নফি এজবাত ও জহির হাসানের কবিতা | আবু তাহের তারেক

জহির হাসানের কবিতার লাইন আল মাহমুদ ও ফরহাদ মজহার— এই দুইজনের কবিতার লাইনরে ‘ইন্টারসেকশন’ করে। হজরত আল মাহমুদ তান নিকট-দূরের কাব্যপ্রতিভাদের কাছ হইতে একটা সংশ্লেষী ভাব গ্রহণ করছিলেন। তান লেখায় আমের স্ফূর্তি থাকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই, তিনি একটা ‘আধুনিক’ প্রসেসে কাব্য রচনা করতেন। যাতে থাকত ‘শব্দ’ ও ‘মিউজিকের’ দৃশ্যমান প্রয়োগ। হজরত ফরহাদ মজহার আল মাহমুদের কবিতার গুণাবলীরে বহুলাংশেই ধারণ করেন। তদুপরী, রচনায় একটা ভাব-বিশ্লেষণী ধারা তৈয়ার করতে সচেষ্ট হন তিনি। জহির হাসান আল মাহমুদের উপরে উল্লিখিত ‘কৌম চৈতন্যরে’ ধারণ করেন। আর ফরহাদ মজহারের ‘ভাব-বিশ্লেষণী’ ধারারেও নিজস্ব বোঝাপড়ার আলোকে বর্ণিল কইরা তোলেন।

 

কবিতা বিষয়ে জহির হাসানের বোঝাপড়া কেমন! তা বুঝার জন্য, উনার একটা কবিতা পাঠ করি, চলেন—


বাঁশবনের কাছাকাছি

হাঁসগুলি ডুব দিতেছে জলের তলে
তারা যতটুকু সাদা পালকের ছিল
ততটুকু কি থাকতে পারতেছে!

বাঁশঝাড়ে নাই বইছে বাতাস
নড়েচড়ে শুধু ঘুমে।

দাঁড়ায়ে রয়েছে দূরে
একটা ছাতিম উল্টা লামের মতন স্থির।

কোনো গান গাইতে
সাহস পাইতেছি কই!

আমি তো দাঁড়াই
দূরে এক কাতারেই
ওদের আঞ্চলিক ভাষা যদি কিছু বুঝি!

 


কবিতাখানার পয়লা তিন লাইন পড়েন। জলের তলে ডুব দেওয়ার পরের সাদা হাস, আগের মতন সাদা থাকতেছে না— এই কথা তিনি বলতেছেন না। তবুও, সেইটাই মিন করতেছেন প্রশ্ন করার মাধ্যমে। ইসলামের বিখ্যাত ‘নফি-ইসবাত’ ধারণা এইখানে কাম করতেছে। আমরা কলিমা তয়িবায় বলি, ‘কেউ নাই ইলাহ হিসাবে’। এরপরে বলি, ‘আল্লাহ ছাড়া’! (লা ইলাহা, ইল্লাল্লাহ)। মানে, আগে না আসল। তারপরে হ্যাঁ আসল। এই কারণে দেখবেন, সুফি তরিকায় আল্লারে পাওয়ার পয়লা ধাপ হইল ত্যাগ করা। খালি করা। এরপরে, শূন্যের মইদ্যে খোদার কুদরতি হাজিরা অনুভব করা।

 

