আগনের শেষ দিক থেকে তীব্র শীত পড়তে শুরু করে ।
এই হাড় কাঁপানো হিমে আমাকে গোটারাত ফেনির ভিতর, ভারী ইটের গাঁথনির মতন লেপ কম্বল যেখানে অসহায়, সেখানে আমার সম্বল কয়েকটা পাতলা কাপড়ের জোড়া দেয়া নামমাত্র লেপ – এইটা দিয়ে ঠান্ডার চাবুক খেতে খেতে ধান পাহাড়া দিতে হবে ! এই দেহ প্রায় সত্তরটা আগন দেখেছে। কোনবারই এমন হয় নি। কিন্তু এইবার হচ্ছে। আসতে আমি বাধ্য। একমাত্র ছেলে মারা গেল – এই মাত্র মাসখানেক আগে। গোটা আকাশটা দ্বিতীয়বারের মতো আমাকে কাঁধে নিতে হল। নাতি আর নাতনি – দুটোই হাইস্কুলে । আর তাদের মা । এই নিয়ে জীবনে পুরোপুরি নতুন আর অচেনা এক শীতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। কৃপা প্রভুর !
অনেক বছর আগে , এমনি এক আগন মাসের শুরুতে রবিরবাজার থেকে ধান বেচে আমি আর বাপ বাড়ি ফিরতেছিলাম । শীতকালের বিকাল। রাঙা রোদ একটু ঝলকানি দিলেই শেষ। অনন্ত রাতের আগে আগে আলোছায়া ঘেরা সন্ধ্যাকাল ঝুপ করে গিলে খাওয়ার জন্য হা করে বসে আছে। প্রায় অর্ধেক পথেই সাঁঝ হয়ে গেল। ঠান্ডাও যেন আচমকা বেড়ে গেল । বাজারে যাওয়ার সময় ধানের ভারের পিছন পিছন দৌড়তে থাকায় শরীর ঘেমে গিয়েছিল। তার একটু পরে যে এমন হু হু শীত আসবে তা কল্পনাও করি নি। বাপেরও হয়তো বাজারে শীতকাপড় নেয়ার কথা একদমই মাথায় ছিল না। চোরা একটা বাতাস এসে সিনা বরাবর বারংবার ছোবল মারছিল। দুই মণ ধান ভারে করে অনায়াসে বাজারে যাওয়া শক্তিশালী বাপকেও দেখলাম হি হি করে কাঁপছেন । একটা জায়গায় এসে বাপের মনে কি আসলো কে জানে। সদাইপাতি বোঝাই টুকরিটা বাম কাঁধে বদল করে ডানহাত খালি করলেন। তখনো পুরো অন্ধকার হয়ে আসে নি। ডাইনে বাঁয়ে কুয়াশা ঝাঁক বেঁধে নামছিল। যেন মান্ডপে ভোগের ক্ষির ফুটতেছে ডেগের ভিতর , খলখল খলখল করে। এই আবছা অন্ধকারে বাপ আমার দিকে না তাকিয়ে ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমারও ওপরের দিকে তাকাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হল না। এই তীব্র শীতে, এই ঘন কুয়াশায়, জমাট ধূলার পাউডারের ভিতর বাম হাত সঁপে দিলাম। রক্তের টান হয়তো একেই বলে। রুক্ষ, খসখসে, ঠুসাপরা গিরস্তিকামলার হাত। আশ্চর্যজনকভাবে টের পেলাম , শরীরের ভিতর ঠান্ডা শীতল রক্তে রৌদ্রপুড়া লাল মাটির আঁচ লাগল মাত্র । বাপের পায়ের সাথে তাল মিলাতে আমি পারছিলাম না। বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিলাম । প্রায় একরকম দৌড়তে হচ্ছিল আমাকে। দৌড়ানোর ফলে আমার শরীর গরম হয়ে উঠছিল। আগের মতোন ঠান্ডার তীব্রতা আর কাবু করতে পারছিল না। অনেকক্ষণ পর বাপ কিছু বললেন, হাত ধরা অবস্থাতেই।
“ বাবা! এখন কি আগের মতো শীত লাগতেছে !”
আমি বললাম, “ উহু! শীত নাই।”
আবার বাপ বললেন, “ বাবা !, জোরে বলো, শীত শালা ভাগ এখান থেকে! ভাগ এখান থেকে।”
আমিও উনার কথামতো অস্পষ্ট গলায় বললাম, “ ভাগ এখান থেকে। ভাগ এখান থেকে।” মাথার ওপর ঝলমলে আকাশ। ডানে বাঁয়ে কুয়াশার গাঢ় সমুদ্র। ছেলেবেলার শীতখেদানো সেই ডায়লগটা স্মরণ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম । যদি এখন ফু দিয়ে অনিঃশেষ শীতগুলো তাড়িয়ে দিতে পারতাম !
