home আলাপচারিতা হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকার (দ্বিতীয় পর্ব) ।। অনুবাদ: পৌলমী সরকার

হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকার (দ্বিতীয় পর্ব) ।। অনুবাদ: পৌলমী সরকার

প্রশ্ন: আপনার পড়া ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম বই কোনটি?

হা.মু: ‘The Name is Archer’, Ross Mcdonald এর লেখা। বইটি থেকে অনেক কিছু শিখেওছিলাম। শুরু করার পর শেষ না করে উঠতে পারিনি। সে সময় আমি তলস্তয় আর দস্তয়ভস্কির লেখা পড়তেও বেশ ভালবাসতাম। সেই বইগুলিও ভীষণ চিত্তাকর্ষক। যদিও গল্পগুলি বেশ বড়, তবুও আমি পড়া শেষ না করে থামাতে পারিনি। তাই আমার কাছে দস্তয়ভস্কি আর রেমন্ড চান্ডলার অনেকটা একই রকমের। এমনকী এখনও কাহিনী বিন্যাসকালে এই দুজনকে একই মলাটে গাঁথার লক্ষ্য থাকে আমার।

প্রশ্ন: কত বছর বয়সে প্রথম আপনি কাফকা পড়েছেন?

হা.মু: পনের বছর বয়সে। The Castle টা প্রথমে পড়ি। বইটি খুব ভাল। তারপর পড়ি The Trial.

প্রশ্ন: বেশ অন্যরকম ব্যাপার তো! দুটি উপন্যাসই অসমাপ্ত এবং কোনটিরই আর কখনো ইতি টানা হবে না। আপনার উপন্যাসও তো; বিশেষত আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাস The Wind Up Bird Chronicle এ আপনি এমন একটি সমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন, পাঠক উপন্যাসটি পড়ার সময় কোনভাবেই আশা করেনি। এটা কি কাফকার প্রভাব, কোনভাবে?

হা.মু: পুরোপুরি সেটা নয়। আপনি নিশ্চয় Raymond Chandler এর লেখা পড়েছেন। তার লেখাতেও কিন্তু কোন সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি থাকে না। একবার খুব মজার ঘটনা ঘটেছিল একটা। Howard Hawk একবার The Big Sleep নিয়ে একটা ছবি বানাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না যে Chauffeur কে খুনটা কে করেছিল। তো, তিনি Chandler কে ফোন করেছিলেন খুনির নাম জানার জন্য; আর তখন Chandler উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি জানি না!’ আমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পরিসমাপ্তি কিন্তু বেশি কিছু বলে না। আমিও জানি না The Brothers Karamaza এ আসল খুনি কে ছিলেন!

প্রশ্ন: এখনও Chauffeur এর খুনিকে খুঁজে বের করার জন্য The Big Sleep এর পাতা বারবার উল্টে যেতে এত উৎসাহ যোগায়।

হা.মু: আমি নিজে, যেহেতু আমি লিখছি, জানি না কে এটা করেছে। আমি এবং পাঠকেরা সেই সময় একই জায়গায় থাকি। যখন আমি কোন একটি গল্প লিখতে শুরু করি, আমি একেবারেই জানি না শেষটা ঠিক কিরকম হবে, এর পরের অংশটাই বা কেমন হবে। যদি প্রথমেই সেখানে কোন খুন হয়, আমি জানি না যে খুনি কে। আমি ঘটনাটি লিখতে থাকি কারণ আমি নিজেও খুনিকে খুঁজে বের করতে চাই। যদি আমি আগে থেকেই খুনি চরিত্রটি জেনে যাই, তাহলে বাকী গল্পটা লেখার কোন মানেই থাকে না।

প্রশ্ন: কোথাও একটা কি ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাখ্যা না করার চেষ্টা থাকে? যেমন কোন স্বপ্ন যখন বিশ্লেষণ করা হয়, তখন কি তা সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে?

