home কুকুর সংখ্যা কুকুরের ভূয়োদর্শী কান্না ।। তুষার প্রসূন

কুকুরের ভূয়োদর্শী কান্না ।। তুষার প্রসূন

মানুষের সাথে কুকুরের যেমন ভালোবাসার ইতিহাস আছে তেমনি আছে ঘৃণারও। তবে সাহিত্য, উপকথা, মিথ, লোকবিশ্বাসে তার বিশ্বস্ততার ছাপই রেখে চলেছে কুকুর। ইতিহাস বলে, প্রভুর আনন্দের সময়ে কুকুর যেমন নিজের লেজ নেড়ে সামিল হয় ঠিক তেমনি প্রভুর বিপদ বা দুঃখের সময়ে প্রাণ বিপন্ন করে প্রভুর জীবন রক্ষা করে। সাম্প্রতিক কালে, গবেষণা হয়েছে কুকুর সত্যিই মানুষের আবেগের বিভিন্ন স্তরগুলো সনাক্ত করতে পারে কিনা এ নিয়ে, কিংবা প্রভু কাঁদলে কুকুরের কী প্রতিক্রিয়া হয়। এক্ষেত্রে উত্তর পাওয়া যদিও কষ্টের তবে দেখা গেছে কুকুর সাধারণত ঘ্যানঘ্যান করা, গা শোঁকা, গা চাঁটা, কোলে মাথা রাখা ইত্যাদি আচরণগুলি দিয়ে তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু এমন প্রভুভক্ত কুকুর কেনও কাঁদে- এ গবেষণাও তো হতে পারতো? অবশ্য কান্না শুনে কী নির্ণয় করা যায় প্রতিনিয়ত বিশ্বস্ত অভিধা পাওয়া কুকুরের কেনও এমন পরিণাম! মনে প্রশ্ন আসে, কুকুর কি জন্মগত ভাবে কান্নাপ্রবণ? অথবা যে কুকুরগুলো কাঁদে ওরা কি সবাই নেড়ি গোত্রের? সাধারণত ক্রন্দনরত একটি কুকুরের সাথে একে একে আরো কুকুর সামিল হয়, হয়তোবা সহানুভূতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে।

জানি দুঃখের ভেতর লুকানো থাকে আর্ত-চিৎকার। আর  তা পরখ করার জন্য মানুষের বিকৃত রুচি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে প্রায়ই। তারই একটি রূপ কুকুরের লেজ কাঁটা। লেজ কেঁটে কুকুরের হিংস্রতা বাড়িয়ে তোলে মানুষ; পাগলামির কুৎসিত আলো জ্বেলে দেখতে চায় কতোটুকু ক্ষীপ্রতা নিয়ে একটি কুকুর ছুঁটে পালায়। মানুষ দেখতে চায় কতোটুকু বিদ্রোহ লুকানো থাকে তীব্র চিৎকারে। দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের কান্না শুনে মনে হয় স্বজন হারানোর বেদনা। হতে পারে। অঙ্গহানী হলে যেকোনও প্রাণী কেঁদে উঠবে এটাই তো স্বাভাবিক। মানুষ তো আরো ঘটা করে কাঁদে। খরচ করে কাঁদে। কাঁদার পরেও খরচ করে। কিন্তু কুকুরের কান্না লোকচক্ষুর অন্তরালে। জোছনার আলোয় কুকুরের চোখে যে কান্না দেখা যায়, শেষরাতের কুয়াশা তা চুরি করে পালায়। রাতের কান্না সকাল হতেই বায়বীয় রূপে মিলিয়ে যায়। কিন্তু কোথায়? যে লেজ সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলো মানুষের প্রতি, সে লেজই কেঁটে ফেললো মানুষ। কতোটুকু মদ থাকে মানুষের মাথার ভেতরে?

কৈশোরে কুকুরের কান্না দেখে ঢিল ছুঁড়েছিলাম আর ওরা শুধু ঘেউ ঘেউ করেছিল মাত্র। কিন্তু ওরা তো মানুষের দুঃখ কষ্ট হতাশার ভেতর কোনদিন ঢিল ছোঁড়েনি। ওরা শুধু একটু খাবারের জন্যে বেলেল্লাপনা করে। যদিও মনুষ্যের মতো তারা চরম লোভী নয়। মানুষ তো লোভের সীমারেখা বুঝতে বুঝতেই গোটা জীবন ক্ষয় করে ফেলে। মানুষ শুধু কুকুরের গায়েই নয়, নিজের গায়েও নিজেরাই ঢিল ছুঁড়ে ব্যাথা পায়, কাঁদে। আবার নিঃসঙ্গতা দূর করতে কুকুরকেই বিশ্বস্ত অভিধা দিয়ে পোষ মানায়, তারা সহজে পোষ মেনেও নেয়। কেবল মানুষই ক্ষেত্রবিশেষে মানুষকে পোষ মানাতে ব্যর্থ হয়।

উঠোনে শিশুদের একসাথে খেলা করতে দেখেছি। অনতিদূরে দেখেছি কুকুরছানার খেলা। দৃশ্যটি নিষ্পাপ। মানুষের এখানেও ক্ষীপ্র হানা। একদিন কুকুরছানা গুলোকে আর দেখা গেলো না। হয়তো তাদেরকে দূরে কোথাও ফেলে আসা হয়েছে। মানবশিশুরা দিব্যি খেলছে। সেদিন রাতে যে বিলাপ ভেসে এসেছিল, তা কি কুকুরছানাগুলোর মায়ের? কুকুরছানার মা কি মানুষকে অভিশাপ দিয়েছিল? মানুষের এতো পতন কেনো? হায় মানুষ! তারা আজ মানুষের বাচ্চাও চুরি করছে! হয়তো কুকুরের বাচ্চা চুরি করতে করতে মানুষ এখন মানুষের বাচ্চাই চুরি করা শিখে ফেলেছে। মানবশিশুরা আজ আর নিরাপদ নয়। তাদেরকে মানুষ থেকে রক্ষার জন্য আজ  পাহারা দিতে হয়।

তীব্র আকর্ষণ অনুভূত হলে স্ত্রী ও পুরুষ কুকুর একে অপরের সাথে মিলিত হয় প্রকাশ্যে, স্বাধীনভাবে। মানুষ তাই দেখে হাসাহাসি করে। লাঠি নিয়ে তাড়া করে। কিন্তু মানুষ তার মিলনের বেলা বেশ সুসভ্য! যেখানে সেখানে তারা মিলিত হয় না, দরজা বন্ধ করে সমগ্র লোকচক্ষুর আড়ালে মিলিত হয়। কিন্তু ধর্ষিতার ক্রন্দনও তো শোনা যায়। কুকুরের থেকে কয়েকশ’ ধাপ নিচে নেমে সভ্যতার দেয়াল টপকে কে যেন ছুঁটে পালায়! কুকুর সঙ্গম করলে তাদের থেকে কুকুরই বেরিয়ে আসে কিন্তু মানুষ সঙ্গম করলে মানুষের ভেতর থেকে কেনও ঘৃণার কুকুরটিই বেরিয়ে আসবে?

কথিত আছে, কুকুরের কান্না অশুভ বার্তা বয়ে আনে, দেশজুড়ে ডেকে আনে মারী ও মড়ক। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা উদ্বিগ্ন হন। বিপদ থেকে রক্ষা পেতে প্রার্থনা পর্যন্ত শুরু করে দেন। অথচ মানুষ হাসতে হাসতে গাছ উজাড় করে এই জনপদটাকে মরুভূমিতে রুপান্তর করে ফেলছে তাতে কোন দোষ নেই। তবে আশার কথা এই যে, প্রতিটি সংস্কারের পাশেই থাকে বৈজ্ঞানিক যুক্তি। শোনা যায়, প্রাকৃতিক বিপর‌্যয়ের আগে আবহাওয়ায় যে পরিবর্তন হতে থাকে সেটা সবার আগে পশু-পাখিরাই বুঝতে পারে।

পাগলা কুকুরের কাঁমড়ে মানুষ ভুগেছে জলাতঙ্কে। অবশ্য তা নিরাময়ের ওষুধও বেরিয়েছে। কিন্তু মানুষের মধ্য থেকে প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে যে আতঙ্কের অসুখ তা জলাতঙ্কের চেয়েও মারাত্মক; যার প্রতিকার অধরা। কুকুরের কান্নার জলে আজও  জোছনা পড়লে চিকচিক করে, কিন্তু মানুষ তার অপকর্মে নিভৃতে কাঁদে; চোখের জল দেখা যায় না। বলতে ইচ্ছে করে- কুকুর, তোর কান্নার জলটুকু মানুষের চোখে দিয়ে যা। তোর নির্লিপ্ত চোখ দিয়ে আমাদের দেখতে শেখা।

কুকুরের চোখে যতটুকু অশ্রু তার বেশীরভাগ এসেছে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া আঘাতে। এ আঘাত তেমন করে দেখার মতো কেউ নেই, সময়ও নেই। আমরা নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর হচ্ছি। যার পরিণাম আমাদের ক্রমবর্ধমান অশান্তি। প্রায়ই শোনা যায় কুকুর নিধনে মিউনিসিপালটি কর্তৃক সাড়াশি অভিযান। যে কুকুরটাকে মেরে ফেলা হলো তার তো কোনও প্রেমিক বা প্রেমিকা থাকতে পারে, কিংবা সন্তানেরা। দিন এভাবে চলে যায়, রাত আসে। কোনও গহীন থেকে যেন কান্নার শব্দ ভেসে আসে। কুকুরের কান্না।

মা তার ছোট্ট শিশুটির কান্না ভুলিয়ে বেশী করে দুধ পান করায় আর কপালে চুমু দিয়ে বলে- মানুষের মতো মানুষ হও। কিন্তু এ কথা কেনো? মানুষের মতো মানুষ! মানুষ কি তবে জানোয়ারের মতোও হয়? কপালে ভাঁজ আসে। কুকুরের কাছ থেকেই কি তাহলে মানুষকে শিখতে হবে উদারতার ভাষা? অবশ্য মানুষ উল্টো তাকে শুনিয়ে যায় নিধনের পরিভাষা। এতোকিছুর পরেও কান্না ভুলে চুপচাপ আড়াই পাক দিয়ে মানুষের পায়ের কাছে বিশ্বস্ততা আর বিশ্বাসের  আলো জ্বেলে বসে থাকে কুকুর।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য