শহর
আমার শহর এক সবুজ-শরীর আনন্দ
উদ্ধত জংলি খুশিভাব পয়দা করে যেই সৌন্দর্য
ইতিহাসের পাহাড় আর উপত্যকাগুলায় সেই অপূর্ব প্রাণশক্তি মজুত করা
ঝিকমিকা আলো আর ছায়ার বহরে
দরগাগুলা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে
আমি তাদের ঘোড়াগুলার লাগাম টানি
আর আতরের ঘ্রাণ বয়ে বেড়াই
শহরের কলিজার রঙ সবুজের ভিতর
ঢলের পানি আর বাতাসে
আরও কড়া রঙ আসে
এখানে নতুন নতুন উজালা সকালে
নাচতে নাচতে নিজের কোমল আত্মার কাছে
ফিরে আসার মৌসুম
এখানে ধুমধাম ছন্দে পা ফেলে দুর্দান্ত চলা যায়
সারি সারি টিলাজুড়ে খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছি
আমার পায়ের ছাপে আমাদের বাড়ি খুঁজে নিয়ো
(২০২৪)
রোজায়িতা
তুমিও দেখো আমাকে, স্বপ্নের অধিক এই স্বপ্নে?
আমার কম্পাস এখন তোমাদের টিলার দিকে
নদীর বাতাসে তোমার জানালা আর্দ্র, ঝাপসা।
আমার এই দাঁড়ায়ে থাকায় আজকে স্থিতি নাই
মসজিদে সেজদা করি আল্লাকে
আর মাথা তুলে খুঁজি তোমার ছোটভাই কই!
তার কাঁচা বয়স তোমার দিকে আমার রাস্তা তৈরি করে
তুমি চা বানাও আমার জন্য
তুমি ভাবাও আমাকে
পোড়াও আমাকে
ফিদা করে করে অবশিষ্ট রাখো আমাকে
আমি ত থাকি, তোমার হাঁসির বিস্তৃতি পরিমাণ
তুমি গাইতে পারো না
পুরানো দিনের সব গান অর্থবহ করে তোলো
লিরিক গভীর করো
টিউন তীব্রতর করো
আমি পছন্দ করি, দুর্লভ হারের মতো, তোমার গলায় রগের উঠানামা
তোমরা আছো এই অঞ্চলে
তাই বৃষ্টিপাত হয় ঘন ঘন
বারবার আমার ফিরার পথ আটকে দেয়
তুমি হাঁসো
কুশল জানাও
টিভি দেখো
টিভি বন্ধ করো
আমি আসি
তুমি উঠে পড়ো
আর তুমি, তাকায়েই থাকো শুধু, আমার তাকায়ে থাকার দিকে।
(২০২২)
পরপুরুষ
সমস্ত ছফর শেষে, তোমাদের নগরীই যেন
আমার কামনা ছিল, নেমে গেছি মুছাফির কোনো
চিনা নাই রাস্তাঘাট, চিঠিতেও ছিল না ঠিকানা
আমি ত পরপুরুষ, তুমিও মেয়েলোক, বেগানা
কে কার খবর রাখি, হাঁটার পথের শেষে খালি
তোমাকে স্মরণ করি নয়া কোনো গান ভেবে নিয়ে
তোমাকে দেখছি যেন, হলুদ বাড়ির ধার দিয়ে
পুরানো ধাঁচের নাকি, তোমাদেরও বাসা-বাড়ি-গলি?
যেখানে তোমার নামের সুরভিত বাতাসের ঘাঁই
বণিকের গায়ে লাগে জাহাজ ভিড়ার ব্যস্ততায়
খেয়াঘাট, বন্দরে খুঁজে, তোমাকেই দেখে ফেলি যদি
নারীর দরদ দিও, যা আমি কখনো পাই নাই।
যেন এ নগরীরই পরাজিত শেষ জমিদার
তোমাকেও হারাইছি, না পাইছি নিজের এলাকা।
(২০২৩)
শাহজাদি
বড় বড় ড্রাগনের পিঠে উড়ে আসে শাহজাদি
শাহজাদি খোলা চুল
শাহজাদি পুতুলের শরীর
কাঁপা কাঁপা বোতাম আর পাখির দরদ ভরা জান
এখনও
তারও কি আছে খানিক কারোর প্রতি টান!
কখনো ঘুমের ঘোরে
কয়েক কদম ধরে ধরে
তার সাথে সাথে হাঁটা যায়
মদির কণ্ঠস্বরে
সিনার আকার লক্ষ্য করে
অল্প কথাও বলা যায়
শাহজাদি গোশলে
শাহজাদি বলে না
শাহজাদি হাসে
মোমের দেহে কেমন
রূপার অনুকরণ
ঘুমাতে নিলেও তার ঘ্রাণ চলে আসে
আমি কেন এক জোড়া শাদা ঘোড়া পালি
সে ত কখনো তার
দুনিয়ার ওই পার
ভুলে গিয়ে এইদিক আসবে না!