হা.মু: বই লেখার একটি সুন্দর দিক হলো, লেখাকালীন সময়ে আপনি জেগে থেকেও স্বপ্ন দেখতে পারেন। যদি এটি সত্যিকারের স্বপ্ন হতো, সেটাকে আপনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন না। লেখা চলাকালীন, আপনি জেগে আছেন, আপনি তখন স্বপ্নের সময় বা দৈর্ঘ্য ইচ্ছেমত পছন্দ করতে পারেন। আমি সকালে চার-পাঁচ ঘণ্টা লিখি এবং নিদিষ্ট সময় শেষ হয়ে এলে আমি সেদিনের মতো শেষ করি। আবার পরেরদিন শুরু করি। যদি এটা সত্যি স্বপ্ন হতো, আপনি তা করতে পারতেন না।

প্রশ্ন: আপনি বললেন যে, যখন লিখেন তখনও আপনি জানেন না খুনি চরিত্রটা কে। তবে আমার একটা ব্যতিক্রমি ঘটনা মনে পড়ছে: ‘Dance Dance Dance’ এ ‘Gotanda’ চরিত্রটি। চরিত্রটি নির্মাণের সময় থেকে তার অপরাধ স্বীকার করার মুহূর্ত অব্দি – কোথাও একটা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে অপরাধী সাজানোর চেষ্টা ছিল। তার অপরাধে বা উপন্যাসের বিন্যাসেও তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তাকেই অপরাধী বলে সন্দেহ হয়। আপনি কি আগে থেকেই তাকে অপরাধী হিসাবে নির্বাচিত করেননি?

হা.মু: আমি আমার আশেপাশের মানুষদের লক্ষ্য করে লেখার চরিত্রদের নির্মাণ করে থাকি। নিজে বেশি কথা বলতে ভালবাসি না, বরং অন্যের গল্প শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তারা কি ধরণের মানুষ তা আমি স্থির করি না। বরং একটু ভাবার চেষ্টা করি, তারা কি ভাবছেন, কোথায় চলেছেন। এভাবেই টুকরো টুকরো দেখা আর অভিজ্ঞতা থেকে রসদ সংগ্রহ করে নেই। আমি বুঝি না যে সেগুলো কতটা বাস্তবসম্মত বা কাল্পনিক, কিন্তু আমার কাছে আমারই সৃষ্ট চরিত্ররা অনেক বেশি খাঁটি – আসল মানুষদের থেকেও। যে ছয়-সাত মাস আমি লিখি, সেসব চরিত্র আমার মধ্যেই থাকে। এটা খানিকটা মহাজাগতিক আকার ধারণ করে।

প্রশ্ন: আপনার কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলি যেন আপনারই দৃষ্টিভঙ্গিকে আপনার লেখার  এক অনন্য জগতে প্রতিফলিত করে। তারা স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন দেখে।

হা.মু: এভাবে বিষয় ভাবলে বুঝতে পারবেন : আমার একটি যমজ ভাই আছে। এবং দু বছর বয়সে আমাদের মধ্যে একজন, অন্যজন আর কি, অপহৃত হলো। তাকে বহুদূরে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত আমরা একে অপরকে আর দেখিনি। আমার কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে আমি তাই-ই ভাবি। যে আমারই একটা অংশ কিন্তু আমি নই এবং তাকে আমি বহুদিনই দেখিনি। এটি খানিকটা আমারই পরিপূরক অংশ। ডিএনএ-এর ভিত্তিতে আমরা এক, কিন্তু আমাদের পরিবেশ-পরিস্থিতি আলাদা। সুতরাং আমাদের ভাবনা-চিন্তার পদ্ধতিও আলাদা। যখনই আমি নতুন বই লিখি, নতুন কিছু ভাবার চেষ্টায় থাকি। কারণ কখনো কখনো আমি আমার আমিত্বে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এভাবে কখনো কখনো সেই ক্লান্তি ভোলার চেষ্টা করি। এটা একটা কল্পনার জগৎ। আমার মধ্যে যদি কল্পনাই না থাকলো, তাহলে লেখার আর তাৎপর্য কি!

প্রশ্ন: একটি লেখার মোটামুটি কতগুলি খসড়া করেন?

হা.মু: চার থেকে পাঁচটি। ছয় মাস ধরে প্রথম খসড়াটি তৈরি করি। পরবর্তী খসড়াগুলোর জন্য আরো সাত থেকে আট মাস সময় নিই।

প্রশ্ন: যথেষ্ট তাড়াতাড়িই!

হা.মু: আমি পরিশ্রমী। আমার কাজে ভীষণভাবেই মনোঃসংযোগ করি। তাই এটা সহজ হয়ে যায় এভাবে, জানেন। বাস্তবিকই সহজ এটা। কারণ আমি যখন লিখি, তখন লেখা ছাড়া আর কিছুই করি না।

প্রশ্ন: আপনার প্রাত্যহিক কাজগুলি সাধারণত কি রকম?

হা.মু: যখন উপন্যাস লিখি, ভোর চারটেয় উঠে টানা পাঁচ থেকে ছয়ঘণ্টা লিখি। বিকেলে ১০ কিলোমিটার দৌড়াই বা ১৫শ মিটার সাঁতরাই (অথবা দুটোই করি)। তারপর কিছু পড়াশোনা করি আর গান শুনি। রাত ৯টায় শুতে যাই। ঠিক এই কাজগুলিই আমি প্রত্যেকদিন করি। কোন বদল হয় না। ক্রমান্বয়ে একইভাবে চলতে থাকা জীবন কখনো নিজেই একটি মুগ্ধতা হয়ে যায়। নিজেকে মনের গভীরে পৌঁছানোর জন্য আবিষ্ট হই। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এই একই কাজ একটানা করে যাওয়া, তা বছরে ছয়মাস হলেও – এর জন্য যথেষ্ট মানসিক ও শারীরিক দৃঢ়তার প্রয়োজন। সেদিক থেকে, উপন্যাস লেখা দস্তুর মতো বেঁচে থাকার এক প্রশিক্ষণ বলা যায়। নান্দনিক অনুভবগুলোর সাথে শারীরিক দৃঢ়তারও যেখানে খুব প্রয়োজন।

প্রশ্ন: Hard Boiled Wonderland নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন।বইটির সামঞ্জস্য আর ঋজুতা আপনার অন্য বইগুলো থেকে এটিকে আলাদা করেছে।উপন্যাসটিতে কি কোথাও আপনার বক্তব্য প্রকাশের ধরন বা কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছিল?

হা.মু: হ্যাঁ। আমার প্রথম দুটি বই জাপানের বাইরে প্রকাশ পায়নি।আমিই চাইনি প্রকাশ করতে। সেগুলোকে আসলে আমার অপরিণত কাজ মনে করেছিলাম। বইগুলিও খুব সংক্ষিপ্ত। সঠিক ভাষায় বলতে গেলে আমার নগন্য কাজ।

প্রশ্ন: সেগুলির খুঁত কি কি ছিলো বলে মনে করেন?

হা.মু: আমার প্রথম দুটি কাজে আমি জাপানি সাহিত্যের গঠন-কাঠামোকে ভেঙে ফেলে নতুনভাবে সাজাতে চেয়েছিলাম। মানে গঠনশৈলীটি মূল কাঠামো বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে চেয়েছিলাম।তারপর আমি সম্পূর্ণ নতুন কিছু দিয়ে আরেকটা কাঠামো তৈরি করি। কিন্তু তখন এ ব্যাপারে অনভিজ্ঞ ছিলাম। সঠিক পন্থাটি আমি চিনতে পারি আমার তৃতীয় বইয়ের পরে, “A Wlid Sheep Chare (1982)” এ। বলা যায়, প্রথম দুটি বইয়ে আমার হাতেখড়ি হয়েছিল। তার বেশিকিছু নয়। A Wlid Sheep Chare (1982) কেই আমি আমার নিজস্ব ঘরানার প্রথম কাজ বলে মনে করি। তারপর থেকেই আমার বই পরিণত হতে শুরু করে এবং গঠণকাঠামো আলাদা হয়। প্রতিবারই যখন লিখতে শুরু করি, আগেরবারের কায়দাটিকে ভেঙে ফেলে নতুন কিছু করতে চাই। গঠণশৈলীর ব্যাপারে আমি সবসবময়ই বিশেষ চিন্তিত থাকি। যদি গঠণ বদলাতে হয়, তাদের আমার তাদের আমার কাহিনীবিন্যাসের কায়দা আর চরিত্রগুলিকেও ক্রমান্বয়ে বদলাতে হয়। যদি তা না করে চিরাচরিত প্রথাই অবলম্বন করি, বারবার একই ফর্ম আমাকে ক্লান্ত করে তুলবে।

(চলবে)


প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

 

অনুবাদক:

পৌলমী সরকার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মানের ছাত্রী।

 

 

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য