home ই-বুক, দর্শন ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি (১১ পর্ব) ।। অরুন্ধতী রায় ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি (১১ পর্ব) ।। অরুন্ধতী রায় ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

আফজাল গুরুকে ফাঁসি দেয়ার পরিণতি

২০০১ সালের সংসদ আক্রমণের মূল আসামী আফজাল গুরুর গোপন এবং হঠাৎ ফাঁসি কার্যকরের রাজনৈতিক ফলাফল কি হবে? কেউ কি জানে?

৩ নভেম্বর নয়াদিল্লী তিহার কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপারিটেন্ডের পক্ষ থেকে যেনতেনভাবে মুদ্রিত, অসার আমলাতন্ত্রের নমুনাস্বরূপ যে মেমো বা আদেশনামা আফজালের পরিবারকে পাঠানো হয়েছে তাতে প্রতিটি নামের বানান অপমানজনকভাবে ভুল লেখা হয়েছে। “মিসেস তাবাসসুম এসএইচ আফজাল গুরুর স্ত্রী’র প্রতি” লেখা চিরকুটটি এরকম:

হাবিবুল্লাহর পুত্র এসএইচ মোহাঃ আফজাল গুরু কর্তৃক ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রপতির প্রতি যে মার্সি পিটিশন করা হইয়াছিল তাহা নামঞ্জুর হইয়াছে। ফলস্বরূপ ৯/০২/২০১৩ তারিখে হাবিবুল্লাহর পুত্র মোহাঃ আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ডের দিন ধার্য করা হইয়াছে। সকাল ৮ ঘটিকায় কেন্দ্রীয় কারাগার নং-৩ এ উক্ত দণ্ড কার্যকর হইবে।

আপনাকে অবগত করার জন্য এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যাবলী সম্পাদনের নিমিত্তে এই তথ্য জানানো হইলো।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাবার পর এই চিরকুটটি আফজাল গুরুর পরিবারের হাতে এসে পৌঁছায়। ফলে তার স্ত্রী তাবাসসুম তার সর্বশেষ বৈধ আইনি সুযোগ- মার্সি পিটিশন নামঞ্জুরের বিপক্ষে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার- থেকে বঞ্চিত হয়। আফজাল এবং তার পরিবার উভয়েরই আলাদাভাবে এই চ্যালেঞ্জ করার অধিকার ছিল। উভয়কেই তা থেকে বঞ্চিত করা হয়। কারণ উল্লেখ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও,  তাবাসসুমের কাছে পাঠানো মেমোতে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মার্সি পিটিশন নামঞ্জুরের কোন কারণ লেখা হয়নি। কোন কারণে যদি তা লেখা না থাকে তাহলে কিসের ভিত্তিতে আপিল করা হবে? অথচ ভারতের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাকি সকল বাদীকেই মার্সি পিটিশন নামঞ্জুরের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করার শেষ সুযোগটি দেয়া হয়েছে।

যেহেতু ফাঁসির আগে তাবাসসুমকে শেষবারের মতো তার স্বামীর সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি, যেহেতু তাবাসসুমের ছেলেকে তার বাবার কাছ থেকে শেষ বারের মতো কোন উপদেশ বা কয়েকটা কথা শোনার সুযোগ দেয়া হয়নি, যেহেতু তাকে তার স্বামীর মৃতদেহটি কবর দেয়ার জন্য হলেও ফেরত দেয়া হয়নি, এবং যেহেতু কোন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমপন্ন করা যাবে না, তাহলে “পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যাবলী” বলতে কারাগারে ম্যানুয়ালে কোন কাজকে বোঝানো হয়েছে? ক্রোধ? উদভ্রান্ত, অপূরণীয় শোক? প্রশ্নহীন অনুমোদন? সম্পূর্ণ একমত প্রকাশ করা?

ফাঁসি হয়ে যাবার পরে, পথেঘাটে অবর্ণনীয় আনন্দ উল্লাস করা হলো। সংসদ হামলায় যারা মারা গিয়েছিল তাদের শোকসন্তপ্ত স্ত্রীদের টিভিতে দেখানো হলো। তাদের সাথে অল ইন্ডিয়া অ্যান্টি টেরোরিস্ট ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম.এস. বিত্তা- যার ভয়ালদর্শন গোঁফ এই শোকাবহ পরিস্থিতিতেও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল- তাকে দেখা গেলো। কেউ কি এই বিধবা জায়াদের বলতে পারবেন যে তাদের স্বামীদের হত্যাকারীরা ঠিক ওইদিনই, ওইখানেই, ঠিক ওই জায়গাটিতেই, আক্রমণের খানিক বাদেই মারা গিয়েছিল? এবং এই হামলার পরিকল্পনাকারীদের কোনদিন শাস্তি দেয়া হবে না কারণ আমরা এখনও জানি না তারা কে?

