভাবসাব আপাদমস্তক জুড়িয়া,
শেয়ানা বেপারি হইও, বুঝিও ধান্দা হাড়ে হাড়ে

 


বাটি ও আইসক্রিম


যদি দুইদিন কথা না বলো
যদি দুইদিন খেয়াল না করো

বড় কোনও ব্যাপার না এটা
এখন আমি বুঝি

শীতের রাতে আগুন জ্বালিয়ে
রাত শেষের জন্য বসে থাকি

ওই আগুনে মাংস পুড়ে পুড়ে খাই
নিজেরে থামাই, নিজেরে থামাই
নিজ থেকে না ডাকি যেন
নিজ থেকে যেন না যাই

যেন নিজেই ফিরে আসো
পিছন থেকে কাঁধে হাত রেখে
যেন নিজেই নাম ধরে ডাকো

আর তখন
আমিও আইসক্রিম হয়ে
ধীরে ধীরে গলে যাবো

তোমার রোদের আলোয় গলতে গলতে
তোমার বাটির আকার
ধারণ করবো

 


সবকিছু এভাবেই বানানো


বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে
এই মহাবিশ্বের জন্ম হইছে

একটা বিরাট বিস্ফোরণ
তারপর আরও অনেক কিছু

শুরুতে তো অণু-পরমাণুও ছিল না
সবকিছু ধাপে ধাপে আসছে

আমরা কথা বলতে পারি নানা বিষয়ে
ফিজিক্সের রুল কখন কীভাবে আসলো
কেমিস্ট্রির রুল কখন কীভাবে হইলো
আর বায়োলজির জন্ম কোন মুহুর্তে

নানারকম রুল আছে
এগুলা মেনেই সবকিছু চলতেছে
একটা গ্রহ উড়ে এসে
আরেকটা গ্রহের অরবিটে
চলে আসতেছে না

চাইলেই মঙ্গল আর পৃথিবী
পারবে না একই কক্ষপথে
দুইজনের সংসার বানাইতে

এখানে নিয়ম শৃঙ্খলা আছে
সূর্য পূর্ব দিকেই উঠে
আর পশ্চিমের দিকেই গড়ায়া যায়

চাঁদের আকর্ষণে জোয়ার ভাটা হয়
তেজ কটাল মরা কটাল
আরও কি কি আছে

সবকিছু এভাবেই বানানো—
নিয়মের অধীনে

নিয়মের সাথে নিয়ম
তার সাথে আরও নিয়ম
এভাবে একটা জাল হইছে

সব ঘটনা
এই জালের ভিতরেই ঘটে
জালের বাইরে কোনো ঘটনা নাই

নিয়মেরা নিয়ম’দের সাথে মিলে
এমনই এক জাল বানাইছে
যেখানে আমাদের মিলনের
নাই কোনো পথ

যতোই চেষ্টা আমি করি তবু
তা শুধু তোমাকে
আরও দূরেই নিয়ে যাবে

এভাবেই সবকিছু বানানো হইছে

 


এমনভাবে বেঁধে ফেললাম সমুদ্রকে


এমনভাবে বেঁধে ফেললাম আমি
আমার বুকের সমুদ্রকে—

এমনভাবে ফ্রিজ হয়ে গেলো সমুদ্র;
তার উজান, তার শাদা ফেনা
সবকিছু এমনভাবে
থমকে গেলো
এক পলকে—

এমনভাবে হাওয়ার গতি
শূন্য হয়ে গেলো
যা কিছু যেমন ছিলো
তেমন রয়ে গেলো—

পাঁচতলা থেকে ছুড়ে ফেলা ময়লার পলিথিন
এভাবেই ভেসে থাকলো শূন্যে— স্থির

হৃদপিণ্ড বন্ধ করে শীতনিদ্রায় চলে গেলাম
যেদিন জাগবো সেদিন আবার
শুরু হবে বয়স এখান থেকে

চুপ একদম চুপ মেরে গেলাম
যেন কোথাও কোনও ঝড় নাই
রক্তের প্রবাহ নাই

পাহাড় হয়ে গেলাম আমি,
বরফ হয়ে গেলাম আমি,
কিছুই বলবো না আর

কিছুই বলবো না আর,
কিছুই দেখাবো না,
জানাবো না কিছুই

নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখলাম আমি,
যেন পোস্টার পড়তেছি এমন ঢংয়ে
থাকলাম দেয়ালের দিকে চেয়ে

তোমারে পার হয়ে যাইতে দিলাম
আমার পিছ দিয়ে

 


মৃত ছিলাম, হারিয়ে ছিলাম


মৃত ছিলাম, হারিয়ে ছিলাম
এই পৃথিবী থেকে

তুমি রিপ্লাই দিবার পরে
সতেজ হই

কিছুক্ষণ মেসেজটাকে
এভাবেই থাকতে দেই,
সিন করি না

তুমি রিপ্লাই দিবার পরে
চায়ের পানি বসাই, বারান্দায় যাই
ব্যাটারি রিকশাদের চলাচল দেখি
নিজেকে বলি অনুভব করো এই সময়টাকে

তুমি রিপ্লাই দিবার পরে
পাখিদের খাওয়াই, গোসল করি, গান গাই

 


উজ্জলতা


ভালবাসা তো একটা শব্দ

বললাম, আমি তোমাকে ভালবাসি;
আসলে কোন ঘটনাটা ঘটতেছে
আমার মধ্যে?
কোনটারে আমি ভালবাসা নামে ডাকতেছি?

