home কবিতা কবিতালাপ ।। সুবর্ণা গোস্বামী

কবিতালাপ ।। সুবর্ণা গোস্বামী

আপনি কবিতা লিখতে শুরু করলেন কিভাবে?

সুবর্ণা: কবিতা লেখা শুরু করেছি প্রথম প্রেমে পড়ার পর।মানে সবাই যেমন করে আর কি। কাউকে দেখানোর মত সাহস হয়নি কখনও। পরে ফেসবুক এলো বা আমিই ফেসবুকে এলাম।এখানে দেখি আমার নিজস্ব একখান দেয়াল আছে সেখানে আমি যা ইচ্ছে আঁকতে পারি; কেউ দেখলে দেখুক,না দেখলে না দেখুক। তারপর থেকে কবিতার প্রকাশ শুরু মূলত।

আপনার কাছে কবিতা মানে কি?

সুবর্ণা: আমার কাছে কবিতা মানে কিছু শব্দ, তা বাক্য নাও হতে পারে কিন্তু সে হবে  অবচেতনের ডানা যে ডানায় কবি উড়বেন তাঁর একান্ত আকাশে, আর পাঠকও তাই। ডানার সংখ্যা জানা নেই , কিন্তু তা প্রত্যেক পাঠককে স্বতন্ত্রভাবে দেখাবে স্বতন্ত্র ভুবন। আর একটু সহজে বলতে গেলে কবিতা হচ্ছে আয়নার মত। একটিই আয়না সবাই সেখানে কেবল নিজেকেই দেখতে পাবে।

কবিতায় কোনো বিষয় থাকা কতখানি জরুরী?

সুবর্ণা: কবিতা কবির স্বাধীনতার ক্ষেত্র। সেখানে কবির একমাত্র দায় হচ্ছে শিল্প। এছাড়া কবির কোন নির্দিষ্ট বিষয় নির্বাচনের দায় নেই। কবিতা যেহেতু চিন্তার বহিঃপ্রকাশ সেহেতু সেখানে কোন না কোন বিষয় নিশ্চয়ই থাকবে। সেটা একক হতে হবে এমন কোন কথা নেই। বিষয় নির্বাচন করে কবিতা লিখতে বললে আমি কখনও হয়ত লিখতেই পারব না।

সার্থক কবিতা হয়ে ওঠার জন্য একটি কবিতায় কি কি থাকা জরুরী মনে হয়?

সুবর্ণা: সার্থক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য দুরকম মনে হয়। হয় আপাত নিরর্থক হতে হবে অথবা সরল সত্যের শৈল্পিক সৌন্দর্য থাকতে হবে।অর্থাৎ নান্দনিক হতে হবে।প্রথমটা ব্যাখ্যা করার জন্যে বলা যায় পাঠককে ভাবানোর জন্যে এবং শিল্পের খাতিরে যা বলতে চাই তা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে হবে। তা না হলে এক রবীন্দ্রনাথ যা লিখে গেছেন তার বাইরে লেখা তো দূর কল্পনা করাই কঠিন। তাহলে কেউ আপনার আমার কবিতা কেন পড়বে? কোথাও শুনেছিলাম, আপনি কি বলছেন সেটা জরুরি নয় কিভাবে বলছেন সেটা জরুরী।দ্বিতীয় গুণ ব্যাখ্যা করা অবান্তর।

আপনার কোন বই প্রকাশ হয়েছে?

সুবর্ণা: দুটো বই আছে। ‘কীর্তিনাশা’, ২০১১ সালে প্রকাশিত। ‘ধানসিঁড়িটির তীরে’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত। আর দ্বিতীয়টি বেরিয়েছে এ বছরই, চৈতন্য থেকে। নাম ‘জলের জ্যামিতি’।

কবিতায় ছন্দ থাকা না থাকার তর্কে আপনি কোন পক্ষে, কেন?

সুবর্ণা: ছন্দের প্রশ্নে আমি স্বাধীনতার পক্ষে।অর্থাৎ যিনি ছন্দে লিখে আরাম বোধ করেন তিনি লিখুন যিনি তাতে আরাম পাচ্ছেন না তাকে সেখানে বেঁধে রাখার অধিকার কারো নেই।

আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশের কবিতায় পরিবর্তন আসছে?

