home সমালোচনা সাহিত্য কবিতার পেছনে দৌড় চলে না, কবিতা খুঁজে নিয়ে শরীরকে বলে, “কিছুটা শরীর সহো” ।। তাসনুভা অরিন

কবিতার পেছনে দৌড় চলে না, কবিতা খুঁজে নিয়ে শরীরকে বলে, “কিছুটা শরীর সহো” ।। তাসনুভা অরিন

পৃথিবী যে শরীর জন্ম দিল সে কি তা সহ্য করে, না বোধের নির্মাণে নিজেরই কাছে বোহেমিয়ান করে রাখে নিজের অস্তিত্ব?

কে কাকে সহ্য করে অস্তিত্ব সঙ্কটের এই পৃথিবীতে?
সংশয় বস্তুবাদী সময়ের কোন সমালোচনা না, বরং অস্থি চামড়ার মতন সত্য। এই সত্যকে যখন প্রশ্ন করা হয়, ”তুমি কে?”
সত্য তখন বিভাজিত যেমন সপ্তপদী খেলা আলোর আড়ালে । সংশয় অথবা অপরাধবোধ তাকে ম্যাকবেথের মতন তাড়া করে।

”রক্তমাখা টুথব্রাশ ধুতে ইচ্ছা করে না।
আমাদের প্রযত্নে বেড়ে উঠা ছুরির সংখ্যা কতো?
মানুষ মূলত পৃথিবীর বিকশিত অসুখের নাম।”

কবিতা ছোট ছোট ছবির জমে উঠা আর ছবি অনেকগুলো কবিতার ধারক। একটা পৌনঃপুনিক সম্পর্ক আছে এখানে। ”কিছুটা শরীর সহো” কবিতার ভুবনে ছবির অথবা ছবির অঙ্গনে কবিতার একটা মিথস্ক্রিয়া।
শব্দ এখানে ইমেজ অথবা ইমেজ  আলাদা আলাদা প্রতীক । এই প্রতীকগুলো জড়ো হয়ে হয়ে প্রকাশ করছে অনুভূতি, যাকে কবিতা বলে ডাকছে পাঠক।

 

শিল্পী থেকে শিল্প এখানে কতটা দূরে?

সে কি শুনতে পায় তার সৃষ্টির আর্তনাদ না সহ্য করে তার আপন শরীর?

এসব প্রশ্ন আবহ সঙ্গীতের মত ঘুরতে ঘুরতে ক্লাসিক মোচড় সৃষ্টি করেই হারিয়ে যায়। মানুষ এখানেই কবি , চিত্রকর আবার পাঠক, তিন মাত্রার ফ্রেমে আটকানো।

”চিড়িয়াখানায় মানুষের ছায়া থাকে না।
শব্দ ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়লেও দূরের মরীচিকাই ভালবাসি।
বুদ্ধের অরধনিমিত চোখ সম্পূর্ণ নেমে এলে হামেশা মৈথুনের দৃশ্য ভেঙ্গে যায়।”

মারুফ আদনানের প্রথম কবিতার বই ” কিছুটা শরীর সহো”

সবাই যখন বৈচিত্র্য খুঁজছে কবিতায় বা অন্য কোথাও , উপজাত হিসেবে জন্ম নিচ্ছে কৃত্রিমতাও। কিন্তু মারুফের কবিতা পড়তে গিয়ে হয়ে যেতে হয় ভাস্কো দা গামা। সে একটি আবিষ্কারের ভিতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পাঠককে। পাঠকের এই সরাসরি অংশগ্রহণ কবিতাগুলোকে মুহূর্তে মুহূর্তে জীবন্ত করে রাখে। তার ভাষার সরলতার সাথে বোধের গভীরতা মিশে জন্ম দেয় মগ্নতার আবেশ। কবিতাকে তখন আয়না আয়না লাগে, পুরো পৃথিবী এই পৃথিবীর ভিতর।

”পৃথিবীর মানুষ অন্য কিছুর ছায়া হতে পারে না?
আমি নিজেই নিজের ছায়া, আপনিও আপনার ছায়া।”

কবিতার স্বতঃস্ফূর্ততা কোন ইজম দিয়ে আটকানো যায় না, জন্ম দেয় নতুন ইজমের। এই  কবিতাগুলো বৃত্তফর্মে লেখা অর্থাৎ যেকোনো লাইন থেকে কবিতা শুরু হতে পারে আবার যেকোনো লাইনে কবিতা শেষ হয়ে যেতে পারে। এমনকি কবির আঁকা ছবিও কবিতার অংশ। পাঠক এখানে কবির মতন স্বাধীন। কারণ এই বৃত্তফর্মে লেখা কবিতা ভাবনার দিক থেকে যেমন বহুমাত্রিক তেমনি পাঠককে মুক্ত ভাবে চিন্তার সুযোগ করে দেয়। পাঠক চাইলে কিছু না ভেবেও শুধু কবিতার নির্যাস নিতে পারে। এখানে মারুফ গতানুগতিক চমক সৃষ্টির প্রবণতা নয় বরঞ্চ বোধের গভীরতাকে উসকে দেয়। তার ভাষায় – ”বইটার কোন শুরু বা শেষ নেই, যেকোনো লাইনে শুরু যেকোনো লাইনে শেষ, একটা বৃত্তের মত।”

সে ”বৃত্ত ফর্ম ” সৃষ্টির ভিতর দিয়ে কবিতার শরীরে জন্ম দিল দেখার নতুন দৃষ্টি, কেবল দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেই না প্রকাশ ভঙ্গিতেও।

সংশয়কে প্রকাশ করার প্রবণতা উত্তরাধুনিক কবিতার স্বভাবসুলভ ব্যাপার।

”সংশয়ী মানুষের আঙ্গুল মৃত্যুর পরেও নাকি স্পর্শ খোঁজে।”
অথবা ”বিশ্বাসের চাইতেও একা হতে চাই অথবা ঘুমের চেয়েও অধিক বিচ্ছিন্ন।”

তবে সংশয় বা সন্দেহ সত্যে পৌঁছানোর উপায় । যেখানে দ্বন্দ্ব নেই সত্যের সন্ধান সেখানে অসম্ভব। দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই শিল্পে যুক্ত হয়েছে সন্দেহের প্রবণতা। তাই, কবিতায় নিছক সৌন্দর্য বয়ান বা ছন্দের একাডেমিক নিষ্ঠা প্রহসনের মতন লাগে। মানুষ কি শুধু প্রশ্ন করতে সক্ষম , গ্রহণে সক্ষম নয়? সে প্রেমকে, প্রচলিত সুন্দরকে অবিশ্বাস করে আর কাঠঠোকরার মত তৈরি করে নিজের প্রতিমূর্তি। এখানে অবিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় আধ্যাত্মিকতা অথবা আধ্যাত্মিকতা প্রচলিত ভাববাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে বস্তুবাদে।

আদনানের কবিতায় ভাববাদ , আধ্যাত্মবাদ , পরাবাস্তবতা এর প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি বস্তুবাদের ফ্রেমে বন্দী হয়ে আছে । যেন পুঁজির কাছে জীবন, প্রেম , আবেগ , বিবর্তন সবকিছু স্থবির । এখানেই তার কবিতার বিষণ্ণ রুপ, প্রকট আর ভাষা অভিমানের ছলে কটাক্ষ প্রবণ । একে উত্তরাধুনিকি ও রোমান্টিসিজম বলা যায়।

শরীর আর মন এর যোগসাধন প্রাচ্য শিল্পে আদি বিষয়।  ফ্রয়েদিও ভাবধারা থেকে ভিন্ন হয়ে অনেক বেশি সংযোজিত আর ব্যাপ্ত। এখানে শরীর শরীরপ্রধান না হয়ে অনেগুলো প্রশ্ন উত্তরের খেলা খেলতে খেলতে প্রকাশ করছে সমান্তরাল মহাবিশ্ব বা অলটার ইগো এর অস্তিত্বকে। যেমন ”চাইলে শরীরের তলে তলে নিয়ত উনিশ টুকরা অন্ধকার জমাতে পারি আমরা” অথবা  ”পুরো একটা শরীর সহ বেঁচে থাকা হচ্ছে এইখানে” অথবা ”নিত্য এই শরীরের বাইরে আর যা কিছু সবই নেপথলিনসহ ভাঁজ করা আছে”  অর্থাৎ আমরা যে শরীর কে একমাত্র সত্য ভাবছি তাই একমাত্র না । হয়ত এই শরীর আমাদের পুর্নাঙ্গ  শরীরের অংশ বিশেষ যা ভাজ করা যায়, যেখানে অন্ধকার জমিয়ে রাখা যায় ।

”তোমার হাড় শরীরের কোথাও সেলাই করে রাখলে আস্তে আস্তে সেটা নিজের হয়ে উঠবে এমনটাই বিশ্বাস করেছিলাম। সেলাই করা তোমার ষষ্ঠ পাঁজরের অগ্রভাগ আমার গলার বামপাশে আছে, নিজের হয়ে উঠেনি।”

খুব সহজ উপমায় সম্পর্কের সম্পর্কহীনতার কথা বলে দিল কবিতায়। এটা সংশয় না সত্য, এ নিয়ে তর্ক না, বরঞ্চ মেনে নেয়া অভিমান যা নিরজ্ঞান মনে জমতে জমতে হয়ে যাচ্ছে কবিতা।

”একবিন্দু তুমি পাঁজরের কোথাও আটকে থাকো, আটকে থাকো।”

”যে হাত ধরে আছ তার মানুষটি কই?”

অস্তিত্ব সঙ্কট আস্তে আস্তে ব্যক্তির শরীরেও ঢুকে গেছে । মানুষ তাহলে আর নিজের শরীরেও বাস করে না। এই  উপলব্ধি বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আসে নিজের সাথে নিজের, যেমন –  ”নিজের শরীর স্পর্শ আর অন্যের শরীর স্পর্শের মধ্যে একটা পার্থক্য হলো প্রথমটা মৃত আর দ্বিতীয়টা জীবন্ত মনে হয়।”

বাস্তব কি সবসময় ভয়ঙ্কর, সে ভূতের মতন মানুষকে তাড়া করে ফিরে সবসময়?

”ঈশ্বর, আমি বিশ্বাস করতে চাইনা যে, তুমি মানুষের মাংস খাও।“

“ঈশ্বর আমাদের শরীরের ক্ষতের যন্ত্রনা তুমি বুঝবে না।”

এই ঈশ্বর ক্লাসিক যুগের মহান অবতার না, মানুষের অস্তিত্ব সঙ্কটের সময় সবচে নির্বিকার আশ্রয় সেখানে। ”চেষ্টা করলে আপনিও পারবেন, হত্যার পর হাতের রক্ত ধুয়ে নিয়ে দুপুরের ভাত খেতে।”

তাই মহাবিশ্বের সামগ্রিক চেতনা বিদ্যুৎ বাতির মতন জ্বলে উঠছে শরীরে। আর যে একে সহ্য করছে সে কে? সে কি ঈশ্বর ?
মারুফের ঈশ্বর পিকাসোর ঈশ্বরের মতন দরজা দিয়ে বের হয়ে জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে।

পুরো বইটাই একটা ধাঁধা । একটাই কবিতা আবার একের ভিতর বিভাজিত অনেকগুল কবিতা,

”কবর তো বস্তু ধারন করে বায়বীয় আত্মার ব্যাপারে তার কোন অভিজ্ঞতা নাই।”

আবার এই শরীর সহ প্রতদিনের জীবনে ফিরে আসতে হয়।

”শরীরে প্রাণ আছে তা মানুষ জানে কোথাও হোঁচট খাওয়ার পর।”

”তোমার কাছে যা শরীর আমার কাছে তা অসুখ। তোমার কাছে যা পাথর আমার কাছে তা উপায়।”

অথবা ”ছুরি হয়ে উঠার জন্য সব ছুরিরই হত্যার অভিজ্ঞতা থাকা দরকার।”

এখানেই আদনানের কবিতা সমসাময়িক অন্যান্যদের থেকে আলাদা। সে মানুষের মত অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে দেখেছে একটা ছুরিকে আবার সমর্পণের ভঙ্গিমায় তাকেই বলতে হয় – ”যে ছুরি তোমার চোখ ধারণ করতে পারবে তা দিয়েই হত্যা করো আমাকে।“

মারুফের কবিতায় নিঃসঙ্গতা আছে রোমান্টিসিজমে আক্রান্ত কবিতার মতন,

‘’পৃথিবীতে শরীর ছাড়া থাকার কোন উপায় আছে কি?”

”লোমশ হতে হতে একা হতে থাকি।‘’

এত শব্দের ভিড়েও একা মানুষের কোন শব্দ থাকে না।

‘’সর্বমোট শব্দের সাথেও কিছু মানুষের শব্দ মিশে না কখনো। পশুর মতন একা সে।“

তার এ একাকীত্ব পাশবিক বাস্তবতা। আর একে আত্মস্থ করে উঠাই যেন মহান জৈব ধর্ম। তাই পৃথিবীতে শরীর আসলে কতটা শরীর?

‘’তোমার পা দুটো তুলে রেখো না কেবল, পরে থেকো প্রতিদিন।’’

আমরা কেন হাত পা খুলে ঘুমাতে পারি না যখন আমরা যন্ত্রের মতন ব্যবহিত।

‘’তোমার ভেজা পা আর ভেজা পাথর দৃশ্যত একই ঘুঘুর দুই ডানা।‘’

জীব আর জড়ের সহ অবস্থান এই শরীর। অথবা ‘’পৃথিবীতে কখনো তোমার শরীর পাথর পাথর লাগে।‘’

এই জড়বাদ কখনো কখনো তীব্র সঙ্কটের কারণ।

‘’তোমার হাঁটা মুখস্থ করে নিয়েছি, ভিড়ে আর হারাবে না।‘’ অথবা  ‘’তোমার গলা স্পর্শ করতে করতে ভাবছিলাম এখানে পিচ্ছিল খাদ্যনালী।’’

প্রেম এর ভিতর কামের উপস্থিতি পিচ্ছিল খাদ্যনালীর সাথে তুলনায় এনে এর ছায়া অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয়া। ‘’বিশ্বাস করতে পারেন, মানুষ নিজের ছায়া থেকে দূরে যেতে পারেনা।‘’

মানুষ সবচে বেশি কামুক তার নিজের প্রতি। এই লিবিডো নিজের থেকে জন্ম নিয়ে আবার ছায়া হয়ে ফিরে আসছে নিজেরই শরীরে। ‘’ঈশ্বর হয়ত মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন ক্ষুধা আর সঙ্গম দিয়ে।‘’ ক্ষুধা আর সঙ্গম এখানে মুখ্য।

‘’মানুষ আসলে অভ্যাসবশত বেঁচে থাকছে”। “এইখানে দিন দিন ব্যক্তিগত পাসওয়ার্ড বেড়ে যাচ্ছে, ফলে ভাল লাগছে না।‘’

মানুষ সিসিফাসের মতন অসহায় প্রযুক্তির খেলনা নিয়ে খেলতে খেলতে । তার সমস্ত সম্ভাবনা  নিয়ে সে জড় হতে হতে মিলিয়ে যায়।

‘’মানুষের ভাবনা থেকেও তার হাত ছোট বোধয়।‘’

মারুফের কবিতার জগৎ শরীরকে কেন্দ্র করে প্রকাশ করছে পৃথিবীর কোষ , জীবন যাপনের ভাষা । তার আঁকা ছবিতেও একই উচ্চারণ । শব্দ আর ছবি এক হয়ে মানুষকে তার ইন্দ্রিয়ের ভিতর থেকে নিয়ে যাচ্ছে ঈশ্বরের ইন্দ্রিয়ের কাছাকাছি । যেমন জগৎ এক থেকে সঞ্চালিত হতে হতে আবার ফিরে আসছে এক এ।  সিসিফাসের নিয়তির মতন আটকে আছে মানুষ আর ঈশ্বর একটা গোলকধাঁধায় । তার আঁকা শরীর ভিন্ন শরীর খুঁজে খুঁজে মূলত নিজেরই শরীরকে হাতরে বেড়াচ্ছে। এমনকি কাল্পনিক অলটার ইগো’র  জন্ম দিচ্ছে।

‘’কিছুটা শরীর  সহো‘’ এমন একটা বই যা মূলত পাঠের ভ্রমন থেকে পাঠক আর লেখকের ভিতর স্নায়ুর সম্পর্ক তৈরি করে যেখানে তৃতীয় সত্ত্বার উপস্থিতি সম্ভব না। প্রেম, দেহ, আত্মা, জীবন যাপন সবকিছুর আদি একটা পর্যায় আছে হতে পারে সেটাই কোষ, সেটাই ঈশ্বর বা অন্য কিছু বা কেউ না কিন্তু তার সংবেদনশীল উপস্থিতি সমস্ত লাইনে লাইনে। এই রহস্য  হ্যমেলিনের বাঁশির মতন আবেদন জাগায়।

‘’হাত খুলে রেখে শরীরের সংজ্ঞা পাল্টে দিই।“

“বুকে লোম ভর্তি মানুষেরা শিশির ভেজা ঘাসে হাঁটে না।‘’

‘’কিছুটা শরীর সহো‘’ কবিতার একটা শিহরণ।


বই: কিছুটা শরীর সহো
কবি: মারুফ আদনান
রিভিউ: তাসনুভা অরিন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য