আমরা কবিতায় বর্ণিত ‘উলটা লামের’ কাছে আসি। আরবিতে ‘লা’ শব্দের অর্থ না। এদিকে, আলকোরানের শুরু হয় তিনটা হরফ দিয়া- আলিফ, লাম ও মিম। সুফি সাধকদের কাছে এই তিন অক্ষর মূলতঃ দেখার তিনটা দুনিয়া। আল কোরানের সুরা বাকারার শুরু হয় এমনে— ‘আলিফ লাম মিম। জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফিহি’। আলিফ, লাম আর মিম হইল তিনটা হরফ। এদের বাহ্য কুনু অর্থ নাই। উনারা হইলেন সুরা বাক্বারার পরথম আয়াত! দোসরা আয়াতে খোদা বলতেছেন, ‘এই কিতাব বিষয়ে কুনু সন্দেহ নাই।’ অনেকে বলেন, ‘এই কিতাব’ বলতে আলকোরানরে বুঝানি হইছে। যদিও একটু খিয়াল কইরা পড়লে, এও বুঝা সম্ভব যে, ‘এই কিতাব’ বলতে পয়লা আয়াতের ‘আলিফ লাম ও মিমরে’ বুঝানি হইছে! সুফি সাধনায় এইজন্য, আল্লারে পাইবার পথ গূঢ়। এখন, জহির হাসানের কাছে, আলিফ-লাম-মিমের ‘লামখানা’ উলটা। অর্থাৎ, আরো জটিল ও বোধগম্যহীন! তাই ‘কিতাব’ (আলিফ-লাম-মিম) পড়তে নিজেরে মাজুর বা দুর্বল ফিল করতেছেন তিনি। ফলে, কিছুটা হতাশাবশত, কুনু গান গাওয়ার দুঃসাহস মনে আনতে পারতেছেন না কবি!

কবিতার শেষ তিন লাইনে আবার ‘নফির’ ব্যবহার করছেন লেখক। তিনি খাড়া হইতেছেন ‘দূরে’। অবশ্য, একই লাইনে বলতেছেন, ‘এক কাতারেই’! অর্থাৎ, তান কাছে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’র দূরত্ব বেশি নয়—অল্প। একদম শেষ লাইনে তিনি একখান পদ ব্যবহার করছেন— ‘আঞ্চলিক ভাষা’। আদতে, জহির তথাকথিত এই ‘আঞ্চলিক ভাষা’ দিয়াই তৈয়ার করবেন তান কাব্যজগত।

উপরের কবিতায় খিয়াল করি যে, জহির হাসান গল্পের ভঙ্গিমায় কথা বলেন। যার আবার গদ্যবৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এদিকে, তার কবিতায় বয়ানের একটা রীতি আছে। তা, মূলতঃ ‘না’ হইতে ‘হ্যাঁ’র দিকে সদা যাইতে প্রস্তুত। আর, তান বুলি ‘আঞ্চলিক’। ফলে, আমরা পকিরিতির লগে মোলাকাতের একটা আন্তরিকতাও খিয়াল করি উনার কবিতায়।


জহিরের কবিতায় খালি খালি লিটারারি ফিগারের মাধ্যমে পকরিতির পারসনিফিকেশনই থাকে না, তাতে ভাবও থাকে সমানতালে।


জহির একটা ইসলামি সভ্যতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, বা ওয়ার্ল্ডভিউ চাউর করেন তান কাব্যজগতে। তান কবিতায় শূন্য, নাস্তি, বা নফির উপস্থিতি জরুরীভাবে হাজির থাকে। থাকে ইসবাত বা অস্তির হাজিরাও। এই জাগায়, তারলন কবিতা বাংলা মুলুকের অন্যতম আদি ভাব ‘বৌদ্ধবাদের’ লগে মিলামিশা করে। যদিও তিরিশের দশকীয় নিখিল নাস্তিরে তার কবিতা আইঞ্জা মারি ধরে না। আসলে, পশ্চিম ইউরোপীয় চিন্তা ও যাপনে একটা নিখিল নাস্তির উপস্থিতি আছে। তীব্র শীত ও ঊষড় ভূমি দ্বারা বেষ্টিত হওয়ার কারণে বুঝি বা, পশ্চিম ইউরোপীয়দের মানসিকতার গড়ন অন্যরকম। ‘মডার্নিজমের’ আবির্ভাব তাদেরকে আরেক প্রস্থ নাস্তির অন্দরে হারাইছে (ঢুকাইছে)। তিরিশি কবিরা, অনেকটা মনোজাগতিক উপনিবেশবশত, (পড়ুন, ‘মাইমেটিক ডিজায়ার’) পশ্চিম ইউরোপের ‘মডার্নিস্টিক’ কাব্যভঙ্গিমা রপ্ত করার তৎপরতা চালাইছিলেন নির্দ্বিধায়। পরে এইটা ব্যপকহারে পরবর্তী কবিদের আরাধনার-বস্তুতে পরিণত হয়। জহির এই ‘মডার্নরে’ তিরিশি লফজে গ্রহণ করেন নাই।

