home গল্প তুঁহু মম যম সমান । প্রান্ত পলাশ

তুঁহু মম যম সমান । প্রান্ত পলাশ

(প্রিয় গাল্পিক খোকন কায়সারকে)

 

হালের জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি, আগে কলেজ আছিল, সেইখানে দাঁড়াইয়া অশোক ব্যানসন লাইট টানতে লাগল। সেইখানে মানে গেইটের সামনে, ঠিক গেইটের সামনেও না, একটু পাশে, ফুটপাত ফুটপাত ভাব যেইখানে। গরমকাল। লেবুপানি বেচতেছে অনেকে। কাঠের কী একটার ভেতর লেবু ফালি কইরা হান্দায় আর মুঠি দিয়া চাপ দেয়। ফিরিত কইরা লেবুর রস গেলাসে ঢোকে। তারপর পচা পানির বরফ থিকা চুঁইয়া আসা পানি গেলাসে দেয়। কেউ খাইলে আহ্ পরম শান্তি। গা দিয়া যতডি ঘাম বাইর হয়, তা এক গেলাসেই কুপোকাত। অশোক ঠিক এমন পরিস্থিতির ভিতর দিয়া ব্যানসন লাইট টানে। এই সিগ্রেট তার না। মানে সে কিনে নাই। এক বন্ধু দিছিল। সাকুরা থিকা মদ খাইয়া বাইর হওনের পর ওই বন্ধু পান খাওয়ার সময় পাঁচটা বিধবা ব্যানসন কিইনা দিছিল। এই আর কি। তেমন গল্প নাইকা।

 

কিন্তু মাঙ্গির পোর গল্পের কি আর শ্যাষ আছে! অশোক সিগ্রেট শ্যাষ কইরা হাঁটে ডান দিক দিয়া। তারপর বাম দিক। রিকশার পুন্দানি খাইতে খাইতে একটু আগায়। একটা ছোট্ট মন্দির, তার সিঁড়িতে গিয়া বসে। গালে হাত দেয়। প্যান্টের চেইন ঠিক আছে কি না দ্যাখে। যথারীতি খোলা দেইখা আবার লাগায়। এই লাগালাগিতে জীবন ভরা। অশোকের ভাল্লাগে না। ব্রাহ্ম মন্দির। তার মনে স্মৃতি আশকারা দেয়। এইখানে একদিন সাক্ষী-সাবুদ ছাড়াই সে বিয়া করছিল। স্পেশাল বিয়া। য্যান জগতে কেউ আর এই বিয়া করে নাই! সে হাসে। তারপর উইঠা ডার্বি সিগারেট কেনে। টানে। টানতে টানতে আবার মন্দিরের সিঁড়িতে গিয়া বসে। যারা তাগো বিয়া করনের নামে সই-টই নিছিল, উকিল ধরাইছিল, তাগোর কথা ভাবে। আরও ভাবে, জীবনে তো বিয়া একখানই। একখানই সে করছে। সেইটা স্পেশাল। একটা ভাব তার চোখেমুখে আসে। সেই ভাব ভাবের না অভাবের, সে বুঝতেআরে না। না বুঝতে বুঝতেই সে বিচি চুলকায়। জীবন তার কাছে চুলকানির মত মনে হয়। যত চুলকাইবা তত মজা। কিন্তু এই মজা দিয়া তো জীবন চলে না। ফলে ঘা হয়। জ্বালা বাড়ে। এই জ্বালাতনে জীবন বিদিক।

 

অশোক আবার ডার্বি কিনতে যায়। চারপাশে কাপড়ের দোকান। এই এলাকার নাম না কি ইসলামপুর। য্যান এইখানে সুবেদার ইসলাম আইসা খাড়া হইয়া রইছে। নানা শব্দ তার কানে লাগে। ছোট থিকাই সে শব্দ নিয়া গেইম খেলে। ভাষা নিয়া গেইম খেলে। রাস্তায় দাঁড়াইয়া শোনে কত মানুষ কত কিসিমের ভাষা কয়। অশোক নানান শব্দ কানের ভিতরে ঢুকাইয়া বহুভাষার স্বাদ পায়। সেই ভাষায় আরবি, ফারসি, পর্তুগিজসহ নানা কিসিম গিজগিজ করে। ডার্বি ধরাইতে ধরাইতে তার হাসি পায়। কে জানি তারে কইছিল একবার, ‘ডার্বি, তুই খেতে পারবি?’ সেইসব কথাও তার মনে পড়ে। সে তো ডার্বি খাইত না। ব্যানসন খাইত। অহন ট্যাকাটুকা নাই, তাই সে খায়। সিগ্রেটে টান দিতে দিতে অশোক চোখ বুইজা ফেলায়। এই তার দোষ। সে ভাষা শোনে। নানা কিসিমের ভাষা।