ফেনির ঘরটার ভিতর শুকনো খড় জমিয়ে ওম ধরে রাখবার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সেইটা পর্যাপ্ত নয় শীত আটকানোর জন্য । চাইলে এখন আমি এই খোলা জায়গায় কিছু খড় আর ন্যাড়া জমিয়ে আগুন পোহাবার ব্যবস্থা করতে পারি। ঊর্ধ্বাঙ্গ যদিও ভারী জাম্ফার আর তার উপর ভারী চাদর দিয়ে ঢাকা। কিন্তু নীচের দিক পুরাই খোলা। হাঁটু অবধি চাদরটা ঝুলতে পারে কোনমতে। গামছার নীচে নাংগা পা, মোজা নাই , জুতা নাই – এমন নির্বোধ শিকার পেলে শীত কী একটুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াবে নাকি হু হু করে দাঁত বসাবে ! কামড় বসিয়েছে ঠিকই। কিন্তু মন অন্যদিকে থাকায় খুব একটা বুঝতে পারতেছি না। উলকাপড়ের ভারী একটা ফুল প্যান্ট ছিল। রবিরবাজার থেকে সস্তায় কিনেছিলাম। খোলা ভ্যানের মাল। একদিন সেটা ছেলে নিয়ে গেল। নেয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে ভুল করে রেখে আসছে। কত করে বললাম। শশুরের ভুলবশত রেখে যাওয়া চটিস্যান্ডেল পুনরায় উনার পায়ে গিয়ে জোড়া লাগতে পারে, সুন্দরী শ্যালিকার ননদের অসুস্থ দেবরকে নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় বের করতে পারে, হয় না শুধু বাপের বুড়া বয়সে খুচরো টাকা তিল তিল করে জমিয়ে কেনা সামান্য একটা উলের প্যান্টের বেলায়!
মানুষের জীবনটাই বা কী একটা খেলা – যে বৌমা একদা আমার ভাতের থালে কাঁচা গোবর ঢেলে দিয়েছিল, দুর্গন্ধে সেদিন পেটের নাড়িভুরি উলটে যাওয়ার দশা, তিনদিন ভাত এক দানা না দেখে হঠাৎ সাদা ভাত দেখতে পেয়ে পাগলের মতন হয়ে গিয়েছিলাম। সাদা ভাতের ওপর গোবরের ঝোলটুকু চোখ বন্ধ করে ভুলে যেতে চাইছিলাম, সাদা ভাত শুধু সাদা ভাত । কিন্তু পারি নি। শেষ পর্যন্ত মানুষেরই জয় থেকে গেল। ঐদিন যদি ক্ষুধার জ্বালায় গোবরমাখা ভাত খেয়ে ফেলতাম, আমার জন্ম, আমার এদ্দিনের জীবন, মানুষের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা সব ব্যর্থ হয়ে যেতো। আর বৌমা তখন খুশি হয়ে প্রতিদিনের এঁটো , রাতের পচা-বাসী খাবার নেকেন্দ্র মাস্টারের কুকুর ধর্মেন্দ্রকে না খাইয়ে আমাকেই খাওয়াতো। ভাগ্যের কি খেলা দেখো, সেই বৌমা আজ দুপুরবেলা মাছের মাথাটা আমার তরকারির বাটিতে এত ভরপুর করে সাজিয়ে দিয়েছে যে কাঁসার বাটির গা বেয়ে উপচে পড়ছে তীব্র গন্ধ ছড়ানো বাতাসের গতিপথ স্তব্ধ করে দেয়া লাল কড়া মাছের ঝোল ।
নাহ ! এখানে আর দাঁড়িয়ে করবোটা কি! ফেনির ঘরে ঢুকে আপাতত খড়ের ভিতর গলা অবধি ডুবে থাকলে আরাম পেতে পারি। আমি গিরস্তির মানুষ। জন্ম থেকেই মাটি আর ধানের ঘ্রাণ মেখে বড় হয়েছি। কেউ বললে হয়তো বিশ্বাস করবে না , আজ সত্তর বছর যাবত এবার, আজ এই প্রথমবারের মতো ধান পাহাড়া দিতে ঘরের বাইরে খোলা মাঠে আসলাম। আগে এমন চল ছিল না। ঘরে আনা হতো ধানের মুইট। বারান্দায়, গোয়ালঘরে, উঠানের কোণায়-কানায় মুইট এনে এনে সিঁড়ি করা হতো। তারপর ভইষ দিয়ে কিংবা গরু দিয়ে সপ্তাদিন অথবা দুই সপ্তাহও চলে যেতো – মাড়া দিয়ে ধান তুলতাম, খেড় আগলা করতাম। এখন মাড়াই মেশিন এসে সব হিসাব পালটে দিয়েছে। ধানের মুইট আর ঘরে আনার দরকার নাই। নতুন বানানো খলায় মুইট এনে রাখো। মাড়াইমেশিনকে ফোন দাও। সে এসে এক ঘণ্টার ভিতর ধানের জায়গায় ধান আর খড়ের জায়গায় খড় আলাদা করে রেখে দেবে।