ইসলামি ঐতিহ্যে, কায়েনাতের সবকিছুই খোদার কুদরতের অংশ। হজরত ইবনে আরাবির কথাবার্তা এই জায়গায় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহ পাক ‘’কুন” বা হও বলার পরে, “ফায়াকুন” অর্থাৎ, সবকিছু হইছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাই খোদার এলাহি কুদরত। গাছ, বিরিক, লতা, পাতা এই কুদরতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কারণে দেখবেন, জহির হাসানের কবিতায় একটা জসীম-উদ্দীনীয় বস্তুবিশ্ব হাজির থাকে। অবশ্য, এই ‘বিশ্ব’ জহিরে আরো ব্যপক অর্থে ও শৃংক্ষলিত উপায়ে প্রযুক্ত। তিনি ইসলামি সভ্যতার জায়গা হইতে একটা ‘কসমোলজি’ ধার করেন। যেইখানে সবকিছু একে অপর হইতে বিযুক্ত নয়! এই ধারণা দক্ষিণ এশীয় চিন্তার অন্যান্য ঘরানায়ও একভাবে না একভাবে বিদ্যমান। জসীমের লগে জহিরের আসল তফাত ‘ভাবে’। জসীমের কবিতায় আঞ্চলিক উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকে। যেইগুলারে তিনি লিটারারি ফিগারের মাধ্যমে, একটা মানবিক রূপে (পারসনিফিকেশন) হাজির করেন। জহিরের কবিতায় খালি খালি লিটারারি ফিগারের মাধ্যমে পকরিতির পারসনিফিকেশনই থাকে না, তাতে ভাবও থাকে সমানতালে।

জীবনানন্দের লগেও জহিরের একটা লেনাদেনা আছে। জীদার কবিতায় বাংলার মাটি, জল, রূপের ব্যবহার আছে ব্যাপক অর্থে। অবশ্য, সেইটা অনেক বেশি ‘চিত্ররূপময়’। তাতে উপমা ও চিত্রকল্পের ব্যবহার অত্যধিক। অন্যদিকে জহিরে রূপকের ব্যবহার বেশি। ‘সিমিলি’ ও ‘ইমেইজ’ একটা ‘সেনসুয়াস’ অভিজ্ঞতা ক্রিয়েট করে। অন্যদিকে, ‘মেটাফর’ ও ‘এলিগরি’ একটা ‘ট্রান্সফরমেশনাল’ অভিজ্ঞতা দান করে পাঠকের মনে। রূপক একের লগে অন্যের ‘মিলনরে’ সম্ভব করে। উপমায় সেইটা খুব একটা পসিবল হয় না। এই কারণে, সুফি সাহিত্যে রূপকের ছড়াছড়ি। মডার্নিস্ট ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদীরা (পড়ুন, ‘ইন্ডিভিজুয়ালিজম’) হয়ত তাই, রূপকরে ভয় পায়! সিমিলি, ইমেইজ ইত্যাদির মাধ্যমে অপররে ছুঁইয়া দেখতে চায় তারা। কিন্তুক মিইশা যাইতে চায় না পকরিতির লগে।