আসলে তোমার সাথে যখন থাকি
গুড ভাইবে থাকি
আমার ভালো ফিল হয় বোথ শরীরে ও মনে
একটা পিয়ানো বাজতে থাকে
জীবনের পর্দার পিছনে
আর আমি যেন ইসকুলে পড়ি
সারাদিন চলমান একটা সাইকেল
যা কোনও দিন কোনও স্টপেজে
আর থামবে না

আই লাইক দা আইডিয়া অফ ইউ
আমি পছন্দ করি তোমার ভেতরের সকাল বেলা

আর আমি জানি
সকাল বেলার মধ্যে দিয়েই আমার
যেতে হবে সকাল বেলার দিকে

আর তোমার কাছে যাওয়া
একটা ভেতরের দিকের যাওয়া

আর এটা হচ্ছে এমন
যেন আমি
আমার গা থেকে
একটার পর একটা জ্যাকেট
খুলে ফেলে দিচ্ছি

যেন হালকা হয়ে যাইতেছি রোজ রোজ
যেন দিনকেদিন বেড়ে যাইতেছে
আমার উজ্জলতা

 


সে এক পাহাড়ি ঝর্না


সে এক পাহাড়ি ঝর্না
শুধু আমার বেলায় তার জল শুকিয়ে আসে

সে পাহাড়ি ফুলের দেবী
সে হাঁটলেই ফুল ছড়ায় পথে পথে
যেখানে সেখানে সে ছড়িয়ে বেড়ায়
তার ফুলফুলাদি

শুধু আমার বেলায়
ফুলেরা কাগজ হয়ে যায়,
চোখেরা ঘুমে ভেঙে আসে

আমার বেলায় বলতে হয়
আজ ঘুমায়ে যাই

তবু আবার যখন সে আসে
টাশকি লেগে ভাবি এ নজরানা
খোদার নাকি শয়তানের তরফে আসে

সে এক পাহাড়ি ঝর্না
শুধু আমার বেলায় তার জল শুকিয়ে আসে

 


পরিশেষে


পরিশেষে তোমারি কাছে ফিরা আসা বাইধ্যতামূলক
অনেক রাগ বিরাগ কইরা, মনে মনে গজগজ
করতে করতে তোমারে যেন কথার তীর দিয়া
খুন কইরা ফেললাম কয়েকবার
আর সব চক্র পুনরায় ঘুইরা ফিরা
পরিশেষে তোমারি কাছে ফিরা আসা অমোঘ বিধান

পরিশেষে তোমার ভোলাভালা কথায়
গলতে গলতে, একটু একটু সংশয় নিয়াও
আগাইতে থাকা আর কথা কইতে থাকা

কেমন আছো,
কী অবস্থা তোমার,
রইদ আছে নাকি তোমাদের ওইখানে?

আমাদের এইখানে তো রইদ পড়তাছে
অফিসে রওনা হইলাম নাস্তা করি নাই

তুমি কি ছাতা লাইক করো? ছাতা?
তোমারে একটা মাল্টিকালার
ছাতা কিন্যা দেই?

 


তোমার মতো করে কথা বলি


আমি তোমার মতো করে কথা বলি
তোমার মতো করে তোমাকে ডাকি
তোমার মতো করে তোমাকে বলি –
তুমি যে আমার পাখি

জমাট বেঁধে যায় পুরো পৃথিবী
হয় যদি একটা লাল গোলাপ ফুল
যদি জন্ম লয় এক মানবী
সেই তো তুমি
মিলিত হয় পৃথিবীর সকল নদী
উত্থিত হয় সকল আগ্নেয়গিরি
পৃথিবীর সব ফুল তোমার
পৃথিবীর সব বাগান তোমারি
পৃথিবীর পরতেকটা সকাল তোমার জন্যে আসে
পৃথিবীর সব শাড়ি তোমার জন্যে বোনা হয়
পৃথিবীর সব নূর জ্বলে ওঠে
তোমার বাড়ি

 


তুমি শুধু দূরে যেতেই পারো


তুমি শুধু দূরে যেতেই পারো
দূরে যাওয়া তোমার হাতে একটা আর্ট;
কত যে সুন্দর ভাবে তুমি দূরে যাইতে পারো,
কত যে মিহি মিহি সুতার আচড়ে
তুমি দূরে যাইতে পারো,
কত মিঠা মিঠা পানির আবেশের ভিতর
আমি হঠাৎ বিমোহিত হয়ে দেখলাম
কখন তুমি নিঃশব্দে চলে গেছো
এক কোটি আলোকবর্ষ দূরে;
বিমোহিত আমি বিমোহিত হয়ে দেখলাম
তোমার এইসব আর্ট
যেন একটা এবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং
অনেক ক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম
অনেক দিন তাকিয়ে থাকলাম
প্রতিটা খণ্ড খণ্ড চেয়ে দেখলাম
একেকটা বিকাল কাটানোর মতো
একেকটা বিছানায় ঘুমাইয়া পড়ার মতো;
তোমার দূরে যাওয়া দেখতে দেখতে
আমি এই পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম
নাপিতের মেশিনের ঘষায় চুলেরা যেমন
নেশাগ্রস্তের মতো ছুটে যায় বাতাসের সাথে

 

 



লাবিব ওয়াহিদ

প্রকাশিত কবিতার বই: মনে হয় তোমারি দরদ দিয়া বানাইলা, আমিই তোমার সরকারি হাসপাতাল। অনুবাদ করেন। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দেশের বাড়ি নোয়াখালী।

শেয়ার

Facebook
WhatsApp
X
Telegram
Threads

আরো পড়ুন

আবু তাহের তারেক
তানভিরুল হক রাহাত
সৌরভ রায়
সত্যজিৎ সিংহ
রাবিয়া সাহিন ফুল্লরা
নাদিয়া জান্নাত
সুলাইম মাহমুদ
তাসনুভা তাজিন তুবা
শুভ্র সরকার
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
হুসাইন হানিফ
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
মেহেদি হাসান তন্ময়
তাহমিদ রহমান