home ই-বুক, ভিনদেশি সাহিত্য আমার পড়ালেখা — ভিএস নাইপল ।। ভাষান্তর: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল ।। পর্ব ১২

আমার পড়ালেখা — ভিএস নাইপল ।। ভাষান্তর: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল ।। পর্ব ১২

                                                   পর্ব ১২

আমরা যারা পরবর্তীকালের লেখক, তাদের লেখা মূলত উপন্যাসের তৈরি হয়ে যাওয়া কাঠামো থেকেই উৎপত্তি হয়েছে। আমরা আর কখনোই এই ধারার সৃষ্টিকালের লেখক হতে পারবো না। হয়তো এই কাঠামোতে আমরা নতুন কিছু সংযোজন করতে পারবো, কিন্তু মূল কাঠামোটি আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। আর কখনোই আমরা রবিনসন ক্রুসোর সমার্থক কিছু লিখতে পারবো না। ক্রুসো দ্বীপের ভেতর দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মত বন্দুক ছুঁড়েছিল, ঐ জায়গায় সৃষ্টির আদিকাল হতে কেউ কখনো এই কাজটি করেনি। ক্রুসো যা করেছেন তা করার সুযোগ ভবিষ্যতেও আমরা কখনো আর পাবো না। এক্ষেত্রে রূপক ব্যবহার করে বলা যায় যে, উপন্যাসের উদ্ভাবকদের দিকে কান পাতলে আমদের কেবল তাদের ছোড়া বন্দুকের শব্দেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। প্রথম দিককার ঔপন্যাসিকেরা নিজেরাও জানতেন না যে তারাই এই পথের পথিকৃত। কিন্তু আবার একই সময়ে (উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ম্যাকেইয়াভেলি তার ডিসকোর্স এবং মনটেইন তার অ্যাসেইস লেখার সময় বুঝতে পেরেছিলেন যে তারাই এই পথের পথিকৃৎ) তারা নিজেদের এই উদ্ভাবনী সম্পর্কে জানতেন। উপন্যাসের উদ্ভাবকেরা নিজেদের আবিষ্কার নিয়ে ভীষণ উত্তেজনাও অনুভব করতেন। ঐ উত্তেজনার অনুভূতিটুকু আমাদের ভেতরেও প্রবাহিত হয়েছে আর লেখার এক অতুলনীয় শক্তিও আমাদের অনুভবেও স্পন্দিত হচ্ছে।

 

নিচের দীর্ঘ অংশটি ১৮৩৮ সালে রচিত নিকোলাস নিকলবি এর প্রথম অধ্যায় থেকে নেয়া হয়েছে। ডিকেন্স যখন এই উপন্যাসটি লেখেন তখন তিনি মাত্র ছাব্বিশ বছরের এক তরুণ লেখক। বজ্, পিকউইক এবং অলিভার টুইস্ট লেখার পর ডিকেন্স তখন একটি সত্য আবিষ্কার করে ফেলেছেন। তা হলো যে লন্ডন শহরে যা কিছু তিনি নিজের চারপাশে দেখতেন তার সবই নিজের লেখার ভেতর নিয়ে আসার ক্ষমতা তার আছে। আর তাই দেখার বিষয়বস্তু সাবলীলভাবে বর্ণনা করতে করতে তিনি কাহিনী পরে নিয়ে এসে জোড়া দিতে পারতেন।

 

“জনাব নিকলবি টেবিলের ওপরে রাখা হিসাবের খাতাটি বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন। তার অন্যমনস্ক দৃষ্টি নোংরা জানালা পার হয়ে বাইরে আটকে গেল। লন্ডনের শহরতলীর কিছু কিছু  বাড়ির পেছনে বিষাদাচ্ছণ্ন এক টুকরো জমি থাকে যেগুলো সাদা চুনকাম করা চার দেয়ালে ঘেরা। আশেপাশের কালো চিমনিগুলো ঐসব টুকরো জমির দিকে বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এসব জমির ভেতর বছরের পর বছর ধরে বিকলাঙ্গ ভঙ্গিতে দুই-একটা গাছকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। শরতের শেষে যখন অন্য সব গাছের পাতা ঝরে যায় তখন এইসব বিকলাঙ্গ গাছ গোটাকয়েক নতুন পাতার জন্ম দিয়ে বেঁচে থাকার প্রবল প্রচেষ্টা করে যায়। পরবর্তী মৌসুম না আসা পর্যন্ত এসব গাছ এমন জীর্ণ-শুষ্ক ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে থাকে। লন্ডনের মানুষ কখনো কখনো এইসব অন্ধকারে ভরা জমির টুকরোকেই ‘বাগান’ নামে অভিহিত করে থাকে। এমন নয় যে এসব বাগানে কেউ গাছ লাগিয়ে পরিচর্যা করে। বরং কখনো কেউ এসব জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও করে না। পুরনো আমলে ওসব জায়গায় ইটের ভাটা ছিল। সেই জমিতে কিছু জীর্ণ আগাছা বড় হয়েই এসব বাগানের সৃষ্টি হয়েছে। এসব হতশ্রী জায়গায় বেড়ানো বা সময় কাটানোর কথা কেউ কখনো কল্পনাও করে না। গোটাকতক ঝুড়ি, আধা ডজন ভাঙ্গা বোতল বা এ ধরনের আরো কিছু জঞ্জাল এসব টুকরো জমিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাগানের সাথে লাগোয়া বাড়িগুলোতে নতুন ভাড়াটে এলেও এসব জঞ্জালের কোন রফা হয় না। তারা চলে যাবার পরও এসব  জঞ্জাল যেমন ছিল তেমনই পড়ে থাকে। খড়ের ভেজা টুকরোগুলো অলস ভঙ্গিতে যতোটা সময় প্রয়োজন ততোটা সময় নিয়ে ক্ষয়ে যায়: ভাঙ্গাচোরা বাক্সের সাথে মিশে ওগুলো চির-বাদামী রূপ ধারন করে, সেসবের পাশেই পড়ে থাকে ফুলের ভাঙ্গা টব- আর এসব কিছুই শোক সন্তপ্ত ভঙ্গিতে ‘কালো’ ও নোংরা আবর্জনার দখলে চলে যাবার অপেক্ষায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে।

 

ঠিক এমনই একটি জায়গার দিকে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিলেন র‌্যাল্ফ নিকলবি…তার দৃষ্টি মৃতপ্রায় বিকৃত আকৃতির একটি গাছের ওপর নিবদ্ধ। কয়েক বছর আগে ঐ বাড়িটার কোন এক বাসিন্দা সবুজ রংয়ের  টবে গাছটি লাগিয়েছিল। নিতান্ত অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে টবটা রংহীন হয়ে গেছে আর সময়ের সাথে সাথে টবের গাছটা রুগ্ন মলিন আকার ধারণ করেছে………গাছটা ছাড়িয়ে আরেকটু দূরে বাঁয়ের একটি ছোট্ট ধূসর জানালায় একজন করণিকের চেহারা আবছা দেখা গেল; ঐ এক মুহূর্তের সুযোগেই জনাব নিকলবি লোকটিকে তার সাথে দেখা করার ইঙ্গিত দিলেন।”

 

ডিকেন্স প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রাঞ্জল বর্ণনা দিয়েছেন। আর পাঠক হিসেবে আমরা তা উপভোগও করেছি। কারণ এইরকম বিশদ বর্ণনা, উপন্যাস পূর্ববর্তী সাহিত্যে দেয়া হতো না। এটি একটি নতুন স্বাদের মতো যা লেখকের সাথে সাথে পাঠকেরাও মজা করে উপভোগ করেছে। এই একই স্বাদ কিন্তু বারবার ভালো লাগবে না। অর্থাৎ এই একই পদ্ধতি পুণরায় ব্যবহার করে আশানুরূপ ফলাফল প্রত্যাশা করাটা বৃথা। এই ধরনের বর্ণনা বারবার ব্যবহার করলে এর মূল আকর্ষণটাই হারিয়ে যেতে বাধ্য। আর তাই লেখালেখি সবসময় নতুন কৌশল কেন্দ্রিক হতে হবে। এ কারণে সব লেখকের মেধাই সবসময় নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কারে খরচ হয়ে আসছে। (চলবে)



একাদশ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য