তুলনা হিসাবে, আমরা জসীমের ‘আসামানী’, জীদার ‘আবার আসিব ফিরে’ ও জহিরের ‘আম্মার হাঁসগুলি’ কবিতা পাঠ করতে পারি। এই তিন তিনটা কবিতায়ই দেশজ উপাদানের হাজিরা খিয়াল করা যায়। জসীমের উক্ত কবিতায় করুণ রস, জীদার কবিতায় রূপ-রস, আর জহিরের কবিতায় ভাবরস বেশি বেশি অনুভব করতে পারি। জীদার কবিতায় হিন্দুয়ানী জগৎবীক্ষার ‘এনথ্রোপোমরফিক’ একটা ছিটা আছে যা আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিক কায়দায় উপস্থাপিত। এদিকে, লেখক জহির নিজেই তান কবিতায় বর্ণিত হাঁস হইয়া গেছেন। তান বইনরে এই হাঁসের রুহু বানাইয়া ফেলছেন। জহির আধুনিকতাবাদী ছলনায় নাই। দেখব যে, তিনি সরাসরি ইন্টারভিন করবেন। আর তার ইন্টারভেনশন ভাবসঞ্চারী। পড়ুন, জহিরের ‘আম্মার হাঁসগুলি’ নামক কবিতাখানা—


আম্মার হাঁসগুলি

আম্মার হাঁসগুলির চোখ ছিল, তবু
আমার বোনই দেখি রাখত।
পুকুরে নামত ওদের প্রায় সবাই বিকালের মতো।
ওদের পেট ভরি গেলে ওরা উঠি আসত উঠানে
যেহ্যানে কুঁড়াভাত দিত
কদমতলায়, ওদেরে শামুক ভাঙি দিত
ইটের পর রাখি। ওরা মাঝেমধ্যে ঠোঁটে বাড়ি খাইত।
ওদের পেট ভরি গেলে দুলি দুলি হাঁটি হাঁটি
পুকুরের মধ্যে পুরানো দিনদের বুনো গায় মাখি উঠি আসত।
ওদের ১/২টা রাস্তা ছিল মনে মনে
সামনে কোনোদিন গরু বান্ধা পড়লে
ওরা গরুর পেটের নিচ দিয়া
ওলানের নিচ দিয়া চলি যাইত।
ওদের হলুদ পায়ের পরশ নিতে
গতকালের বিস্তৃত রাস্তা
যেন ঠিক ঠিক মনে উলি উঠত।
দাদাই আমার ঐ বোনটার নাম রাখছিল
আত্মা। আম্মা ডাকত রুহু।
আত্মাই আম্মার হাঁসগুলিরে চিলের ছোঁ,
শেয়ালের হাত-পা থাকি বাঁচাইত।
আত্মারে আমরা
ভাবতাম তার শরীর আছে।
সে আমাদের বোন।
আম্মাদের হাঁসগুলা
কিছুদিন দেখিশুনি রাখে।
আমি ওরে একদিন ছুঁই
দেখছিলাম।
কইছিলাম, তুই তো
আমারই পোড়া পালকের বোন!

 


জীদার ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাখানা উৎকৃষ্ট মানের হইলেও, জবানের ক্লাসগত একটা জটিলতা এইখানে আছে। ফলে, এই কবিতা আমজনতার মুখে মুখে খুব একটা চলবে না। এই কবিতায় আরো আছে আধুনিকতাজনিত বর্ণনার ‘আড়ষ্টতা’। জসীমের ‘আসমানী’ কবিতাখানা জীদার কবিতার শ্রেণিগত সমস্যাগুলা অনেকটাই উতরাইতে সক্ষম। এই কাব্য বহুলভাবে পঠিত ও শ্রুত হইবার তাকত রাখে। জহিরের ‘আম্মার হাঁসগুলি’ কবিতাও সেইমতন। যদিও, গদ্য ও গল্পের গুণে গুণান্বিত হওয়ার কারণে, আবৃত্তির সময়ে এতে জীবনানন্দীয় বা জসীমীয় আবেগ এতে ততটা যুক্ত করা যায় না।

