home কবিতা কনক ও বনমোরগ সিরিজের সাতটি কবিতা ।। হাসনাত শোয়েব

কনক ও বনমোরগ সিরিজের সাতটি কবিতা ।। হাসনাত শোয়েব

মাছ ধরার গান

বাবার সাথে আমরা যখন মাছ ধরার গান শুনতে যেতাম আমাদের একটা নদীর প্রয়োজন হতো। আমরা আঙুল দিয়ে মাটি কেটে কেটে নদী বানাতাম। বাবা একটা পাতা নদীতে দিয়ে বলত— এটা হল মাছ। সেই থেকে আমরা পাতা দেখলে মাছ মাছ বলে চিৎকার করে উঠতাম।
সেবার শীতকাল আর গেলো না। মানে শুধুই শীত। আমরা নদীতে গিয়ে মাছ নিয়ে আসতাম। গাছে লাগিয়ে রাখতাম। আর বাবাকে বলতাম — পাতাদের কোন নদী নেই কেন?
— কারণ তার গাছ আছে।
আমার মন খারাপ হতো। আমি ওই দূরের আকাশ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, আর ভাবতাম আমার নদী কিংবা গাছ কোনটাই নাই।
কনক বলতো- জানিস! ওই যে তোর শাদা ঘুড়িটা সেখানে আকাশ বেঁধে রেখেছিস। যার কাঁধে হাত দিয়ে ভাবিস। ওটা কি জানে রঙের তীব্রতা কখনো দৃশ্য দিয়ে মাপা যায় না।
— সে শুধু জানে কোন প্রত্যাদেশেই সে ভেঙে পড়বে না। কারণ প্রকৃতিতে সেই কেবল ইশ্বরের নিকটবর্তী।
— তুইও ইশ্বরের কাছে থাকিস। ঠিক বারোটা এক মিনিটে ঝুলে গেছিস। তুই জানিস না?
— আমাকে কেবল মানুষের চিবুকের দৈর্ঘ্য মাপার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
— তবে সীল মাছের সাথে শীতের দূরত্বের কি হবে?
— স্তনের উষ্ণতার সাথে সীল মাছের যতটুকু পার্থক্য তা এবার আমরা সোয়েটার দিয়ে পুষিয়ে নেব।

 

গভীর গোপন অসুখ

সারি সারি লাল মোরগ আমার দিকে ছুটে আসছে। যাদের চিবুক জুড়ে বিষন্নতা। মোরগের চিবুকে হাত রাখলে মানুষের পাকস্থলীর ওজন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। সেইসাথে বিষন্নতারও। পোষা মোরগের চিবুকে হাত রেখে বাবা একদিন বলেছিলো
— যীশু মোরগ ভালোবাসত। কারণ তার আছে সংখ্যা সম্পর্কিত যাবতীয় ধারণা। তারা বরাবর ফুরিয়ে যায় এক, দুই করে।
— আচ্ছা বাবা, পাখিদের মধ্যে মোরগ সবচেয়ে কাছে থাকে মানুষের, কেন?
— সে পাকস্থলীর বেদনা বুঝতে পেরেছিলো।
— তবে ছুরির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষ কতটুকু জানে?
— ঠিক ততটুকু, যতটুকু মানুষ মাংসের ক্ষেত্রফল আঁকতে পেরেছিলো।
— কনকের মাংসে মৃত্যুর দাগ ছিলো সেটা তুমি বুঝতে পারোনি কেন?
— দ্বিপ্রহরের যেকোন মৃত্যু গণনা অযোগ্য। এমনকি যীশুর সেই প্রিয় মোরগেরও।

 

অরিজিনাল সিন

— ঘাস হল তোমার পৃথিবীর কেশ। পোলাপান বালেগ হলে যেমন কেশপ্রাপ্ত হয় তেমনি পৃথিবী বালেগ হলে তার উঠে ঘাস।
বলেই বিজ্ঞান স্যার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
বিজ্ঞান স্যারকে আমি বাসায় বাবা বলে ডাকতাম।
প্রতিদিন স্কুলের মাঠে গিয়ে ঘাসের উপর হাত বুলিয়ে দিতাম। মনে হতো পৃথিবীর বুকে হাত দিয়ে আছি।

