যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন | হাসান রোবায়েত | পর্ব ৪

যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন

 

লম্বা বারান্দায় শপ বিছিয়ে মা পড়াতে বসাতো। এ বাড়ির বারান্দাতেই আমার প্রথম পড়তে বসা। আমার প্রথম পড়া ‘আদর্শ লিপি’র পাতা। প্রচ্ছদে দুইটা শাপলা ফুটে আছে। একটা শাপলার কলি। তিনটা পাতা। কালির ঢেউ ঢেউ চিহ্ন দেখলেই আমার কেমন সত্যিকারের শাপলা দেখতে ইচ্ছা করতো। একদিন মাকে বললাম—ও মা, হামাক শাপলা ফুল দেখাবেন? মা বললো—শাপলা ফুল এটি কুনটি পামু! মাধুডাঙা বিলোত ম্যালা শাপলা ফুল হয়। তোর নানীর বাড়িত গেলে দেখিস। আমার কেবল মনে হচ্ছিল, কাজ রেখে নিয়ে যাওয়ার ভয়ে মা মিথ্যা বলছে। কাসেম মাস্টারের আমবাগানের ভেতর দিয়ে পুব দিকে গেলেই তো পুকুর। ওখানে নিশ্চয়ই শাপলা আছে। তখনো ওই পুকুরে যাই নি আমি। বাড়ির আশেপাশেই আমার যাতায়াত। পেছনের গড় আর আকাশমণিই আমার সীমানা। আর জিগার গাছের নিচে যে দোকান মাঝে মাঝে সদাইপাতি আনতে যাই ওখানে। সন্ধ্যার আগে আগে কেরোসিন তেল। নুন মশলা লবণ। বাড়ির দক্ষিণ দিকে ছিল একটা পুকুর। গড়ের নিচে লম্বা আয়তাকার মাঠ। বিকালে গাদল-গাদল খেলা হতো সেখানে। এরপরেই একটা পুকুর। পুকুরের পশ্চিম পাশে হালকা বাঁশের আড়া, একটা পুরনো বট। 

 

প্রত্যেক শিশুর কল্পনাতেই কিছু মাঠ এমন থাকে যে প্রান্তরে তার রাজপুত্র আর কোটালের ছেলেকে দেখতে পায় ঘোড়া নিয়ে চলে যেতে। এমন দিঘি থাকে যার গভীরে পৃথিবীর সমস্ত রাজকন্যা রাক্ষসের হাতে কয়েদ। আর সেই প্রাণভোমরাটিকেও শিশুরা দেখতে পায় তারই পরিচিত জগতে। এভাবেই নানান স্থান তার মগজে গেঁথে থাকে। গড়ের নিচের ওই বট আর দিঘিটি ছিল তেমন। মনে হতো, মা আর নানীর কিস্তায় শোনা প্রত্যেকটা ভূত ওই বটগাছেই থাকে। দিনে কোথায় যেন চলে যায় সন্ধ্যা হলেই গোধূলির লালরঙ মুখ নিয়ে ফিরে আসে আবার। তখন সরসর করে পাতা কাঁপে, পাখিরা ভয়ার্ত ডেকে ওঠে সহসাই। পাশের ওই দিঘির ছিল ধ্যানের মতো পানি। ভাবতাম, এখানেই বন্দী আছে আজানা রাজ্যের সেই রাজকন্যাটি। বড় হলে যখন আমার নিঃশ্বাস দীর্ঘ হবে, যখন সাঁতার শিখে যেতে পারবো, এপার থেকে ওইপারে এক ডুবে দেখে আসবো গরুর চোখের মতো সেই মায়াবিনীর মুখ। 

 

পুকুর ঘিরে অনেক খেঁজুর গাছ। আমার চেয়ে বড়রা সেসব গাছে উঠতো। খেজুর পাড়তো। কাঁচা খেজুরে কামড় বসালেই গড়িয়ে পড়তো কষ। নরম শাঁস। খুব ভালো লাগতো। খুব সকালে গাছের নিচে ছড়িয়ে থাকতো খেজুর। দৌড়ে চলে যেতাম ছোট ছোট খেজুরের লোভে। আঁটি শক্ত হলে লবণ দিয়ে মাখিয়ে বয়ামে রেখে দিতাম। কয়েক দিন পরেই কেমন লাল হয়ে যেতো। পাকা খেঁজুরের স্বাদ সারাদিন মুখে লেগে থাকতো। 

