home ই-বুক, দর্শন কনফুসিয়াস ফ্রম দ্য হার্ট । ইউ ড্যান । বাংলায়ন : নাঈম ফিরোজ । ভূমিকা পর্ব

কনফুসিয়াস ফ্রম দ্য হার্ট । ইউ ড্যান । বাংলায়ন : নাঈম ফিরোজ । ভূমিকা পর্ব

হৃদয়ালিন্দে কনফুসিয়াসঃ কনফুসিয়ানিজমে নুসন্ধানী এক অভিযাত্রা

 

(‘চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াস এই সময়েও কেন প্রাসঙ্গিক?’ এই উত্তর খুঁজতে তাঁর জীবনদর্শনের উপর ‘Professor Yu  Dan’  এর ‘Confucius From The Heart : Ancient Wisdom for Today’s World’  বইয়ের এক সুনন্দ ভাষান্তর)

  • মোহাম্মদ নাঈম ফিরোজ 

 

ভাষান্তরের ভূমিকা

সামাজিক সম্পর্কসমূহ প্রাকৃতিক ধারার একটি অংশ। বাস্তবিকপক্ষে পারস্পরিক সম্পর্কসমূহের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিলয় না হয় এমনভাবেই নিজ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার পাশাপাশি মানুষের সর্বাপেক্ষা জরুরি গন্তব্য হওয়া উচিত তার অনুভূতি, চিন্তা ও তৎপরতাকে মহাজাগতিক ঐকতানের সমমেলে সুস্পন্দ রাখা। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি কনফুসিয়াস এর দার্শনিক মতবাদসমূহে এবং তা আমাদের জানিয়ে দেয় ‘দূর প্রাচী’র(the ‘Far East’) সমাজবলয়ে জনতা কেন প্রাতিষ্ঠানিক আইনের দ্বারস্থ  হতে নিঃস্পৃহ এবং উদ্ভূত বিরোধ নিষ্পত্তিতে আদালতবিমুখ। দূর প্রাচ্যের আইনব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, বিবাদমূলক বিচার ব্যবস্থাই বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র পন্থা নয়। সেখানে আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির আরও কিছু বিকল্প পন্থা রয়েছে। ইহা সত্য যে, পশ্চিমা বিশ্বেও এমন সব বিরোধ উদ্ভূত হয় যা স্বাভাবিক নিয়মে আদালত-প্রদত্ত বিচারিক সিদ্ধান্তের আলোকে নিষ্পত্তি করা চলেনা-এর উদাহরণ রয়েছে এমনকি আন্তর্জাতিক আইনে, শ্রম আইনে এবং এমন সব ক্ষেত্রে যেখানে বিবদমান পক্ষগণ আদালতের মধ্যস্থতায় নয় বরঞ্চ আপোষ ও শালিসের মাধ্যমেই বিদ্যমান বিরোধ নিষ্পত্তিতে অধিকতর আগ্রহী হয়ে থাকেন। ইহা শুধু অর্থের অপচয়েরই নিরোধ করে না বরং মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক রক্ষায় বিশ্বাসের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই প্রকারে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কৌশলগুলো বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি, বিচার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা ও মামলা-ব্যয় কমাতে প্রচলিত আদালত-ব্যবস্থার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে দিনকে দিন। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা ADR  কনফুসিয়ানিজম থেকে এর মূল Spirit পরিগ্রহ করে এবং বিভিন্ন আইন ব্যবস্থায় এই ADR গৃহীত হয়েছে বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে। এইভাবে কনফুসিয়ানিজম তুলনামূলক আইন (Comparative Law) এর অগ্রগতিতে নিয়ামক হিসেবে আজও এক গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ ভূমিকা রেখে চলেছে। এই যুক্তিই তো দিয়েছেন পণ্ডিতেরা যে, ADR কৌশলগুলো হল কনফুসিয়ানিজম বা ‘ li ’এর বাস্তবিক প্রকাশ। বোধগত পার্থক্য নির্বিশেষে দুনিয়ার প্রত্যেক আইন ব্যবস্থাই  ADR কৌশলগুলোকে দেখেছে তাদের স্ব-স্ব সমাজে অধিকতর শান্তি ও সম্প্রীতি সংস্থাপনের অণুঘটক হিসেবে। নিজস্ব অন্তর্নিহিত গুণাগুণ নিয়ে এবং অনন্য সব সুবিধার আধার হিসেবে ADR কৌশলগুলো বিরোধ নিষ্পত্তিতে মৌলিক তাৎপর্যপূর্ণ এক অবস্থানে আসীন হতে সক্ষম হয়েছে। আর এভাবেই আমরা কনফুসিয়াস এর নিকট একান্তই ঋণী হয়ে পড়েছি- যাঁর দর্শনেই সকল প্রকার বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা ADR  কৌশলগুলোর দার্শনিক ভিত্তি।

২.

চৈনিক ঐতিহ্যমতে কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ছিলেন একাধারে একজন চিন্তক, রাজনৈতিক সত্তা, শিক্ষক এবং চীনা-চিন্তাধারার Ru মতবাদের প্রবক্তা। কনফুসিয়ানিজম হচ্ছে তাঁর শিক্ষা থেকে জাত এক নৈতিক ও দার্শনিক ব্যবস্থা। নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক ও নিম-ধর্মীয় চিন্তাধারার সমন্বিত এক ব্যবস্থা হিসেবে কনফুসিয়ানিজম এর অত্যন্ত প্রভাব রয়েছে পূর্ব-এশিয়ার সংস্কৃতি ও ইতিহাসে। কনফুসিয়াসের দর্শনের সরকারি পর্যায়ে প্রচারণার সুবাদে পূর্ব-এশিয়ার কতিপয় রাষ্ট্রে কনফুসিয়ানিজমকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীন এর মূল ভূখণ্ড, কোরিয়া, তাইওয়ান ছাড়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ চাইনিজ অধ্যুষিত সিঙ্গাপুর কনফুসিয়ানিজম দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তবে জাপান একটু ভিন্ন আঙ্গিকে কনফুসিয়ানিজমকে আত্তীকরণ করেছে। কনফুসিয়ানিজমের মৌলিক দীক্ষা ব্যক্তির নৈতিক উৎকর্ষ লাভের উপর গুরুত্বারোপ করেছে যাতে করে আরোপিত বাধ্যকরী আইন নয় বরং ব্যক্তির নৈতিকতাপ্রসূত সদ্গুণাবলির ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হতে পারে। কনফুসিয়ানিজম অন্য অর্থে ‘হিউমানিজম’; ইহা এমন এক দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি যা ধর্মতত্ত্বের সমস্যা ও আরাধ্য বিমূর্ত সত্তা নয় খোদ মানবসত্তা, মানুষের অর্জন ও কল্যাণের কথা বলে। কনফুসিয়ানিজম এর মর্মানুযায়ী মানুষকে কেন্দ্র করেই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আবর্তনশীলঃ মানুষ একা নয়, অন্য মানুষ সঙ্গে করেই বাঁচে সে। মানুষের জন্যে পরম লক্ষ্য হচ্ছে তার ব্যক্তিক ‘সুখ’। আর স্বাভাবিক নিয়মে সেই ‘সুখ’ অর্জিত হতে পারে কেবল শান্তি অর্জন প্রক্রিয়ায়। Lunyu এবং Analects হিসেবে সংরক্ষিত কনফুসিয়াসের শিক্ষা পরবর্তীকালে একজন আদর্শ মানুষের  শিক্ষা ও শিষ্টাচার গঠন-সংক্রান্ত চৈনিক ভাবধারার ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করে। একজন আদর্শ মানুষ কিভাবে জীবন যাপন করবেন, অন্যদের সাথে মিথস্ক্রিয়া সম্পন্ন করবেন আর কিভাবেই বা আদর্শ মানুষের উপযোগী সমাজ ও সরকার কাঠামো নির্মিত হবে সেই তত্ত্বও তাঁর মতবাদ সরবরাহ করে। চীনা-চিন্তাধারার ইতিহাসের বিংশ শতকের অতীব প্রভাবশালী ইতিহাসবিদ Fung Yu-lan চৈনিক ইতিহাসে কনফুসিয়াসের প্রভাবকে পাশ্চাত্যে সক্রেতিস এর প্রভাবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কনফুসিয়াস এর দর্শন এই পোড়া সময়েও কি আমাদের পথ দেখাতে পারে, মানবমুখী সমাজ ও আইন ব্যবস্থা বিনির্মাণে? চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াস এই সময়েও কেন প্রাসঙ্গিক? এইসব কতিপয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাঁর জীবনদর্শনের উপর ‘Professor Yu  Dan’  এর ‘Confucius From The Heart : Ancient Wisdom for Today’s World’  বইয়ের এই এক ‘সুনন্দ’ ভাষান্তর-প্রয়াস আমার বিনম্র নিবেদন কনফুসিয়াসে তিলমাত্র আগ্রহ রয়েছে এমন সব পাঠকের উদ্দেশে ।



চলবে



 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য