সেই ধান আর আধাকাঁচা খেড় বাড়িতে এত তাড়াতাড়ি তুলবে কেন ! আবার সেই ডাবল কাম। প্রতিদিন ঘর থেকে ধান বের করো আর রইদে দাও। আবার সন্ধ্যার আগে ধান তুলে ঘরে ঢুকাও। আমরা একটা জীবন এভাবেই পার করে আসছি। কিন্তু এখন আর এতকিছু করার সময় কোথায় ! মাড়াইমেশিন তোমার খলায় ধান আর খেড় রেখে দিয়েছে। এখন তুমি খলার মধ্যে খেড়ের ফেনি বানিয়ে রাতজেগে সপ্তাদিন থাকো। দিনে ধান শুকাও আর রাত হলে ঘুমাও। ব্যস ঝামেলা শেষ। কিন্তু আমার ঝামেলাটা কোথায় জানেন ! আমি কোনদিনও এইভাবে কনকনে শীতের রাতে খোলা মাঠের মধ্যে রাত কাটাই নি। তাও যদি বুঝতাম, একটা দুইটা দিন। আমাকে এখন থেকে পুরো সাত থেকে আটদিন রাত কাটাতে হবে। কেউ শুনলে বলবে, তাহলে তোমার ছেলের বৌ এসে রাতজেগে ধান পাহাড়া দিক আর তুমি বিছনার মধ্যে লেপ কাথা মুড়িয়ে ঘুমাও! হা হা! না না। আমি এমনটা বলতে চাই নি। মানুষ অভ্যাসের দাস। এর আগে এমনটা করি নি বলেই মুচড়ামুচড়ি করছি। আশা করি সামনের বছর ঠিক হয়ে যাবে। ছেলে থাকতে সে-ই ঘর ছেড়ে খলার ফেনির ভিতর রাত কাটাতো। আমি প্রথম দিকে একটু অবাক হতাম। আমার মতো একটা বেকার বুড়ো থাকতে বাড়ির কর্তা কেন বৌ-বাচ্চা ফেলে ধান পাহাড়া দিতে তীব্র শীতের মধ্যে খোলা মাঠে রাত কাটাতে যাবে! স্বামীকে বাগাতে না পেরে বৌমা সব আক্রোশ ছুড়ে মারতো আমার দিকে। আমারতো অপমান খেতে খেতে চামড়া মোটা হয়ে গেছে। গায়ে না লাগালেইতো ঝামেলা শেষ! কিন্তু মনটা খচখচ করতো। যে ছেলে বিকাশের এজেন্টের চাকরি নিয়ে সকালে যায় আর রাতে ফিরে, যে আদৌ জানেই না ধান কবে রোয় আর কবে কাটে – সে হঠাৎ এই আগন মাস আসলে ঘর ছেড়ে বৌ-বাচ্চা ছেড়ে গোটা রাত কনকনে শীতের নীচে তাও কিনা খেড়ের ফেনির মধ্যে! বাপ আমি নাকি সে! ওর শিরার ভিতর রক্ত কত মাইল বেগে দৌড়চ্ছে সেইটা আমার চাইতে ওর বৌ বেশী জানে! যে জিনিসটা সন্দেহ করতাম, নিশানা একদম সেদিকেই যেতো। কিন্তু ঘটনা এইটা না। আর ৮/১০ জন যা করে ঠিক সেরকম করবার মানুষ নয় এই ভাগ্য সিংহ। ছেলে যা করছে সেইটা মানুষ মেনে নিবে। বলবে , এমনইতো হয়। জোয়ান ছেলে সংসারের হাবিজাবি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি বছরের ৪/৫ টা দিন মেয়েমানুষ নিয়ে চুপিচুপি মৌজ-মস্তি করে, সেখানে অন্যায় কি আছে! কিন্তু ছেলের সাথে সংগমরত মেয়েমানুষের শীৎকার শুনে সেই ছেলের বুড়া বাপ যদি ঘরে গিয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে ছেলের বৌকে বিছানায় ন্যাংটা ঘুমানোর দৃশ্য দেখবে বলে তীব্র বাসনা করে – নদীর ঢেউ কি তখন দাঁড়িয়ে পড়বে একটুক্ষণের জন্য! বয়ে চলা বাতাস কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইবে ধূলোমাটির রাস্তার দিকে চেয়ে! কারণ অভিধানেতো এইসব লেখা নাই। যেটা লেখা নাই সেইটা আমি বলো আর তুমি বলো গাছ বলো আর পাথর – কেউ মানবে কেন! শীতের রাতে কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমানোয় বৌমাকে ন্যাংটা দেখতে পেলাম না বটে তাই বলে ছেড়ে দিলাম না সেখানেই। নিজের বিছানায় গিয়ে দিনের বেলা বৌমার স্নানের দৃশ্য চোখের সামনে এনে প্রবল উত্তেজনায় বিলোল হলাম কিছুক্ষণ। ছেলেবেলার লুকলুকি গাছের মগডালে চড়ে টসটসে লুকলুকির ঝোপায় হাত বাড়িয়ে ধরতে পারব কিনা এমন একটা দৃশ্যের শিরশির অভিজ্ঞতা চোখের সামনে এসে পরে। স্প্রিঙের মতন ডাল বাতাসে দুলতে থাকে, শূন্যে একবার ওঠে একবার নামে। এই বুঝি লুকলুকির ঝোপা হাতের নাগালের মধ্যে চলে এলো! উফ! এই আরেকটু! এই এই!