সুবর্ণা: নিশ্চয়ই এসেছে। বলা যায় ওলটপালট হয়ে গেছে। বহুজন বহুভাবে লিখছেন। নিষেধের সব কাঁটাতার উধাও হয়েছে। আমি অবচেতনে যা ভাবছি, যেভাবে ভাবছি সেইভাবে প্রকাশ করতে পারছি।সেখানে কোন শব্দ বাধা হচ্ছে না ,ছন্দ বাধা হচ্ছে না; এটাই তো আমূল পরিবর্তন।

অনেক ভাল লেখা হচ্ছে এখন।বৈচিত্র বাড়ছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে আরোপিত কবিতাও। অনেকেই অভিধান থেকে শব্দ খুঁজে জোড়া লাগিয়ে কবিতা সেলাই করছেন। তালি-পট্টিসমেত তা দেখতে দিব্যি ফ্যাশনেবল। কিন্তু অন্তঃসারশূন্য।

একজন কবিকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে কোন বিষয়টি?

সুবর্ণা: একজন কবিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তার মৌলিকতা,লেখার ধাঁচ।তবে এখানে হাল ফ্যাশানের কবিতায় কিছু সমস্যা আছে। সবাই একই ধাঁচে লিখছেন। দু একজন চোখে পড়ার মত কিন্তু অনেকেই ভাল লেখা স্বত্বেও স্বকীয়তা না থাকায় তাদের কবিতা হয়ে যাচ্ছে গড়পড়তা লেখা।

সাহিত্যে রাজনীতি ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখেন?

সুবর্ণা: কবিতা তো আসলে চিন্তার প্রতিফলন, চিন্তায় রাজনীতি থাকলে কবিতায় তা আসবেই। তবে কবিকে আমরা কবি ভাবার আগে ভাবি আদর্শ মানুষ। তার আদর্শ যদি বিতর্কিত হয় তাহলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই যে কোন মানুষকেই ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক ,কবি বা রাজনীতিবিদ হওয়ার আগে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে মানুষ হবার। আর মানুষের যে কোন কাজ তা রাজনীতিই হোক না কেন মানবিকই হবে নিশ্চয়ই।

আপনার প্রিয় কবি সম্পর্কে জানতে চাই। কেন তিনি প্রিয়?

সুবর্ণা: প্রিয় কবি জয় গোস্বামী। কারণ তাঁর কবিতার স্বতঃস্ফুর্ততা। মনে হয় যেন পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত। অদ্ভুত তার শক্তি,অদ্ভুত তার কোমলতা আর অদ্ভুত তার সৌন্দর্য। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয় এই শব্দগুচ্ছ কখনও কোথাও আটকায়নি, কখনও কোন শব্দ সেখানে সংশোধিত হয়নি। নিরাভরণ নিরাবরণ সৌন্দর্য কেবল, প্রকৃতির মত সহজ ও স্বাভাবিক।

 

 



                                     সুবর্ণা গোস্বামীর কবিতা

 

হাসি নিয়ে কয়েকটি কথা

তোমার আঙুরের মত হাসি নিয়ে দীর্ঘ একটি কবিতা হতে পারে ভেবে হাসিটিকে পাশে শুইয়ে রেখেছি বহুদিন। সেই কৌতুকে নিছক বেলুনের মত একদল রূপকথা দমফাটা হাসির শব্দ করে ফেটে যায়। ভয়ঙ্কর চমকে উঠে উত্থানের লাশ পতনের দিকে দৌড়ায়। আমরা কেমন করে এমন ডুকরে হেসে উঠতে পারি!

শিমুলের ডালে কাঠঠোকরার ঘরখানি অক্ষত থাক,যদিও তা তৈরি করে ক্ষত।

জানো রানুদি,যে মেয়েটা কথায় কথায় কাঁদত সে এখন কথায় কথায় হাসে। আর হাসতে হাসতে একটা রাজহাঁসের মাথা কেটে বিনুনিতে ঝুলিয়ে দেয় ।মাথাটা বেলী ফুলের মত কী ভীষণ ফুটে থাকে অন্ধকার চুলে।

 

 

আমি ও দৃশ্য

আমি ও দৃশ্যের মাঝখানে ঘোলা কাচ,
জীবনকে তাই খুব ঝাপসা দেখি।
উপরন্তু আমারই লাশ কাঁধে আমি
বেতালের কাছে শিখি প্রশ্নের পঞ্চবিংশতি।

ভেতরে ভেতরে পোশাক গুটিয়ে নিয়ে
শামুকের দল চলে বিষণ্ণ অন্তরালে।
একলা পড়ে থাকে সাজ সমারোহ,
আয়নায় লুপ্ত চন্দনের দাগ,
একলা পড়ে থাকে পথে অমেয় অরণ্য।

দৃশ্যের ওপারেও এক মন্ত্রমুগ্ধ গ্রাম
একা একা থাকে।

 

 

আত্মহত্যা

কাচগলা মোমের চৌখুপিতে রাজা মৌমাছি;
প্রেতের হাসি ছিলে ছিলে খায় সফল ভূ-ভারত,
আমিই সেই প্রেতের সম্রাট,অপ্রয়োজনীয় দস্তখত।

পাশা খেলে সোনার কাঁকনে বিমর্ষ দেয়ালঘড়িটি।
জিতে যায় আত্মহনন।

নক্ষত্রের ব্লেড ষোল খণ্ডে কাটে
মাঘী পূর্ণিমার চাঁদ,
রূপকথা প্রকাশ্যে ছাল তুলে নেয় নটে গাছটির,
গল্পের মাঝপথে গাছটি মারা যায় বিষণ্ণতায়।

পরদিন শূন্যতায় বিস্তারিত পায়ের আওয়াজ-
শব্দের হ্যালুসিনেশন!
 

নিমন্ত্রন সমীপেষু

নিমন্ত্রন পেয়েছি তোমার। আমাকে ডেকেছ,আমি-কে নয়। পেতলের পানপাত্রে ম্যুর পুরুষের মুখ মাঝরাতে জ্বলে ওঠে খুব, বুকে! চকচক করে ওঠে গোপন মদিরা। এ কোন চুমু নয়,অনিকেত বৈঠাও নয়, এ হাসি-শুধুই শরীরের।

উড়ন্ত আমার ছাই তোমার ডেরায় যাবে, লুফে নেবে তাস,বাজি তোমার মূলজ থেকে, তারপর রোঁয়া হয়ে তোমার মখমলে- তুমি সরাতে চাইবে,সরবে না।

নীল সেলফি সংগ্রহে রাখতে নেই মুছে দিও।

বরং জন্ম নিয়ন্ত্রক রাখো বাসনার শেল্ফে।

 

 

পোশাকের দুঃখ

আমি এখন আর বিতর্কিত নই।অন্তত নিজের কাছে।যে পথে হাঁটা উচিত হাঁটছি- অথচ আনন্দহীন একেকটা গাছ মরে যাওয়া পাতার কবরে দাঁড়িয়ে আছে।একজন বলেছিল গল্প লিখতে, আমি গল্প লিখছি।গল্পহীনতার গল্প।
মাঠ, তোমার গায়ে কেন ঘাসের মড়ক! ফড়িঙের বিলুপ্ত বসত!
এ শহর কুমারী হয়েছে আবার। পরে আছে জ্যামিতিক দুল।একেকটা রিকশায় উড়ে উড়ে যায় ভ্রমরের টানটান প্রেম।

তুমিও দেখেছ আমাদের মত অবিকল দেখতে পুতুলগুলি নগ্ন ছিল, নিমগ্নও। তুমি ভুল বলেছ। নগ্নতার কোন দুঃখ নেই।পোশাকের আছে। একান্ত ঝড়ের মধ্যে কাঠপিঁপড়ে অবলম্বন খোঁজে।আজ পুতুল মেয়েটার জন্মদিন ছিল।তাকে কেউ ফুল দেয় নি, আমিও না। মনে মনে কপালে একটা চুমু খেয়েছিলাম। জানানো হলো না।

 

 

ডুবসাঁতার

পৃথিবীর সব ভালই ভাসমান, সেকথা জানে ধ্রুপদী মীনেরা। নীল ছলকে তাই নিখাদ সাঁতার;পূর্বাশা সত্যি সত্যিই একটি দ্বীপের নাম। আঁকানো গাছ,আরও নত হয়ে শেখো জলের ভৈরব কিন্তু ভুলেও দক্ষিন দিকে চেও না।কেউ না জানলেও সবাই জানে শীতকালে সূর্য ঠিক পূর্ব দিকেও ওঠে না।

মায়ের সঙ্গে ফেনিল সাদার খুব সুসম্পর্ক জেনে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে ঘুমিয়েছিল একজন নৌকা। তার কেনজানি আর কোন সাঁতার ছিল না।
একদা এক ডুবসাঁতারে সে হারিয়েছিল মাঝি ও বৈঠা।

 

 

রৌরব

বিষতূর্যের প্রতি এক আঁধার বলেছিল,মৌনজিভ, অহম, উল্লাস এই তিনই শব্দের ঘোর অভিশাপ। আঁধারকে চেন না? আঁধারই সেই বিশুদ্ধ লম্পট যে তার আরণ্যক বুকে শিকার করে সব নারীছায়া, জবাফুল, লালের কল্লোল।

আর তোমরা তো সবাই জানো, ছায়া অর্থ স্বাধীনতা নয়।
যাবতীয় পবিত্রতা আক্ষরিক অর্থে পরাধীন। মগজের নিয়ত ভোজউৎসব মতান্তরে ঢেউ।
তারপরও যে পদ্মনাভি ফুটে থাকে বীর রৌরবে, পোশাক যদিও তার শান্ত সরোবর।
তার থেকে এনে দিও জবা, ছায়াফুল নয়।

 

 

একটি বিচ্ছেদ

নকশি কাঁথার দ্বীপে নীল ঘোড়াটির সঙ্গে আমার আলাপ। আমি জিজ্ঞেস করলাম তার অনন্তে কতগুলি তন্তু আছে, সে জানতে চাইল আমার শেকড় কতটা বালিতে আর কতটা আকাশে। তারপর আমরা সূচ পরানো সুতায় নিজেকে জড়াতে জড়াতে পরস্পরের ঠোঁটে চুমু খেলাম। সেটি একান্তই পরাবাস্তব এবং সামাজিক চুমু।
সেখানে অমোঘ কোন মনখারাপ ছিল না।
ধীবর গোষ্ঠীর কেউ মাঝখানে যোগ করল ঢেউ; আমরা তরঙ্গের সাথে উড়তে উড়তে মাছ আঁকলাম। সোনালি আঁইশের মাছ। তার সাথে জল। জলের সাথে ভীষণ অন্তরঙ্গ সবুজ মলাটের বিবিধ মৌনতা। আমরা একসাথে এক আলোকবর্ষ হাসলাম।

সুতো শেষ। এক হঠাৎ টানে ছিঁড়ে গেল আমাদের অন্তর্লীন নীলনকশা।

 

 

কোলাজ

সমুদ্রের খুব জোছনা সংসার। ঘ্রাণরাত্রির হালকা বেগুনি ঘর। তুমি শুয়েছিলে প্রবাল বধূর সাথে, নিয়ন অন্ধকার জ্বেলে। নেপথ্যে বেজে উঠলো ডাগর ফড়িঙের গান।
চাঁদের তুমুল টানে তখন তুমিও জোয়ার। লবণস্নাত মারমেইড। ভেসে গেল পৃথিবীর পাড়।
আমার হিংসে হচ্ছিল। রক্তের সিম্ফনি থেকে নির্মোহ নিসর্গ হতে হতে আমি আগুনপাতায় লিখে গেলাম-
আমি জ্বালিয়ে দেব নব, তোমাদের চুমুর কোলাজ।

 

 

ঝাড়খণ্ডের চাঁদ

একটি বাসী রবীন্দ্ররচনাবলীর পাশে শুয়ে আছে ঝাড়খণ্ডের চাঁদ। বিবস্ত্র। পাশে রুমালি রুটির মত তার অহম। তিনিও বলাই বাহুল্য, বিবস্ত্র।
এসো যুবতীরা, আজ স্নান হোক। অজগরের কাছে হেরে যাক উল্টোপুরাণ।
নির্মাতা ধমনী কেটেছেন। তৃতীয় মাত্রার বিশেষ দৃশ্যটিতে ফোয়ারা ছুটে যাচ্ছে রক্তের-
ভেতরে মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে এক প্রশ্ন দম্পতি।
তাদের গর্ভে অসংখ্য অনাগত শুন্য।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য