অন্যদিকে, কাশ্মীরে আবারও কারফিউ জারি করা হলো। ওখানকার মানুষকে আবারও আস্তাবলের পশুদের মতো আটকে রাখা শুরু হলো। তারা আবারও কারফিউ অস্বীকার করল। ইতিমধ্যে তিন দিনের ভেতর তিনজন মানুষ মারা গেছে, এবং আরো পনেরজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। ওখানকার সংবাদপত্রগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু ইন্টারনেট ঘেঁটে যে কেউ বুঝতে পারবে যে এবারের ঘটনায় তরুণ কাশ্মীরীদের আচরণ ২০০৮, ২০০৯, ও ২০১০ সালের গণ-আন্দোলনের মতো নয়। ওইসব আন্দোলনে প্রায় ১৮০ জন মানুষ মারা যাবার পরও কাশ্মীরী তরুণেরা  বেপরোয়া এবং উদ্যমে উন্মত্ত ছিল। এবারে তাদের ক্রোধ শীতল এবং ক্ষয়িষ্ণু। ক্ষমাহীন। এমনটা না হবার কি কোন কারণ আছে?

প্রায় বিশ বছরেরও অধিক সময় ধরে কাশ্মীরীরা সামরিক দখলদারিত্বের ভেতর বসবাস করছে। যে হাজার হাজার মানুষ তাদের জীবন হারিয়েছে তাদের মধ্যে অনেককে হত্যা করা হয়েছে জেলখানায়, টর্চার সেন্টারে, এবং “এনকাউন্টার”-এ, সেটা নকল বা আসল যাই-ই হোক। আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ড এই সকল মৃত্যুর চাইতে আলাদা। কারণ এই ঘটনা যুব সমাজ- যাদের কখনো সরাসরি গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা হয়নি- তাদেরকে লড়াইয়ের মঞ্চের পাশে বসে ভারতীয় গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ মহিমা উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। যুব সমাজের চোখের সামনে ঘটনার চাকা ঘুরছে। তারা দেখছে গণতন্ত্রের সমস্ত বেশ্যাবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান, সরকার, পুলিশ, আদালত, রাজনৈতিক দল, এবং অবশ্যই গণমাধ্যম, একসাথে মিলে একজন মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। তরুণরা জানে, যে কাশ্মীরী মানুষটিকে মেরে ফেলা হয়েছে তাকে সুষ্ঠু বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং কোনভাবেই তার দোষ যুক্তিসংগত সন্দেহের উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। (নিম্ন আদালতে চলা বিচারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কার্যত তাকে কোন প্রতিনিধিত্ব করতে দেয়া হয়নি।  রাষ্ট্র তার (মানুষটির) পক্ষে লড়বার জন্য যে আইনজীবীকে নিয়োগ দিয়েছিল, সে কারাগারে তার সাথে কখনো দেখাই করেনি। উপরন্তু ওই আইনজীবী তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অপরাধমূলক অভিযোগের প্রমাণগুলো সমর্থন করেছে। ব্যাপারটি বিবেচনায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে এতে কোন অসুবিধা নেই।) কীভাবে সরকার অপেক্ষারত মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীদের সারি থেকে টেনে বের করে এনে শাস্তির পালা আসার আগেই আফজাল গুরুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়েছে- কাশ্মীরের তরুণেরা তাও দেখেছে। তাদের শীতল, জ্বলন্ত ক্রোধ এবার কোন আকার ধারণ করে কোন পথে যাবে? এই ক্রোধ কি তাদেরকে সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত আশীর্বাদীয় স্বাধীনতার পথ- যার জন্য তারা পুরো একটা প্রজন্ম ধরে ত্যাগ স্বীকার করে আসছে- সেই দিকে নিয়ে যাবে? নাকি এই ক্রোধ তাদেরকে আরেকটি বাধভাঙা সহিংসতার চক্র- যেখানে তারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর সামরিক বুটের নিচে বলবৎ হওয়া “স্বাভাবিক অবস্থার” ভেতর দিন কাটাবে- সেইখানে নিয়ে যাবে?