শুকনো মাটির ঢেলার ওপরে বরুয়া বাঁশের মুগুইরের বারি পরতেছে। প্রত্যেকটা আঘাতে একটা ছন্দোবদ্ধ ধ্বনি থাকতে পারতো। ইশকুলের ঘন্টা আর মন্দিরের ঘণ্টা – দুটোই পিতলের, দুটোরই একেক রকম আওয়াজ হয়। ছন্দও ভিন্ন ভিন্ন বহন করে বটে। কচুপাতায় জল পরলে যদি একসাথে অনেকটা কচুপাতা থাকে, প্রত্যেকটারই শব্দ শোনা যায়, এমনকি সুক্ষ্ণ হলেও শ্রবণের নজর এড়ানো সম্ভব হয় না তার পক্ষে। একটা সামান্য জিনিস নিয়ে এতটা উপমার দরকার হয়তো পরতো না। মাটির ঢেলা ভাঙার মধ্যে মুড়িভাজার শব্দ ঢুকে পড়লেও আমার অতটা কপালে কুচকানোর কথা না। শব্দ নিয়ে আমার আগ্রহ উদ্দীপনা আদৌ কখনো ছিল বলে মনে পড়ে না অন্তত। কিন্তু এখন আমি এমন একটা জায়গায় বসে আছি, হাবিজাবি চিন্তা করা ছাড়া তিন ঘণ্টা টাইম পাস করার অন্য কোন বিকল্প আপাতত নাই। ইতোমধ্যে একঘন্টা প্রায় কেটে গেছে। আমার পাস মার্ক ওঠে নি এখনো। বাকী দুই ঘণ্টায় যে কিছু করতে পারব সে ভরসাও খুব কম। মানে অংকে আমি ফেইল। ক্লাসের নাম্বার টু ছাত্রী এবার আর প্রমোশন পাবে না। কোবরা জিনাত রেহনুমা রাখি সবাই ক্লাস এইটে চলে যাবে। কমনরুমে আমাকে টিটকারি মারবে। আসতে যেতে পথে জুনিয়রদের সামনে মুখের সামনে আমাকে অপমান করবে তাচ্ছিল্য করবে। যেমনটা আমি আগে করেছিলাম এখন সেইটা ফেরত আসবে চাবুকের বাড়ি হয়ে ।
ভগবানের বিচার থেকে রেহাই পাবে না কেউ। দাদুর ভাতে কাচা গোবর ঢেলে দেয়ার দিন মা হনহন করে ভিতরে চলে গেলেও আমি দাদুর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কদিনের অভুক্ত দাদু সেদিন কাঁচা গোবরের ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ সহ্য করে ভাতের যেটুকু তখনো গোবরের তরলে ভিজে নি সেই সামান্যটুকু সরিয়ে খেয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। হয়তো আমি সামনে না থাকলে তিনি খেয়ে ফেলতেন। মায়ের ভয়ে কিছু বলতে না পারলেও বুক ঠেলে কান্না চলে আসছিল আমার। মনে-প্রাণে ভগবানকে ডাকছিলাম, দাদুর দুর্ভিক্ষের ক্ষুধাটা সেইদিনের জন্য যেন তিনি বন্ধ করে রাখেন। ভগবান আমার কথা ফেলেন নি। দাদু ভাতের থালটা একপাশে সরিয়ে কনুইতে মুখ বুজে হু হু করে কেঁদেছিলেন। তারপর ছলছল চোখ দিয়ে আমাকে পাশ কাটিয়ে জানলার বাহিরে তাকিয়েছিলেন। ঐ তাকানোটার মানে আমি তখনই বুঝেছিলাম। এর অর্থ হল- ভগবান তুমি তার বিচার করবে। কিন্তু এত দ্রুত যে ভগবান উত্তর দিয়ে দেবেন এতটা আশা করি নাই। সেই মাকে এখন দেখি দাদুর মাছের বাটিতে উপচেপড়া ঝোল দিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করছেন। বাবার মৃত্যুর পর দাদুই এখন আমাদের সব। যে লোক একদা এ বাড়ির বেওয়ারিশ কুকুরের চাইতে অধম ছিল আজ সে তিনটা অবলা প্রাণের একমাত্র ভরসা।
গতবার ঠিক এমন সময়ে পরীক্ষার পরে বাড়ি ফিরলে ঘরে তালা দেখতাম। উঠান থেকেই চিৎকার দিতাম। জানতাম, বাকী সবাই মিলে আলুক্ষেতে গেছে। তারপরেও মাকে কাশুবি (ছিনাল) বলে গালি দিতাম। মার দোষ নেই কোন, তবু এটা করতাম। আমার গালি শুনে বাবা খুব খুশি হতেন। বাবা মাকে ভালোবাসতেন এরকম মনে হয় নি কখনো। মাঝেমধ্যে রাতের বেলা মদ খেয়ে এসে যখন মায়ের চুল টেনে ধরে মারতেন আমার তখন মায়ের জন্য খারাপ লাগতো ভীষণ। মারের সময় বাবা ফেনা গ্যাজানো মুখ দিয়ে “কাশুবি” “ কাশুবি” বারংবার এই শব্দটা দিয়েই চেঁচাতেন। আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতো। তখন দাদুকেও দেখতাম বাবার পক্ষে তাল দিচ্ছেন আর মা’র উদ্দেশ্যে মেঝেতে “থু” “থু” বলে শুকনা থুথু ফেলছেন। গোটা পুরুষজাতির ওপর আমার ঘেন্না সেই থেকে শুরু হয়ে গেল। কিন্তু পরের দিন সকালে উল্টোচিত্রটা দেখতাম। রাতভর মার খেয়ে হাতেমুখে কালশিটে দাগ, অভুক্ত রাত থেকে, তবু নারীটিকে দেখতাম রক্তাক্ত ফোলা ঠোঁট নিয়ে নির্লজ্জ বেহায়ার মতোন পুরুষটির মানিব্যাগ থেকে টাকা সরিয়ে নিচ্ছে আর পুরুষটি দেখেও না দেখার ভান করে মুখ টিপে টিপে হাসছে। কী যে ভয়ানক রাগ হতো তখন মা’র ওপর !
আলুক্ষেতের কাছাকাছি এসে আমার চিৎকার আর নাকি কান্না কমে যেতো। বাবা আমাকে পরীক্ষা কেমন দিয়েছি সেইটার চাইতে আমার কাশুবি বলে মা’কে গালি দেয়াটাকেই জরুরি বলে মনে করতেন। তিনি ঠা ঠা করে হাসতেন। তার হাসি শুনে আমি আরো ক্ষেপে যেতাম। এবং তখন আরও মাকে এবার চিৎকার নয় ফিসফিস করে মা’কে শুনিয়ে বলতাম, “কাশুবি” “ কাশুবি” । মা’র অসহায় হাসিটা আমার বুকে এসে বিঁধতো। একটু পরে ঘরে গিয়ে কোন এক নিভৃতকালে মা’র কোলে মুখ বুজে হাউমাউ করে কাঁদব। মা তাতে যদি একটু স্বান্ত্বনা পান !
মা খুব সুন্দরী। স্বামী মারা যাওয়ার পরেও তার চামড়ায় ছায়া পরে নি এতটুকু। সৌন্দর্য কি কখনো ঢিলে হয়, মরিচা ধরে, ভাটা পড়ে ! এখনো তার টানটান বুক দেখলে আমার ঈর্ষা হয়। আমি তার মেয়ে। আর কদিন পরে তার জায়গায় আমি যাব – এ নিয়েতো পরম নিশ্চিন্তি আর বুকের ভিতর চিরায়ত তীব্র বাসনা থাকবার কথা। কিন্তু আমার ভাগ্যটাকে ভগবান এখানেও বঞ্চিত করে রেখে দিলেন। বাঁশঝাড়ের তলায়, প্রায়ান্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে টুকরো যে অংশটা সামান্য দূর থেকে ঝলমলে রোদকে দেখে, তার তৃষ্ণা তার বেদনা একমাত্র সে ছাড়া বুঝবে অন্য কেউ!
মায়ের রুপজৌলুস শুধু বাবার অধিকারেই থাকবে এইটা মানতে আমার একটু অস্বস্তি ছিল। রাস্তাঘাটে তার সাথে গেলে আমার থেকে দু ক্লাস উপরে পড়া ছেলেরা পর্যন্ত তার দিকে যে চোখে তাকায়, ঐ তৃষ্ণার জন্য যে কোন যুবক যে আগুনের গর্তে ঝাঁপ দিতে পারে, গাড়ির তলায় নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে পারে, ধারালো চাকু হাতে ধরা শত্রুর (শত্রু হিসাবে বাবার চেহারাটাই ভেসে উঠতো চোখের সামনে) সামনে মুখোমুখি হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। এমন নারীর জীবন কামনা করে না আছে কোন এমন কেউ!
