home ই-বুক, দর্শন কনফুসিয়াস ফ্রম দ্য হার্ট । ইউ ড্যান ।। বাংলায়ন : নাঈম ফিরোজ । দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ দ্বিতীয় পর্ব

কনফুসিয়াস ফ্রম দ্য হার্ট । ইউ ড্যান ।। বাংলায়ন : নাঈম ফিরোজ । দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ দ্বিতীয় পর্ব

                                            যাত্রাঃ আত্মা অভিগমে, পেরিয়ে যাই অন্তর

 

তর্কসাপেক্ষ যে, নিজের আচরণের ব্যাপারে ভাবাভাবি, দুঃখ করার বা লজ্জিত হবার মতো যদি কিছু না থাকে তবে তা খুব নিচু মানের ব্যাপার মনে হতে পারে। এক অর্থে তাই সত্য। আমাদের মধ্যে যে কেউ তা করতে পারে। একইভাবে,যদিও ইহাকে সঠিকভাবে দেখলে সর্বোত্তম মানদণ্ড হতে পারে।

এটা নিয়ে ভাবুনঃ এইভাবে বাঁচা যে আমরা সারাজীবন যা যা করেছি যা দাঁড়াতে পারে পর্যালোচনায় তা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

 

এইজন্যই কনফুসিয়াস এটাকে Junzi-এর একটা মানদণ্ড চিন্তা করেছেন।তাহলে কিভাবে আমরা এ ধরনের শক্ত অন্তর অর্জন করবো, যা আমাদের উদ্বিগ্নতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও শঙ্কামুক্ত রাখবে?

 

যদি আপনি একটি শক্ত অন্তঃকরণ পেতে চান, আপনাকে প্রাপ্তি ও পরাজয়ের ব্যাপারে উদাসীন হতে হবে, বিশেষ করে পার্থিব ব্যাপারে। যারা পার্থিব প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়ে খুব বেশি ভাবেন কনফুসিয়াস তাদের ‘খর্ব মানব’ আখ্যা দিয়েছেন, এবং ‘ক্ষুদ্র’ বলে ত্যাগ করেছেন, অন্য অর্থে ছোটো মানসিকতার এবং দ্বিতীয় স্তরের মানুষ।

 

কনফুসিয়াস একবার বলেছিলেনঃ ‘আপনি কি এই ছোটো মননের মানুষকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনায় রাখবেন?’ না। যখন এ জাতীয় লোক কোনো সুবিধা পেতে ব্যর্থ হয়, তারা এর অপ্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে আর পেয়ে গেলে তা হারানোর ভয় করে। যেহেতু তারা হারানোর ভয়ে থাকে। তাই তারা তাদের পার্থিব প্রাপ্তিকে ধরে রাখবার জন্য সম্ভব সবকিছু করে এবং আরো বেশি বেশি প্রাপ্তির আশা করে।

 

সত্যিকারের সাহস কী?

কীভাবে তা ত্রুটিপূর্ণ স্বেচ্ছাচারিতা থেকে আলাদা ?

কনফুসিয়াস সাহসের কী সমাচার বলেছেন?

 

পার্থিব প্রাপ্তি নিয়ে যে মানুষ মগ্ন তিনি না হতে পারেন বড় মনের মানুষ, না পারেন অর্জন করতে কোনো শান্ত অন্তর ও নিরপেক্ষ অন্তঃকরণ  বা তাদের সৎসাহসও তেমন একটা থাকে না।

 

কনফুসিয়াসের Zilu নামে একজন শিষ্য ছিলেন, একজন সুবিবেচক মানুষ। যিনি সাহসের ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলেন।কনফুসিয়াস একবার কৌতুকীয় উক্তিতে বলেছিলেন- ‘যদি আমার এই বড় কাজ একদিন আর কাজে না আসে, আমি সাগরে আর নদীতে একা একা নৌকায় ঘুরি সেদিন। আর সেদিন যদি একজনও আমায় অনুসরণ করে সে Zilu-ই হবে।

Zilu এটা শুনে খুব প্রসন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু তার গুরু বলেই চললেনঃ ‘আমি এটা বলেছি এজন্য যে সাহস ছাড়া Zilu-এর আর কিছুই নেই। সাহসের প্রতি ভালোবাসা Zilu-এর নির্ণায়ক গুণ ছিলো কিন্তু তার বীরত্বসূচক মনোভাব ছিলো অচিন্তনীয়ভাবেই অগভীর। সে অকুতোভয় ছিলো না।

কিন্তু আরেকদিন Zilu তার গুরুকে জিজ্ঞেস করলোঃ ‘একজন Junzi কি সাহসকে চূড়ান্ত গুণ হিসেবে গণ্য করেন?’

