দশটি কবিতা | রাবিয়া সাহিন ফুল্লরা

আমার ত এখন দুইটা হার্ট


নিজেরে যে একলা ভাবুম
ভাবতে গেলেই লাগে যে,
আমার ত এখন দুইটা হার্ট!
একটা আমার
আরেকটা যে কার!
আমি খাইলেই যার খাওয়া হয়ে যায়
আমি হাঁটলেই যার ঘুম পায়
আমার উমে যে শান্তি পায়
হাত-পা নাড়ায়

যদিও দিনে দিনে টের পাই আমি
সে আরেকজন হয়ে উঠতেছে
আমার শরীরে আর থাকবে না বেশিদিন
যদি থাকতো,
দুইটা হার্ট নিয়ে ঘুরতাম আমি!
অবশ্য একটু ঠেস দিয়ে হাঁটা লাগতো, এখন যেমন
সামান্য বাঁকা হয়ে, পেটটারে সামনে ঠেলে
কেমন পেটভরা হাঁসের মতন
পা দুইটা ছড়ায়ে ছড়ায়ে

পুকুরে নামি সাঁতরানো যাইতো যদি
সেই একজনের মতন
আমিও পুকুরের পেটে ভাসতাম
হাত পা ছুঁড়তাম
শরীরের ভারটা পানিতে ছাড়ি
পুকুরের পেটে আরেকটা হার্ট হয়ে উঠতাম!
পুকুর কি তখন হইতো আমার মা?

কুচিওয়ালা জামায়
তারে ত আর গুঁজায়ে রাখা গেলো না…

২০২২


প্রজাপতি


প্রজাপতির ডানার মত গুটায়ে আসা চোখ দেখলেই বুঝি, তুমি ঘুমাবা এখন। কিন্তু আমার চুলায় যদি ভাত থাকে, যদি মাছের কড়াইয়ে ভাজতে থাকা মাছ পুড়ে যাবার ভয় থাকে, যদি আর কেউ না থাকে বাসায়, কিংবা থাকলেও ঘুমে, তোমারে বসায়ে রাখব আরো কিছুক্ষণ, তুমি কানবা, এটা ওটা দিব খেলতে, তুমি ছুঁড়ে ফেলে দিবা সব একটা একটা করে,  শুধু মা, মায়ের গন্ধ, শুঁকবা বলে চিল্লায়ে মাথায় নিবা বাসা, আমি তখন সান্ত্বনার ছড়া মুখে, ঘুরব চারপাশে, আদরের ললিপপ বানাব ওলে ওলে, না না, এইত আসতেছি, ভাত হয়ে গেছে, বাবা, আর একটু, এখনি নামাব, এইত শেষ, তারপর ফুলের মত পাপড়ি মেলে আমি তোমারে কোলে নিয়ে বসব। মায়ের সুবাসেই তুমি ছড়ার গুনগুন,  মামনুন, ঘুমায়ে পড়বা আমার কোলে।

 

মার্চ, ২০২৩

 


তেলাপোকার খোঁজে


আমার শুরু করতেই যত ইতস্ততা;
একবার শুরু করা গেলে
আর থাকবে না আধোয়া কাপড়
না মোছা ঘর।
যদিও তেলাপোকারা ওয়াশরুমেই থাকে।
তোমাকে খাওয়াতে নিলে বারবার ওয়াশরুম খোলা লাগে।
দেখো দেখো, কত তেলাপোকা, সব পালাইছে।
অথচ তোমারে রেখে যখন গোসলে যাই
আর তুমি কানতে থাকো দরজায়
তেলাপোকারা তোমার হয়ে গোসল করে
এদিক ওদিক দৌড়ায়
তোমার মত কী কী যে করে বুঝতে পারে না
জুতার নিচেও লুকায়
বাথরুমের ব্রাশগুলা ওদের বেশি পছন্দ
আর পছন্দ আধোয়া কাপড়।
কখনো বেসিনে, আধোয়া প্লেট ধোয়ার পরে
বেসিনটা ঘামায় ইদানিং
ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়তেই থাকে
যেন নারকেল পাতা চুয়ে রাতের শিশির, সারারাত
পড়তেছে চালে।
আর আমরা মা ছেলে
তখনও এক লোকমা ভাত হাতে;
ডালের পেঁপে আর কুমড়া ভাজি দিয়ে, লগে এক টুকরা ইলিশ ভাজা প্লেটে জুড়াবে।

জুন, ২০২৪

 


মরিয়ম ফুলের রেণুরা


মা হইলাম, অথচ আমি কেন মরিয়ম হইলাম না, খোদা?
বায়তুল মোকাদ্দাসের ঝাড়ুদার মরিয়ম হইলাম না!
এমনকি কোন মসজিদে গিয়ে নামাজেই দাঁড়াইলাম না!
অথচ ঠিকই বাচ্চা পেটে আসলো।

দুই বছর হয়ে গেছে
এখনো দলা পাকায়ে
এমনভাবে ঘুমায় সে
যেন আমার পেটেই আছে।
খালি হাত পাগুলা
আরো বিস্তৃত হয়ে ছড়ায়ে পড়ছে।
যেন দখল হওয়া ভূমি ফেরত চাইতেছে!

ফিলিস্তিনে জান নিয়ে ছুটতে থাকা বাচ্চাগুলার মা কেন হইলাম না আমি?
তাদেরকে কোলে আগলায়ে রাখতাম এমন।
নেতানিয়াহুর মত জালিমের হাত থেকে বাঁচাইতে
তাদেরকে নিয়ে ছুটতাম পূর্বদিকে
যেমন ছুটছিল হারুনের বইন মরিয়ম।

বোঁচকা কান্ধে পিঁপড়ার মত সারিবান্ধা ফিলিস্তিনিদের ভিড়ে আমিও থাকতাম জর্ডান নদীর তীরে।
অথচ, আমি কি জানি তোমার আরশে পৌঁছার রাস্তা কোনদিকে?

ফিলিস্তিনিদের জায়নামাজ হয়েই
আমি পড়ি থাকতাম চাই তাদের পায়ের নিচে।
তাদের কান্নায় ভিজি উঠতাম চাই
ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়া ফিলিস্তিনের মাটি হয়ে।

ধূ ধূ গাজার আকাশে মেঘ দেখলাম, দলাপাকানো সাদা
যেন উড়তেছে ফিলিস্তিনি শিশুরা।
যেন জালিমের চোখে ধূলা মারি
বাতাসে উড়তেছে ফুলের রেণুরা।

তোমার রহমতের বিষ্টি যদি নামে
সেদিন বারুদ হয়েই ফুটবে ওরা ফিলিস্তিনের লুদ্দ গেইটে।

২০ মার্চ, ২০২৫

 


উলালে


কী সুন্দর হাসি হাসি মুখ করে কথা বলতেছি
আহারে! আহারে!
যেন মাত্রই বিষ্টি হইলো
আর মাত্রই রইদে চকচকা উঠানে ঝাড়ু দিতে আসলাম।
কাঠবাদামের ফুল রেণু রেণু
পড়ে আছে কাঁচা আম আর
কচি পাতার দল এখানে ওখানে।
একপাশে শুকনা পাতা মেলে দিয়ে
ঝকঝকা উঠানে
এখন লাল লাল মরিচ শুকাইতে দিবো রে!
মুগ আর খেসারীও দিবো কিছু
আর কিছু খাইশ্যা
আলাদা আলাদা বিছানে।
বিষ্টিতে ওদানো কাপড়ও
মেলতে হবে দড়িতে।
ওরে, অনেক রইদ রে আজকে উঠানে!
উলালে আমি ভুলেই গেছি কী ছিল যে মনে…

০৮ এপ্রিল, ২০২৫

 


দুপুরের পরে


দুপুরের পরে কী করা যায়
ঘুম তো শেষ, বই পড়তেও দিবা না, যাও
দেখো তো, বাইরে বাতাস আছে কি না
রিনিরিনি করে পাতারা কাঁপতেছে কি না
মসজিদের সামনে বিছায়ে থাকা ফুল
ইটের টাল আর তার পাশে
দেবী দুর্গার মত হাত ছড়ানো পেঁপেগাছ
আছে কি না লাল কৃষ্ণচূড়া গাছ
পুঁইয়ের লতা আর নীল ভাসতে থাকা আকাশ
বিষ্টির পরে ওঠা মিষ্টি রইদ
দুয়েকটা রিকশা আর
পান-ফুচকার দোকান
আমরা বাইরে যাব!
গাড়ি কল দিছো?
হুমম, হ্যালো, হ্যালো..
দেখো তো, বাইরে বাতাস আছে কি না
ভার্সিটির ছেলেরা গান গাইতেছে কি না…

মে, ২০২৫

 


রসমালাই


খুব কম কথার ভিতরেই আমি থাকতে চাই
তাকালেই বুঝে যাবা এমন সহজ হবে প্রতিটা কদম
যেরকম গ্লাসভরা পানি নিয়ে হাঁটতে থাকা তোমার ভীরু পা
যেন আমার দিলের উপর এমনভাবে রাখলা
যাতে ব্যথা না পাই, পানিতে না ভিজে যাই
এমনই দরদে আগলায়ে রাখবা—
বুঝিবা কাচের গ্লাস
পড়লেই ভেঙ্গে যাবো
আর চোখ বড় করে তাকাবো। তাতেই
তুমি কানবা আর গালে গাল ঘষবা
হুমম, আম্মুর ননাই!
মিস্টার রসমালাই!

মে, ২০২৫

 


দুপুরবেলার পিঁউ পিঁউ


পাখিটা কোথায় বসে যে পিঁউ পিঁউ ডাকতেছে! ভাতের প্লেট হাতেই জানলা দিয়ে কতরকমে যে বিছরাইলাম। কাঁঠাল গাছে যে শালিকটা ডাকতেছে কতক্ষণ পর পর, তার ডাকের ভিতর থেকেই কি পিঁউ পিঁউ আসতেছে? না তো, নিমের ডালেও নাই কেউ।

তাহলে কে ডাকে এমন কোলছাড়া ছানার মতন?

বর্ষায় গাছেদের মতন পাখিরাও কেমন বাড়তেছে সংখ্যায়। সেদিন এক বসন্তবাউরির ডাক শুনে এত আনচান লাগলো! তারপর থেকেই মাথা বের করে দেখি, এই শহরে টিকে থাকা কে কোন পাখি!

একদিন এক কাঠঠোকরারে দেখলাম, লালঝুঁটি মাথায় কাঠের তক্তার উপর ভাত খেয়ে গেলো সামনের বারান্দায়। কী সুন্দর ছোপালো হলদে রঙ তার!

আরে, ওই তো বুলবুলির ছানাটা!

ডানা মেলতে মেলতে উড়ি উড়ি করতেছে একা।

পুঁইশাকের ক্ষেতে ছোট ছোট পাতার নিচে, সামান্য যে ছায়া সেখানে বসেই খানিক পর পর, পিঁউ পিঁউ আর
চারপাশের দালান থেকে কেউ যদি ময়লা ফেলে আবার, এই ডরে তারে আমি চোখে চোখে রাখি। খানিক পরেই দেখি, দুইটা বুলবুলি হাজির। কার্নিশে বসে বাসি ভাত খাইতেছে, আর ছানাটা তার মায়েরে দেখেই যেন ওড়া শিখে গেছে।

ডুমুরের ডাল থেকে ডালে, ধীরে

পাখনা দুইটা ছড়ায়ে, মায়ের লগে কী যে কুয়ারা করে!

২৬ জুন, ২০২৫

 


বাবল 


আম্মু কই? আম্মু কই?
আম্মু ত বই পড়ে শুয়ে শুয়ে
তুমি তার পাশে হাতি-ঘোড়া নিয়ে
খেলো আর গীত গাও: মা মা মা!
লোল আসে ঠোঁটে
আর বাবল ফোটে
উড়াতে গিয়ে গড়ায়ে পড়ো বইয়ের ওপর
চুমু দাও গালে আর চোখের পাতায়
আর নিজের রসমালাইয়ের মত গাল
মেলে রাখো আম্মুর বইয়ের পাতায়।

২৫ অক্টোবর, ২০২৫

 


সাঁকো


পাশাপাশি দুইটা আই আর মাঝখানে সাঁকো।
চক দিয়ে একটা খুব এইচ আঁকা হলো।
সাঁকো ধরে আমরা কি এবার বনশ্রী যাবো?
বিষ্টি নামবে আর চকলেট মোমো খাবো..!

জানুয়ারী, ২০২৬

 


ছবি


ছবি তো আঁকতে পারি না ভালো।
খারাপও কি পারি?
সে হাবিজাবি আঁকে আর বকে—
বলে, এটা হলো মশারী।
এই দেখো, পাখির বাসা।
কি সুন্দর জঙ্গল!

ভিতরে কিন্তু পাখি আছে।
পাখি ডিমে বসে ছানা ফোটায়।
পাখি বেলকনিতে এসে খুঁদ খায়।
পাখি চঞ্চল—আমরা ঘুমাই।

পাখি নিরলে কথা বলে।
পাখি কি বুলবুল?
যেই একটা ছবি তুলতে যাই,
পাখি থাকে না। পাখি কবিতা হয়ে যায়।

জানুয়ারী, ২০২৬

 




রাবিয়া সাহিন ফুল্লরা

রাবিয়া সাহিন ফুল্লরা কবি ও অনুবাদক। জন্ম ১৯৯৭ সালের ২ মার্চ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার মাইটভাঙ্গা গ্রামে। রাজনীতি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রকাশিত কবিতার বই—দরিয়ার ফুল (২০২১), দুই আনা সফর (২০২৪)। অনূদিত বই—গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রালের কবিতা (২০২৩), ফোরো ফারোখজাদের কবিতা (২০২৩), মরম আল মাসরীর কবিতা (২০২৫)। যৌথগ্রন্থ—খান আতাউর রহমানের গানের বই ‘পাখি রে তুই দূরে থাকলে’ (২০২২)। নিয়মিত লিখছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।

শেয়ার

Facebook
WhatsApp
X
Telegram
Threads

আরো পড়ুন

সত্যজিৎ সিংহ
নাদিয়া জান্নাত
সুলাইম মাহমুদ
তাসনুভা তাজিন তুবা
শুভ্র সরকার
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
হুসাইন হানিফ
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
দর্শন-ই-সাইবারশাহী
মেহেদি হাসান তন্ময়
তাহমিদ রহমান
মাহীন হক
দ্বিতীয় দশকের কবিতা
কাজল শাহনেওয়াজ
দ্বিতীয় দশকের কবিতা