এই এলাকায় বসবাসকারী আমরা সবাই জানি যে, ২০১৪ সালটি ভিন্ন পথের জল প্রবাহের সন্ধিক্ষণ হতে যাচ্ছে। খুব শীঘ্রই পাকিস্তান ও ভারতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সেইসাথে জুম্মু ও কাশ্মীর প্রদেশেও নির্বাচন হবে। আমরা আরো জানি যে যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করবে ততোক্ষণে চরম অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা পাকিস্তান থেকে বিশৃঙ্খলা কাশ্মীরে এসে উপচে পড়বে। এমনটা আগে আরো কয়েকবার ঘটেছে। ভারতীয় সরকার যে প্রক্রিয়াতে আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলো তাতে বোঝা যায় যে তারা আসলে এই অস্থিতিশীলতার প্রক্রিয়াতেই ইন্ধন যোগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। (অর্থাৎ যে রকম পরিস্থিতিতে তারা ১৯৮৭ সালের কাশ্মীর নির্বাচনের সময় কারচুপি করেছিল, সেরকম পরিস্থিতিকেই তারা আবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।)

কাশ্মীর উপত্যকার টানা তিন বছরব্যাপী গণ-প্রতিবাদ ২০১০ সালে এসে শেষ হয়। সরকার তখন তাদের কথিত “স্বাভাবিক অবস্থা”কে (হাসিখুশি পর্যটক আর কাশ্মীরী ভোটার) ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার তার অতীতের এতোসব প্রচেষ্টা এখন ইচ্ছাকৃতভাবেই নষ্ট করে দিচ্ছে কেন? আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ডের সাথে বৈধতা, নৈতিকতা, এবং আর্থিক স্বার্থের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। এসব প্রকাশ্য বিষয়গুলো একপাশে সরিয়ে রেখে আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ডের পুরো প্রক্রিয়াটিকে যদি শুধু রাজনৈতিক এবং কলাকৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তাহলেও বলতে হবে যে এটি একটি বিপদজনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড। কিন্তু, এমনটাই করা হয়েছে। পরিষ্কারভাবে এবং জ্ঞানতই এটা করা হয়েছে। কেন?

আমি “দায়িত্বজ্ঞানহীন” শব্দটি পরামর্শ হিসেবেই ব্যবহার করেছি। আসুন দেখা যাক শেষবার কি ঘটেছিল?

২০০১ সালে, সংসদ আক্রমণের কয়েক সপ্তাহের ভেতরেই (এবং আফজাল গুরুকে গ্রেপ্তারের কয়েক দিনের মধ্যেই) ভারত সরকার পাকিস্তান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের ফিরিয়ে আনে এবং সীমান্তে আধা মিলিয়ন সৈন্য বসায়। জনগণকে কেবল একটি তথ্যই তখন জানানো হয়, আর তা হলো- দিল্লী পুলিশের স্পেশাল সেলে বন্দী থাকা অবস্থায় আফজাল গুরু স্বীকার করেছে যে সে পাকিস্তানপন্থী জঙ্গী সংগঠন জইশ ই মোহাম্মদ ( জেইএম) এর সদস্য। সুপ্রিম কোর্ট পুলিশি হেফাজতে আফজালের কাছ থেকে নেয়া এই “জবানবন্দী”কে আইনিভাবে অগ্রাহ্য বলে সরিয়ে রাখে। আইনভাবে অগ্রাহ্য কোন দলিল কি করে যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরির ব্যাপারে গ্রাহ্য হয়?

এই মামলার সর্বশেষ বিচারে, “সমন্বিত বিবেকের সন্তুষ্টি বিধান” বিষয়ক বর্তমানের বিখ্যাত বক্তব্য ছাড়াও সুপ্রিম কোর্ট আরেকটি কথা বলেছে। আর তা হলো, সরাসরি কোন প্রমাণ না থাকায় “এ ব্যাপারটি প্রমাণ করা যায় না যে আফজাল গুরু কোন সন্ত্রাসী দল বা সংগঠনের সাথে জড়িত।” তাহলে এতোসব সামরিক আগ্রাসন, সৈন্যদের প্রাণ হারানো আর জনগণের টাকার এতো বিপুল পরিমাণ রক্তক্ষরণ এবং একটি পারমাণবিক যুদ্ধের সত্যিকার ঝুঁকি নেবার প্রয়াসকে আমরা কোন যুক্তিতে যথার্থ বলে মেনে নেবো? (মনে আছে, কীভাবে বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল এবং কীভাবে তারা তাদের কর্মচারীদের সরিয়ে ফেলেছিল?) তাহলে কি সংসদ আক্রমণ এবং আফজাল গুরুকে গ্রেপ্তারের ঘটনার আগেই কিছু গোয়েন্দা কার্যক্রম সম্পণ্ণ হয়েছে যা দেশবাসীকে জানানো হয়নি? তাই যদি হয়ে থাকে তবে কীভাবে আক্রমণের ঘটনাটি ঘটতে দেয়া হলো? আর গোয়েন্দা তথ্য যদি এসব বিপদজনক সামরিক ঠাট-ঠমক কে যুক্তিসংগত ভাবার ক্ষেত্রে এতাটাই সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে ভারত, পাকিস্তান, আর কাশ্মীরের মানুষের তা জানার কোন অধিকার নেই কেন? এসব প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করে আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে আরো শক্ত করা হলো না কেন?

সংসদ আক্রমণের মামলার ব্যাপারে সীমাহীন বিতর্কের মাঝেও সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই ব্যাপারে- বামপন্থী, ডানপন্থী, হিন্দুত্ববাদী, উদারমনা, জাতীয়তাবাদী, রাজদ্রোহী, হতাশাবাদী, সমালোচক গোষ্ঠী- সকল মহলই একইরকমভাবে নিরব ছিল। কেন?

হয়তো জইশ ই মোহাম্মদ (জেইএম) সত্যিই এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। প্রভিন স্বামী সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে পরিচিত “সন্ত্রাস” বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। ভারতীয় পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে তার ঈর্ষণীয় কিছু তথ্যসূত্র আছে। প্রাক্তন আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাভেদ আশরাফ কাজীর ২০০৩ সালে দেয়া একটি স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য এবং ২০০৪ সালে আমির রানা নামের একজন পাকিস্তানি পণ্ডিতের প্রকাশিত বই থেকে সম্প্রতি তিনি একটি উদ্ধৃতি টেনেছেন। তার ওই উদ্ধৃতি অনুযায়ী, জেইএম-ই ভারতের সংসদ আক্রমণের জন্য দায়ী (ভারতকে অস্থিতিশীল করার প্রয়াসে লিপ্ত একটি সংগঠনের প্রধানের কাছ থেকে পাওয়া বিবৃতির সত্যনিষ্ঠার ওপর এই বিশ্বাস সত্যিই খুব মর্মস্পর্শী)। তারপরও ২০০১ সালের সৈন্য মোতায়েনের সময় কী এমন জরুরী প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল তার সঠিক ব্যাখ্যা এসব থেকে পাওয়া যায় না।

তর্কের খাতিরে স্বীকার করে নেয়া যাক যে জেইএম এই হামলা ঘটিয়েছে। হয়তো আইএসআইও এতে জড়িত ছিল। কাশ্মীরে গুপ্ত হামলার ব্যাপারে পাকিস্তানি সরকার নির্দোষ এমন ভান করারও কোন প্রয়োজন আমি দেখি  না। (একইভাবে ভারতীয় সরকার বেলুচিস্তান এবং পাকিস্তানের কিছু অংশে হামলার জন্য দোষী। মনে করে দেখুন, ৭০ এর দশকে ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। এছাড়াও ভারতীয় বাহিনী শ্রীলঙ্কান তামিলদের ছয়টি ভিন্ন জঙ্গি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর ভেতরে আশির দশকের এলটিটিই-ও আছে।)

চারিদিকে এ এক নোংরা দৃশ্যকল্প।

পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ হলে তখন কী অর্জিত হতো এবং এখনইবা এতে কী লাভ হবে? (বিপুল পরিমাণে মানুষ মারা যাওয়া ছাড়া এতে আর কিছুই হবে না। সেই সাথে কিছু অস্ত্র ব্যবসায়ীর ব্যাংক একাউন্টে মোটা অংকের টাকা জমা হবে।) ভারতীয় বাজপাখিদের নিয়মিত পরামর্শ অনুসারে সমস্যাকে “গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা’র একমাত্র উপায় হলো ‘হট পারসুইট’ এবং পাকিস্তানের ভেতর থেকে “সন্ত্রাসী শিবির” “উপড়ে ফেলা”। সত্যিই কি তাই? আমাদের আক্রমণাত্মক কৌশলগত বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে ঠিক কতজন টিভির পর্দায় দেয়া স্বাক্ষাৎকারে প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র ব্যবসার প্রতি নিয়মিত আগ্রহ প্রকাশ করে তা যদি আমরা একটু খতিয়ে দেখি তাহলে নিঃসন্দেহে খুব আকর্ষণীয় এক গবেষণার বিষয় পাওয়া যাবে।

