home বই পরিচিতি ‘অতিরিক্ত বাগানবাড়ি’ পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতা ।। ইলিয়াস কমল

‘অতিরিক্ত বাগানবাড়ি’ পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতা ।। ইলিয়াস কমল

ইলিয়াস কমল লেখালেখি করছেন দীর্ঘদিন। ২০১৩/১৪ সালের দিকে প্রথম কবিতার বইয়ের জন্য পাণ্ডুলিপি গুছিয়েছিলেন। একে একে প্রকাশ হয়েছে বন্ধু-বান্ধবদের বই; শুধু মজা করার জন্য যাদের বইয়ের প্রচ্ছদ করে ফেসবুকে ছেড়েছেন—বই হয়ে গেছে তাদেরও। কিন্তু কমল নিজের পাণ্ডুলিপি ফেলে রেখেছেন ডাটা সেন্টারে। মাঝে মাঝে বের করে পড়েন আবার বন্দী। যেন অচ্ছুৎ শব্দগুচ্ছ নিয়ে খেলা করা মোটেই শোভন নয়। অবশেষে সব দ্বিধা আর কাটাকুটি ক্ষান্ত দিয়ে এবার ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ হচ্ছে ইলিয়াস কমলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অতিরিক্ত বাগানবাড়ি’। বইটির প্রকাশক ঐতিহ্য। কমলের ‘অতিরিক্ত বাগানবাড়ি’ পাণ্ডুলিপি থেকে একগুচ্ছ কবিতা পড়া যাক।


গৌতমের পিতা

পিতা-পিতা বলে চিৎকার করে কয়েকটি চড়ুই—
তারা জানে না তারা মূলত আহত; এবং যার পরিচয়
ছন্দোবদ্ধ বৃত্তের অক্ষরে, তার স্থাবর-অস্থাবর
সমস্ত জানালা কে বা কারা নিয়ে গেছে আজ।

রুদ্ধশ্বাস থেকে মুক্তি—তারপর আর কোনও সত্য নেই,
কেবলি অদৃশ্য হাহাকার কার পাখনায়
রং ছড়ায়? যারা রঙের সওদা করে বেড়ায়
তাদের জানালাগুলো প্রকৃতই রুদ্ধ;

এবং সে মৃত্যুর কথা ঘুম ভাঙা পাখির মতো সুরেলা বেজে উঠলেও
পিতা-পিতা বলে চিৎকার করে ডেকে ওঠে কয়েকটি চড়ুই এবং গৌতম।

 

জাহাজি

দুরভিসন্ধী দৃষ্টি আরও দূর বয়ে যায় গন্তব্যহীন নাবিকের মতো
যেমন পূর্বপুরুষেরা গিয়েছিল প্রাচীন গুহায়।

প্রাচীন প্রজাপতির ডানায় অনেক রং—অনেক বেসাতি,
শৌখিন মখমলের মতো জমিয়ে রেখে নীল সুগন্ধী
পুষে রাখি প্রাচীন ফ্রেমে। পুষে রাখা সময়ে আমি তার ঠিকানায়
পাঠিয়েছি হাওয়া আর গুহাময় শৈশব অথবা আকাঙ্ক্ষার প্রেম।

কবেকার বৃষ্টির রং মুছে গেলে আমরা আজও সেইসব পাখির
ডানাহীন উড়াউড়ি দেখি, মেঘেদের মতো আমিও
শৈশবের ঠিকানাহীন ঠিকানায় বসতি গেড়েছি—

বসতি জুড়ে আছে প্রাচীন প্রহর, কবেকার সন্ধ্যায়
আমরা পড়ছিলাম কেবলি কৈবর্ত ঘুড়ি
যার রংহীন আবাসন কেড়ে নিয়েছে কোনও এক পাঠক;

আবারো আলোহীন পৃথিবীতে সেইসব মহীরুহের সাক্ষাৎ মেলে
কখনও যিশু, কখনও প্রেমিকা, কখনও বন্ধুর ডেকে আনা ঝড়ে।

 

লেবু বাগান

অনেক দূরের পথ ফেলে এসেছি শৈশবের দুয়ারে।
আমি কি কেবল ঘোড়া?
যে দিকে ছুটায় সেই দিকেই ছুটি?
অথচ আমার জানা ছিল কোন দূর
মরূদ্যানের পাশেই রয়েছে এক বিস্তীর্ণ লেবুর বাগান…
মিঠাপানির স্বাদ লেগে রয়েছে তার থোকা থোকা ঠোঁটে!

এইভাবে পার করে এলেও সু-সময় প্রাণের ঢেউ
কোনও বাগান দেখিনি; একদা যেখানে দেখেছি কেবল ছায়া
অথবা জলের বিস্তার-
আজ সেখানে কেবলই শূন্যতা, নিয়তির কাছে হেরে যাওয়া যুবকের মতো
আমিও কোনও এক লেবু বাগান সৃষ্টির প্রচেষ্টায় বুনে চলেছি
এক একটা বীজ;
বৃক্ষ হোক শান্তির মহিমান্বিত ছায়া
লেবু বাগানে ফুটে উঠলেই শাদা ফুল
ধীরে ধীরে হয়ে যাবে আস্ত এক শরবতের পেয়ালা।

 

প্রতিদ্বন্দ্বীগণ

আপেল বাগানে ছুটে চলা মেঘ
তোমার নাম কে রেখেছে পাখি?

এই শস্যের প্রান্তর ভেজা মাটির গন্ধ ছিল তোমার গায়ে
তবুও হরিণ শাবকের জন্মের কথা গল্প করে
কাটিয়ে দিয়েছি নাম ভুলে যাওয়া শৈশবের ইতিহাস

প্রতিদিন অক্ষরের মৃত্যু গণনা করে বানিয়েছ প্রাসাদ
তারও একটা গল্প আছে, সে কি তোমার মনে আছে?

পাশের উঠানে এখনো সূর্য ওঠে
যাকে আমি ডুবতে দেখিনি কভু
তার নামে কেবল একটা নদীর ঠিকানা হতে পারত
তুমি সেই প্রাসাদের রাজা-রাণী হয়ে থাক
তবে তোমার ঠিকানা আছে ফুল বাগানের মালির কাছে
যে কিনা নামের অক্ষরে ইতিহাস লিখতে গিয়ে
পাখির সংসারের কথা লিখে রাখে পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠায়

এতসব জল্পনা আর কল্পনার রাজত্বের কথা ভুলে যাও
দেখো মন্ত্রীর গাড়ির পতাকার চেয়ে
বাগানে ফোটা ফুলের ঘ্রাণ বড়ই মিষ্টি।

 

ইলিশ

গোপনে ঝরে যায় ইলিশের শখ।

কাঁঠাল পাতার মতো বুক থেকে আতরের সুবাস উঠলে
রাত পোহাবার কথা বলতে গিয়ে ঘুমিয়ে যায় পাড়ার
বন্ধু-খোকাদের বাবারা

একটা বৃত্ত,
এক অর্থে নতুন কোনও সংসারের চাবির মতো
অনুর্বর ভূমির জন্য যেমন কোনও পরাবাস্তব গাছ
সে আলোর ছায়া মেখে গোপন ডাকবাক্সের কাছে
সন্তর্পণে ভাঁজ করে রাখো অভিযোগ

ইলিশ বোকা মাছ
জেনে-শুনে আসে মৃত্যু শিকারে—

 

পিতার মুখ

আরও বছর বিশেক আগে জেনেছিলাম পিতার বয়স
আমার চৌহদ্দিতে তখন মাতাল গন্ধের হরিণ
এবেলা নিরামিষ অথবা কোনও এক মাছেদের কাছে
ছুটে গিয়ে পিতা আমার দারুণ আকালের ছবি এঁকেছিল
আমাদের চোখের সামনের ক্যানভাসে—
তখন তাঁর বয়স ষাট।

আমরা তখন হৃদয়ের তন্ত্রীতে গেঁথে রাখি বুক গন্ধি ফুলের সৌরভ
পিতার বালিশে ছিল অজস্র ব্যর্থতার গল্প
অথচ আমাদের পিতৃবেলার কথা ভেবে মা আমার জমিয়েছে সুতি শাড়ি—
কাঁথার ভাঁজের ওমে আমরা আর আমাদের শৈশব ভিজে উঠত ঘেমে
কখনোবা পিতার আহ্বানে গিলেছিলাম নিশীথে হেমলক
চারপাশের বেগুনি দেয়াল আর কেরসিনের আলোয় পিতার
চোখের চশমায় দেখেছিলাম নিরাপদ আনন্দের হাসি।

আমার পিতা, আরও বছর বিশেক আগে যার জেনেছিলাম বয়স
এখনও আমার কাছে তাই মাত্র ষাট।

 

অযান্ত্রিক অক্ষরের প্রতিলিপি

০৫.
গতকাল সন্ধ্যায় যে খরগোশটি জন্মেছে
সে আসলে একজন চিত্রকর—
পথে পথে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে

বৈঠকঘরে রোজকার আসর জমলে
হন্তারকের ঠিকানা হয়ে যায় মেঘ চিঠির বাড়ি
অপরাজিতা তবুও একটা ফুলের উদাহরণ

পাখিদের পারিবারিক হয়ে সিংহাসন ধরে রাখো
পুচ্ছহীন ময়ূর

অযান্ত্রিক অক্ষরের প্রতিলিপি

০৮.
বাবা ছিলেন আমার আত্মহত্যার ওষুধ
নিজেকে মৃত্যুর আপেল করে দিয়ে
সেজেছিল মোমের পুতুল
তার কাছে ছিল সেই সংসারের চাবি
যা কিনা খুলতে গিয়ে
হারিয়ে ফেলেছি মাঠের পাশে বসে থাকা
টাকি মাছের বংশ পরিচয়

প্রতিবার জন্মাবার সময় তার কথা ভাবি,
মনে হয় সে কোনও রাজকন্যার মতো
গভীর জলের মাছ হয়ে গেছে।

 

ইতিহাস

আর বেলা মাছের ইতিহাস পড়াতেন জিওগ্রাফি স্যার, লাল টুকটুকে বউ মাছগুলোর গল্প বলতেন তিনি; সেবার আমাদের স্কুলে চাঁদবিষয়ক একটা লাইব্রেরি চালু হয়েছিল। সেখানে প্রতি পূর্ণিমায় আমরা চাঁদের গর্ভবতী রূপ দেখতাম। বালিকারা লজ্জা পেয়েছিল প্রতিবারই।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য