home ভিনদেশি সাহিত্য কোথাও কোন আশা নেই । হুয়ান রুলফো ।। অনুবাদ : শাকিলা পারভীন বীথি

কোথাও কোন আশা নেই । হুয়ান রুলফো ।। অনুবাদ : শাকিলা পারভীন বীথি

(ভাষান্তর করা হয়েছে হুয়ান রুলফোর গল্প “No oyes ladrar los perros” এর ইংরেজি অনুবাদ “NO DOG BARKS” থেকে) 

হুয়ান রুলফো (১৯১৭-১৯৮৬) একজন মেক্সিকান সাহিত্যিক। তার বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের মাঝে উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ “EI LIano en IIamas (1953)” এবং উপন্যাস Pedro Paramo (1955). “EI LIano en IIamas (1953) ” গল্পগ্রন্থটি সতেরটি গল্পের সংকলন। এখান থেকে পনেরটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ “The Burning Plain  and Other Stories” নামে প্রকাশিত হয়। এই গল্পগ্রন্থের বিখ্যাত গল্পগুলোর মাঝে Tell Them Not to Kill Me! , They Gave Us The Land , Because We Are so Poor , No Dog Barks  অন্যতম । 


হেই  ইগনাসিও, উপরে থেকে কোন আলোর সিগনাল  পাচ্ছিস বা কোন শব্দ ?

–   কিছুই দেখা যাচ্ছে না ।

–   এতোক্ষণে তো অনেক কাছে চলে আসার কথা ছিলো

–   হুম , কিছুই শোনা যাচ্ছে না

–   ভালো করে দেখ

–   কিছুই দেখতে পাচ্ছি না

–   পোড়া কপাল তোর ইগনাসিও ।

 

মানুষ দুটির গভীর ছায়া আগের মতোই চলমান । নদীর তীর ধরে আঁকা–বাঁকা পাথুরে রাস্তা বেয়ে এগিয়ে চলেছে সেই গভীর ছায়া । একটিই ছায়া  আর যেন তা টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে । ওদিকে আগুন থেকে আলো চুরি করে এনে পৃথিবী মাত করে রেখেছে গোলাকার চন্দ্রটা ।

 

–   এতোক্ষণে তো আমাদের শহরে পৌঁছে যাবার কথা ছিলো ইগনাসিও !  তোর তো কান খোলা আছে । ভালো করে খেয়াল কর তো কুকুরের ঘেউঘেউ শোনা যাচ্ছে কিনা ! ভুলে গেছিস সেই যে  ওরা বলেছিল পাহাড়ের কাছেই তনায়া শহর ? পাহাড় ছেড়ে আসার কয়েক ঘণ্টা হয়ে গেল। মনে নেই কথাটা তোর ?

–   হ্যাঁ, কিন্তু কোন নিশানাই দেখছি না ।

–   ক্লান্ত লাগছে

–   আমাকে নামিয়ে রাখো ।

 

বুড়ো লোকটি এবার পিছু হটতে থাকলো হেলান দেবার মতো কিছু একটা পাবার আশায় । একটা দেয়ালের মতো কিছুতে ঠেস দিয়ে ভারসাম্যটা ঠিক করে নিলো তবু কাঁধের ভার মুক্ত করলো না। যদিও তার পা অসার হয়ে আসছিলো, তবু সে বসলো না কোথাও । কেননা, একবার যদি তার ছেলেকে কাঁধ থেকে নামায় সাধ্য নেই তার আবার তোলার । কয়েক ঘণ্টা আগে কয়েকজন মিলে ছেলেকে কাঁধে বসিয়ে দিয়েছিলো । এবং সেই থেকে এভাবেই সে ওকে বহন করে চলেছে ।

– কেমন লাগছে তোর ?

– ভালো না

দুজনেই খুব কম কথা বলছে । প্রতিবারই দু’ একটা শব্দে । কখনও মনে হচ্ছে ছেলে তার ঘুমাচ্ছে । কখনও মনে হয়েছে তার ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে । শীতে কাঁপছে যেন ছেলেটা । সে জানে কখন ছেলেটা থরথর করে কেঁপে ওঠে। ঝাঁকুনিই তাকে টের পাইয়ে দেয়। আর তখন পা দুটো দিয়ে ছেলেটা তার পাছায় খোঁচা দিতে থাকে। আবার কখনো  হাত দুটো বাবার কাঁধকে জড়িয়ে ধরে সবলে নাড়া দিতে থাকে সে যেন তার মাথাটা একটা ঝুমঝুমি মাত্র। সে দাঁতে দাঁত চেপে থাকে যেন জিহবায় কামড় না পড়ে । পুত্রের এমন কর্ম শেষ হলে সে জিজ্ঞেস করে –

খুব কষ্ট হচ্ছে ?

কিছুটা – পুত্র তার উত্তর  দেয়।

প্রথম দিকে সে পিতাকে বলতো “আমাকে এখানেই নামতে দাও … এখানেই নামিয়ে রেখে যাও … একা যাও। একটু সুস্থ হলেই আমি তোমাকে কাল বা যেকোন সময় ধরে ফেলবো।”

কমপক্ষে পঞ্চাশবার এইসব সে বলেছে । কিন্তু এখন আর কিছুই বলে না । আকাশে তখন পূর্ণ চাঁদ । ওদের সামনেই জ্বলছে । বড় আর নীলচে চাঁদের আলোতে ভরে গেছে ওদের চোখ–মুখ । চাঁদের আলোতে তাদের ছায়াকে আরো প্রসারিত আর অন্ধকার মনে হচ্ছে ।

আমি বুঝতে পারছি না আমি কোন দিকে চলেছি – সে বলে উঠলো ।

কিন্তু কেউ  কোন উত্তর দিলো না ।

একজন উপরে বসে আছে। তার রক্তহীন ফ্যাকাসে মুখ চাঁদের দীপ্তিতে উদ্ভাসিত । আর সে এই তো তার নিচে । 

তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস ইগনাসিও ? তোর অবস্থা সুবিধের মনে হচ্ছে না ।

যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সে এবারও নিশ্চুপ ।

সে কুঁজো হয়ে হাঁটতে লাগলো । তার জবুথবু শরীরটাকে এবার একটু সোজা করে নিলো যেন প্রয়োজন পড়লে আগের মতো হাঁটতে পারে ।

– এটা কোন রাস্তা হতে পারে না। ওরা তো বলেছিলো পাহাড়ের পিছনেই তনায়া শহর। আমরা পাহাড় পার হয়ে এসেছি । অথচ না তনায়ার দেখা মিলছে, না কোন শব্দ আমাদের সে শহরের কাছে পৌঁছার ইংগিত দিচ্ছে। তুই বা উপর থেকে বলছিস না কেন তুই কি দেখতে পাচ্ছিস, ইগনাসিও?

– আমাকে নিচে রাখো বাবা

– খারাপ লাগছে ?

– হ্যাঁ

– যেভাবেই হোক তোকে আমি তনায়া নিয়ে যাবই যাব । ওরা বলেছিলো ওখানে একজন ডাক্তার আছে। আমি তোকে তার কাছে নিয়ে যাব । ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এভাবে নিয়ে যাচ্ছি । এর মানে কি এই যে মরার জন্য তোকে রাস্তায় ফেলে যাব?

সে একটু শিউরে উঠল । কয়েক পা সে এলোমেলো হেঁটে নিজেকে সামলে নিলো ।

-আমি তোকে তনায়া নিয়ে যাবই ।

– নিচে নামাও আমাকে

এবার ওর কণ্ঠ বেশ নরম যেন ফিসফিসিয়ে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে ।

– আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই

– ওখানেই ঘুমাও। আমি তো বেশ শক্ত করেই ধরে আছি ।

আলো ছড়িয়ে আকাশটা  তখন ঝলমলে করে রাখছিলো ঊর্ধ্বমুখী নীল চাঁদ। বুড়ো মানুষটির ঘর্মাক্ত মুখে ঝিকমিক করছে সে চাঁদের আলো। শুধু কোন রকমে  চোখ দু’টোকে সে আলোর অত্যাচার থেকে আড়াল করে রেখেছে । মাথাটা সে খুব নিচু করতে পারছে না। কেননা তার মাথার সাথে ছেলে বাঁধা ।

– আমি কোন কিছুই তোর জন্য করছি না। আমি করছি তোর মৃত মায়ের কথা ভেবে। তুই তোর মায়ের সন্তান তাই করছি । তোর মা আমাকে ক্ষমা করতে পারতো না যদি তোকে ওখানেই ফেলে আসতাম আর চিকিৎসার জন্য এসব না করতাম। সেই আমার মনে এ ভার বহন করার শক্তি যুগিয়েছে, তুই নস। তোর জন্য  নানাবিধ সমস্যা, ধিক্কার, লজ্জ্বা ছাড়া কিছুই পাইনি ।

– আমার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেলে যাক, তবু আমি তোকে তনায়া নিয়ে যাবই। তোর যে ক্ষতি হয়েছে তা নিরাময়ের সুযোগ যেন ডাক্তারের মেলে। এবং আমি নিশ্চিত, সুস্থ হওয়ামাত্র কুপথেই চলে যাবি আবার। সেটা নিয়ে অবশ্য মাথাব্যথাও নেই আমার । যেহেতু অনেক দূরে চলে যাবি তোর কাণ্ডকীর্তি আমি জানতেও পারবো না।  আগেও তো হয়েছে এমন। তুই আমার সন্তানতুল্য নস। তোর শরীরে আমার যে রক্ত বইছে তা অভিশপ্ত রক্ত।

আমি বলেছি “আমার শরীর থেকে যে রক্ত তোর শরীরে গেছে তা দূষিত রক্ত ”। আমি তখনই বলেছি যখন দেখেছি তুই এখানে–সেখানে ঘুরাঘুরি করিস, খুন –খারাবি আর ডাকাতি করিস। যদি মনে হয় আমি বানিয়ে বলছি আমার বন্ধু ত্রানোকুইনোকে জিজ্ঞেস করতে পারিস। সেই তো তোকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল। তোর নাম রেখেছিল। অথচ তোকে চিনে ফেলার কুফল তাকেও ভোগ করতে হয়েছে। তখন থেকেই বলেছি “এ আমার ছেলে হতেই পারে না ”।

– ভালো করে নজর রাখ যদি কিছু দেখা যায়। অথবা যদি কিছু শুনতে পাস। তুই যেহেতু উপরে তুই বুঝবি। আমি তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।

– কিছুই দেখছি না ।

– তোর কপালে শনি আজ

– আমি তৃষ্ণার্ত ।

– থাম তো! আমরা হয়তো বেশ কাছেই আছি। হয়তো গভীর রাত বলে শহরের বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কুকুরের চিৎকার তো তোর শোনার কথা। চেষ্টা করে দেখ না।

– পানি দাও

– এখানে পানি কোথায়! চারপাশে পাথর ছাড়া কিছু নেই। আর পানি পাওয়া গেলেও তোকে খাওয়াতে পারব না। একবার নিচে নামালে তোকে তুলতে পারব না ।

– তেষ্টায় গলাটা ফেটে যাচ্ছে। ক্লান্ত লাগছে।

– তোর জন্মের সময়ের কথা মনে পড়ছে। এমনই ছিল। ঘুম থেকে উঠেই তুই খেতে চাইতি আবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তি। তোর মা তোকে পানি দিত। বুকের দুধ তার  শুকিয়ে গিয়েছিল। পানিতে তোর খিদে মিটতো না। তুই অস্থির হয়ে উঠতি।

বিষয়টি বুঝতাম না যেন। এতো রেগে যেতাম তোর উপর। যা হবার হয়েছে। তোর স্বর্গীয় মা চেয়েছিল তুই সবল হয়ে বেড়ে উঠবি। সে ভাবতো বড় হয়ে তুই তার কত কাজে লাগবি! তুই ছাড়া তার আর কোন অবলম্বন ছিল না। আরেকজন তবু জন্মের সময়ই তাকে মেরে ফেললো। নতুবা বেঁচে থাকলে তোর এসব কাজ –কর্ম দেখেই তার মরণ হতো।

তার মনে হলো তার কাঁধ জাঁকিয়ে যে বসে আছে তার পায়ের বন্ধনী ঢিলা হয়ে গেছে; পা দুটো যেন ঝুলছে। মাথাটা তার ভেজা ভেজা মনে হলো।  মনে হলো যেন কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে অনুভব করলো চুলের উপর ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রুজল।

– কাঁদছিস ইগনাসিও? মায়ের কথা ভেবে কান্না পাচ্ছে? কখনো তো তার কথা ভেবে কোন ভাল কাজ করিসনি! তোর  জন্য সবার শুধু দুর্নাম জুটেছে। যেন ভালবাসা দেইনি কখনো, শুধু কুটিল বুদ্ধিই দিয়েছি। বিনিময়ে কি পেলি দেখ? ওরা তোকে আহত করলো।

কি হয়েছিল তোর বন্ধুদের?  একে একে সকল শেষ করে দিল। কেউ বাদ পড়লো না। ওদের নাকি কষ্ট ভাগাভাগি করার কেউ ছিল না, কিন্তু তোর বেলা?

অবশেষে শহর পাওয়া গেল। চাঁদের আলোতে তখন শহুরে ছাদগুলো ঝলসে যাচ্ছে। হাঁটু মুড়ে সে হঠাৎ বসে পড়লো। ছেলের ভারে তার তখন ভেংগে পড়ার দশা। প্রথম বিল্ডিংটার রেলিং ধরে সে একটু গা ছেড়ে দিলো। তার মনে হলো শরীরের সকল অঙ্গ–প্রতঙ্গ  খুলে খুলে যাবে। ছেলের জাপটে ধরা হাত দুখানি আলগা করে দিলো। সাথে সাথে কুকুরের ঘেউঘেউ  শব্দ শুনতে পেলো।

– এই শব্দ তুই শুনিসনি ইগনাসিও? সে বলে উঠলো – আমার মনে একটু আশা জাগানোর সুযোগও তুই দিসনি?

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: