home ই-বুক, দর্শন ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি (৭ম পর্ব) ।। অরুন্ধতী রায় ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি (৭ম পর্ব) ।। অরুন্ধতী রায় ।। ভূমিকা ও অনুবাদ: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

আমি বরং আন্না হবো না

তার  কাজকর্ম গান্ধীর মতো হলেও তার দাবী দাওয়ার ধরণ একেবারেই গান্ধীর মতো নয়।

টিভিতে আমরা যা দেখছি তা যদি এক বিপ্লব হয় তবে এই বিপ্লব নিঃসন্দেহে বর্তমান কালের সবচেয়ে বিব্রতকর এবং দুর্বোধ্য বিপ্লবের একটি। এখনকার মতো, আপনার মনে জন লোকপাল বিল সম্পর্কে যে প্রশ্নই আসুক না কেনো, আপনি যা যা উত্তর পাবেন তা  অনেকটা এমনই-

বক্সে টিক দিয়ে রাখতে পারেন:
ক. বন্দে মাতরম  (তোমাকে প্রণাম মা)
খ. ভারত মাতা কী জয় (ভারত মায়ের জয়)
গ. ভারতই আন্না, আন্নাই ভারত
ঘ. জয় হিন্দ (ভারতের জয়)

সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে হলেও এ কথা বলা যায় যে, মাওবাদী এবং জন লোকপাল বিলের মধ্যে একটা ব্যাপারে মিল আছে- উভয়েই ভারত রাষ্ট্রের পতন চায়। একপক্ষ একেবারে নিচের স্তর থেকে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছে। এ যুদ্ধ শুরু হয়েছে আদিবাসীদের এক বিশাল সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। এরা গরিবের চেয়েও বেশি গরিব। অপর পক্ষ কাজ করছে সবচেয়ে উপরের শ্রেণী থেকে নিচের দিকে, তাদের বিপ্লবের হাতিয়ার হলো রক্তপাতহীন গান্ধীয় ক্যু; নতুনভাবে শপথ নেয়া সাধু এবং মূলত শহরবাসী ও সুবিধাভোগী মানুষের দ্বারা গঠিত এক সেনাবাহিনী এই পক্ষে কাজ করছে। (এই পক্ষের সাথে আবার সরকারও সর্বশক্তি নিয়োগ করে নিজের পতনের জন্য কাজ করে চলছে।)

২০১১ সালের এপ্রিল মাসে, আন্না হাজারে’র প্রথম “আমরণ অনশন” এর শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে, নিজেদের সুনাম ধ্বংসকারী দুর্নীতি কেলেঙ্কারির ওপর থেকে জনতার মনোযোগ সরানোর উপায় হিসেবে সরকার আমন্ত্রণ জানালো “টিম আন্নাকে”। ব্রান্ড নেম হিসেবে এই নামটিই আন্নার দলের “বেসামরিক সদস্য”দের  পছন্দ। সরকারের পক্ষ থেকে একটি নতুন দুর্নীতি দমন আইনের খসড়া তৈরির কমিটিতে অংশগ্রহণ করার জন্য টিম আন্নাকে অনুরোধ করা হয়। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে এই যৌথ কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়া হয়। তারপর সরকার একাই আইনটি প্রস্তাবাকারে সংসদে পেশ করে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনটি এতোই ক্রুটিপূর্ণ যে সেটা গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

অতঃপর, ১৬ আগস্ট, আন্না হাজারে তার দ্বিতীয় “আমরণ অনশন” শুরু করার দিন সকালে, অনশন শুরু করা কিংবা কোনো বেআইনী কাজ করার আগেই তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। ফলে জন লোকপাল বিল বাস্তবায়নের সংগ্রাম- প্রতিবাদ করার অধিকারের সাথে সাথে খোদ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে মিলে মিশে একীভূত হয়ে যায়। এই “দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের” মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আন্না মুক্ত হয়ে আসেন। তবে সুচতুরভাবে তিনি জেল থেকে বের হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একজন সম্মানিত মেহমান হিসেবে তিহার জেলে রয়ে যান। সেখানে তিনি জনসম্মুখে অনশন করার অধিকার আদায়ের জন্য আর একটি অনশন শুরু করেন। তিন দিন ধরে জেলের বাইরে যখন জনতা আর টেলিভিশন চ্যানেল-ভ্যানগুলোর ভিড় বাড়ছিল, তখন টিম আন্নার সদস্যরা কড়া নিরাপত্তার ভেতরেই ওই জেলে বন্যার পানির মত আসা যাওয়া করতো। ওই সময়, টিম আন্নার সদস্যরা অনশনরত আন্না হাজারের ভিডিও বার্তা এনে বাইরে অপেক্ষারত টিভি চ্যানেলের কাছে পৌঁছে দিতো যাতে সমস্ত জাতীয় টিভি চ্যানেলে সেগুলো প্রচারিত হয়। (আর কোন ব্যক্তি কি এতোটা বিলাসের মধ্যে জীবনযাপন করতে পারবে?) ইতিমধ্যে, দিল্লী পৌরসভার ২৫০ জন কর্মী, পনেরোটি ট্রাক এবং মাটি সরানোর ছয়টি যন্ত্র দিন রাত কাজ করে সপ্তাহের শেষ দিনের দর্শকদের জন্য রামলীলার কাদাময় ময়দান প্রস্তুত করতে লাগলো। তারপর, বহু লোকের সেবা গ্রহণ করে, শোরগোল করে ওঠা জনতা এবং ক্রেনে ঝোলানো ক্যামেরার চোখের সামনে দিয়ে, ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসকদের সেবা গ্রহণ করে তৃতীয় বারের মতো শুরু হলো- আন্নার আমরণ অনশন ।

“কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ভারত এক”- টেলিভিশনের সঞ্চালকেরা আমাদের জানালেন। আন্না হাজারের কর্ম পদ্ধতি গান্ধীয় মতে হলেও তার দাবী দাওয়া একেবারেই সেরকম নয়। গান্ধীজীর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ধারণার বিপরীতে জনলোকপাল বিল হলো দুর্নীতি দমনের এক নির্মম আইন যেখানে সাবধানে বাছাই করা কিছু মানুষের সমন্বয়ে গঠিত একটা প্যানেলের মাধ্যমে একটি বৃহৎ আমলাতন্ত্র পরিচালনা করা হবে। এই বিলের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী, বিচারপতিগণ, সংসদ সদস্য, এবং আমলাতন্ত্রের সব অংশীদার থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিম্ন শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীকে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। লোকপালের হাতে তদন্ত, পর্যবেক্ষণ, এবং বিচারের ক্ষমতা- সবই থাকবে। কেবল লোকপালের নিজের জন্য এই বিলে কোন কারাগারের কথা বলা হয়নি! লোকপাল একটি স্বাধীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে; এর উদ্দেশ্য হলো আমাদের বর্তমানের ফুলে ফেঁপে ওঠা, অগ্রহণযোগ্য, দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের মোকাবেলা করা। একে- একটির বদলে দুটি সর্বময় ক্ষমতাধীন রাজ্য শাসন বলা যায়।

আমরা কীভাব দুর্নীতিকে দেখি তার ওপরেই নির্ভর করছে এর স্বার্থকতা বা ব্যর্থতা। দুর্নীতি কি কেবলই অর্থনৈতিক অনিয়ম বা ঘুষ প্রথার বৈধকরণ? নাকি এটি কুখ্যাত অসম সমাজ যেখানে ক্ষমতা শুধু ছ্ট্টো এক গোষ্ঠীর কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে সেখানকার সামাজিক লেনদেনের মুদ্রার মতো? উদাহরণস্বরূপ, কল্পনা করে নিন একটি শপিং মল ভরা শহর যেখানে রাস্তার হকারদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একজন হকার স্থানীয় চৌকির পুলিশ এবং পৌরসভার কর্মচারীকে সামান্য পরিমাণ ঘুষ দেয় যাতে করে সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে শপিং মল থেকে কেনাকাটা করার সামর্থ্য নেই এমন মানুষদের কাছে তার পণ্য বেঁচতে পারে। এটা কি খুব বেশি ভয়ঙ্কর অপরাধ? ভবিষ্যতে তবে কি ঐ হকারকে লোকপালের কর্মীকেও ঘুষ দিতে হবে? সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের উপায় কি প্রশাসনের কাঠামোগত অসমতার সামাধান করা? নাকি নতুন এক ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করা যার কাছে সাধারণ মানুষকে  নতি স্বীকার করতে হবে?