 

আসসালামুওয়ালাইকুম। হলিউড আছে? আপনার কাছ থেকে কি আর বেশি দাম নেব? পিঁপ পিঁপ। ওই ফকিন্নির পোলা, রিকশা চালাইতে জানস না? যেই দিক দিয়া আইসছ সেই দিক দিয়া ভইরা দিমু। পিঁপ পিঁপ। শালার চাকরিটা এবার যাবে। হ্যালো, আমি ব্যস্ত আছি, রাতে কথা বলব। ভাইজান সারাদিন কিছু খাই না। অই যাহ। ঢাকা শহরে আর থাকা যাবে না, এত জ্যাম, এখানে মানুষ বাস করে? শোনো, ব্যাংকে আমি টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি, তুমি কাল তুলে নিয়ো। কিরিং কিরিং। বস দ্যাখেন একটা ভুল হইতেই পারে, শর্মিলাকে আফটার অল হাউজ থেকে বিদেয় করবেন না…

 

এইবার অশোক চোখ খোলে। আসলেই তো। বিদায় ঠিক না। জীবনে কেউ কি কখনও বিদায় হয়? সব থাইকা যায়। তার নির্দিষ্ট কোনো ভাষা নাই। না সাধু না চলিত। লেবু চিপার মত কেমন এক ভাষা তার ভিতর থিকা চিরিত কইরা বাইর হয়। তারপর ঠান্ডা জলে মিইশা যায়। তহন সে যা কয় তা না হয় কথা, না হয় খিস্তি। মানে কিছুই হয় না। এই হওয়াহওয়ি আর না-হওয়াহওয়ির মাঝখানে পইড়া অশোক চিরিত কইরা বাইর হইয়া যায়, কখনও রাস্তায়, কখনও ঘরের ভিতরেই। উবু হইয়া, ঠ্যাঙ উপরে তুইল্লা, হাত ছড়াইয়া, দেয়ালে হেলান দিয়া হেলেনরে ভাবতে ভাবতে সে বোকাচোদা বইনা যায়। তারপর তার কণ্ঠ দিয়া চিরিত কইরা একখান গান বাইর হয় : লর্ড আই অ্যাম ওয়ান, লর্ড আই অ্যাম টু…

 

কোনোরকমে ঠেইলাঠুইলা অশোক ডিগ্রি পাস করছিল। লেখাপড়ায় তার মন বসত না। একসময় আমার সাথে চামার, তুমির সাথে চুমি মিলাইয়া কবিতা লিখত। তারপর সে একদিন বুঝল অন্তরে মিল না থাকলে অন্ত্যমিল দিয়া বালের কিছু হয় না। তারপর ক্ষ্যামা। সেই যে স্টপ, তা ফুলস্টপ হইয়া রইল অহনতরি। এহন সে চারপাশ দ্যাখে। সংসার করে। যা একটা দোকানে সেলসম্যানের চাকরি আছিল, তা-ও হারাইছে হুদাই হা কইরা থাকোনের লিগা। দোকানে কত সুন্দরী মাইয়া আসে। সে হা কইরা তাকায়। তারপর দুইশো ট্যাকার জিনিশ একশো ট্যাকা কয়। হাসিমুখে নিয়া যায় সুন্দরীরা। মালিকের পোঁদে বাঁশ যায়। তারপর আর কী। চাকরি তো থাকে না, নেকি?