— আচ্ছা মালা কি কখনো কাঞ্চনজঙ্ঘার মেঘ দেখতে গিয়েছিলো?
— মালা মূলত মাছের জীবন সম্পর্কিত ধর্মের বিধান বুঝতে চেয়েছিলো।
— এই শহরের বাচ্চাদের মুখোশ পড়িয়ে রাখা হয় কেন?
— প্রশ্নটা অধিবিদ্যক নাকি সায়েন্টিফিক?
— ধর প্রশ্নটা থিয়োলজিক্যাল।
— তবে সকল ধর্মেই বাচ্চাদের বিশেষ ছাড় দেওয়া আছে। যদিও মুখোশ পাঠ প্রতিটি ধর্মের অরিজিনাল সিনের একটা।
এভাবে কনক-আমার সংলাপ চলতো মধ্যরাত পর্যন্ত। অতঃপর নদীটাকে বুক পর্যন্ত টেনে দিয়ে শুয়ে পড়তাম।
শেষ রাতের দিকে জোয়ার শুরু হতো। আমরা ভিজে একাকার হয়ে যেতাম। কখনো কখনো দেখতাম বাবাও ঘুমোতে আসতো আমাদের সাথে।
— আহা! আমাকেও ভিজিয়ে দিলি।
— তুমি আসলা কেন, তুমি জানো না প্রতি রাতে এখানে বান ডাকে?
— আমি তো তোদের থেকে আলাদা নারে। তুই কি জানিস! এখানে না আসলেও আমিও প্রতি রাতে ভিজে যাই। এভাবেই হয়তো ভিজে যেতে হয়।

 

মৌমাছি কিংবা ইশ্বরের জবানবন্দি

বাবা আমাকে নরকের সাতটি দ্বার এক এক করে দেখিয়ে বললেন- কোনটা ভালো লাগে দেখ। জীবনে কোন কিছুই তো দেখে-শুনে নিতে পারলিনা। এখানে যেনো ভুল না করে বসিস। আমি অনেক চিন্তা-ভাবনার পর প্রজাপতির সৌন্দর্যতত্ত্ব দিয়ে বানানো নরকটিকে বেছে নিলাম। বাবা হতাশ হয়ে বলল— নরকেও তোর বিলাসিতা গেলো না। আমি কিছু না বলে হাসলাম।

আমি আর কনক একই ঘরে থাকতাম। দুজনেরই শাস্তি হয়েছিলো বিগত প্রেমিকাদের স্মৃতি এবং স্বর্গীয় পিতামহের অহংকার। এইসব শাস্তিতে বিষণ্ন আমার চোখে কনক হাত রেখে বলত- প্রিয় মৌমাছিরা জানে, ফুলের গভীরে ছুঁয়ে থাকা ভালোবাসা কিংবা যন্ত্রণার কথা।

অতঃপর আমাদের ঈশ্বরের মুখোমুখি করা হলে কনক ঈশ্বরের দিকে হেসে বলল— সদাপ্রভু আপনি কি জানেন পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া জুতোদের বেদনার কথা?
ইশ্বর উত্তর দিলেন— আমি বস্তুত যেকোন ঘ্রাণেন্দ্রিয় থেকে দূরে অবস্থান করি।
-তবে নিশ্চয় আপনি জানেন না বন্ধ ঘড়িরা তাদের ডায়েরিতে মৃত্যু বিষয়ক যা লিখেছিলো তা।
-আমি বস্তুত সেইসব ঘড়ি হয়ে ডায়েরি লিখেছিলাম।
-সদাপ্রভু ঘড়িদের তবে কে বন্ধ করে দিয়েছিলো?
-নক্ষত্রে মুখ হারিয়ে ফেলা শিশুরা।