মনে পড়ে, জহির হাসান একবার এই প্রবন্ধের লেখকরে উদ্দেশে এই কথাখান কইছিলেন, ‘আপনার কবিতায় লিরিকস্বভাব বেশি!’ জহির যে কম লিরিকাল, অথবা তান কবিতায় যে শূন্যতার হাজিরা থাকে- এইগুলা ‘পোস্টমডার্নিস্টিক’ এপ্রোচ বটে! জহিরের সফর হয়ত এমনই। যেইখানে ছান্দিক চপলতার চাইতে গদ্যের দৃঢ়তা ও গল্পের আয়েশী মাধুর্য বেশী উপকারী।


কবি হজরত জহির হাসান তান কবিতায় থাকা যৌথ-চৈতন্যের কারণ হিসাবে ইবনে খালদুনের ‘আসাবিয়ত’ ধারণার কথাও বলেন। যেইটারে তিনি ‘মায়া’ হিসাবে লোকেইট করেন। নজরুলের দ্রোহী চরিত্র উনার মইধ্যে ‘ডিকলোনিয়াল’ স্বভাব জারিত করছে- এও কইলেন তিনি।


আলাপের শুরুতে আল মাহমুদের কৌম চৈতন্যের কথা বলছিলাম আমরা। জহিরের ‘আম্মার হাঁসগুলি’ কবিতা কৌম চৈতন্যে ভরপুর। চিরাচরিত বাঙালি যৌথ-পরিবারের ইয়াদ এইখানে জারিত। এতে শুধু মায়ের আদর নয়, বইনের দরদও প্রতিফলিত। এদিকে, আমাদের যৌথ-জীবনে অপরাপর প্রাণীরাও অতটা ‘অপর’ আছিল না। এদিকে, সুফি কসমোলজিতে, আম্মারে সহজেই জগত-কর্তারূপে স্থাপন করা সম্ভব। কারণ, খোদার অপর নাম রহমান। আর রহমান শব্দের জড় বা মূল হইল রেহেম। যার অর্থ পেট। অর্থাৎ, আমরা খোদা নামক আম্মার দয়ার পেটের ভিতরে বসবাস করি! এদিকে, খোদার পালনস্বভাবও কবিতায় প্রকাশ আছে। এইখানে আমরা তান হাঁসই বটে! সুফিজম বা ইলমে তাসাউফরে, এই বাবদে, ‘ইকো-ক্রিটিসিজমের’ জায়গা হইতেও কেউ কেউ পাঠ করতে ইচ্ছুক! সে জগতরে ‘রবুবিয়াতের’ ডোরে বাইন্ধা রাখে। (ব্যক্তিগতভাবে আলাপকালে, কবি হজরত জহির হাসান তান কবিতায় থাকা যৌথ-চৈতন্যের কারণ হিসাবে ইবনে খালদুনের ‘আসাবিয়ত’ ধারণার কথাও বলেন। যেইটারে তিনি ‘মায়া’ হিসাবে লোকেইট করেন। নজরুলের দ্রোহী চরিত্র উনার মইধ্যে ‘ডিকলোনিয়াল’ স্বভাব জারিত করছে- এও কইলেন তিনি। খিয়াল করলাম, ‘নফি’ নামে উনার একখান কবিতাও আছে! আদতে, এইটা সেই ‘নফি-ইসবাতের’ ধারণার স্পষ্ট ‘এলিউশন’! )

এদিকে, জীদার কবিতার নেতি জহিরে আছর করে না। জহির নেতিরে নাই অর্থে ভাবেন না। ফলতঃ, তার না’র মিনিং আনকন্ডিশনাল বা বহু। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং, এই অর্থে যে, আধুনিক পদার্থবিদ্যার মতে, (কোয়ান্টাম ফিজিক্সে) ফেনোমেনা ‘সম্ভাবনা’ আকারে মজুত থাকে। সে কীভাবে ধরা দিবে, তা নির্ভর করে পাঠক বা দ্রষ্টার দৃষ্টিভঙ্গির ওপরে!

