home কুকুর সংখ্যা মিথোজীবন ।। অলোকপর্ণা

মিথোজীবন ।। অলোকপর্ণা

ঘুম থেকে জেগে উঠে রোজ সকালে আমি একটা পাখিকে চায়ে ভিজিয়ে বিস্কুট খেতে দিই। বিস্কুট খেয়ে তবে ডানা ঝাপটিয়ে পাখিটি উড়তে শুরু করে সেদিনের মতো। পাখিটির নাম অভিমান। নিজের উপর অভিমান করে সে পাঁচিলে বসে পালক খুঁটে ছিঁড়ে ছিটিয়ে রাখে চারদিকে। আকাশের ওপর অভিমান করে সে সারাটা দিন পুকুরপাড়ে ঘুরে বেড়ায়। উড়তে যায় না। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলে, তোমার কী?

* বিষণ্ণতা যে মিষ্টি মতো এক অসুখের নাম, সে একদিন আমায় একটা কুকুরছানা হ্যান্ড পাপেট এনে দিলো। একা ঘরে রাতে আলো জ্বেলে আমি হাতে পরে নিই কুকুর ছানা আর এসে দাঁড়াই আয়নায়। কুকুরছানা নিজের মনে কথা বলে চলে, রাত পার হয়ে যায়। আর পুরোটা সময় আমার মুখে লেগে থাকে হাসি। সকাল বেলা পাখিটির চা বিস্কুট খেতে আসা দেখে আমি হাসি হাসি মুখে ঘুমিয়ে আছি। পাখিটি আমার থেকে দূরে সরে যায়। ওর আবার অভিমান হয়।

মানসিক বিকৃতির চতুর্থ সপ্তাহে আমি আবিষ্কার করলাম সব কিছুর’ই দ্ব্যর্থ আছে। আমার হাতে গজিয়ে ওঠা কুকুরছানার মাথাটা এরই মধ্যে আমার আঙুলগুলো খেয়ে নিয়েছে, আমি টের পাইনি। তবে এতে যা সুবিধা হয়েছে তা হলো, এখন আর কুকুর ছানার মাথার মধ্যে আমার আঙুলগুলো নড়াচড়া করে না। কুকুরছানার হ্যান্ড পাপেট এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমায় নিয়ে সে আয়না থেকে আয়নায় ঘুরে বেড়ায়। তবে বেশিক্ষণ এক আয়নায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। পাখিটি কয়েকদিন হলো ঘুরে এসেছে, আমায় ডেকে তোলার জন্য জানালায় ঠোঁট দিয়ে আওয়াজও করেছে। কিন্তু আমি তখন কুকুরছানার মাথার ভেতর হাত গলিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম বলে তাকে চা বিস্কুট দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করিনি। খেয়াল করলাম, পাখিটি বেশ কয়েক দিন হলো আর আসছে না। অভিমাননামী পাখিটি আমায় ত্যাগ করেছে।

আমি এখন হাসিমুখে আয়না থেকে আয়নায় ঘুরে বেড়াই। আমার ডান হাত থাকে কুকুরছানা হ্যান্ড পাপেটের মাথার ভেতর। আজকাল আর হাত থেকে পাপেটটা খুলে রাখি না ঘুমের সময়। বেশ হাসিমুখে স্বপ্নগুলো এঁকেবেঁকে চলে যায় আমার মাথার মধ্য দিয়ে। বিষণ্ণতা নামের মিষ্টি ধূসর অসুখটাও আর নেই। আমি বাজার করি কুকুর ছানা হাতে গলিয়ে, আমি বিকেলে হাঁটতে বেরোই কুকুর ছানা হাতে গলিয়ে, আমি ম্যুভিহলে একাকী ঠাণ্ডা হয়ে বসে থাকি কুকুরছানা হাতে গলিয়ে। সামনে ক্রিশ্চিয়ান বেল অন্ধকার আকাশের মধ্য দিয়ে বয়ে যায় আর আমার পাখিটির কথা মনে পড়ে। কুকুরছানা হ্যান্ড পাপেট তাঁর মায়াবী চোখ আর ঝোলা জিভ বের করে বলে ওঠে, অভিমান, বিষণ্ণতা- এদের পরে কী পড়ে থাকে জানো?

ক্রিশ্চিয়ান বেল শহরের সব থেকে উঁচু বাড়ির ছাদে একা দাঁড়িয়ে থাকে, পরাজিত। আমি ভেবে বলি, অসাড়তা?

কুকুরছানা জিভ বের করে আমার গাল চেঁটে দিয়ে বলে, না গো না, অভিমান মরে গেলে পড়ে থাকে নির্লিপ্তি। ম্যুভিহল থেকে ফিরে কুকুরছানা পাপেট আমায় আয়নার সামনে নিয়ে যায়। বলে, দ্যাখো-

-কী?

-নিজেকে

আমি দেখি পাপেটের ভেতর আমার গোটা শরীরটা ঢুকে গেছে, শুধু মাথাটুকু আগাছার মতো বাইরে ঝুলে আছে। আর সেই মাথায় যে ঠোঁট, তাতে একটা হাসি, অবিকল ম্যুভির জোকারটির মতো।

কুকুরছানা পাপেট মিষ্টি করে বলে, দেখলে?

-কী?

-নির্লিপ্তি?

আয়নায় নিজের বিকৃত হাসিমুখে চোখ রেখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়াই আমি। কুকুরছানা পাপেট আমার হাসিমুখ দেখতে দেখতে আমার কাঁধের কাছে জিভ বের করে লালা ঝরিয়ে যায়।

 

*ঋণ– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য