নির্বাচিত দশ কবিতা • রনক জামান


অন্ধ


একা অন্ধ লোকটি আজ
নিজের চেহারা ভুলে—হাসছে আপাদমস্তক 

…এবং
তার কবেকার আলোর স্মৃতি
মনে হয় দূরবর্তীতম এক তারার মতো…

অর্থাৎ এখনো সে স্বপ্ন দেখে—
দেখে রোদ
এত উজ্জ্বল!
যেন ঝলসে যাবে বোবা চোখ।

আর রোজ, একা একা
পিছু নেয় রোদটির—
তারাটির কাছাকাছি একদিন পৌঁছে যেতে!


দাবা


‘In Chess, whichever move you make, you must face the consequences.’

এই গাঁয়ে
অবসরে দাবা খেলে মানুষগুলো।
তাদের খেলার পাশে, অনেক ক্ষতের পাশে, কাত হয়ে—
মরে থাকে মেধাবী
ঘোড়া।

খেলা
শেষে তথাকথিত
সেই গ্রামব্যপী—বেখেয়ালে, ব্যস্ত হালে মানুষেরা—
খামোখাই নড়েচড়ে
ফেরে

আর
আয়রনিক্যালি তারা
আটকে যেতে থাকে গুটির শরীরে, নীরবে
তাদের ফসলী মাঠ হয়ে ওঠে দাবার ঘরের মতো, ক্রমশ
দাবার ছকের মতো
সমতল।

সুতরাং
প্রায়শ হঠাৎ—

প্রিয়
কাঁচানীল
আকাশ হতে—ঘন
ও চিরচেনা মেঘের মতো অথচ
নেমে আসে মনুষ্যগুটি অভিমুখে, এক হাতেই
তালি দিতে দিতে, দানবিক
অচেনা একটা
হাত


বোধি


কোথাও একটি গাছ—
         সবুজ পাতার ফাঁকে অসংখ্য অতিথি পাখি ধরেছে। পেকে পেকে ঝরতেছে আকাশের দিকে।
         বিনিময়, নিযুত-লক্ষ মাইল দূর হতে আলো এসে, হাতের তালুতে এসে, ভেঙেচুড়ে ছড়িয়ে গেল।

কোথাও একটি গাছ—খুঁটে খুঁটে খেয়ে নেয় আলো।
         মাথার উপর জল—উবে উবে মেঘ; তার—একটু হিমালয়, একটু সাগর আর একটু সিন্ধু নদ।


ভাব না ভাষা, কে


আবছা দুপুরে—
চর অচরজুড়ে, মেঘ না বৃষ্টি—
মুষলধারে ঐ ঝরছে পাতারা
লাশের উপরে

এ রূপ মরতে
এরূপ মর্ত্যে : ভাব না ভাষা, কে
ডিম না মুরগি কে আগে এসেছে
এ বায়ুবর্তে—

হচ্ছে বৃষ্টি
যেনবা এমবুশ, মুষলধারেতেই
সাঁতার কষছে স্রোতের উলটো
ভাসছে লাশটি

ভাষাটা থেমেছে
কলম ও কাগজে, ভাষাটা থামলেও
একটি ভাবনা উদিত হচ্ছে
মৃতের মগজে—


ধীবর পল্লী


চন্দ্রশাসিত রাত।

একটা শামুক, ধীরে, ধানগাছ বেয়ে উঠতেছে…

দূর, আউশের ক্ষেত, আষাঢ়ের ব্যাঙ ডাকছিল আর নরম হাওয়ায়, এই চন্দ্রালোকের তলে, ধীবরপুত্র এক বাঁশের খইচা হাতে যথেষ্ট ছায়ামূর্তির মতো—নড়ছে চড়ছে ও একটা হিজলগাছ চিরকাল নিম্নভূমির দিকে অল্প ঝুঁকে…

দূর, খালজুড়ে কচুরিপানার বুদ্বুদ
লগি, অন্তরীক্ষ ছিঁড়ে উড়ে যাবে চাঁদের পাশে

কোষানৌকায়—ক্লান্ত ধীবর, অবিকল যিশুখ্রিস্টের মতো জলের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে…


মানুষের বনে


খ.

এই গ্রাম—ভোর হতে
এখনো অল্প রোদ, নীল আকাশ কিছুটা বাকি।
তবু মানুষের ঘুম ভাঙে, নিচু লয়ে ভাঙে; 
সেই ভাঙার শব্দে
সেই ওমের শব্দে
আর যেই শিশির ঝরতেছে—সেও এক শব্দ
খবরের কাগজ থেকে উঠে আসা খুন-ধর্ষণের চিৎকারে 
জেগে উঠছে মানুষ
বলছে পরস্পর রাত্রিকালীন স্বপ্ন।
আর জাগরণে ডুবে যেতে যেতে—
ওরা ভাত খায়
নিজ হাতে
মানচিত্র এঁকে এঁকে
জগতের ভূমি ও ভূমিকা বাড়ায়।

ঘ.

পাকুড়বৃক্ষ একা, সবদিকে তাকিয়ে আছে খেয়ালে।
নিচে গ্রাম বিছিয়ে, আজও কারা গান গায়
হ্রস ও দীর্ঘ বাক্য বলে—
নির্ভুল গঞ্জিকাবাংলা ভাষায়।

দূরে মাগরিব, প্রতি সিজদায়
ইমাম বদলে যায় আয়াতের সুরে।
আর এখানে, নাতিসন্ধ্যায়
খোদার দস্তখত নকল করে—

‘…একটাই মুহূর্ত, তারে টেনেটুনে অনন্তকাল…’
বলছিল সাধু। কিংবা চোর।
লাল চোখ। সূর্যের মতো লাল।
ওরা খণ্ডকালীন ঈশ্বর।


নতুন এক মৃত্যুপদ্ধতি


ম’রে যাবার মতন—কী এক নষ্ট ঋতু, জগতে!

