home কবিতা দ্বিচরণ ৫০ ।। প্রান্ত পলাশ

দ্বিচরণ ৫০ ।। প্রান্ত পলাশ

নয়া অনর্থের দিকে ঠেলে দিচ্ছ, না আমিই যাচ্ছি
খুদভিখারির মতো পাতে রাখা এঁটোকাঁটা খাচ্ছি

২.
হৃদয় বন্ধক রেখে কেন-যে উঠলে মেতে ফ্লেক্সি-বিনিময়ে
বাণিজ্যবান্ধব প্রেমে বিষাদ-বিস্বাদ ঠোঁট যাচ্ছে ক্ষয়ে ক্ষয়ে

৩.
দু’চোখ খোলাই, তবু দেখছি না কিছু
দেখে যায় ভেতরের ক্রুশবেঁধা যিশু

৪.
এত প্রসাধন—রূপপুঁজি—শতভাগ তুলোর তোয়ালে
স্নানঘর থেকে ফিরে কখনও ভেবেছ, কী তুমি খোয়ালে?

৫.
প্রকৃত প্রেমিক আমি—ক্ষুধা নেই, দেশপ্রেম পেটে,
আসছে ভাদ্র মাস, কুকুর-সঙ্গম দেখে যাবে দিন কেটে!

৬.
পার্লারে ভরেছে দেশ—অনির্ণীত তুমি—এত সাজগোজ,
হৃদয় বিক্রির টাকায় আমরা নিচ্ছি কিনে রেজিস্ট্রি-কাগজ!

৭.
বিপ্লব কে বা না চায়, কে না করে, যার যার নিজস্ব ভঙ্গিতে
অবশ্য মৃতুই আসে—খালি পায়ে, কাফেলায়, সরল সঙ্গীতে

৮.
আমার আদর্শলিপি সীতানাথ বসাক প্রণীত;
পরিচয় এখনও সরল বর্ণে, মারপ্যাঁচে ভীত!

৯.
শরীর ভেঙেছে আগেই, এবার ভেঙে গেছে মনটাও?
মুখের ভেতর বাতাস ঢুকিয়ে ঢোক গিলে খেয়ে নাও!

১০.
শরীরে বিশ্বাস যদি, অশরীরে আস্থা নেই কেন?
অ-ভাবে পদার্থ হলে অপদার্থে পিয়ানো লুকোনো?

১১.
রাখাল জানে রাখাল জানে ভালো
পেনসিলে আঁকা বাঘের মুখটি কালো!

১২.
কে যে ডান, কে যে বাম
দেখি দুজনের—সমকাম

১৩.
এই তো রাজার মাঠ, তুমি বামে বসো, হাত রাখো বুকের বা-পাশে
ভালবেসে ছুঁয়েছি তোমাকে—ধুকপুকে বিজেপির গন্ধ নাকে আসে?

১৪.
বলতে পারো কেমন আছি, তোমার কাছে তথ্য আছে?
জানলা দিয়ে আকাশ দেখি, ঝাপসা লাগে স্বচ্ছ কাচে!

১৫.
কাঠের মঞ্চে কোথাও আছে গর্ত কি?
নাচছে দেখি পা-ফাটা এক নর্তকী!

১৬.
রিলেশনশিপ মানে কি জাহাজ-সম্পর্কিত?
আমি আদার ব্যাপারী, গন্ধ লাগে ঘৃত!

১৭.
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই দেশে বেঁচে আছে যারা;
দেখে, নিজ হাতে নিজেকেই খুন করা খুনির চেহারা!

১৮.
তারা এক কড়াইয়ে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান
তেল আর আগুন জড়িয়ে ধরে পরস্পরকে খান

১৯.
ভেবেছিলে ছোঁবে—ভেঙেছে দৃষ্টির খুনে ভুল
অদূরে রয়েছে পড়ে ব্যথাহীন বিচ্ছিন্ন আঙুল

২০.
পোশাক খোলার পর প্রশ্ন জাগে—হায়, এ দেহ আমার?
অন্ধকারে অন্য দেহ, তার বুকে সঁপে দিই উত্তরের ভার!

২১.
আজ শনিবার, কাল রোববার, পরশু না সোম? তাই তো?
আমাদের দিন যায়, দিন গুনি, হিসাব কিছুটা জানি, হয়তো!

২২.
রূপালি সন্ধ্যায় কতবার ছুটে গেছি পুইশ্যলি গাঙে,
মাদক ছিলিস না তো, তবু তোকে খেলো কোন নাঙে?

২৩.
এ দেশ সন্দেশ, খাও ইচ্ছেমতো।
আমরা কামরা, ভেতরে ধর্ষিত!

২৪.
ব্রিটিশরা যায়নি এখনও, যায়নি পাকিরা, প্রতিদিন তারা তড়পায়—
মনের কলোনি না গুঁড়িয়ে দিয়ে কেন গেলে বিপ্লবী কামাক্ষ্যা রায়?

২৫.
Omg! কী বলো, শহিদমিনারে তুমি দাওনি ফ্লাউয়ার?
জাস্ট ফাক ইউ, অফকোর্স আসতে হবে নেক্সট ইয়ার!

২৬.
ধর্মবক আকাশে উড়ছে, নেমে খুঁটে খাবে মানুষের পাপ—
খুনির রক্তাক্ত হাতে আমরা দিয়েছি তুলে নিরীহ গোলাপ!

২৭.
আমি তোমার কোথাও ছিলাম না—ঝাপসা আকাশ, জাহাজডোবা জলে
ভোরে তবু শীত লেগেছে খুব, তোমার পিচুটিভরা চোখের মিসড কলে!

২৮.
এ দেশ কাদের? কারা আজও নিশ্বাস ফেলে আলোকিত ঘাড়ে?
জানি, প্রশ্ন সরল; করুণ উত্তর পেতে যেতে হবে রায়েরবাজারে!

২৯.
কোনটা অধিক মজা, গরু না কি শুয়োরের নলা?
তর্ক চলুক, এর ফাঁকে কেটে যাক বাউলের গলা!

৩০.
চিরকাল আমরাই হারি, জয়ী হয় ক্রুসেড, জিহাদ
রক্তে শরীর ডুবিয়ে আর কত হুর-অমরত্বের স্বাদ!

৩১.
রবীন্দ্রবিরোধিতায় সাহিত্যও আছে, সম্প্রদায়ও আছে, এ দুটোই রাজনীতি
আছে প্রেম-প্রীতি, কেশের বাণিজ্য—দুটোর ককটেল; বিস্ফোরণে ভীতি!

৩২.
প্রেমিক মাত্রই বিশ্বাসঘাতক, প্রেমিকা তুলসি—
পাতায় দুলছে জল; অন্ধকারে পোশাক খুলছি!

৩৩.
দাঁড়িয়ে স্তনের শীর্ষে বলছে পিঁপড়ে :
জীবনও ঈষৎ চ্যাপ্টা, হিপ্পিপ হুররে!

৩৪.
হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই—স্লোগানবর্ণিত
এক ভাই কাটা পড়ে—চামড়াজনিত!

৩৫.
ঝিনুক সরবে ফাটো, ঝিনুক সরবে ফেটে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মানুষের মুখে ছুঁড়ে দাও…

৩৬.
দাঁড়িয়ে নিথর ছাদে কৌতূহলী শিশু
সারা গায়ে মাখিতেছে আকাশের হিসু!

৩৭.
জানি, যার মানি আছে শেষমেষ হবে তার তুমি,
তোমাকে নিজের ট্রফি ভেবে মিছেমিছি করতল চুমি!

৩৮.
কী এমন আছে তোর, আমি আর আমি জটলা পাকিয়ে বসি তোর শবাধারে?
অল্প বৃষ্টি হল, তাও জল শুষে নিল মাটি, এরপর সোঁদা গন্ধ হাঁটছিল ঘাড়ে!

৩৯.
ফুরিয়ে আসছে দ্রুত সাদাসিধে কথা, সাদাসিধে মানুষের দিন
মীরজাফরকে বুকে পুষে এ দেশ থাকতে চায় জাফরবিহীন!

৪০.
‘বড্ড অভিমানী ছিলে তুমি’—আমাদের শিল্পীমন ন্যাকামিতে ঘেরা
তোমার কাজের চেয়ে ‘অভিমান’ জরুরি এ দেশে, বোঝোনি নভেরা?

৪১.
যাহারে মামণি ডাকি, সে ডাকিছে ভাই
বকা দিলে উল্টো বলে, ‘চটি পড়েন নাই?’

৪২.
কোন জামানায় আছি, এ কিরাম ট্রেন্ড?
কৃষ্ণরে কতিছে রাধা ‘হ্যালো বয়ফ্রেন্ড’!

৪৩.
আমার ঠোঁটের কাছে ঠোঁট এনে বলল সে, ‘বাসো তো? বাসো তো?’
আমি বললাম ‘ভালো’, বললাম ‘ভালো, ভালো তো, ভালো তো’…

৪৪.
ভাষার মরণ আছে, আছে কবিতারও
তোমার বাঁচনটুকু লিখে যেতে পারো

৪৫.
বিবেক : আমাকে তুলছো কেন চ্যাংদোলা করে?
মানুষ : তোমাকে প্রত্যহ কিনি ক্ষমতার জোরে!

৪৬.
বাতাস যে রসিকতা করে, তার সারকথা এই—
তোমার সময় যাক চলে যাক ওড়না গোছাতেই!

৪৭.
নিরক্ষর স্তন—বোঝে না হাতের ভাষা, ইশ
হাতও মূর্খ বটে—অহেতুক করে নিশপিশ!

৪৮.
মৃতই তো, না হলে মাথার ’পর ভনভন করে কেন মাছি?
আর সব ধ্বংস হোক। থাকুক পরমদেশ। নাম : সোনাগাছি

৪৯.
ফুটে আছে রক্তফুল, তুমি তার ডাকনাম রেখেছো পলাশ,
‘প’ বর্ণ হয়েছে গুম; জীবন্মৃত দেখে যায় জীবিতের ত্রাস!

৫০.
কাব্যচর্চা এক ধরনের পাপ
কপালজুড়ে ছোবলপ্রিয় সাপ!

 

কবি পরিচিতি:

pranto

প্রান্ত পলাশ। জন্ম ০৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪, চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তশহর দর্শনায়। পৈতৃক ভিটা চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি থানার উত্তরভূর্ষি গ্রামে। প্রকাশিত কবিতার বই : সাধুখালির রাত (ঐতিহ্য-২০১২) ও জরায়ুর কান্না (ঐতিহ্য-২০১৫)।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য