 

বাইলা মাছের ঠোঁট সংলগ্ন আঙুর

খাওয়া শেষ হলে আমরা মুখটাকে মুছে রাখতাম। ঠোঁট দুটো ফালি ফালি করে কেটে রাখতাম। কাটা ঠোঁট ছুঁয়ে বাবা বলত— ঠোঁট কাটলে তোকে বাইলা মাছের মতো লাগে। বলে বাবা হাসত।
আমি ভাবতাম অন্য কথা। বাবাকে বলতাম— আমি কেবল চুমু খাওয়ার কথা ভাবছি। কাটা ঠোঁট দেখলে সবাই আমাকে বাইলা মাছ বলে ক্ষ্যাপায়। কেউ চুমু খেতে চায় না।
বাবা কিছু বলত না শুধু হাসত।
কাটা ঠোঁট ভাঁজ করতে করতে তিন মাস পার হয়ে যেতো। এই সময়টা আমি কেবল দেয়াল ঘড়িতে লাগানো পাহাড়ের স্টিকারের দিকে চেয়ে থাকতাম। বাবা একটা ইংরাজি ডিকশনারি দিয়ে বলত- কাটা ঠোঁটে দ্রুত ইংরাজি শেখা যায়।

কনক একদিন জানতে চেয়েছিলো— আচ্ছা ট্যাটুগাছ কি?
আমি হেসে বললাম— ফলবতী মাছেদের নাম ট্যাটুগাছ। যেসব মাছের পেটে আঙুর জন্মায় তাদেরকে ট্যাটুগাছ বলে।
— যাহ! তুই বলেছিলি যীশু নিজেকে আঙুর গাছ ভাবতো।
— আঙুর গাছ আসলে এক ধরণের ছলনা।
কনক খুব বিরক্ত হয়ে বলতো— যন্ত্রণাগুলোর নাম রাখা যেতে পারে আঙুর গাছ।
যেদিন কনক মরে গিয়েছলো আমি বারোটি বাইলা মাছের ঠোঁট কেটে দিয়েছিলাম। তাদেরকে যখন কনকের সাথে কবর দিতে গেলাম বাবা প্রত্যেক বাইলা মাছের ঠোঁটে একটি করে আঙুর রেখে বলেছিলো— কিছু কিছু যন্ত্রণা সাথে নিয়ে যেতে হয়।

 

কাঠবাদামের কান্না

সেটা খুব সম্ভবত যীশুকাল। যখন ময়ূরের সাথে নেচে-গেয়ে আমার বাবা ঘরে ফিরেছিল। আর আমরা রাত গভীর হলেই কাঠবাদামের কান্না শুনতে পেতাম। বাবা তার ঘুঙুর খুলতে খুলতে বলত
— যেখানে মোরগের পালক উলটে পড়ে থাকে অথবা শিশুদের মুখস্থবিদ্যার পাশে শুয়ে থাকে যাযাবর ঘ্রাণ সেখানে গিয়ে নাচবি না। পাপ হয়।
অতঃপর বিবিধ ঘ্রাণ এবং পাপ মাথায় নিয়ে আমরা ঘুমাতে যেতাম। শহরে নানা রকম পাপীদের সাথে আমার প্রায় দেখা হতো। যাদের বেশিরভাগই ঘুড়ি উড়াতে জানতো না। আরেকদল ছিল যারা কখনো পাহাড়ে উঠেনি। আমি দেখেছিলাম একদল যুবক মৌমাছির ঘ্রাণ শুষে নিয়ে নিজেদের পাপ স্বীকার করে নিয়েছিলো বলে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেখানেই আমি কনকের খোঁজ পেয়েছিলাম।
আমাকে ওই দলে দেখে কনক বলেছিল
— শেষ পর্যন্ত তোর তাহলে সাহস হলো। অথচ আমি মরে যাওয়ার সময় শেষবারের মত হাতটা ধরার সাহস তোর ছিলো না। খুব হাসি পাচ্ছিল যখন দেখলাম তুই দেয়ালঘড়ির ঘণ্টার কাঁটাটা ধরে কাঁদছিলি। স্রেফ মৃত মানুষের হাসার নিয়ম নাই বলে হাসিনি।
— কিন্তু সেদিন তুই মরেছিলি কেন? অথচ তোকে আমি ময়ূরের জীবন সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।

— এরপর দীর্ঘঃশ্বাস ছায়া ও ছায়াহীনভাবে দীর্ঘ হতে থাকে।
আয়নার সামনে গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াই আমি, তুমি এবং সে। আয়না থেকে কেবল একটিমাত্র মুখোশের প্রতিচ্ছবি ভেসে আসছিল। যার বাদামি কেশর থেকে জাফরানের সুগন্ধে ভেসে যাচ্ছিল মাতামহীর নাচঘর।

— শেষবারের মতো আবারো কাঠবাদামের কান্না শুনতে শুনতে হয়তো ঘুমিয়ে কিংবা না ঘুমিয়ে পড়ি।

 

সমস্ত দিনের যন্ত্রণা

অবশেষে বুঝি যে ঘুমন্ত মানুষের একটি পাহাড়ের প্রয়োজন হয়। আমরা টিকটিকির কাছ থেকেই ভবিষ্যৎ দেখতে শিখি। দেখতে দেখতেই বিকেলগুলো মার্বেলের মতো করে গড়িয়ে পড়ে। আমরা অনেক কিছুই বোঝার পরও আরও অনেক কিছু বুঝতে বাকি থাকে। সেই সাথে সমুদ্রের সাথে দোহারের একটি সম্পর্কও বুঝে ফেলা যায়। এই সমস্ত সমুদ্রের পানি কিছু দূর গড়ানোর পর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে নতুবা একটা দীর্ঘ ঘুমের যাত্রা শেষ হয়।
— তোরা কাছাকাছিই থাকিস। কনকের এমন একটা কথার পর আমরা আর এক চুলও নড়তে পারিনা। বুড়ো আঙুলে কি একটা শিকলের মত করে লেগে থাকে। বাবাও বলেছিল
— বাবা, সমুদ্র ও পাহাড় কখনো একসাথে দেখিস না। আয়ু কমে যায়। খুব বেশি সুন্দর একসাথে দেখতে নেই। হায়! মানুষ না বুঝেই কত আয়ু কমিয়ে ফেলে। নয়ত মানুষ ঠিক তিনশ বছর বাঁচত। অথচ বাবা সমুদ্র ও পাহাড় কোনটাই ঠিকঠাক দেখেনি কিন্তু কত তাড়াতাড়ি মরে গেল।
— বাবা মরে গেল আর তুই এলি। আমি বুঝিও নি। আমি মুলত সব সুন্দর না বুঝেই দেখেছিলাম। ঠাণ্ডা ঘড়ির কাঁটার মত তুই দুলতে শুরু করিস! তোকে দেখেই কনক বলেছিল— দেখিস ও একদিন গলায় সাপ দুলিয়ে আসবে ঠিক যেমনটা তুই চেয়েছিলি। আমি জানি তোর চোখের কাছে হেরে গিয়েছিল বাউফলের গন্ধযুক্ত সমস্ত নারী।
— তুই একদিন তোর একুরিয়ামটা ধার দিস বলেছিল কনক — আমি মাছ সেজে বসে থাকব। তার ঠিক তিনদিন পর কনক তার ঘরে ক্রুশ বানিয়ে ঝুলে পড়েছিল। নিচে পড়েছিল একটি চিরকুট— ‘আমাদের ঘুমের নাম একেকটি দিনের মৃত্যু’। হ্যাঁ! ঠিক! তখন দুপুর বারোটা বেজে ছাব্বিশ মিনিট।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য