ভুট্টা ক্ষেতের উপরে—বিকাল ছড়িয়ে বিস্তারিত—
যতটা দেখায় চোখ তারও বেশি এখানে আকাশ;
কেননা আকাশ আজ উড্ডীন পাখিতে ভরাট
হয়ে আছে; ওইপাশে থেমে আছে সবটুকু আলো।
যেহেতু আকাশ, মানে সবদিকে পথ বিথারিত,
নীরদার্দ্র;—মেঘ ঘোলা করে পাখি উড্ডীন আর
অনেক ডানার ছাপ ফেলে অচেনায় উড়ে যাচ্ছে—

এসবের নিচে আজ, নিজের ভেতরে মরে যাচ্ছি।
নিজের ভেতরে মরে, কাত হয়ে পড়ে থাকতেছি।


শৈশব


উড়তে পারছি না আর
মেরুদণ্ড ভুলে গেছে ডানাদের কথা;

অথচ আমার
এই নশ্বর শরীরের পবিত্র অঙ্গ ছিল মায়ের আঁচল
(সেই ভালো ছিল)

এখন প্রায়শ স্মৃতির ভেতর—
শৈশব থেকে আমি দৌড়ে বেরিয়ে পড়ি
এক ডানাভাঙা ঘুড়ির পিছু—

পায়ের তলায় ঘাস মিছেমিছি ভাঙছে সবুজ, আর
চিরায়ত রোদের নিচে—
নশ্বর শরীরের পবিত্র অঙ্গ ছিল ঘুড়ির নাটাই
স্মৃতির ভেতরে তাই
দৌড়ে দৌড়ে আমি পৌঁছে যাচ্ছি প্রায়ই পৃথিবী-কিনারে, আর

সেই মায়ের আঁচল
সেই ঘুড়ির নাটাই

স ম স্ত স মে ত  আ জ

পৃথিবীকে মনে হচ্ছে
নশ্বর নিজেরই বাকিটা শরীর


টু বিল্ড এ ফায়ার


শীতে জমে যাচ্ছে শুক্রতারা—

নিচে
কনকনে মাঘ ভেঙে, আব্বু, খোদার দিকে যাচ্ছেন

অবিরল
নাড়াজ্বলা আগ
চারপাশে মানুষের লালচে চেহারা নড়ছে—

‘আগুন পোহাইতে শ্যাষম্যাশ দোযখে যাবো রে?’

*

দাদা তো কবেই
গেছে—
সিথানে পুরাতন রেডিও ছেড়ে

সেইঘরে দাদী
অনেক ঘুমের গভীরে
প্রিয় হাঁসেদের ডাকে ‘তৈ তৈ!’

গত আশ্বিনে
একটা হাঁসের ছাও শেয়ালে নিয়েছে
গাঢ় ঘুমের ভেতরে দাদী

সেই শেয়ালটাকে খুঁজছে।

*

মাঘী চাঁদ
মাথার উপর—

একটি দৃশ্য হয়ে
চিত্রনাট্য মেপে একটি দৃশ্য হয়ে
চারপাশ জ্যোৎস্নাবৃত কুয়াশায়
চারপাশ কুয়াশাধোয়া জোছনায়

অবিরল উড়ছিল
নাড়াজ্বলা অগ্নিকণা

তাহাদের অন্ধকারে—
ওরা
পিঠ ঠেকিয়ে
মানুষের চোখগুলি বিম্ব ফলাতে শিখছে;
প্রাণের চিহ্ন হয়ে

এইটুকু,
আপাতত,
অন্য দৃশ্য হয়ে—

‘কত নাম জমছে লাশের, একটাও আমার না রে!’

*

এইটুকু স্বার্থকতা নিয়ে—
কোথাও বাদুর ঝাপটালো

কোথাও নামাজ শেষ, রান্না বাকি।
আম্মা’র দুইহাত ভর্তি দোয়া।
আম্মা
ডানকানে
কম শুনছেন।

গত ধানের বতরে
এক ধান ছিটকে
তার কানের ভেতরে—

কনকনে মাঘ।
নাড়াজ্বলা অবিরল আগ।
চারপাশে

মানুষের উষ্ণতা
অস্তিত্বের সুরে
যেন নতুন আজান বুনছে।

‘…আমাদের মাথার উপর যদি ঠেকতো আরশ!’

*

আমাদের ঊষ্ণতা
খিদে আর খোদা বলতে—

আব্বু, ধীর পা’য় হেঁটে হেঁটে
চালতাগাছের নিচে
               বাড়ি ফিরছেন


রনক জামান

জন্ম : ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১; মানিকগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ। পড়াশোনা : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (রসায়ন শাস্ত্র)। কবিতার অবসরে অনুবাদও করেছেন কিছু।
ranakzaman1991@gmail.com

প্রকাশিত গ্রন্থ
কবিতা

শামুকচর্য (২০২৪)
অগ্রন্থিত ওহী (২০১৯)
ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা (২০১৬)

অনুবাদ

ললিতা – ভ্লাদিমির নবোকভ (২০১৬, ২০২২)
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে – সেরা ২০ ছোটগল্প (২০১৮)
আমক – স্তেফান সোয়াইগ (২০১৮)
দক্ষিণে – সালমান রুশদি (২০১৮)
ইসমাইল কাদারের কবিতা (২০১৭)


 

শেয়ার করুন

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading