স্ট্যারি গগ | তথাগত তৃত

…তারপর, শেষে, আয়না দেখে রঙ চড়ানোর মতো ইজেলে তাকিয়ে নিজেরে গুলি করে দিলেন।

বরাবরই জীবনানন্দ। বা, ভিনসেন্টের জীবন দ্বিতীয়বার রিপিট হইছে জীবনানন্দের মধ্যে।

ভ্যান গগের (মূল উচ্চারণ অবশ্য ‘ফ্যান খৌ’) পেইন্টিং জীবন শুরু হইছিলো ২৭ বছর বয়সে। এই কথা জানা যায় তাঁর চিঠিপত্রের বিশাল স্তুপের মাধ্যমে। মোট চিঠির সংখ্যা প্রায় ৯০০। এই চিঠির বেশিরভাগই (৬৫০+) তার ছোট ভাই থিওরে লেখা। বলা হয়, ভিনসেন্ট যদি সাহিত্যিক হইতো তাইলে শুধু এইসব চিঠির জন্যই সাহিত্য তাঁরে মন রাখতো। এতো আর্টিস্টিক কথাবার্তা, প্রকৃতি দেখার নমুনা আর বর্ণনা। মৃত্যুর পর এই চিঠি উদ্ধার হয় তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর মাধ্যমে, যেহেতু গগের মারা যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে থিও-ও ইন্তেকাল করেন। বড় ভাইয়ের শোকেই নাকি মারা যান। তো পরবর্তীতে এইসব চিঠিপত্রের তারিখ দেখেই গগের জীবনী উদ্ধার হইতে থাকলো, যেমন জীবনানন্দের বেলায় তাঁর ফালায় যাওয়া ডায়রি। যেমন জীবনানন্দের চাকরির ঝামেলা। যেমন জীবনানন্দের খালি কবিতা লেখা। এইগুলা রিপিটেশনই! ভ্যান গগ তারো আগেই একই কাজ করে গেছেন। গগ একটা পেইন্টিং বিক্রির দোকানে চাকরি করতেন, সেই চাকরি টিকাইতে পারেন নাই। এরপর মাস্টারি, তারপরে ধর্মযাজক, কয়লার খনিতেও কাজ করছেন উনি। কোনোটাই টিকে নাই, ফলত আজকে তাঁরে আর্টিস্ট হিসেবেই চিনতেছি। কিছুই যখন আর হচ্ছিলো না থিও বললো ‘তুমি তাহলে আর্ট-ই করো না কেন? তোমার আর্ট তো ভালো’।

এবং ভিনসেন্টের আর্টিস্টিক লাইফের শুরু।

আর্টওয়ার্ক: তথাগত তৃত

কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম ছাড়াই একা-একা শুরু হইলো গগের আর্ট লাইফ। মাত্র আট-দশ বছরের শিল্প-জীবনে একজন আনাড়ি চিত্রকর থেকে দুনিয়ার সর্বাধিক চর্চিত শিল্পী হয়া উঠলেন এবং এক্সপেন্সিভ আর্টওয়ার্কের তালিকায় নাম উঠায় ফেললেন। কিন্তু জীবদ্দশায় একজন ভ্যানগগরে কেউ স্বীকার করে নাই। যেমন জীবনানন্দরেও তেমন কেউ স্বীকার করে নাই।

আট বছরে প্রায় ২১০০+ পেইন্টিং করেন। আজকে তাঁরে মর্ডান আর্টের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে মানা হইলেও জীবিত থাকতে কেবল একটা আর্টই বিক্রি করতে পারছিলেন। মাত্র একটা আর্ট। যেহেতু আর্ট বেচতে পারতেন না—জীবন কাটাইছেন অভাবে। ছোট ভাইয়ের পাঠানো টাকাকড়ি দিয়া খাওয়া কম, রঙ কিনছেন বেশি। একুশশো আর্টের মধ্যে পুরা লাইফে যাঁর একটা পেইন্টিং বিক্রি হইছে তাঁর তো ডিপ্রেসড হওয়া স্বাভাবিক। এবং হইছেন। এক পর্যায়ে ভ্যান গগরে পাগল ভাবা হইতো। পাগলা টাইটেল নিজেই পাইতে সাহায্য করছিলেন। পেন্সিল শার্প করার চাকু দিয়া কান কাইটা ফেললেন। সেই কান প্যাকেট কইরা মাগি পাড়ায় গিয়া এক বেশ্যার হাতে ধরায় দিয়া আসলেন। কেমন পাগলা হইলে নিজের কান বেশ্যারে দিয়া আসতে পারে! বেশ্যার কথায় মনে পড়লো, বনলতারে সেইরকমই ভাবা হয় মাঝেসাঝে। নাটোরের যেই মহিলা শান্তি দিসিলো জীবনানন্দরে। এটা নিয়া যদিও তর্ক আছে। জীবনানন্দ মাগি পাড়ায় যাইতে পারে, আবার ঐ পদের মহিলারে নিয়া কবিতাও লেখতে পারে; লোকজন এইটা মানতে চায় না। কেন চায় না?