কনফুসিয়াস তাকে উত্তর দিয়েছিলেন- ‘কোনো Junzi ব্যক্তির কাছে নৈতিকতাই হচ্ছে চূড়ান্ত। সাহসী কিন্তু অনৈতিক Junzi সমস্যা তৈরি করবেন যখন একজন ছোটো মনের দস্যু মানুষের কাছেও’।

এর মানে এই যে, কোনো Junzi-এর জন্য সাহসের মূল্য দেয়াটা ভুল নয়, তবে তাকে তা নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত আকারে ধারণ করতে হবে, এর একটা পূর্বশর্ত আছে আর তা হলো নৈতিকতা। সেসব বীরপনা যা নৈতিকতাকে আগে ধরে আনে তাই সৎসাহস।

 

অন্যথায় একজন Junzi তার বীরপনাকে সমূহ ক্ষতির কারণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন এবং একজন সামান্য মানুষও দস্যুতে পরিণত হয়ে যেতে পারেন।

 

মনে করেন ডাকাত এবং দস্যুরা বাড়িঘর লুট করে, দস্যুতা করে এমনকি হত্যাযজ্ঞও চালায়, তাই তাদের কি সাহসী বলা যায় না? যদিওবা নৈতিকতাহীন এই অবাধ সাহসিকতা দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ জিনিস।

তাহলে নৈতিকতা কী এবং আমরা কীভাবে বুঝবো কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল?

এটা পরিস্কার যে এই ধরণের বাধা অভ্যন্তরীণ। কনফুসিয়াস বলেনঃ জরুরি কাজে নিবিষ্ট থাকলে ভুল করা যেকোনো মানুষের পক্ষেই কঠিন। (Analects IV) অন্য অর্থে বলা যেতে পারে, যদি কোনো মানুষের অন্তর্গত নিয়ন্ত্রণবোধ থাকে তবে তিনি জীবনে খুব কম ভুলই করবেন।

 

যদি কোন ব্যক্তি প্রতিদিন ‘তিন অব্দি গুণে রাখতে পারে’ (Analects I) যদি আপনি সেই পর্যায়ে সত্যিই পৌঁছতে পারেন  ‘আপনার চাইতে ভালো কারো সাথে দেখা হলে আপনি যদি আপনার চিন্তাকে তাঁর মতো উজ্জল করতে চান।‘ যখন আপনি আপনার সমকক্ষ কাউকে পেয়ে যান তবে নিজেকেই বুঝতে চেষ্টা করুন এবং নিজেকে পরীক্ষার মুখোমুখি করুন। (Analects IV) তখন আপনি নিজেকে নিবর্ত করতে পারবেন।

 

কারো নিজের ব্যর্থতা বা সফলতা নিয়ে ভাবাটা বা তদনুযায়ী কাজ করাটাই কনফুসিয়াস বা তার শিষ্যদের শেখানো সেই সৎসাহস।

বহু বছর পর, লেখক ও রাজনীতিক Su Shi এই সাহসিকতাকে তার ‘On Staying Behind’-এ বলেছিলেন। তিনি একে ‘মহৎসাহস’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেনঃ

 

“ যাকে অতীতের পণ্ডিতেরা অসামান্য সাহস ও মেধার মানুষ বলতেন তার থাকতে হবে আত্মনিয়ন্ত্রণ যা সাধারণ মানুষের থাকে না। কিছু জিনিস আছে যা মানুষ সহ্য করতে পারে না। সাধারণ মানুষ যখন লজ্জিত হয় সে তার অস্ত্র বের করে এবং মারামারি করতে উদ্যত হয়। এটাকে কিন্তু বীরোচিত বলা যায় না। এমনও সাহসী লোক দুনিয়াতে আছেন যারা সহসা আক্রান্ত হলে ভয় পেয়ে যান না, কোনো কারণ ছাড়া সমালোচিত হলেও চটে যান না। এটা এজন্য হয় যে এই মানুষগুলোর লক্ষ্য থাকে অনেক দূরে আর তারা অনেক ব্যাপক ও উচ্চ আশাবাদ লালন করেন।“