যেদিন মাকে বললাম , “ মা দাদু লুকিয়ে লুকিয়ে তোমার স্নান করা দেখে”। আমি আশা করেছিলাম সেটা শুনে মা তীব্র রাগে ফেটে পড়বে। আমার নিজের পর্যন্ত দাদুর এমন কর্মকাণ্ডে প্রচণ্ড ঘেন্না হচ্ছিল। এখনো আমি সেটা মেনে নিতে পারি নি। কিন্তু মাকে দেখলাম, সে আমার কথাটা শুনে আমার থমথমে মুখ দেখেও সেরকম কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। যেন মেয়েমানুষের কাছে এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা। আমার কাছ থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল , “তোর বাবাকে কিছু আবার বলতে যাস না। কি থেকে কি করবে বলা যায় না”। আমার কেন জানি মায়ের কথা শুনে মনে হল – দাদুকে ভেজা শরীর দেখানোতে তার কিছুটা নিরব সন্মতি আছে। আমারতো উচিত ছিল সেই তখুনি প্রচণ্ড রাগে থরথর করে কাঁপা এবং মাকে মুখের ওপর ঠাস ঠাস করে কিছু বলা। ক্রোধের রেশ থাকতে থাকতেই মনে হল চোখের সামনে বাবার প্রেমহীন মুখটা ভেসে উঠেছে , বাবার প্রতি হঠাৎ উথলে ওঠা বেদনা মুহূর্তেই মুমূর্ষু প্রদীপের দপ করে নিভে যাওয়ার মতন মিলিয়ে যেতে চ্যুতি সময় লাগল না, কারণ বাবার ঠিক পেছনে দেখতে পেলাম মায়ের কাতর চোখ। মার খেতে খেতে কুঁকড়ে যাওয়া ভয়ার্ত চেহারাটাও।
আজ বোধ হয় এই পরীক্ষার হলে অনন্তকালের জন্য বাকী পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধুলোবালির সাথে মিলেমিশে যাব। এতকিছু নিয়ে মাথায় খেলে গেল কিন্তু তারপরেও সময় যেন আজ আমাকে নির্মম প্রতিশোধ নিয়ে তবে রেহাই দেবে। ঘড়ির কাঁটা দেখাচ্ছে মাত্র দশ মিনিট পার হয়েছে! বাকী সময় এইভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে স্যার আর ম্যাডাম দুজনে সন্দেহের চোখে তাকাবেন। না জানি আরো কত অমৃত বচন বর্ষণ হবে আজ। হে প্রিয় কর্ণদ্বয়, সামনের দিনগুলিতে তোমাদেরকে কুকুরের গাঢ় চামড়া আর ভারী মাংসের আস্তরের সমান্তরাল হতে হবে, আজতো একটা দিন মাত্র। এখন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমাদের পরীক্ষা দিয়ে যেতে হবে। আপাততো অংক পরীক্ষার খাতায় নিজের মাকে নিয়ে রচনা লিখতে বসে যাব নাকি !
আমরা চার বান্ধবী আবার মিলেছি। রানিদের ঘরটা আগের মতই আছে। মাটির বেড়া, ঝকঝকে, লেপে পুষে মসৃণ করে রাখা। উঠানের কোণে ঝাকড়া আমগাছটা এখনো চড়া রৌদ্রে ছায়া দেয়, স্নিগ্ধ ,শীতল। ওদের বাড়ির পিছন দিকে জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যাবে বড় একটা শিমুলগাছ, ফাল্গুন মাসে খা খা করা দুপুরবেলা শিমুলফুল সমেত গাছটাকে মনে হবে রোদ, সবুজ আর উপুর হওয়া নীল আকাশ – এসবের মধ্যেও সে বড় একা, নিঃসঙ্গ। শিমুল গাছটার নিচে পরিত্যক্ত একটা রাস্তা, সে রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে শিমের ডালপালার আগ্রাসী জঙ্গল দ্বারা গ্রাস হওয়া একটা টিনের চালার ঘরের সামনে। রানিকে যেকথা জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে সর্বদা বলে থাকি, সেটার পুনরাবৃত্তি হল, “আচ্ছা রানি ! এই ঘরের মানুষরা আর আসে নাই! ” । রানি কি বলবে সেটাতো জানা। এই গল্পে নতুন কিছু নাই। “আহা! এখনো সেই নাগরকে ভুলতে পারিস নি বুঝি! পার্টির ওরা বার্মায় গিয়ে বিয়ে শাদি করে একেকজন বুড়ো হয়ে মরেই গেছে হয়তো ”।
আমি তখন চোখের সামনে মাঘের সকাল, ন্যাতানো রোদ, শিশিরে লবডব ঘাস আর কড়া হলুদ রঙের সর্ষে – এইসব দেখি। একটা লাল রঙের প্যানাসোনিক টু ইন ওয়ান কাঁধে নিয়ে মাথায় সবুজ গামছা পরা একটা লোক যার শুধু পিছন দিকটাই দেখতে পাচ্ছি, গান বাজছে “এই গি অঞ্জলি / নঙ্গি ইংনা মাইথংনা / পথা হাল্লে এই গি থাময়বু ……”।
রানি কি আর আমার মতন অত নিখুঁত করে দৃশ্যগুলি দেখেছে! তার এবং তাদের প্রায় সকলের চিন্তাভাবনা ঐ এক, মানে একটা জায়গাতেই আটকে থাকে। কোন জিনিসের প্রতি আগ্রহ মানেই বুঝি প্রেম হয়ে গেল! আমার কথাগুলি রানির উদ্দেশে বলা হলেও বিকালবেলা শিবরাত্রির মেলায় যাওয়ার উদ্দেশে সাজগোজ করতে থাকা, এই ভরদুপুর থেকে, ব্লাউজ ছাড়া, কেবল ফানেক তোলা বুকের ওপর পর্যন্ত – মিতালি প্রসাধনীর গভীর গোলকধাঁধায় এত নিমগ্ন থেকেও আমার কথাগুলি শোনামাত্র কিভাবে চমকে উঠল, যেন দোয়েল পাখির ডিম গাছের ওপর থেকে রোদে ঝাঁঝরা পাথরের ওপর পরে ফেটে চূর্ণ হয়ে গেল। বেমথৈ বড়লোকের মেয়ে। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের আলাপ সালাপে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নাই, এরকম সে ভাণ করে থাকে, কিন্তু মূলত সে সকল কিছুই শোনে এবং যা কিছু দেখেছে সেটা তার বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনে আরো জোড়াতালি দিয়ে বর্ণনা করে। মানুষ চিনতেতো আর কম চিনলাম না। এরা আমার বান্ধবী, সুখদুখের আপনজন, তারাই আমাকে যদি সেই কবেকার অবুঝ বয়সে মুসলিম এক ছেলের সাথে চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময় ঘর ছেড়ে অতিবাহিত করেছিলাম- এই একটা মানদণ্ড নিয়ে আমার গোটা জীবনটাকে বিচার করে, বাকী মানুষদের আর দোষ কোথায়!
ওদের মুহূর্ত সময়ের এই কৌতূহল বলো আর অস্বস্তি আমাকে অতটা প্রভাবিত করে না। এভাবেইতো জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছি। জানলার বাইরে ঐ যে নিঃসঙ্গ শিমুলগাছ আর তার কাণ্ডের ওপর সুশোভিত অপরূপ লাবণ্যময়ী ফুল– যে কিনা সৌন্দর্য অকাতরে বিলিয়ে দেবে পাত্রে অপাত্রে তারপর একসময় সৌন্দর্য হারিয়ে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে চুপসে যাবে এবং মারা যাবে – এমন জীবনইতো আমি চেয়েছিলাম, তাই না!
প্রায় অনেক বছর পর আজ মেলায় যাচ্ছি। সোনারুপা চাবাগানের বড় জোড়াটিলার নিচে ন্যাড়াকাটা খোলামাঠের সামনে একটা ঢেউখেলানো উঁচু ঢিবি, তার ওপর সাদা আর কড়া সবুজের মিশেলে চুনকাম করা পাকা মন্দির, জোড়া শিরিষগাছ ডানে বায়ে, বাতাসার গন্ধ বাসী পাকা কলার গন্ধ, পেটমোটা পূজারির মরামাছের চোখের মতন নির্বিকার শীতল চোখ! – এইসব দেখেছিলাম অনেক বছর আগে, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়, মামারবাড়ি বেড়াতে এসে। আজ কি হুবহু সেইরকম দৃশ্য দেখতে পাব! পৃথিবীর কতকিছু বদলে গেল, একমাত্র আমিই বোধহয় অপরিবর্তনীয় রয়ে গেলাম!
কিন্তু আমি কি আজ আদৌ মেলায় যেতে পারব! যে সঙ্গদের পাল্লায় এসে পড়েছি, মনে হয় না মেলায় যাবে বলে মিতালি শ্রীমঙ্গল থেকে এখানে এসেছে। সেই তখন থেকেই দেখছি সে আর রানি দুজনে মুখে চন্দন মেখে মেঝেতে বসে হাসাহাসি করে যাচ্ছে। বেমথৈ তার বাড়িতে গেছে। সেখান থেকে সে পুরো রেডি হয়ে আসবে। সমস্যা করবে এই দুজন। যেকোন অনুষ্ঠানে এদের সাথে যাবার কথা থাকলেই ঝামেলা শুরু করে দেবে। মিতালিটা একদম ফালতু। দেখতেতো এমনিতেই বিশ্রি। কিন্তু সে নিজে এটা স্বীকার করবে না। আমি জানি আর একটু পরেই সে রানির নিজের আলমারির সমস্ত কাপড় বের করে তার সাথে ম্যাচ করে কিনা দেখবে। একটা একটা করে পরে আয়নার সামনে যাবে আর আবার ঘুরে দরজার সামনে আসবে। এইভাবে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে সবশেষে পাটির ওপর বিছানো ধুয়ে রাখা পাটভাঙা বিশৃঙ্খল কাপড়ের স্তুপে পরে হাউমাউ করে কাঁদবে। এইগুলা নতুন কিছু না। আজও তার পুনরাবৃত্তি হবে ।
শীতের বিকাল ফুরিয়ে যেতে কতক্ষণ! সন্ধ্যাবেলা মেয়েমানুষ কেউ মেলায় যায় ! আমরা চারজন হাত ধরাধরি করে হাঁটছি আর আমাদের পিছনে সুদর্শন এক পাল ছেলে। রানি আর মিতালি ওদের তুচ্ছ কথায় হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যাচ্ছে প্রায়। সমস্ত কিছুর মূল কেন্দ্রবিন্দু যে আমি এটা এই অপদার্থ দুইটা একদমই বুঝতে পারছে না। নাকি বুঝেও না বোঝার ভাণ করে যাচ্ছে – ভগবান জানেন। কিন্তু আমি কি আর ওদের কাতারে পড়ি! যথারিতী আমি রাজহংসী, উঁচু গ্রীবা, রৌদ্রের লালচে ছটা আমার মুখের ওপর, গভীর আনত চোখ – যাকে পাশ ফিরে দেখতে গিয়ে মেলা ঘুরে আসা সাইকেল আরোহী রাস্তা ছেড়ে টনটনা শুকনো মাটির ঢিবির ওপর চিৎপটাং। এই দৃশ্যগুলি কল্পনা করেইতো অনেক বছর পর মেলা ঘুরতে আসা। খাজা জিলাবি খাওয়ার বয়স আছে নাকি