 

তয় অশোকের চাকরি না থাকলে কী হইব, তার বউ সাবিহার আছে। সকালে গালে ক্রিম লাগাইয়া সে সার্ভিসে যায়। বডি স্প্রে দেয়। উচ্চ শিক্ষিতা। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থিকা মাস্টার্স পাস। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি। তার সংসার কইতে গেলে এহন সে একাই চালায়। সাবিহার মত ভাল মাইয়া সে জিন্দেগিতে দ্যাখে নাই। এইটা সে ভালভাবে জানে। খালি একখান সুদর্শন চেহারা আর ভাবুক ভাবুক ভাব লইয়া, মিষ্টি মিষ্টি কথা কইয়া সে সাবিহারে পটায়ছিল। আসলে পটায় নাই, ভালবাসছিল। সাবিহাও সাড়া দিছিল। এক অদ্ভুত পাগলামি সাবিহার ভাল লাগছিল। অশোক একদিন কইছিল, ‘দ্যাখো, সারাজীবন পুরুষরা সংসার চালাইছে, আমারে বিয়া করতে চাইলে তোমারে চালাইতে হইব। শুধু সংসার না, সব। সব তুমি চালাইবা। রাইতেও। আমি ফ্যালফ্যাল কইরা থাকুম। আমার চাইয়া থাকতে ভাল লাগে। কও, তুমি পারবা না?’

 

সাবিহা পারছিল। অশোক পারে নাই। সাবিহা সব বোঝে। অশোক বোঝে না। তার মনের ভিতর জগাখিচুড়ি কাজ করে। সে বোঝেই না সে কী করতে চায়। এই যেমন অশোক সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়াইয়া খাড়াইয়া ফষ্টিনষ্টি করে, কিন্তু রাইতে সাবিহার বুকে দুই হাঁটু গুঁইজা কান্দে। বারবার এক কথা কয়, ‘তুমি আমারে ছাইড়া যাইয়ো না, প্লিজ। যাইয়ো না।’ সাবিহা যাইব বইলা মনে হয় না। অশোক কানতে কানতে ঘুমাইয়া যায়। সাবিহা বোঝে না কী হইছে অশোকের। প্রেমের দিনগুলিতে সে এমন আছিল না। টিএসসিতে দাঁড়াইয়া অশোক লাল চা আর ব্যানসন খাইত, সাবিহা আইসা বিল দিত। শিশুর মত সারাদিন পাগলামি করত। চুমাচাটি দিত। সাবিহা তারে শুধু কইত, ‘তুমি ভালবাসো। আমি শুধু ভালবাসা চাই। তোমাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই। তুমি আবার কবিতা লেখা শুরু করো।’

 

সাবিহা সকালে ঘুম থিকা ওঠে। তারপর রেডি হইয়া অফিসে যায়। অশোক ব্রাশ কইরা সাত তলা থিকা নামে। নিচের এক হোটেল থিকা দুইটা স্যাঁকা রুটি আর একটা ডিমভাজি নেয়। এই দিয়া সে নাশতা সারে। মাঝে মইধ্যে ডাইলভাজি। মাঝে মইধ্যে গরুর কলিজা ভুনা। খাইতে খাইতে অশোক ভাবে, কী নির্বিকার চিত্তে তার মত খাইসটারে সাবিহা দিনের পর দিন পাত্তা দিতেছে। জব করে না, ইনকাম করে না। ডার্বির ট্যাকা পর্যন্ত সাবিহা দেয়। তার কান্দা আসে। ভাবে, ‘আমি ক্যান এমন হইলাম? আমার ক্যান কিচ্ছু ভাল্লাগে না? আমি ক্যান নানান ভাষা, নানান কিসিমের চিন্তায় জড়াইয়া আছি? আমি ক্যান আগের মত নাই? আমার ক্যান সাবিহার বুকে হাঁটু গুঁইজা কানতে ইচ্ছা করে?’

 

অশোক কোনোদিন ভাবে নাই, তার জীবন এমন এক্সট্রা কারিকুলাম পর্যায়ে আসবে। স্টুপিড থুক্কু স্টুডেন্ট লাইফে অশোক যখন দুনিয়ার মজদুর এক হও কইয়া শহিদমিনারে খাড়াইয়া চিল্লাইতো, তহনও সে কিছু বোঝে নাই। একসময় যহন সে গ্রামে সর্বহারাগো লগে মিশত, রাইত-বিরাতে অস্ত্র হাতে নিয়া সমাজবদলের চিন্তা করত, হুট কইরা গ্রামের এক বাড়িতে ঢুইকা মুরগি রান্না কর টাইপের দৃশ্য দেখত, তহনও সে ভাবে নাই জীবন একটা এক্সট্রা কারিকুলাম। সেইটা পড়তে হয়। জানতে হয়। নিজের জীবনরে না বদলাইয়া সমাজবদলের স্বপ্ন সে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হইয়া অবশেষে সব বান্ধব ছাড়ছিল। একদিন সে টিএসসিতে সাবিহার প্রেমে পড়ে। তার মনের ভিতর হিন্দু-মুসলমান খেলা করে না। সে জানে মাইয়া মাইয়াই। আর সে অশোক হইলেও কি, কুদ্দুছ হইলেই কি। পোলা তো পোলাই। প্রেম তো প্রেমই। বিয়া তো বিয়াই। তার আর সম-অসম কী।  কিন্তু এই বাল থিকা তার মুক্তি নাই।

 

সাবিহা অফিসে যাবার পর অশোক নাশতা খাইয়া রেডি হইতে যায়। দরজা আটকানো। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট খুইলা সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। বোঝার চেষ্টা করে সে হিন্দু না মুসলিম। বৌদ্ধ না খ্রিস্টান। না কি বহু আগে এক গারো মাইয়া প্রেমে পড়ছিল আর কইছিল, ‘শুধু তোমারে চাই, তোমার পরিচয় কী তা না’। অশোক তা-না-না কইরা গাইয়া তার সাথে দিন গুজরান করছিল। পরে দেখছিল, ইচ্ছা করলেই সব কিছু হয় না। পাওন বইলা তো কিছু নাই। আর মাইয়া! কিন্তু সাবিহার এইসব আছিল না। তার ভিতরে এইসব কোনো বালাই আছিল না। সাবিহা কইত, সে নারী আর তারে ভালবাসে। সাবিহা কইল, ব্যস। অশোকও কইল, ব্যস। হইয়া গেল। স্পেশাল বিয়া। জীবন তাগো কাছে স্পেশাল মনে হইল।

 

সাবিহা আর অশোক একদিন ব্যাংকে যায়। তাগো একটা নতুন অ্যাকাউন্ট করা লাগব। তো কাগজপত্র দেখানোমাত্র ফয়িন্নিরপুত ব্যাংকার কয়, একজন হিন্দু আর একজন মুসলিম। ক্যামনে হয় অ্যাকাউন্ট? ভাইজান কি কনভার্ট হইছেন? অশোকের রক্ত গরম হইয়া যায়, সাবিহা তারে থামায়। সাবিহা উচ্চশিক্ষিত, ব্যাংকাররে বুঝাইয়া নানান কাগজপত্র দেখাইয়া অ্যাকাউন্ট খোলে। অশোক বোঝে, একটা আকুতির মতো নরম সুরে কিছু কথা কইলে পাবলিক ঠান্ডা হয়। ওই ফয়িন্নিরপুত ব্যাংকারও হয়ত হইছে। কিন্তু তার জ্বালা মেটে না। অশোক ভাবে, এই দেশে একটা বালের অ্যাকাউন্ট খুলতে লাগলেও কি হিন্দু-মুসলমান লাগে? এত লাগালাগি ক্যান? এত লাগালাগি অশোকের ভাল্লাগে না। সে মন খারাপ কইরা বাসায় চইলা আসে। সাবিহা অফিসে যায়।

 

অশোক বাসায় গিয়া টিভি ছাইড়া দেয়। ওইখানে গান হয়। রবিঠাকুরের। মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান… এই বালমার্কা বৈষ্ণব ভাষায় ত্যক্ত হইয়া অশোক চ্যানেল ঘুরাইয়া দেয়। ডিসকভারি চ্যানেলে ঢোকে। সেইখানে কিভাবে বাঘ হরিণরে অ্যাটাক করতেছে, সেইসব দেইখা সে শান্ত হয়। কিভাবে একটা ছোট্ট বান্দরশিশু পানি খাইতে গিয়া ইয়া বড় কুমিরের দাঁতে আটকাইয়া যায়, সেইসব দেইখা সে শান্ত হয়। কিভাবে ইয়া বড় বনমোষ সিংহীর গালে গিয়া ধরা পড়ে, সেইসব দেইখা সে শান্ত হয়। তার শান্ত না হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। জাঙ্গিয়া পরতে পরতে অশোক গান গায় : মরণ রে তুঁহু মম জাঙ্গিয়া সমান… তারপর অশোক আলনার দিকে তাকায়। দ্যাখে, সাবিহার প্যান্টি আলনার এক কোণায় ঝুইলা আছে। একটা না, কয়েকটা। অশোক আবার গান গায় : মরণ রে তুঁহু মম প্যান্টি সমান…

 

অশোকের কিচ্ছু ভাল্লাগে না। তার জাঙ্গিয়া পরতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু বউ তারে কয় পরতে। বউ নিজেই তারে কয়েকটা জাঙ্গিয়া কিইনা দিছিল বঙ্গবাজার থিকা। দামে সস্তা হইলে কী হইব, চাইপা ধরে। অশোক সারাজীবন এই চাইপা ধরা পছন্দ করে না। যেমন অশোক যখন আগে চাকরির লিগা অ্যাপ্লিকেশন দিত, সেইখানে না কি এক বিশেষ ভাষায় অ্যাপ্লিকেশন দিতে হইত। সে বাংলা ইংরেজি ফারসি আরবি হিন্দি মিশাইয়া আবেদন দিত আর তার আবেদনে সাড়া দিয়া কল আইত না। তারে ক্যান একটা নির্দিষ্ট ভাষায় আবেদন দিতে হবে? একটা চাকরি, সে বিনীতভাবেই করতে চায়, সেই কথা তারে তার মত বলতে দিতে হবে না? মানুষ কি পরভাষায় আবেদন করে? অশোক যহন প্রেম নিবেদন করছিল, তহন কি সে বলিউড-টালিউড দেইখা নিবেদন করছিল? ভাষা তার একান্ত আপন। সে য্যামনে কইব কোক, সে-ই তো কইছে, নেকি? এই ভাষাও কি হিন্দু-মুসলমানের? এই ভাষাও কি বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের? অশোক ডার্বি ধরাইতে ধরাইতে গান গায় : মরণ রে তুঁহু মম যম সমান… টিভিতেও গান চলে : দিল মে মাগার জ্বালতে রাহে, তেরে লিয়ে তেরে লিয়ে…

 

অশোক আজিমপুর গোরস্তানের পাশ দিয়া হাঁটতে হাঁটতে ইডেন কলেজের সামনে যায়। এইপাশে ফুচকা বিক্রেতা, ওইপাশে কামিজ বিক্রেতা। এইপাশে চা-র দোকান, ওইপাশে ব্রা-র দোকান। কোনোটাই দোকান না। কোনোটাই স্থায়ী না। সব অস্থায়ী। কখনও দোকান বসায়, কখনও বসে না। পুলিশ থাকতে দিলে বসে, উঠাইয়া দিলে উইঠা যায়। অশোক জীবনের এই খেলা জানে। কোথাও জীবন চিরস্থায়ী না। কোথাও ভাষা চিরস্থায়ী না। শুধু ভাসা, শুধু ভাসা। আবার তার রবিঠাকুরের গান মনে পড়ে : শুধু যাওয়া-আসা, শুধু স্রোতে ভাসা…

 

সাবিহা হয়ত বোঝে অশোকের এই হাহাকার, পাগলামি। হয়ত বোঝে না। তারা যখন শুইতে যায়, অশোক সাবিহার বুকে দুই হাঁটু গুঁইজা থাকে। তারপর কান্দে। ভাঙা গলায় গান গায়। তারা যখন সত্যিকার অর্থে শোয়, মানে ইয়ে আর কি, তখন অশোক গান গায় : শুধু যাওয়া-আসা, শুধু স্রোতে ভাসা… সাবিহার অতিষ্ঠ লাগে। আর কত পাগলামি। আর কত সহ্য করবে সে। সাবিহারও কান্না পায়। সে অশোকরে বুকে জড়াইয়া রাখে। চোখে পানি ফেলে। কয়, ‘বাবু, তোমার পাগলামির জন্য মানুষ আমাকে কী বলে জানো? তুমি এমন করো কেন? কে কী বলল, তাতে তোমার-আমার কী আসে যায়? এই যে তুমি ইনকাম করো না। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘোরো। বাসায় এসে চুপচাপ অল্প করে খাও। কিছু বললে উত্তর দাও না। রাতে কান্না করো। আমাকে কিছুই বলো না। আমি কী করতে পারি? আমাকে তো বলতে পারো। আমি আর কত সহ্য করব, বলো?’ সাবিহা অশোকরে জড়ায় ধরে। তারপর কি কি জানি করে।

 

অশোক ইডেন কলেজের সামনে দাঁড়ায়। নানা মানুষের, নানা মুখের, নানা মুখোশের শব্দ তার কানে আসে।

 

এটা কত? না না সাইজ ঠিক হবে। ঝাল বেশি দিয়েন। মামা, পানি কই? একশো টাকা একশো টাকা। ধ্যাৎ পুরা দিনটাই মাটি। মামা এইটা কত? দুইশো টাকা। আফা দেইখা লইয়েন। এত সস্তায় আর পাইবেন না। পিঁপ পিঁপ। ভাইয়া, পলাশীর মোড় এই দিক দিয়ে? কিরিং কিরিং। উফ শিট। জানিস সুমন না কাল রাতেও। পিঁপ পিঁপ। এই ঝালমুড়ি। পাঁচ টাকায় পাচ্ছেন ছোলাবুট। এক দাম। এক রেট। খাইলে মজা পাইবেন। পিঁপ পিঁপ। উফ, জ্যামের জ্বালায়। মালাউনগো লিগা আর কী যে কইতাম। ওই মালু। হা হা হা। তোরে কই নাই দোস্ত। কিরিং কিরিং।

 

অশোক বাসায় যায়। আবার ডিসকভারি দ্যাখে। একটা বাঘ এক পাল হরিণ থিকা এক হরিণরে টার্গেট করে। তারপর ধরে। গলায় কামড় দেয়। রক্ত বাইর হয়। হেরপর আরেকটা বাঘ আসে। দুইজন মিইলা খায়। আরেকটা বাঘ আসে। সে-ও খায়। একটা সিংহ একটা গলা-উঁচা জিরাফরে ধরে। মাটিতে শোয়ায় দেয়। তিনটা সিংহ মিইলা খুবলাইয়া খায়। হরিণরা পালায়। জিরাফরা পালায়।

 

সাবিহা অশোকরে ডাকে। অশোক গান গায় : মরণ রে তুঁহু মম যম সমান… সাবিহা একবার হাসে। একবার বকে। ‘কী হয়েছে তোমার? আমাকে শান্তি দেবে না?’

 

অশোক টয়লেটে হিসু করতে যায়। সাবিহা বিছানা গোছায়। অশোকের সেই দিনগুলার কথা মনে পড়ে। তার বাপ তারে একবার কইছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিরা কিভাবে হিন্দুগো লুঙ্গি খুইলা দেখছিল। কাডা না আকাডা। কাডা হইলে যাও, না হইলে মরো। অশোক প্যান্ট খুইলা দাঁড়ায়। একবার লাইট জ্বালায়, একবার নিভায়। দ্যাখে, আলো আইসা তার ওই জায়গায় পড়তেছে। দ্যাখে, অন্ধকার আইসা তার ওই জায়গায় পড়তেছে। ভয়ে গা শিরশির করে অশোকের। কুঁচকাইয়া ওইটা পাঁচ বছরের শিশুর মত হইয়া যায়। টাইনা লম্বা করতে চায় সে। পারে না। বিচি চুলকায়। তা-ও পারে না। এই না পারার ভাষা তার জানা নাই। এই ভাষা কি আরবি? এই ভাষা কি হিন্দুগো বাংলা? অশোকের জানা নাই। অশোক লাইট অফ করে আবার। দুই আঙ্গুল দিয়া একবার ফুটায়, কয়—  মুসলমান। দুই আঙ্গুল দিয়া আরেকবার বুজায়, কয়—  হিন্দু। অশোক ফুটাইতে থাকে, অশোক বুজাইতে থাকে

 

সাবিহা অশোকরে ডাকে, ‘অ্যাই শুনছো? এতক্ষণ কী করো ওয়াশরুমে?

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য