home ই-বুক, ভিনদেশি সাহিত্য আমার পড়ালেখা । ভিএস নাইপল । প্রথম পর্ব ।। অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

আমার পড়ালেখা । ভিএস নাইপল । প্রথম পর্ব ।। অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

অনুবাদকের কথা:

ভি.এস. নাইপলের লেখার সাথে পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতোকোত্তর করার সময় তার আ বেন্ড ইন দ্য রিভার নামের উপন্যাসটি আমাদের পড়তে হয়েছিল। অসাধারণ একটি রচনা। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী এই লেখকের কাহিনি, শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন থেকে শুরু করে গল্প বলার ভঙ্গি এবং লেখার দর্শন পুরোটাই তার স্বতন্ত্র লেখকসত্ত্বার পরিচয় দেয়। নোবেল কমিটির মতে, “Naipaul is a modern philosopher carrying on the tradition that started originally with Letters persanes and Candide. In a vigilant style, which has been deservedly admired, he transforms rage into precision and allows events to speak with their own inherent irony.”

আমার পড়ালেখা (রিডিং অ্যান্ড রাইটং আ পারসোনাল অ্যাকাউন্ট) বইটি ২০০০ সালে দ্য নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস কর্তৃক প্রকাশিত হয়। বইটিতে তিনি মূলত তার লেখক হয়ে ওঠার কাহিনি আমাদের বলেছেন। সেই কাহিনি বলতে গিয়ে ঔপনিবেশিক কাঠামোর কথা যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে ভারতবর্ষের দুর্দশার কথা, এসেছে সাহিত্যের  বিভিন্ন ধারা এবং চলচ্চিত্রের কথা। এই বইয়ের মাধ্যমে নাইপল আমাদের সামনে তার একান্ত লুকানো যে জগৎ তুলে ধরেছেন, ব্যক্তিগতভাবে তা আমাদের সাহিত্যচিন্তাকে নাড়া দিয়েছে, সাহিত্য নিয়ে আমাদের উপলব্ধিকে আরও শানিত করেছে। অন্য সবার সাথে সেই উপলব্ধিটুকু ভাগাভাগি করার মানসেই বইটির অনুবাদ কাজে হাত দেওয়া।

  • মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

আমার  পড়ালেখা, পর্ব ১

“স্মৃতি বলতে আমার কিছুই নেই। নিজের মনের বড় দোষ-ক্রটিগুলোর

মধ্যে এই স্মৃতিহীনতা একটি দোষ : যা কিছু আমাকে আকর্ষণ করে তা

নিয়েই আমি ভাবতে থাকি, মনের নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আগ্রহকে

পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সুবাদে একসময় ঐ বিষয়ে নতুন কিছু

খুঁজে পাই আর তাতেই পুরো বিষয়টির প্রতি আমার সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গি

পাল্টে যায়। আমার পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের কাচকে আমি যতভাবে সম্ভব

ততভাবেই তাক করে মেলে ধরি অথবা গুটিয়ে নেই।”

                                                — স্টেনঢাল

                                                 দ্য লাইফ অব হেনরি বুল্যান্ড

 

আমার বয়স তখন মাত্র এগারো, তার বেশি নয়। ওই বয়সেই লেখক হবার বাসনা আমাকে পেয়ে বসলো আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই ইচ্ছেটা আমার লক্ষ্যে পরিণত হলো। এত অল্প বয়সে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করার বিষয়টি হরহামেশা চোখে না পড়লেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। বই ও ছবি সংগ্রাহকদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন খুব অল্প বয়স থেকেই কাজ শুরু করেছিলেন। সাম্প্রতিককালের একজন স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগাল কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলেন যে, মাত্র ছয় বছর বয়সেই তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আমার ক্ষেত্রে অবশ্য খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের মতো কিছু ঘটেনি। ছেলেবেলার লেখক হবার ইচ্ছাটা আমার জন্য অনেক বছর ধরে কেবল স্বপ্নই থেকে গিয়েছিল। নতুন ঝরনা কলম, ওয়াটারম্যান কালি আর রুল টানা লেখার খাতা পেতে আমার ভালোই লাগত। কিন্তু ওসব লেখার সরঞ্জাম তেমন একটা ব্যবহার করা হয়ে উঠত না। কারণ লেখার ইচ্ছা বা প্রয়োজন কোনোটাই তখন আমার মধ্যে তেমন জোরালো ছিল না। আমি কিছুই লিখতাম না, এমনকি চিঠিও নয়। কারণ চিঠি লেখার মতো কোনো পরিচিত মানুষও ছিল না। স্কুলের ইংরেজি রচনা বিষয়ে আমার তেমন কোনো পারদর্শিতার কথা মনে পড়ে না; বাড়ির লোকের কাছে আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতেও পারতাম না। তাছাড়া, নতুন বইয়ের প্রতি লোভ থাকলেও পাঠক হিসেবে আমি বেশি একটা আগ্রহী ছিলাম না। উপহার হিসেবে পাওয়া সস্তা কাগজের ঈশপের গল্প সংকলনের মোটা একটা বই আমার খুব পছন্দ ছিল। জন্মদিনের উপহারের টাকা জমিয়ে কেনা অ্যান্ডারসনের গল্প সমগ্রটাও আমার পছন্দের তালিকায় ছিল। কিন্তু অন্যসব বই – বিশেষত স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের যেসব বই ভালো লাগা উচিত সেগুলো পড়ার ক্ষেত্রে আমার ছিল ভীষণ অনীহা।

আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব ওয়র্ম সাহিত্যের বই থেকে কখনো কখনো টানা দু-এক ঘণ্টা আমাদের পড়ে শোনাতেন। বেশির ভাগ সময়েই তিঁনি কলিনস ক্লাসিক পর্বের টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি থেকে পড়তেন। স্কুলের সুখ্যাতি বৃদ্ধির জন্য পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া হতো। এই শ্রেণীকে বলা হতো ‘মেধা প্রদর্শনী’ শ্রেণী। সরকারের পক্ষ থেকে ত্রিনিদাদ দ্বীপের সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই ‘মেধা প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠিত হতো। এই প্রদর্শনীতে জয়ী হওয়া মানে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ লাভ করা। তাছাড়া, এই প্রদর্শনীর পুরস্কার হিসেবে প্রচুর বই দেওয়া হতো। সর্বোপরি এতে জয়ী হতে পারলে নিজের এবং স্কুলের জন্য যে সুনাম অর্জন করা যেত তা ছিল অত্যন্ত গৌরবের ব্যাপার।

‘মেধা প্রদর্শনী’ শ্রেণিতে আমাকে পর পর দু’বছর থাকতে হলো। অন্যসব মেধাবী ছাত্রদেরও একই শ্রেণিতে দু’বছর রাখা হলো। প্রথম বছরটা ছিল যাচাই করার বছর। এই সময়ে পুরো দ্বীপে বারোটা ‘মেধা প্রদর্শনী’ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর এ সংখ্যা বেড়ে বিশে এসে দাঁড়ায়। বারো হোক অথবা বিশ, স্কুল কর্তৃপক্ষ যতটা সম্ভব বেশি প্রদর্শনীতে অংশ নিতে চাইত। আর তাই ছাত্রদের প্রচুর খাটান হতো। সাদা রঙের সরু একটা বোর্ডের নিচে আমাদেরকে সারি বেঁধে বসানো হতো। মাথায় পাতলা, চকচকে কোঁকড়া চুলের অধিকারী শিক্ষক জনাব বল্ডউইন অনভিজ্ঞ কাঁপা কাঁপা হাতে বোর্ডে ছাত্রদের নাম লিখতেন। যেন তেন  ছাত্রদের নাম নয়। গত দশ বছরে এই স্কুলের যেসব ছাত্র ‘মেধা প্রদর্শনীতে’ জয়ী হয়েছে শুধু তাদের নামই ওই বোর্ডে স্থান পেতো। ব্যাপারটি আমাদের জন্য একইসঙ্গে ছিল ভীতিকর এবং গর্বের। আমাদের শ্রেণীকক্ষটা প্রধান শিক্ষক জনাব ওয়র্মের অফিস হিসেবে ব্যবহার হওয়াটাও আমাদের মনে একই ধরনের ভয়-আনন্দ মেশানো দ্বৈত অনুভূতি জাগাত। জনাব ওয়র্ম ছিলেন একজন বয়স্ক আধা-কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ।  গড়নে ছোটখাটো, মোটাসোটা মানুষটা সবসময় চোখে চশমা আর গায়ে স্যুট পরে থাকতেন। উঠে দাঁড়িয়ে চলাফেরা করতে তাঁর রীতিমত শ্বাসকষ্ট হতো। আমাদের স্কুলের দালানটা ছিল ছোট্ট। এর দরজা জানালাগুলো সারা বছর খোলা থাকত। স্কুলের শ্রেণীকক্ষগুলো হালকা বেড়া দিয়ে কোনোরকমে পৃথক করা ছিল। হয়ত এই সংকীর্ণ দালানের ভেতরের কোলাহল ভরা পরিবেশ থেকে মুক্তি দেবার জন্যই তিঁনি মাঝে মাঝে আমাদেরকে নিয়ে উঠোনের শামান গাছটার ছায়ায় গিয়ে বসতেন। তাঁর চেয়ারটা উঠোনে বের করে আনা হতো। ক্লাসে ডেস্কের পেছনে যেভাবে বসতেন ঠিক সেভাবেই গাছের গুঁড়ির পাশে রাখা চেয়ারে গা এলিয়ে বসতেন ওয়র্ম স্যার। তাঁকে ঘিরে দাঁড়ানো ছাত্ররা নীরব নিশ্চল থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে যেত। তিঁনি তার থলথলে হাতে কলিন্স ক্লাসিক সমগ্র নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জোরে জোরে পড়ে যেতেন। দেখে মনে হতো, জুলভার্নের রোমাঞ্চকর গল্প  নয়, তিঁনি গুরুগম্ভির প্রার্থনা পুস্তক থেকে পবিত্র প্রার্থনা বাক্য পড়ে শোনাচ্ছেন। জুলভার্নের লেখা টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি পরীক্ষার পাঠ্যতালিকায় না থাকলেও ওয়র্ম স্যার এই বইটা দিয়েই তার প্রদর্শনী ক্লাসের পড়া শুরু করতেন। প্রেক্ষাপট সম্বন্ধে ধারণা দিয়ে আমাদের ভেতর পাঠাভ্যাস গড়ে তোলাই  ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। একই সাথে পরীক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে ছোট্ট একটু বিরতি দেওয়ার জন্যই পাঠ্যতালিকার বাইরের বই তিঁনি পড়াতেন। স্কুল পড়ুয়াদের যেসব লেখকের বই পছন্দ করা উচিত তাদের মধ্যে জুলভার্ন অন্যতম। আগেই বলেছি, আমার বয়সী ছেলেমেয়েদের যেসব লেখকের বই পছন্দ করা উচিত তাদের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল কম। তাই জুলভার্ন আমাকে টানত না। অধিকন্তু এই সব ক্লাস আদতে আমাদের ছুটির সময়ে যখন কোনো বিষয় না পড়িয়ে বিরতি দেবার কথা, তখন হতো। ফলে প্রাপ্য ছুটির পরিবর্তে, ঐ সময়  চুপচাপ দাঁড়িয়ে বা বসে থেকে পড়ার প্রতি মনোযোগ দেওয়াটা আমার জন্য ভীষণ কঠিন ছিল। ওয়র্ম স্যারের পড়া প্রতিটি শব্দই আমি বুঝতাম কিন্তু বিন্দুমাত্র মনোযোগ দিতাম না। সিনেমা দেখার সময়ও এমন হতো। কিন্তু সিনেমা হলে বসে থাকার মধ্যে একটা আলাদা মজা আছে যেটা ওয়র্ম স্যারের ক্লাসে ছিল না। তাঁর পড়ানো জুলভার্নের গল্প থেকে কয়েকটা সাবমেরিন আর কয়েকজন ক্যাপ্টেনের নাম ছাড়া বাকি কোনো কিছুই আমার মাথায় ঢোকেনি অথবা স্মৃতিতে  জায়গা করে নিতে পারেনি।

অবশ্য একথা ঠিক যে, এই সময়ের মধ্যে লেখালেখি সম্পর্কে আমার নিজের ধারণা গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। এই সব ধারণা একান্তই ব্যক্তিগত হলেও আশ্চর্যজনকভাবে উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। এই চিন্তাভাবনাগুলো স্কুল থেকে পাওয়া শিক্ষা থেকে একেবারেই আলাদা। ক্রমশ ভেঙে পড়া বর্ধিত হিন্দু পরিবারের বিশৃঙ্খলার ভেতর থেকে এই লেখালেখির ধারণাই আমার ভেতরে লেখক হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিল। আর এই মহান কাজে উৎসাহী করে তোলা ধারণাগুলো আমি বাবার কাছ থেকে শোনা ছোট ছোট কিছু বিষয় থেকে পেয়েছিলাম। বাবা আমাকে প্রায়ই এটা সেটা পড়ে শোনাতেন।

আমার বাবা ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। নিজের প্রবল আগ্রহ আর পরিশ্রমের জোরে তিনি সাংবাদিক হতে পেরেছিলেন। বাবা তাঁর নিজের মতো করে লেখাপড়া করতেন। যে সময়ের কথা বলছি তখন তাঁর বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়। সেই বয়সেও তাঁর শেখা শেষ হয়নি। বাবা একসাথে অনেকগুলো বই পড়া শুরু করতেন যার কোনোটাই হয়ত শেষ করতে পারতেন না। বইয়ের গল্প বা যুক্তি-তর্কের প্রতি বলতে গেলে তাঁর কোনো আগ্রহই ছিল না। লেখকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা লেখার কৌশল খুঁজে বের করার জন্যই তিনি বই পড়তেন। এ কারণেই পড়তে তিনি আনন্দ পেতেন। পুরো বই নয়, বইয়ের ছোট কোনো অংশ থেকেই তিনি লেখকের লেখনীর আসল স্বাদটুকু খুঁজে নিতে জানতেন। কোনো বইয়ের কোনো বিশেষ অংশ পছন্দ হলে বাবা তখনই সেটা আমাকে পড়ে শোনাতেন। পড়ার সময় মূল ভাবটুকু ব্যাখ্যা করে আমাকে বুঝিয়ে দিতেন। এভাবেই আস্তে আস্তে তাঁর পছন্দগুলো আমার নিজের পছন্দে রূপান্তরিত হলো। ফলে স্কুলের জাতিগত বিভেদ মিশ্রিত ঔপনিবেশিক পরিবেশ আর বাড়িতে বিদ্যমান এশিয়ান অন্তর্মুখী আচরণ সত্ত্বেও আমার ভেতর ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কে নিজস্ব এক ধারণা গড়ে উঠতে থাকল। বলা বাহুল্য, আমাকে পড়ে শোনানো বাবার পছন্দের বইয়ের অংশগুলোই এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।


চলবে

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য