পাঁচটি কবিতা | আসমা অধরা


নিদারুণ প্রেমে


অথবা, মুগ্ধতার মৃত্যু হয়নি বলে
ঘুমের ঘোরে তার নাম শোনেনি কেউ
যে অন্ধকার বাগানে দৈবাৎ কোনো আওতা নেই
নেই কাগজের ভাঁজ, কালির ঔদার্য;
যথেষ্ট পুরুষ আয়না যেন এক!

এইসব দারুণ উদ্বেগে, প্রাক্তন হয়েছে বিকেল
এ তমসায়, বৈষ্ণব হলে বুঝি খঞ্জনও শৃঙ্গার,
ঊর্ণনাভ স্বেদ, যেন ধমনী ভেঙ্গে গড়িয়ে যায়
প্রগাঢ় কোন শ্রম, তবু সে গুলজার।

গৌড় নাকি দ্রাবিড়ের এক অর্ধস্ফুট বুলি
ওগো ময়ূখ, তোমার কণ্ঠ গলে যাক আলোয়
পর্যাপ্ত পারদ মাখিয়ে দর্পণ গড়ে গেলেই
পাখনা জুড়ে নিয়ে উড়ে যাবে এক মেঘমগ্ন অঙ্গিরা।

সাহসের সহিস, নদীটির কী তবে মন খারাপ?


ক্লান্তি


খুব মড়কের দিন, এমন অশ্লীল নৃত্যের সময়;
আয়না থেকে মুখ ঘুরিয়ে, ক্ষমাশীল ঢেউয়ের মতন
আর্দ্র এক চোখের ভেতর ঘুমোতে চেয়েছি।

এ কেমন জলচক্র, নাইলোটিকা মাছের মতন
হা করে থেকেও শ্বাসকষ্ট! ঘুমন্ত নয়নতারা ফুল
তাকাও, দেখো এই পৃথিবীর সংকীর্ণ কাল।

আমাদের আজব দেশ, অযুত মুখে হাপিত্যেশ
বড় বড় চেয়ারের পাশে গড়ায় কাঁচা মদের গন্ধ,
আর তোমাদের এলাকায় সব অতল গভীর ঘুম।

গোপন সুষুপ্ত ফুলের কাছে পরাগের হিসেব নেই
অথচ পাকদণ্ডীর হাওয়া নিখোঁজ। বলবে কে—
মার্বেল জীবন গড়াতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছে পথ।

বুকের বোতামঘরের ওপরে, চিবুক মুখ পেরিয়ে
তবু, সেই ক্ষমাশীল ঢেউয়ের চোখে ঘুমোতে চেয়েছি।


সংবেদ


চোখ ও মুখ অদৃশ্য হলেই
কুশল ঝরে যায় খুব, দিন রাতে
মনে পড়ে এপাচিদের গ্রাম
ধারালো কুঠারের ডগায় নৃত্যরত মাছি
ভনভন করে আয়ু গিলে খায়।

যে মানুষ বিপ্লব করতে নামলেই ভাবে
রমণীরা লেপ্টে যাবে বুকে
এই সমস্ত বুকের ছাতি চল্লিশ—
মন সংকীর্ণ! মনে শীষ বাজলেই বেড়ে যায়
কারো স্তনের পরিধি ও আয়তন।

স্তন— এক প্রচণ্ড সেন্টিমেন্টাল শব্দ
যুদ্ধ, বিগ্রহ, পূজো, অর্চনা,  আর
মোল্লা থেকে পুরুত, পাদ্রী থেকে শিশুর মুখে
সর্বতোভাবে এঁটে যায়। যেন চাঁদমামা।


এবং প্রেম


দৃষ্টিবন্দি পথ জানে, আদল মিলে গেলে আস্তরণে আর ধুলো ওড়ে না, সে কিংশুক হতে হতে একদিন আরো আরো উচ্ছ্বল ছুঃমন্তরে ঢেলে দিতে পারে বিষাদ। এমন শৈত্যপ্রবাহের দিনে। গুটিয়ে রাখা হাফহাতার ফাঁক গলে নরম রোমের শীর্ণ রেখার পাশে ঘুম পাড়িয়ে রাখা আছে এক বিহান আহ্লাদ! যে কবি আকাশজোড়া পাখির উড়ান দেখে গলে পড়ে যায়, তার মুখ একদিন দুপুরে হরিৎডাঙ্গার বিলে ঝুঁকে পড়ে আকাশ দেখতে থাকা বুকে ঝড় তুলতেও পারে। মেঘের ছায়াকেও মনে হতে পারে ঝাঁকড়া চুলের খুনসুটি। তাল বা তানহীন নদীর মতন কুলকুল করবেই যদি, সশস্ত্র এক অভিবাদনের পথও খোলা থাকতে হয়। এইসব অসভ্য শোকের পাশে বসেও হেসে ওঠা যায় আজকাল, যে কখনো সময় করে উঠতে পারে না ভেবে। কেউ যদি দূরত্বই হলো, অপরজন নাহয় সুমেরীয় প্রাঞ্জল বাইসন হোক, হোক ক্ষীপ্র আলোর গতি…


সু সমাচার


তুমি সু, এক তীব্র আঘাত
এটাকে সুতীব্র বলা যায়
কবিতার মতন। আমি নীরিহ
অস্ত্রের দোকানে সেলসম্যান
এখানে জেন্ডার থাকে না,
বুলেটের মতোই। আকাশ অস্বীকার
করার পর প্রতিদিন, নরম ন্যাকড়া দিয়ে
হালকা হাতে মুছতে থাকি
পলিশড পিস্তল। একদিন এসব
আবর্তনের ফিতে ফেঁসে গেলে
খুব অন্যমনস্ক অথবা অসাবধান
ভাব ধরে, থুতনির নিচ থেকে
মাথার ছাদ উড়ে যাবে।

একটা হুইসেল বাজছে,
ইঞ্জিনঘর ভরা ধুয়োধূলি
অস্পষ্ট দৃষ্টিতে কেঁপে যায় সব ছবি।
দেবতা উড়ে যায় পাখির শরীরে
আর দমবন্ধ হতে হতে দেখা যায়
উচ্ছিষ্টের মতন মাটিতে পড়ে থাকা
সেই হাতের পাশে পড়ে আছে মৃতমাছ।

দৃশ্যতঃ, দুটো দেহই সুন্দর;
খানিকটা ক্ষত ছাড়া নিঁখুত শেইপ
এক বৈরি দিনের খানিকটা বিশ্লিষ্ট রূপ
খুলে যাবার পর, চুরি হয়ে গেছে শ্বাস।
আদিম কুঠুরি জুড়ে সুনশান নিরবতা
ছেয়ে গেলে, সমস্ত আনন্দ হড়কে যায়…


আসমা অধরা

সম্পৃক্ত ছিলেন প্রকাশনা ও সম্পাদনায়।

তিনটি একক কাব্যগ্রন্থ :
১) একদিন ঠিক হেঁটে যাবো
২) হাওয়াকল
৩)ওয়ালথার পিপিকে

 

শেয়ার