বড় বড় ড্রাগনের পিঠে চলে যাবে শাহজাদি
(২০২৪)
সংযম
মিঠা রোদে মনোরম এক লাল ইটা রাস্তা
আমার ঘুমের ভিতর নিজেকে বিছায়ে দেয়
শহরের সিনা বরাবর একটা সাঁকো বান্ধি
সরাসরি যাওয়া যাইতো যদি মফস্বলি পুকুরে
যার উচা উচা পার দিয়ে তুমি
প্রতিদিন কার ইফতারি বয়ে নিয়ে যাও
মুছাফির হইতাম তবে ওই এলাকায়
তোমার ফিরার অক্তের নকশা বানায়ে
সুনসান রাস্তায় ভুখা পায়চারি করতাম
ওই পথে ঘনায়ে থাকা কুয়াশা
গালে-মুখে-পেটে ঢুকে যায়
এক বেলা সরিষা ফুলের আলো
আবার আসে জলপাই রঙের ছায়া
ওর ভিতরেই তোমার পাড়ায় আসতে যাইতে থাকা
কী মনোহর কারুকাজ নিজেই নিজেকে করছো
যে আবার একটা দীর্ঘ রোজায়
আমার শরীরকে আটকাইছি
(২০২৫)
সংশয়
একটার পর একটা ঘটনা, আমাকে
আমার শিশুহৃদয় থেকে
হঠাৎই আলগ করে দিচ্ছে
কাউকে কিছু বলার ভিতর স্বাদ নাই
সবকিছু আজিব রকম যা তা
খালি অসীম উৎসবে ঝলমল করে শিশুদের মুখ
চারদিকে তাদের আনন্দের ফেনা ছিটায়ে রেখে—
আমি পাথরের কুঞ্জে জমে থাকার গান গাই
যেভাবে নদী শুরু করে তার ছফর
আরও গভীর উপত্যকা থেকে—আর
পুরা দুনিয়াই তার গলে পড়ার দৃশ্যে মৃত পড়ে থাকে
সারা পৃথিবীতেই নিজে নিজে মরে যাওয়ার চল আছে
সব জমানায়ই ছিল, আমাদের ভালো লাগে না যখন
আমরা আয়নায় দাঁড়াই
আমি তাকেই ভালোবাসি, যে তোমার দিকে প্রভু!
আরও আরও মায়া করি সারা মানবকূল
সকল প্রাণী আর গাছেদের জন্যেও কাঁদি
আর দিন পার করি নিজের কবিতা নিয়ে সংশয়ে
(২০২৪)
আলস্য
কতগুলা সেজদা জমে যাচ্ছে
কত বর্ষাকাল—শুকনা চোখের ভিতরে পাথর
কারা যেন ঘোড়ায় চড়ে আসে
আর সারা গায়ে ছিটায়ে যায়
লবণের দ্রবণের মতো ঘুম
রাশি রাশি না পড়া বইয়ের মাঝখানে ঘুমাচ্ছি
বন্ধুরা খুঁজতেছে, পাচ্ছে না আমাকে
(২০২৩)
জুলাই
জুলাই আমাদের পিরিত, বন্ধুতা
বাঁচার তুমুল ইচ্ছা
সবকিছু মজবুত বান্ধি রাখছিল
একই সাথে কানতে কানতে
নিজেদেরই রক্তে ভিজা শরীর
আর আত্মার কাছে জমা রাখছিল
যত দূর যাইতেছি জুলাই থেকে
একা হয়ে যাচ্ছি
(২০২৪)
ফানা
আমাদের ইতিহাস হবে শহীদদের জন্য লেখা গান
আমি যে নিজের জিন্দেগির পিছে ছুটতেছি
আর আমার মাহবুবার কথা ভাবতেছি যেই জমিনে
সেই জমিনে আপন রক্তের খুশবু রেখে গেছে যারা
তাদের জন্য এই সবুজ জনপদের
সমস্ত প্রান্তে সফর করবো
পূর্ব বাংলার মহল্লাগুলাকে চিহ্নিত করবো তাদের নামে
ফারুক শান্তের জন্য লেখা থাকবে
আমার লালখান বাজার
বড় দীঘির পার আলো করে থাকবে
জামালের, ইউসুফের চিহ্ন
সন্দ্বীপে সাইমন শুধু তার মায়ের কাছেই যাবে
আর নুর মোস্তফার পরিচয় জানাবো সমগ্র দুনিয়ায়
যেই মাটিতে চোখের রক্ত গড়ায়ে দেয় মোর্শেদ
তার কোনো এক কণা থেকেই জন্ম নিচ্ছি আমি
এই লাল অস্তিত্বে মিশে গিয়ে আমার অবয়ব
ততদিনে না ফানা হয়ে যায়!
(২০২৫)

সুলাইম মাহমুদের জন্ম ও বেড়ে উঠা চট্টগ্রামে। বুনিয়াদি পড়ালেখা পরিবারেই, তারপর কওমি মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ হয়ে বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে। কবিতার টেক্সট আর ক্লাসিকাল মিউজিকের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হইতে ভাল্লাগে।
