আমার! আচ্ছা, পিছনদিকে হঠাৎ হৈচৈ শোনা যাচ্ছে নাকি! আমাদের ঘিরে রাখা ডানদিকের ছেলেগুলা হঠাৎ আমাদের বামদিকে একসাথে চলে আসছে। বেমথৈ এতক্ষণ চুপচাপ আমার মতো আমার ডানহাত ধরে হাঁটছিল। সেও দ্রুত ঘুরে চলে গেছে বামদিকে। প্রায় সবার ভীত-সন্ত্রস্ত চেহারা। যেন অসভ্য গুণ্ডা কেউ বেপরোয়া হয়ে ছুটে আসছে পিছন দিক থেকে। কিন্তু আমার চরম বিপদে আমার জন্য পাগল হওয়া সুদর্শন ছেলেরা আমাকে বাঁচাবে না! সত্যি সত্যি দেখি দমকা একটা বাতাস আমাদের দিকে এসে আছড়ে পড়েছে। ওড়নার কাপড়ে মুখ ঢেকে গেছে। ধূলো একতাল ফেটে পড়েছে সামনে এসে। চারদিক ধোঁয়া আর ধূলোর অন্ধকার। আমি অপেক্ষা করলাম ধূলোর ঝড়টা সরে গেলেই নিশ্চই সুদর্শন কোন ছেলে এসে আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে দেবে। ততক্ষণে আমার পাশ থেকে সবাই সরে পড়েছে। চোখ বন্ধ থাকলেও আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম ধূ ধূ জঙ্গলের রাস্তায় একা আমি, চারদিক সব নিস্তব্ধ, দূরে শোনা যাচ্ছে মানুষের চিৎকার, চিৎকারগুলি সরে যাচ্ছে ক্রমাগত। কিন্তু আমার পাশে একজন যে দাঁড়িয়ে আছে সেটা পরিষ্কার, লোকটা সুদর্শন নিশ্চিত, চোখটা খুললেই তাকে দেখতে পাব, যে পুরুষের জন্য গোটা একটা যৌবনকাল তৃষিত হয়ে কাটালাম, লোকের লাঞ্ছনা পেতে পেতে বুকের রক্ত যেখানে পরিণত হয়েছে হিম পাথরের ধাতব নদীতে, ভালোবাসার নাম শুনলে এই একটু আগে পর্যন্ত মনে হতো একদলা থুথু উঠে আসছে মুখে, সেই দিনগুলির আজই অবসান হয়ে যাবে। আহ! কোথায় হে প্রাণনাথ, প্রাণেশ্বর! কিন্তু চোখ মেলে এ কাকে দেখলাম ! ধনা … ধনা …… ধনঞ্জয় ……
ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে গেল। ধনঞ্জয়তো মারা গেল এই মাস কয়েক আগে। নাকি আদৌ মারা যায় নাই! বালিশের আশপাশ হাতড়ে চার্জার লাইট বের করে অন্ধকার ঘরের ভিতর লাইট জ্বালিয়ে ঘুমন্ত দুইটা বাচ্চা আর তাদের পাশে আর কেউ নেই দেখে নিশ্চিন্ত হলাম – ধনা মারা গেছে। লম্বা একটা দীর্ঘঃশ্বাস বের হয়ে গেলে অন্ধকারের মধ্যে মনে হল বাতাসটা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে চলে গেছে। চার্জার লাইট নিভিয়ে দিলাম, দরকার ছিল না। পাশের বাড়ির পানের জুম পাহাড়া দেয়ার জন্য গাছের আগায় জ্বালানো ভালবের আলোর রেশ আমাদের ঘরের ভিতর পর্যন্ত চলে আসে। ঘুমোতে আর ইচ্ছা করল না। বিছানায় বসে থাকতে চাইলাম আরো কিছুক্ষণ। কী সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম। ভগবানের কী অপার লীলা ! স্বপ্ন দেখিয়ে কি ইংগিত করলেন ! এত বছর বাদে আমার কি পুনরুজ্জীবন ঘটে গেছে !
ছেলে মরে গেলে বাপতো রয়ে গেছে। নাহ ! ঐটা থাকুক। জীবনে টুকটাক ঝামেলা হতেই পারে। বুড়াটা লুচ্চা বটে। কিন্তু স্বামীর অবহেলা পেতে পেতে আমারও মাথার ঠিক ছিল না। এখন সব ঠিক হয়ে যাবে। নিত্যদিনের চন্দ্র সূর্য হঠাৎ আসা ঝড়-তুফানকে কি আর মনে রাখে ! বাড়িতে একজন পুরুষ লোক থাকা ভাল। না থাকলেও ক্ষতি নাই ।
