 

Su Shi  যেমনটা দেখেছেন, সত্যিকারের সাহসীদের এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা থাকে যা সাধারণ্যে বিরল।‘ তারা জনসাধারণের তিক্ত অপমান সইতে পারেন, ঠিক যেমন বিখ্যাত জেনারেল Han Xin-কে মুখোমুখি হতে হয়েছিলো- তাকে এক ব্যক্তির দুই পায়ের নিচে দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পার হতে হয়েছিলো, দুইজন মানুষের মুখোমুখি জীবনযুদ্ধের পরিবর্তে। এটা তাকে যুদ্ধের মাঠে একের পর এক নির্ধারণী যুদ্ধ জিতে অসাধারণ সাফল্য ছিনিয়ে আনতে রুদ্ধ করতে পারে নাই। তার মতন এক ব্যক্তিত্ব কোনো এক মুহূর্তের সন্তুষ্টিলাভের জন্য কোনো এক মুহূর্ত সাহসী হবার বিলাসিতাটুকু করার প্রয়োজন বোধ করেন নাই।

এটা এজন্য যে তার ছিলো আত্মবিশ্বাস, ছিলো বিবেকের নিয়ন্ত্রণ যা যুক্তি ও একটি সুস্থির-সুগঠিত বোধ দ্বারা প্রভাবিত। তার উদার মন ও উচ্চ অভীষ্ট  এই গুণে তাকে গুণান্বিত করেছে।

 

Su Shi এই জাতীয় মানুষকে এমন মানুষ হিসেবে দেখান যে, ‘যখন অযাচিত কিছু ঘটে যায় তারা ঘাবড়ে যান না’। মনের এই পরম অবস্থা অর্জন খুব কষ্টসাধ্য। আমরা পরিশীলিত এবং নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারি এবং যাতে অন্য কারো বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ না ঘটাতে হয়। কিন্তু যখন আমাদেরকে কেউ কোনো কারণ ছাড়াই আহত করবেন তখন আমরা রাগ নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করতে পারি?

 

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, কোনো এক সোমবারে যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বেমক্কা,  উদ্দেশ্যহীন, কিন্তু ভারী শারীরিক আঘাতজনিত অপরাধের শিকার হন, মঙ্গলবারে তিনি তার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন, একজন, আরেকজন, বহুজন… এভাবে।

বুধবারে তিনি একটা বিষাদের অমানিশায় ডুবে রইলেন এবং কারো সাথে তার দেখাও হলো না কোথাও। বৃহস্পতিবার নাগাদ তিনি তার পরিবারের নানান অধর্তব্য কাজ নিয়ে ফ্যাসাদ করবেন……

এর মানে কী? যতবার আপনি আপনার আঘাতের কথা শেয়ার করছেন আপনি আবার যেনো সেই প্রথম মারের সমান মারই প্রতিবারই খাচ্ছেন। এটার আরো অর্থ এই যে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও আপনি এটা দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতিদিন।

যখন দুর্ভাগ্য সমাসীন হয়, এটাকে রাতারাতি কেটে পড়তে দেয়াই এর সাথে যুঝবার সেরা পন্থাটা দাঁড়ায়।এভাবেই কেবল আপনি সেইসব কাজ বেশি বেশি করতে পারবেন যা বেশি অর্থবহ।

কেবল দুর্ভাগ্যের দিন ও ঘটনাগুলোকে আপনাকে পরিক্রমণ করে যেতে দিলেই আপনি পেতে পারেন কার্যকর একটা জীবনায়ন।এভাবে যেতে দিলে আপনি আবেগিকভাবেও অনেক সুসংহত ও সুঠাম থাকতে পারেন।

(চলবে)



দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য