ফরহাদ মজহার আমাদের ‘কাব্য-ঐতিহ্য’ হইতে গদ্যের দৃঢ়তা, যুক্তি, তর্ক ও ভাবের প্রখরতা ধার করতে সক্ষম হইছেন। জহির, ফরহাদের এই পরম্পরা নিজের মইধ্যে জারিত করছেন সফলভাবে। যদিও, জহিরের গদ্য মোলায়েম। গল্পস্বভাবী। এই স্বভাব উনার কবিতায় অনেক স্তর, পর্দা আর খামখেয়ালিরে ধারণ করে। যা তার কবিতারে শক্তিশালি করে। এইরকমই একখান কবিতা হইল ‘আমার সরল তালগাছটি’।

জহিরের কবিতায় একটা আত্মমগ্ন ভাব থাকে। উনার রচনার বড় একটা ঝোঁকই হইল ভাববাদী কাব্য রচনা করা। যদিও, ব্যাপারটা এতেই সীমাবদ্ধ নয়। তার কাব্যে গভীরতা যেমন, তেমন আছে এর বহুগামিতাও। হিন্দুদের দেশ ছাড়ার ইয়াদ তিনি ভুলতে পারেন না। নিজের বাল্যকালরেও কাব্যে আইনা ছাড়েন তিনি!

আমাদের রাষ্ট্রজীবন উনার কাব্যে কেমনে আসতে পারে, সেইটা নিয়া ভাবতেছিলাম। দেখলাম যে, পুলিশরে নিয়া একখান উৎকৃষ্ট মানের কবিতা লেখছেন তিনি, সুররিয়ালিস্টিক মুডে। কবিতার নাম ‘অজান হাঁসটির কথা’। ‘আম্মার হাঁসগুলি’ নামক কিতাবে তা গ্রন্থিত রয়েছে। এদিকে, লাল জুলাই নিয়াও জহির হাসানরে রসোত্তীর্ণ কবিতা রচনা করতে দেখছি। আর, জহিরের সাম্প্রতিককালে লেখা কবিতা ‘নিশ্চয় কিছু একটা আছে ফিলিস্তিনে’ ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাইছে!

জহির হাসান গত শতকের নব্বইয়ের দিকে বাংলা কবিতা লেখতে আইছিলেন। এইটা সেই সময়, যখন কলকাতাপন্থী সাহিত্যভাবনা বেশ শক্তভাবেই মাথাচাড়া দিয়া উঠছিল। বিশেষ করে, আশির দশকে। হয়তবা, আশির অনুকরণপ্রিয়তা উনারে একটা স্বকীয় জার্নি তৈয়ারে উদবুদ্ধ করছিল। জহির এখনো সমানতালে লেখতেছেন। কবিতায় আরো কিছু বাঁক, আরো কিছু স্বর তিনি যুক্ত করবেন, এই বিশ্বাস আমাদের আছে।

 



আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেকের জন্ম সুহিতপুর, ছাতক; সুনামগঞ্জ। ইউরোপে থাকেন। প্রকাশিত বই: অনুবাদ – ফের্নান্দ পেসোয়ার কবিতা (২০১৬), নাগরি প্রকাশ। কবিতা: আইয়ো রেগো ময়না (২০১৮), প্রিন্ট পোয়েট্রি। আম্মা নদী (২০২১), বুকিশ।

শেয়ার

Facebook
WhatsApp
X
Telegram
Threads

আরো পড়ুন

লাবিব ওয়াহিদ
তানভিরুল হক রাহাত
সৌরভ রায়
সত্যজিৎ সিংহ
রাবিয়া সাহিন ফুল্লরা
নাদিয়া জান্নাত
সুলাইম মাহমুদ
তাসনুভা তাজিন তুবা
শুভ্র সরকার
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
হুসাইন হানিফ
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
মেহেদি হাসান তন্ময়
তাহমিদ রহমান