এরপরে, হাসপাতালে কাটা কানে ব্যান্ডেজ নিয়া নিজেরে আঁকলেন গগ। এইটা ফেমাস একটা আর্ট। ভিনসেন্ট একই জিনিস কয়েকবার আঁকতেন। প্রতিটা আর্টের যেহেতু একের অধিক ভার্সন ছিলো তাই মরার পর এইটা নিয়া একটা কনফিউশান তৈরি হইলো। প্রায় সব আর্টের কথাই চিঠিতে পাওয়া যায়, কয়েকটা বাদে। মনে হয় ভিনসেন্ট মরার পর তাঁর কাছের বন্ধু, যে একজন ডাক্তার এবং একই সাথে আর্টিস্ট সে এইরকম কয়েকটা আর্ট নকল করেন। যেগুলার আর কুল-কিনারা করা গেলো না, কোনটা আসল কোনটা ফেইক। কান কাটা ছবির দুইটা ভার্সন পাওয়া যায়। পাইপ ছাড়া ছবিটাই নাকি ফেইক। এদিকে জীবনানন্দ একই কবিতার আগামাথা কাটাকাটি করতে থাকতো বারবার। এমন-কি ছাপা অক্ষরে প্রকাশের পরেও।

জীবনানন্দ মারা যাওয়ার পর যেমন তাঁর ভাই অশোকানন্দ বড় ভাইয়ের এতো এতো কবিতা প্রকাশে উদ্যোগ নিলেন তেমন ভিনসেন্টের বেলায় এই উদ্যোগ নিলেন তাঁর ভাইয়ের বউ। এইদিকে বড় ভাইয়ের স্মরণে নিজের ছেলের নামও রেখে গেলেন  ‘ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ’। আরেক বিষয়, ভ্যানগগের বাপের আব্বার নামও ছিলো “ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ’। আবার ভ্যানগগের বড় ভাইয়ের নামও তাই। গগের জন্মের আগেই বড় ভাই মারা যায়। তো গগরে বড় হইতে হইছে তার নামের কবর দেখে-দেখে। আচ্ছা, গগের মরার পরপর যেকোনোভাবেই হোক তাঁর কাজের মূল্যায়ন হইতে থাকলো। ‘স্ট্যারি নাইট’ নিয়া এতো মাতামাতি আজকে, ঐ টাইমে এই জিনিসে কেউ চোখ ফিরাও তাকায় নাই।

গগের বিয়েটিয়ে হয় নাই। সেই অর্থে তাঁর কোনো প্রেমিকারও অস্তিত্ব নাই। মামাতো বোনরে পছন্দ করছিলেন। মোমের আগুনে হাত দিয়া বলছিলেন প্রেম স্বীকার না করা পর্যন্ত হাত সরাবেন না। প্রেম আর স্বীকার হইলো না। এরপরে পেটওয়ালা এক বেশ্যারে আনছিলেন আর্টের মডেল হিসেবে। বয়সে গগের বড়। ঘুরেফিরে তার প্রেমেও পড়ছিলেন। বাচ্চার দায়িত্ব নেয়ার বিষয়ও আসছিলো। আল্টিমেটলি সেইগুলা কিছু থাকলো না তাঁর সাথে। থাকলো তাঁর প্রিয় ইজেল, রং, তুলি, ক্যানভাস আর প্রকৃতি। গগের একটা লাইন আমার পছন্দের, মন খারাপ কিংবা ভালো, প্রেমে-অপ্রেমে খালি-খালিই আমার মনে পড়তে থাকে—লাইনটা এমন, ‘…and then–I have nature and art and poetry–and if that is not enough–what is enough?’

আর্টওয়ার্ক: তথাগত তৃত

গগের পেইন্টিং লাইফের শুরুর দিকে আরেক চিত্রশিল্পী মিলেটের জনপ্রিয় কাজগুলারে গগ নিজে ট্রাই করতে থাকেন। অনেক কাজ আছে যেগুলা মিলেটের, গগ সেগুলারে আঁকতো, বারবার-বারবার। শুরু থেকেই গগের ব্রাশের ধরন আলাদা। মিলেট আর গগের পেইন্ট পাশাপাশি রাখলেই যে-কেউ বুঝার কথা কোনটা আসলে গগের কাজ। এই প্রতিভারে সারাজীবন সাপোর্ট দিছেন ছোট ভাই থিও। সেইটা পয়সা দিয়া হোক আর সাহস দিয়া। এতো আঁকার পরেও যাঁর আর্ট বিক্রি হইতেছে না তাঁরে এতোকাল কেউ বইয়া বেড়ায় না। থিও বইলো। একটা কথার প্রচলন আছে তাঁরে নিয়া, ‘Without Theo, there would have been no Vincent’। এই কথা বোধহয় অশোকানন্দের বেলাতেও বলা যায়, যেহেতু অশোক জীবনানন্দের ভার নিতো, শেষে এতোসব কবিতাপত্র নিয়া খাটাখাটুনিও কম করেন নাই।

শেষ দুইবছরে প্রচুর আঁকাআঁকি করসেন গগ। যার মধ্যে একটা ‘স্ট্যারি নাইট’। তাঁর আরেক ফেমাস আর্ট হইলো ‘সানফ্লাওয়ার’। যেটার টোটাল ভার্সন ৫টা। পাঁচটার মধ্যে তিনটা নিয়া গবেষণার শেষ নাই। এরমধ্যে একটা নাকি ফেইক, ভিনসেন্ট আঁকেন নাই সেটা। কে যে আঁকলো! আসলেই ফেইক কিনা এইটা নিয়া স্ট্যাডি চলে। ঘুরেফিরে আঙুল যায় চায়নার দিকে। তাঁদের কেনা ‘সানফ্লাওয়ার’ ফেইক। চায়না এইটা নিয়া আলাপে আগ্রহী না। যা পাইছে তা নিয়েই খুশি থাকতে চাইতেছে। লাড়ালাড়ি পছন্দ না। এইটার মূল কারণ বোধহয় চাইনিজদের সংগ্রহের ফুল ফেইক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এটার বিপক্ষে প্রচুর প্রমাণাদি আছে। অন্যগুলার মধ্যে যেইসব সাদৃশ্য পাওয়া যায়, এইটায় সেগুলা নাই। যেহেতু স্টিল লাইফ, তাইলে এমন আনাড়ি ধরণের কাজ ভিনসেন্টের করার কথা না, এইটাই বলতেছে লোকজন।

আর্টিস্ট: ভিনসেন্ট ভ্যান গগ

ভিনসেন্ট নাকি আউটডোরে আঁকতেছিলো। এর মধ্যে কোন সময় বন্দুক একটা বের করে নিজের পেটে গুলি কইরা দিলো। এরপরে হাঁটা দিয়া গেলো যেইখানে সে থাকতো, একটা ঝুপড়ির মতো রুম, কবুতরের খোপে। পুলিশ যখন জানতে চাইতেছিলো–

– তুমি কি নিজেরে গুলি করছো?

– মনে নাই।

– বন্দুকটা কই? ঐটা তোমার বন্দুক নাকি?

– জানি না। বোধহয় আমার না।

পরে তার ডাক্তার বন্ধুরে বললো—সে আত্মহত্যা করতে চাইছে, এইটার জন্য যাতে কাউরে দায়ী না করা হয়। জীবনানন্দের মতোন দুই-একদিন বিছানায় গড়াগড়ি কইরা মইরা গেলো।

তো একজন যে আত্মহত্যাই করবে, সে এতো জায়গা থাকতে পেটে গুলি করবে কেন!এমন পাগল তো সে না। আর তারপর বাঁচার জন্য নিজের বাড়িতেই যাইতে হইলো? আরেকটা গুলি খাইলেই তো মরার কথা, সেইটা করলো না কেন? নাকি সে আত্মহত্যা করেন নাই? নাকি কেউ গুলিটুলি করে দিছে পাগলারে?

পরে নাকি বন্দুকটাও পাওয়া যায় নাই, প্রিয় ইজেলটাও নাই। গেলো কই এইগুলা!

ভাসা-ভাসা থাকলো আসল ঘটনা। ভ্যান গগরে মারলো কে? নাকি আত্মহত্যাই?

জীবনানন্দেরও কী আত্মহত্যা?

(এই বছরের মার্চের ৩০ তারিখ নেদারল্যান্ডসের এক মিউজিয়াম থেকে গগের “দ্য পার্সোনেজ গার্ডেন অ্যাট নিউনেন ইন স্প্রিং” পেইন্টটা চুরি হয়। যেটার মূল্য মিলিয়ন ডলার। মজার ব্যাপার হইলো ঐদিন ছিলো গগের জন্মদিন।)

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: