আমাদের স্ক্রিনময়ী জীবন অনর্গল ডিজি-ছবির বন্যায় চিন্ময়। এই নেটেড দর্শনের গ্লোবাল রাজত্ব শুধু আমাদের অবসরকেই শাসন করে না, কোন ছবির ঝাঁক কিভাবে ইন্টারনেট আর স্ক্রিন বেয়ে আমাদের চোখ ধাঁধায় আর মন মাতায়, তা দিয়ে গড়ে ওঠে আমাদের রোজওয়ারি গণদর্শন আর রাজনীতি। ভিসুয়ালের সেই সাইবারশাহীর নানা ঝাঁকিদর্শন নিয়েই এই কলামের নানান কিস্তি।
ইনস্টাগ্রামের শহরনামা ফিল্টার : ছাঁকা-ছাঁকা এবং ঝাকানাকা
গত বছরের কথা। ঢাকার উত্তরায় হোটেলের বারান্দায় তোলা ছবি জুড়োতে না জুড়োতেই ইন্সটাগ্রামে গরমাগরম পোস্ট করতে গেলাম। দেখলাম ফিল্টারের চয়েস দেখাচ্ছে শহরের নামে – Paris, New York, Tokyo, San Franciso ইত্যাদি। ঝটপট লস এঞ্জেলেস দিয়ে ঢাকা দিলাম ঢাকার ছবিকে। ওটাই বেস্ট লাগছিল দেখতে। কিন্তু ব্যাপারটা বেশ সত্য-সেলুকাস গোছের বিচিত্র, মনে গেঁথে গেল, লেখা হয়ে গলে পড়বার অপেক্ষায়।
এক শহরের মায়া অন্য শহরের গায়ে ছায়া ফেলার ব্যাপারটা বিচিত্র মোটেই না। এক শহর অন্য শহরের জন্য এক ব্র্যান্ড, এক তারা, কিছু বিশেষ খ্যাতির নামচিহ্ন । সে তারা যে বহু দূরের হতে হ’বে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই।


চিত্র ১ ক, খ: মুম্বাইয়ের তারা কলকাতার সাইনবোর্ডে, প্যারিসের স্টারসাইন মুম্বাইয়ের দোকানে
কিন্তু ইন্সটাগ্রামের ফিল্টারের মায়াবী ছায়া খানিক অন্য বস্তু। অদ্যকার সাড়ে বত্রিশভাজা ইন্সটাগ্রাম দেখে মনে পড়া কঠিন যে অপেশাদার মোবাইল ফোটোগ্রাফি দেখানোর জন্যই এর সৃষ্টি আর নিতুই নতুন ফিল্টার অর্থাৎ ভিজুয়াল ডিজিটাল এফেক্টের কাঁধে চড়েই এর রকেটোপম উত্থান। কিন্তু ক্যামেরার লেন্সের ধারণা থেকে এর উৎপত্তি হ’লেও এই ডিজিটাল ফিল্টারের রংঢং অনেক পরিব্যাপ্ত। যদিও যেকোনো ফটোশপ বা ফটোম্যানিপুলেশন সফটওয়্যারের কয়েকটি মোচড়েই এক একটি ফিল্টার নিজের হাতে গড়ে নেওয়া যায়, তবু এর আকর্ষণ অমোঘ!

চিত্র ২: ইন্সটাগ্রামের কিছু আদি ফিল্টার
ইং ২০১৫ সালে, ফিল্টারের জনপ্রিয়তার উষাকালে, Yahoo Labs ও Georgia Tech গবেষকদের লেখা একটি গবেষণাপত্র দু’ধরণের user group কে শনাক্ত করে যারা অনলাইন ফোটোগ্রাফিতে আগুয়ান আর ফিল্টার ব্যবহারেও সদাবাহার – serious hobbyists আর casual professionals। এই দুই দলকে টুইডলডাম আর টুইডলডি-র মত অভিন্ন মনে হলেও – তাঁরা কেউ-ই কিন্তু অ্যানালগ ফোটোগ্রাফির খাটনি বা খরচ চালাতে খুব একটা উদগ্রীব নন, বরং মোবাইল ফোনের দুশো GB মজা ও মাগনার ফিল্টারের দশ হাজার ছবির তেত্রিশ কোটি রকমফেরের উপাসনাই তাঁদের কাম্য। এই পেপারের মতে –
“সিরিয়াস এবং ক্যাজুয়াল উভয় ধরণের ফটোগ্রাফারই তাদের ছবিতে ফিল্টার প্রয়োগ করতে পছন্দ করেন, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যগুলি একেবারেই ভিন্ন। সিরিয়াস ফটোগ্রাফি শখের লোকেরা ফিল্টারগুলিকে ফটোগ্রাফির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন ছবির সঠিক ত্রুটি নিয়ন্ত্রণ করতে, রঙ পরিবর্তন করতে এবং নির্দিষ্ট কিছু বস্তু হাইলাইট করতে। যদিও এই প্রেরণাগুলির মধ্যে কিছু ক্যাজুয়াল ফটোগ্রাফারদের মধ্যেও সাধারণ, তাদের মধ্যে প্রধান উদ্দেশ্য হল তাদের ছবিগুলিকে আরও মজাদার, অনন্য এবং বিশেষ করে ভাগ করে নেওয়ার জন্য দেখানো। মনে রাখবেন যে এটি ইঙ্গিত দেয় যে ফিল্টারগুলি তাদের আরও স্পষ্ট দৃশ্যমানতার পাশাপাশি একটি সামাজিক ভূমিকা (অর্থাৎ, স্বতন্ত্রতা) পালন করে।” কিন্তু ফিল্টারের মজা কি শুধু নিজে হাতে কিছু না করেও, নিজের ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে কিছুই না গড়েও, সেই আনন্দের সস্তা ব্যবস্থা করা?
Jill Walker Rettberg-এর মতে ফিল্টার আসলেই একটা ছাঁকা-ছাঁকা, বিয়োজনমূলক ব্যাপার। “প্রযুক্তিগত ফিল্টার আমাদের নির্দিষ্ট কিছু উপায়ে নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয় কিন্তু বাকি উপায় বন্ধ করে দেয়। আমরা ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করা ছবিতে নির্দিষ্ট কিছু ফিল্টার প্রয়োগ করতে পারি কিন্তু বাকি ফিল্টার প্রয়োগ করতে পারি না। আমরা টাম্বলার বা রেডিটে অ্যানিমেটেড জিআইএফ পোস্ট করতে পারি কিন্তু ফেসবুকে নয়, যদিও পরে ফেসবুক এই নিয়ম বদলাতে পারে। ফটোশপ বা প্রোগ্রামিং দক্ষতা এবং একটি স্ব-হোস্টেড ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অবশ্যই আমরা অন্য উপায়ে নিজেদের প্রকাশ করতে পারি, কিন্তু আমাদের বেশিরভাগেরই এই সংস্থান নেই এবং কেবলমাত্র বিভিন্ন উপলব্ধ ফিল্টারের মধ্যে বেছে নিতে পারি। টুইটার দীর্ঘ ফর্ম লেখা ফিল্টার করে, যার ফলে আমাদের একসাথে ১৪০টি অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। রেডিট তার বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীর কাছে জনপ্রিয় নয় এমন পোস্ট এবং মন্তব্য ফিল্টার করতে আপভোট এবং ডাউনভোট ব্যবহার করে। আপনি যদি যথেষ্ট গভীরভাবে খনন করেন তবে আপনি এখনও আনফিল্টারড পোস্টগুলি দেখতে পাবেন, তবে তা সহজ নয়।”
আর Elena Caoduro-এর মতে ফিল্টার আসলেই একটা যোজনমূলক ব্যাপার। মানে মামুলি বা ফাঁকাফাঁকা কে ঝাকানাকা করাই এর কাজ।
“ইনস্টাগ্রাম ফিল্টারের নান্দনিকতায় বিভিন্ন বিকল্পের সমন্বয় রয়েছে: ফিল্ম টেক্সচার, ফ্রেম, টোন এবং ফিল্ম স্ক্র্যাচ এবং ডাস্ট স্পেক সহ অতিরিক্ত উপাদান। …সেপিয়া টোন, সাদা-কালো এবং ধোয়া রঙের জন্য ফিল্টারগুলি সময় এবং যুগের প্রতীক হিসাবে কাজ করে, যেখানে অন্যগুলি অনভিজ্ঞ ফটোগ্রাফারদের সাথে অ্যানালগ যুগে প্রায়শই ঘটে যাওয়া সাধারণ ত্রুটি এবং নৈমিত্তিক প্রভাবগুলি পুনরুত্পাদন করে… এগুলি আসলে লো-ফাই লুকের জনপ্রিয় সংযোজন হয়ে উঠেছে, সম্ভবত মোবাইল ডিজিটাল ফটোগ্রাফাররা সীমিত ফিল্ম রোলে তোলা দুর্ঘটনাজনিত ছবির স্বতঃস্ফূর্ততার কথা মনে করিয়ে দেয়। এত সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীরা কেন তাদের ডিজিটাল ছবি পরিবর্তন করার জন্য ফটো ফিল্টার অ্যাপের দিকে ঝুঁকছেন তার কারণগুলি একাধিক, যেমন অ্যানালগ নস্টালজিয়ার ভিন্নধর্মী ঘটনার মূল, যার মধ্যে ভিনটেজ পণ্য (পোশাক, নকশার জিনিসপত্র, পুরানো ভিনাইল রেকর্ড) কেনা এবং রেট্রো অনুকরণ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। নাথান জার্গেনসন (২০১১) তার প্রবন্ধ ‘দ্য ফক্স ভিনটেজ ফটো’-এ উল্লেখ করেছেন যে এর সহজ উত্তর হতে পারে যে ফোন ক্যামেরার নিম্নমানের কারণে ব্যবহারকারীরা ‘পুরোনো ছবি তুলতে বাধ্য হয়েছেন যা পরে একটি নকল-ভিনটেজ ফিল্টার দেওয়া হলে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে’। …ইনস্টাগ্রাম ফিল্টার ব্যবহার আংশিকভাবে অপেশাদার ছবিগুলিকে আড়াল করার আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পর্কিত। তবে, এটি শিল্পী এবং পেশাদারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না … এই স্মৃতি কেবল ‘গতকালের জন্য আকুলতা’ (ডেভিস 1979, 16) নয়, বরং বর্তমানের জন্য একটি সৃজনশীল হাতিয়ার।”
এই যোজন-বিয়োজন তত্ব কিন্তু serious hobbyists আর casual professionals-এর ফিল্টার ব্যবহার তত্বের সাথে বেশ খাপে খাপে মিলে যায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এই ফারাক কিন্তু অলঙ্ঘনীয় একেবারেই নয়। একই ইউজার আলাদা আলাদা সময়ে আলাদা আলাদা কারণে ফিল্টার ব্যবহার করতে পারে।
এবার দেখা যাক শহরনামা ফিল্টারগুলোকে। সাথে তাদের বিবরণ।
চিত্র ৩ : ক,খ,গ,ঘ,ঙ,চ,ছ,জ: ইন্সটাগ্রামের শহরনামা ফিল্টার – আবু ধাবি, বুয়েনোস এয়ারেস, জয়পুর, জাকার্তা, মেলবোর্ন, নিউ ইয়র্ক, অসলো, টোকিও








ইন্সটাগ্রাম ফিল্টারের নাম ঠিক কিভাবে দেওয়া হয়? কোনো ব্র্যান্ডের নাম, নখপালিশের শেডের নাম, আইসক্রিমের ফ্লেভারের নাম যেভাবে হ’য় সেভাবে? সে নিয়ে অনেক মিঠে খুনসুটি স্টোরি আছে নেটে। এখন সব ফিল্টার ও তাদের নাম ইন্সটাগ্রাম থেকে দেওয়া হলেও আগে ফিল্টার তৈরি ও তাদের নামকরণ করার ভার জনতার উপর ন্যস্ত ছিল (আমজনতা না, ডিজিটাল আর্টিস্ট জনতা, ইন্সটাগ্রামের এ পি আই বা Application Programming Interface-এর মাধ্যমে) অতএব তা নানা ভিজুয়াল ট্রেন্ডের ওপর নির্ভরশীল তা বলাই বাহুল্য। যত দিন গেছে নামগুলি ততই open signifier হয়ে উঠেছে, তাদের নাম ও তাদের কাজের মধ্যে যোগাযোগ খুব বেশি না। তার openness যতই হালকা দুর্বোধ্যতা আনবে তার হাল্কা আকর্ষণ ততই রহস্যঘন হয়ে উঠবে। অনিঃশেষ ফ্লেভারের এক চকোলেট বক্স যেন। কিন্তু সেই ফ্লেভার প্রায় যেমন উপরের আবু ধাবি ফিল্টারের লালচেপনাকে তার আবু-ধাবিত্ব বা বুয়েনোস আইরেস ফিল্টারের সবজেটে ভাবকে সেই শহরের দৃশ্যসার বলে ধরে নেওয়া খুব মুশকিল। জয়পুর ফিল্টারের ওরিয়েন্টালিজম বেশ সহজবোধ্য হ’লেও তাতে গোলাপির অভাব বেশ দুর্বোধ্য (‘পিঙ্ক সিটি’)। বরং বুয়েনোস আইরেস-এর এক পুরনো সংস্করণ খুব চড়াদাগে ম্যাজেন্টা-পার্পল। কোন শহরের দৃশ্যসারকে দৃশ্যমান করা এই ফিল্টারের উদ্দেশ্য না। শহর শুধু তাদের নামেই, ধামে বা কামে না।

চিত্র ৪ : ক,খ: বুয়েনোস আইরেস-এর এক পুরনো সংস্করণ খুব চড়াদাগে ম্যাজেন্টা-পার্পল
Big Data-য় সওয়ার হয়ে (অর্থাৎ সেই শহরে তোলা কোটি কোটি ইন্সটাগ্রাম ছবির ভান্ডারের কান্ডারী হয়ে) সারা দুনিয়ার বাছাই তেরোটি শহরের visual signature আহরণকারী গবেষকরা একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন (যা আসলে খুব একটা চাঞ্চল্যকর না।) প্রতি শহরে এই ফিল্টারগুলি ব্যবহারের অনুপাত মোটামুটি একই, নিউ ইয়র্ক আনুপাতিক হারে টোকিওর থেকে বেশী নিউ ইয়র্ক ফিল্টার বা টোকিও ফিল্টার ব্যবহার করে না, যা টোকিওর ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ ঢাকা ফিল্টার থাকলেও তা দিয়ে ঢাকার ছবিকে আমি ঢাকা দিতাম না। ফিল্টারের কাম যেমন অতিচেনারে (সদ্য তোলা ছবি যা তখনো চোখে বসানো) খানিক অচেনা করে তুলে আমাদের মন মাতায়, তেমনি তার নামও তাই। ঢাকার দেহে লস এঞ্জেলেস প্রয়োগ তাকে লস এঞ্জেলেস বানিয়ে তুলতে নয় বরং একটু অচেনা ঢাকা দেখার বাসনায়।
আরও পড়তে চাইলে:
Rettberg, Jill Walker. Seeing Ourselves Through Technology: How We Use Selfies, Blogs and Wearable Devices to See and Shape Ourselves. Basingstoke: Palgrave Macmillan, 2014. doi: 10.1057/9781137476661.0004.
Caoduro, Elena. “Photo filter apps: Understanding analogue nostalgia in the new media ecology.” (2014).
https://www.fastcompany.com/1683335/see-your-citys-unique-visual-signature-created-by-its-instagram-photos

সৌরভ রায়
লেখক, সম্পাদক, অনুবাদক ও চিত্রগবেষক
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের LGBTIQ+-সংক্রান্ত অনলাইন ভিসুয়াল কন্টেন্ট নিয়ে গবেষণা করছেন।
