 

একটা হেলানো খেজুর গাছ ছিল। পানির সমান্তরালে গিয়ে হঠাত উপর দিকে চলে গেছে। সুযোগ পেলেই ওই গাছের উপর বসে থাকতাম। হাঁসেরা শামুক গুগলির জন্য অনবরত ডুবছে। একদিকে সাঁতার কাটছে মানুষেরা। কোন ক্লাসের বইয়ে ভুলে গেছি। একটা গল্প ছিল এমন—পুকুরের উপর একটা গাছ। সেখানে মা আর বাচ্চা পাখিটা থাকে। মা সারাদিন খাবারের জন্য কোথায় কোথায় যেন চলে যায়। বাচ্চাটার ভালো লাগে না একা একা। সে তার খড়কুটোর বাসা থেকে ঘাড় উঁচু করে চারিদিক তাকিয়ে থাকে। একদিন দেখতে পায় নিচে পানি। সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানান রঙের মাছ। পাখির বাচ্চাটা ভাবে, কী সুখ ওদের! সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। আর এই ছোট্ট বাসার মধ্যে শুয়ে-বসে ক্লান্ত সে। তার মনে হতে থাকে, যদি লাফ দিয়ে ওই পানিতে চলে যাই অনেক মজা হবে।যেই ভাবা সেই কাজ। ঝুপ করে লাফ দিল পানিতে। আর যাবে কই! বোয়াল, টোংরা (টেংরা মাছকে টোংরা পড়তাম তখন। জোরে জোরে পড়তাম। চাচা একদিন ঠাস করে থাপ্পর মেরে উচ্চারণ ঠিক করে দেয়। এর আগেও কয়েক বার ঠিক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু টোংরাই পড়তাম সব সময়। তাই ওই চড়) শিং; সব কাঁটাঅলা মাছ ঘিরে ধরলো তাকে। সে কী ভয়! কাঁদতে লাগলো বাচ্চাটা। এসব দেখে একটা হাঁস উদ্ধার করলো তাকে। গল্পটা মনে পড়লেই আমি দেখতে পেতাম শোয়ানো খেজুর গাছের মাথায় সেই বাচ্চাটির ঘর। নিচে অজস্র কাঁটাঅলা মাছ। আর বোনের অশ্রুর মতো গোটা গোটা জল। 

 

এই পুকুরেও শাপলা ছিল না। ছিল শাপলা দেখার স্বপ্ন। 

 

একজন বৃদ্ধ ভিখারি আসতেন ধরমপুরে। লাঠি নিয়ে টুকটুক করে হাঁটতেন। আমার চেনা রাস্তার বাইরে সেইসব অচিন পথে যে ঘুরে বেড়ায় তাকেই আমার হিংসা হতো খুব। মার কাছে শুনতাম যমুনার চরে আমাদের জমি আছে। সেখানে মশুর-বাদাম-খেরাচি-কুশার আরো কত কিছু চাষ হয়। কেউ কেউ গভীর রাতে খেরাচি আর মশুরের খেতে গরু ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে। গরুরা এক জমি থেকে অন্য জমিতে মটরের লতা আর ঘাসের বনে চড়তে থাকে। চাঁদের আলো পড়ে যমুনায়। মাছেরা অতল পানির থেকে চলে আসে কিনারায়। বাতাসে পানির দল ভেঙে চিরল চিরল ঢেউ ধাক্কা খায় বালিতে। যেন অল্প পরেই মটর ফুলের উপর রাত্রির বিন্দু বিন্দু স্বেদ আরো গোল হয়ে উড়ে যাবে মহাস্তব্ধতায়। কামলার হুর র র র হুর র র  করে ডাকতে থাকবে গরুদের। এসব মনে হলেই ঈর্ষায় মরে যেতাম। আমার শুধু ঘর আর বই। ভালো লাগতো না। 