এদিকে সমস্ত সাজসরঞ্জাম, কোরিওগ্রাফি, আক্রমনাত্বক জাতীয়তাবাদ, এবং আন্নার বিপ্লবের বিজয় কেতন ওড়ানো- এসব কিছুই ধার করা হয়েছে সংরক্ষণ বিরোধী বিক্ষোভ, বিশ্বকাপ বিজয়ের প্যারেড, এবং পারমাণবিক পরীক্ষার উদযাপন থেকে। এসব অনুষ্ঠান আমাদেরকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় যে, “অনশন” কে সমর্থন না করলে “প্রকৃত ভারতীয়” হওয়া যাবে না। অন্যদিকে, চব্বিশ ঘন্টা সম্প্রচার করা টিভি চ্যানেলগুলোও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে অনশন ছাড়া দেশের আর সব খবরই প্রচারের অযোগ্য।

এই “অনশন” অবশ্যই ইরম শর্মিলার দশ বছরের বেশি সময় ধরে চলা অনশনকে বোঝায় না (শর্মিলাকে এখন জোর করে খাওয়ানো হয়)। শর্মিলার এই অনশন আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট (এএফএসপিএ) এর বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল। এএফএসপিএ’র বদৌলতে মনিপুরে সৈন্যরা সামান্য সন্দেহভাজন মনে হলেই মানুষকে হত্যা করতে পারে। “অনশন” বলতে কুদানকুলামের দশ হাজার গ্রামবাসীর রিলে অনশন যা পারমানবিক শক্তি কেন্দ্রের বিপক্ষে প্রতিবাদ স্বরূপ শুরু হয়েছিল, সেটাকেও বোঝায় না। “জনগণ” বলতে সেই মনিপুরবাসীদেরও বোঝানো হয় না যারা ইরম শর্মিলার অনশনকে সমর্থন দিয়েছে। জনতা বলতে সেইসব মানুষকেও বোঝায় না যারা প্রতিনিয়ত জগতসিংপুর অথবা কালিঙ্গানগর বা নিয়ামগিড়ি বাস্তার বা জয়পুরে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী বা খনির গুন্ডাদের মুখোমুখি হয়ে দিন কাটাচ্ছে। মানুষ বলতে আমরা ভূপাল গ্যাস দূর্ঘটনার শিকার হওয়া মানুষ অথবা নর্মদা উপত্যকার বাঁধের কারণে উচ্ছেদ হওয়া মানুষকেও বোঝাই না। নিউ ওখলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট এরিয়া (এনওআইডিএ) এর কৃষিজীবী মানুষ অথবা পুনে কিংবা হারিয়ানা বা দেশের অন্য কোন জায়গার মানুষ যারা নিজেদের ভিটেমাটি হারানোর ঘটনা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে- তাদের কাউকেই এই “জনতা”র ভেতরে ফেলা যায় না।

“জনতা” বলতে শুধু সেই দর্শকদের বোঝায় যারা যারা জনলোকপাল বিল প্রস্তাবিত এবং পাশ না হলে নিজের হুমকি অনুযায়ী চুহাত্তর বছর বয়সের একজন বৃদ্ধ কীভাবে অনশন করে মারা যাবে, কেবল তারই জমকালো প্রদর্শনী দেখতে এসেছে। এই “জনতা” হচ্ছে হাজার দশেক মানুষ যাদেরকে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো দৈবক্রমে দেড়শ গুণ করে টিভির পর্দায় দেখাচ্ছে। তাদের এই গুণ করার পদ্ধতি দেখে যীশু খ্রিস্টের অলৌকিক উপায়ে মাছ-রুটির পরিমাণ বাড়িয়ে ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়াবার কাহিনী মনে পড়ে যায়। আমরা জানতে পারি, “কোটি কণ্ঠ আজ কথা বলে উঠছে।” “আন্নাই ভারত। ”

এই নতুন সাধু পুরুষ, “জনতার কণ্ঠ” এই মানুষটি আসলে কে? অদ্ভূত হলেও সত্য যে, মানুষটি কোনো অতীব জরুরী বিষয়ে কথা বলে না। মানুষটি যেমন তার প্রতিবেশী কৃষকের আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলে না, তেমনি দূরের রাজ্যের অপারেশন গ্রিন হান্ট নিয়েও কোন উচ্চবাচ্য করে না। সিংগুর, নন্দীগ্রাম, লালগড় সম্পর্কেও সে মুখ খোলে না, কথা বলে না পোস্কো, কৃষক অসন্তোষ অথবা সেজের (এসইজি) ক্ষয়রোগ সম্পর্কে। কেন্দ্রীয় ভারতের জঙ্গলগুলোতে ভারতীয় সেনাবাহিনী মোতায়েন করার সরকারি পরিকল্পনা সম্পর্কে আন্নার কোন মতামত আছে বলে মনে হয় না।

কিন্তু, মানুষটি আবার রাজ থ্যাকেরের ‘মারাঠিদের বিদেশী সম্পর্কে আতঙ্ক’ কে সমর্থন করে। আন্না গুজরাটের সেই মূখ্যমন্ত্রীর “উন্নয়ন মডেল” এর প্রশংসাও করেছেন যিনি ২০০২ সালে মুসলিমদের ওপর যে নির্যাতন হয় তার তত্ত্বাবধায়নে ছিলেন। ( জনগণের হৈ চে এর কারণে পরবর্তীতে এ ব্যাপারে আন্না তার নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু সম্ভবত, এ বিষয়ে তার শ্রদ্ধাবোধ রয়েই গেছে।)

এতসব হৈ হট্টগোলের ভেতরেও, সংযমী সাংবাদিকেরা তাদের যা করণীয় তা ঠিকই করেছে। সাংবাদিকদের ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে আমরা এখন ডানপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ামসেবক সংঘ (আরএসএস) এর সাথে আন্নার পুরোনো সম্পর্কের কথা জানি। রালেগন সিদ্ধিতে আন্নার গ্রামের সমাজ সম্পর্কে পড়াশোনা করেছেন মুকুল শর্মা। তার কাছ থেকে আমরা জানতে পারি যে, আন্নার নিজের গ্রামে গত পঁচিশ বছরে গ্রাম পঞ্চায়েত বা সমবায় সমিতির কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। “হরিজন”দের ব্যাপারে আন্নার মনোভাবও এখন আমরা জানি: “মহাত্মা গান্ধীর স্বপ্ন ছিল যে প্রতিটি গ্রামে একজন চামার, একজন শুমার, একজন কুমার, এবং অন্যান্য পেশাজীবী মানুষ থাকবে। তারা সকলেই নিজ নিজ পেশা ও দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবে, আর এমন করেই প্রতিটি গ্রাম স্বনির্ভির হয়ে উঠবে। রালেগন সিদ্ধিতে আমরা এই মতবাদকেই চর্চা করে আসছি।”

এটা কি খুব বিস্ময়কর যে টিম আন্নার সদস্যরা “সাম্যের জন্য তারুণ্য” বা অ্যান্টিরিজার্ভেশন (প্রো-“মেরিট”) মুভমেন্টের সাথে জড়িত? এই আন্দোলনটি পরিচালনা করছে এমন কিছু মানুষ যারা আবার বড় বড় এনজিও নিয়ন্ত্রণ করে। এসব এনজিওতে অর্থ দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও বিখ্যাত যেমন- কোকা কোলা এবং লেহমান ব্রাদার্স। টিম আন্নার মূল সদস্য অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং মনীষ শিশোদিয়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ‘কবির’ গত তিন বছরে ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে ৪০০,০০০ ডলার অর্থ সাহায্য পেয়ে এসেছে। ভারতের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে অনুদান প্রদানকারীদের মধ্যে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা নিজেরাই অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, বন্দর, ও বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা (এসইজেড) নির্মানকারী আবাসন বানিজ্যের মালিক। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আবার কিছু রাজনীতিবিদের গভীর সম্পর্ক আছে যারা কোটি কোটি রুপী মূল্যের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দেখাশোনা করে। এসব রাজনীতিবিদের কয়েকজনকে এখন দুর্নীতি এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এরা সকলেই এতো উৎসাহী কেনো?

মনে রাখবেন, যে সময়ে জন লোকপাল বিল নিয়ে হৈ চৈ চলছিল, ঠিক সেই একই সময়ে উইকিলিকস বিব্রতকর কিছু ঘটনা এবং কেলেঙ্কারি ফাঁস করে দেয়। এর মধ্যে চাঞ্চল্যকর টু-জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিও ছিল। টেলিযোগাযোগ তরঙ্গ নিয়ে কেলেঙ্কারির এই ঘটনাটি বেশ বিশাল; বড় বড় কর্পোরেশন, সিনিয়র সাংবাদিক, সরকারের মন্ত্রী, এবং কংগ্রেস ও বিজেপির রাজনীতিবিদ- সবাই মিলে এই ঘটনায় বিভিন্নভাবে কয়েক হাজার কোটি রুপী সরকারি তহবিল থেকে পাচার করে দিয়েছে বলে জানা যায়। কেলেঙ্কারিটি প্রকাশ হওয়ার পর এর সাথে দেশের সাংবাদিক-লবিস্টদের যোগাযোগের যে খবর বের হয় তাতে গত কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম তারা লজ্জার মুখে পড়ে। এতো সব জানাজানির পর, মনে হচ্ছিলো এবার বোধ হয় সত্যি সত্যি ভারতেও বৃহৎ কর্পোরেশনের ক্যাপ্টেনরা জেলে বন্দী হতে চলেছে। জনতার দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জন্য এ যেন একেবারে সঠিক সময়। আসলেই কি তাই?

যে সময়ে রাষ্ট্র নিজের চিরাচরিত দায়িত্ব থেকে সরে আসছে এবং এনজিওগুলো সরকারি কার্যকলাপ নিজেদের আওতায় নিয়ে আসছে (পানি সরবরাহ, বিদ্যুত, যোগাযোগ, টেলিযোগাযোগ, খনি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা); যখন কর্পোরেট মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলো তাদের ভয়াবহ ক্ষমতা ও আধিপত্যের মাধ্যমে জনতার কল্পনা শক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে- এমন এক সময়ে যে কারো মনে হতে পারে যে এইসব গণমাধ্যম, এনজিও, ও কর্পোরেশনগুলোকে লোকপাল বিলের আওতায় বিচারাধীন করা হবে। অথচ প্রস্তাবিত বিলে এসব প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখা হলো।

এমন অবস্থায়, সরকারের দুর্নীতি এবং অসৎ রাজনীতিবিদদের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেবার একটি আন্দোলন গড়ে ওঠায়, ঐসব দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যদের তুলনায় জোর গলায় এই আন্দোলনে শরিক হবার সুযোগ পেয়ে গেছে। এবং এর মাধ্যমে তারা খুব খুবই কৌশলে নিজেদেরকে সন্দেহের উর্ধ্বে উঠিয়ে আনতে পেরেছে।

তার চেয়েও খারাপ ব্যাপার হলো, কেবল মাত্র সরকারকে অপরাধী সাব্যস্ত করে তারা নিজেদের জন্য একটি পুরোহিতের বেদী তৈরি করেছে যেখান থেকে আহ্বান জানিয়ে তারা রাষ্ট্রকে জনতার গন্ডি থেকে আরো দূরে সরিয়ে আনছে। এভাবে তারা দ্বিতীয় পর্বের সংস্কারের ক্ষেত্র তৈরি করছে। এই সংস্কারে আছে আরও বেশি বেসরকারিকরণ, জনকাঠামো এবং ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদে আরো বেশি অনুপ্রবেশের সুযোগ। সেদিন আর বেশি দূরে নেই যখন কর্পোরেট দুর্নীতি বৈধ হয়ে যাবে এবং এর নতুন নামকরণ করা হবে তদবিরের সম্মানী।

যে ৮৩০ মিলিয়ন মানুষের দৈনিক আয় বিশ রুপী তারা কি সত্যিই কিছু সংখ্যক আইনকে জোরদার করার ফলে উপকারী হবে? বিশেষ করে এমন সব আইন যা তাদেরকে নিঃস্ব করে দেয়ার পাশাপাশি এই দেশকেও গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে?

ভারতের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের চরম ব্যর্থতার কারণেই এই ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ফলে অপরাধীরাই বিধায়ক নির্বাচিত হচ্ছে এবং কোটিপতি রাজনীতিবিদেরা নিজের এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে একদম ভুলে গেছে। একটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও এখন আর সাধারণ জনতার নাগালের মধ্যে নেই। পতাকা নেড়ে শুভেচ্ছা জানাবার দৃশ্য দেখে বোকার মতো সব বিশ্বাস করবেন না। আমাদের চোখের সামনেই ভারতকে অধিরাজ্যে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে। ব্যাপারটা আফগানস্থানের যুদ্ধবাজ নেতাদের তৈরি যুদ্ধের মতো ভয়াবহ, পার্থক্য শুধু এই যে- ভারতের ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ আরো বড় বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
(চলবে)

৬ষ্ঠ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

 

গ্রন্থ: ক্যাপিটালিজম অ্যা গোস্ট স্টোরি
লেখক: অরুন্ধতী রায়
অনুবাদক: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

[বইটি বাংলা ভাষায় ধারাবাহিক প্রকাশ হতে থাকবে; প্রতি শুক্রবার।]

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য