এইসব যুদ্ধবাজ বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকদের এমনকী যুদ্ধেরও দরকার হয় না। একটি যুদ্ধের মতো জলবায়ু বা পরিস্থিতি- যখন সামরিক খাতের খরচের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী থাকে- তেমন কিছু হলেই তাদের জন্য যথেষ্ট। শুনতে যতোটা মনে হয়, এই “হট পারসুইট” ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কষ্টকর এবং বোধহীন। এইসব যুদ্ধবাজেরা কীসের উপর বোমা ফেলবে? অল্প কয়েকজন মানুষের উপর? তাদের শিবির এবং খাদ্যের চালানের উপর? নাকি তাদের আদর্শের উপর? তাকিয়ে দেখুন আফগানিস্তানে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের “হট পারসুইট” এর শেষ পরিণতি কি হয়েছে। আরো দেখুন যে আধা মিলিয়ন সৈন্যের একটি “নিরাপত্তা বেষ্টনী” কীভাবে কাশ্মীরের নিরস্ত্র জনতাকে দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতসব প্রমাণের পরও কীনা আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে ভারত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে এমন একটি দেশে বোমা ফেলতে যাচ্ছে যেখানে বিশৃঙ্খলা ক্রমশ বেড়েই চলেছে! ভারতের পেশাগত যুদ্ধ ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যেটাকে পাকিস্তানের বিভেদ বলে মনে করে, সেটার প্রতি ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করেও তারা ব্যাপক সন্তুষ্টি পায়। ইতিহাস এবং ভূগোল সম্পর্কে প্রাথমিক কার্যকরী জ্ঞান আছে এমন যে কোন মানুষ মাত্রই বুঝবে যে পাকিস্তান ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়াটা কারো জন্যই খুশির খবর হতে পারে না। (বিশেষত যদি পাকিস্তান ভেঙে একগাদা ক্ষ্যাপাটে, নিরাশাবাদী ধর্মীয় মৌলবাদীদের খণ্ড খণ্ড দেশে পরিণত হয়।)

আফগানিস্তান এবং ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির কারণে, এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকান সরকারের শিষ্য ও অংশীদার হওয়াতে এমনিতেই পাকিস্তান একটি ঘটনাবহুল অঞ্চল। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো অন্তত জানে যে পাকিস্তান দিনে দিনে কী ধরনের বিপদসংকুল হয়ে উঠছে। কিন্তু এই সময়ে যা বোঝা কঠিন সেইসাথে পড়াও দুষ্কর, তা হলো- বিশ্বের নতুন এবং প্রিয় মহাশক্তি (ভারত) এর বিধ্বংসী বাতাস যা দ্রুত গতিতে সামনে ধেয়ে আসছে। ভারতীয় অর্থনীতি যথেষ্ট সমস্যার ভেতর দিয়ে এগুচ্ছে। অর্থনৈতিক মুক্তির ফলে নতুন গজিয়ে ওঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতর উপার্জনের যে আক্রমণাত্মক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে তা খুব দ্রুতই এক সমমানের আক্রমণাত্মক হতাশার রূপ নিতে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে বিমানে চড়ে সবেমাত্র ওড়া শুরু করেছে ইতিমধ্যেই তার গতি কমে আসছে। গতির উল্লাস এখন পতনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

২০১৪ সালে সাধারণ নির্বাচন হবে। নির্বাচনী জরিপ হবার আগেই আমি বলে দিতে পারি যে ফলাফল কি হবে। খালি চোখে দেখলে ব্যাপারটা অবশ্যাম্ভবী না হলেও, আমরা আবারও সংসদে কংগ্রেস-ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এর জোট পেতে যাচ্ছি। (এই দুটি দল প্রত্যেকেই তাদের বলয়ে থাকা সংখ্যালঘুদের কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।) ভারতীয় মার্কসবাদীদের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআইএম) এর সমর্থন যদি কেউ নাও চায়, তারপরও তারা বাইরে থেকে যে এই জোটকেই সমর্থন দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওহ্, এবং এটি একটি মারত্মক শক্তিশালী রাষ্ট্র হবে। (ফাঁসির সারির ওপর থেকে ইতিমধ্যেই গোপনীয়তার আবরণ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফাঁসির লাইনের পরবর্তী জন কি তবে পাঞ্জাবের মূখ্যমন্ত্রী বিয়ান্ত সিং এর হত্যাকারী বলবন্ত সিং রাজওয়ানা? তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে পাঞ্জাবে খালিস্তানি অনুভূতির পূণর্জাগরণ ঘটবে। ফলে আকালি দল এবং বিজেপি মাটিতে ছিটকে পড়বে। এ হলো, কংগ্রেসের পুরোনো আমলের চমৎকার রাজনীতির নতুন প্রয়োগ।) 

(আগামী পর্বে সমাপ্ত)


দশম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

গ্রন্থ: ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি
লেখক: অরুন্ধতী রায়
অনুবাদক: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য