 

ফকির আসার বারটির জন্য অপেক্ষা করতাম আমি। কখনো মক্তবের রাস্তা দিয়ে কখনো খরগোশবনের পাশ দিয়ে আসতেন তিনি। আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে ওয়াজের মতো কী সব বলেই ‘মা গো… বিসমিল্লাহ আল্লাহ … মা দুইডা ভিক্ষে দ্যান গো… বলে উঠতেন তিনি। আমি ছেনিতে কয়েক মুঠ চাল নিয়ে ভো দৌড় দিতাম। তখন আমার নাভি বেশ ফুলা ছিল। ছোট বেলায় নাকি খুব চিৎকার করে কাঁদতাম তাই অমন। উনি আমার নাভিতে লাঠি দিয়ে আলতো খোঁচা মারতেন। আর বলতেন ফকিরের লাঠির খোঁচায় নাকি ভালো হয়ে যাবে নাভি।  আমি শরম পেতাম। এক এক দিন কাসেম মাস্টারের বাগানে আমগাছের নিচে বসে আমার সাথে গল্প করতেন তিনি। একদিন উনাকে বললাম, ‘আচ্ছা, আপনের বাড়ি কুনটি?’ নামটা ভুলে গেছি। হয়তো, বারোপুর নয়তো গোকুল কিংবা সুখানপুকুর ছিল সেই নাম। উনি বলতেন—‘সেডে তো ম্যালা দূরের গাঁও বারে, তুমি চিনবে না’। আমি বলতম—‘তাও কন। বড় হলে সেটি যামু হামি’। উনি সেই দূরের গ্রামের কথা বলতেন। তার বাড়ি ছিল কোনো এক নদীর ধারে। জমিও ছিল কিছু। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন বহু আগে, এক ছেলেরও; যখন উনার শরীরে ছিল বাইম মাছের মতো জেদ। তারপর নদী ভাঙলে বারোপুর অথবা গোকুল অথবা অন্য কোনো নামের গ্রামটিতে চলে এলেন। সেও প্রায় বহু যুগ। এখন তার ছোট্ট একটা খড়ের ঘর আছে। ঘরে তার বউ। একটা মাটির ঠিলা। দড়িতে বাঁধা একটা মই আনুভূমিক ঝুলে আছে ঘরে। মাটির পাতিল থাকে সেখানে। টিনের প্লেট আর জগও আছে তার। খুব সকালে তার গ্রামের রাস্তা ধরে ময়না কাঁটার বন পেছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করেন তিনি। মাঝে মাঝে খোয়া ওঠা রাস্তা মাঝে মাঝে কাদামাটির পথ হেঁটে হেঁটে চলে যান ভিনগাঁওয়ে। জামের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নেন। আবার হাঁটতে হাঁটতে কত স্কুল কত মসজিদ পার হয়ে দুপুরের সূর্যপিণ্ড দেখতে পান। তার লাঠির ছায়া হেলে পড়লে বুঝে নেন সময়। কোনো মক্তবের চাপকল থেকে পানি খেয়ে আবার চলতে শুরু করেন। এভাবেই কারো দিঘিতে গোসল কারো বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে অনন্ত মুসাফিরের মতো হাঁটতে থাকেন তিনি। যেন এক ধ্রুপদী বতুতা যার বোচকার মধ্যে রাশি রাশি পথ খলবল করছে সারাক্ষণ। 

 

কমলার কোয়ার মতো চকলেট দিতেন তিনি। তন্ময় হয়ে তার কথা শুনতাম। আর আমার চোখের সামনে দুলে উঠতো সেইসব পথ। যেন এমন পথের পাশেই কোনো দিঘিতে ফুটে আছে আমার শাপলা ফুল। 

 

আবার ফেরার কথা বলে চলে যেতেন কোথাও ভিন্ন এক ধরমপুরের পথে। 


পর্ব তিন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: