home সমালোচনা সাহিত্য হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প, তাদের বড় জগত ।। এনামুল রেজা

হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প, তাদের বড় জগত ।। এনামুল রেজা

কিছুদিন আগে এক লেখায় বলেছিলাম, পরিণতি প্রবণতা ছোটগল্পের সবচে’ বড় ত্রুটি। বৈশ্বিক ছোটগল্পের যে বিপুলা পৃথিবী, সেখানে খুব সামান্য এবং চলমান হাঁটাহাটির ফলস্বরূপ উপলব্ধিটি কোন একভাবে মগজে গেঁথে গিয়েছে—বিশ্বসাহিত্যের অধিকাংশ ছোটগল্পই তো পরিণতি প্রবণতাকে হেয় করে, সেগুলো কিছু দৃশ্যের বর্ণনায় পাঠকের সামনে কেবল একটি বা একাধিক জগতের দরজা খুলে দেয়, ঐসব জগতে ঘুরে বেড়াবার দায়িত্বটি বর্তায় পাঠকের কাঁধেই। ঠিক এ কারণে লেখকের কাছে ছোটগল্প পাঠকের দাবি থাকে বেশি ও বিচিত্র রকমের: ক্ষীণ অবয়বেও এখানে তৈরি হতে হয় মজবুত চরিত্র, অমর সংলাপ কিংবা জান্তব ও স্মরণীয় কোন বর্ণনা, যা পাঠককে চিন্তায় ফেলবে—মনে জাগিয়ে দেবে জীবন সম্পর্কে গহণ কোন প্রশ্ন। এইসব দাবি-দাওয়া পূরণ না হলে পাঠক নিজের নিজের পন্থায় গল্পটিকে বাতিল করে দেন। মজার বিষয় এখানেই যে একজনের কাছে বাতিল গল্প অন্যের চোখে মাস্টারপিস হিসেবে ধরা পড়তে পারে, আবার হতে পারে উল্টোটিও।

হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প প্রসঙ্গে এ আলাপটির আগে উপরের কথাগুলো ভূমিকাস্বরূপ বলে নেয়া গেল। কম-বেশি একশ’র অধিক ছোটগল্প লিখেছেন হুমায়ূন, নিজ লেখালেখির যে চার দশক সময়কাল—এর পুরো সময়টিতে। এইসমস্ত রচনার যে জগৎ, তা কি সমগ্র হুমায়ূন সাহিত্যের অভিন্ন অংশ নাকি আলাদা কোন মহত্ব এরা বহন করে?

উপন্যাসের হুমায়ূনকে সংজ্ঞায়িত করবার একটা সহজাত প্রচেষ্টা আমাদের মিলেছে। তার অধিকাংশ উপন্যাসে নির্দিষ্ট একটি কাঠামো নির্মিত হয়েছে দীর্ঘ সময়ে, যাদের থিম ঘুরে-ফিরে হাঁটাহাঁটি করে একই আকাশের নিচে, যে আকাশে জোছনার ফুল ফোটে প্রতি পূর্ণিমায়, বর্ষায় ঝুম বৃষ্টি নামে—সেসবে মগ্ন তরুণ-তরুণী ও স্বপ্নবিলাসিদের দেখা আমরা পাই, জীবনযন্ত্রণা ও আনন্দে এরা আক্রান্ত কিন্তু একজন বা কয়েকজনই অজস্র চরিত্রের প্রতিনিধি। এসব ছাড়া আলাদা মাত্রা নিয়ে হুমায়ূনের অল্প উপন্যাসই বেরিয়ে আসতে পেরেছে। ঠিক এ জায়গাটিতেই তার ছোটগল্পেরা এগিয়ে আসে গুটিগুটি পায়ে।

 

এ মুহূর্তে যে গল্পটির কথা মনে পড়ছে, পাপ, ১৯৭১ সনের পটভূমিকায় লেখা। যুদ্ধ-চলাকালীন সময়ে এক স্কুল মাস্টারের বউয়ের কাছে আশ্রয় নেয় এক পাকিস্তানি সৈন্য। নিকটস্থ নদীতে মিলিটারিদের লঞ্চ ডুবিয়েছে দু’দিন আগে মুক্তিযোদ্ধারা, পরাজিত ও পলাতক এ শত্রুটিকে মাস্টারের অন্তঃস্বত্তা বউ আশ্রয় দেয় তাকে না জানিয়েই এবং মাস্টার যখন জানতে পারে—তার দুনিয়া ওলোট-পালোট হয়ে যায়। বউ তাকে অনুরোধ করে, সে যেন এই পাকিস্তানি সৈন্যটিকে দূরের মিলিটারি ক্যাম্পে দিয়ে আসে যেহেতু মাস্টারের বউকে বহেনজি ডেকেছে কিশোর মিলিটারি এবং জীবনভিক্ষা চেয়েছে।

মূল গল্প কিন্তু এখানে না, গল্পের শরীরটি নিয়ে কিছু বলা যেতে পারে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজনের ভাবনা—অতো ভিতরে মিলিটারি আসবে না, কিন্তু দেখা যায় গানবোটে চড়ে ঠিকই হানাদাররা ঐ অঞ্চলে পৌছে গিয়েছে। স্থানীয় মাতব্বর বাধ্য হয়েই মিলিটারিদের খাতির যত্নের ব্যবস্থা করছেন এবং আরাম-আয়েশ শেষে দেখা যাচ্ছে ঐ মাতব্বরের পুত্রবধু, কন্যাদের জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা ভোগের জন্য। অর্থাৎ এ গল্পে যুদ্ধ আসে একেবারে আম জনতার দৃষ্টিকোণ থেকে, যাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের আঁতকা আক্রমণগুলো প্রাথমিকভাবে মনে হতে থাকে দু’একটা গুলির শব্দ, ফুটফাট এবং এসবের ফলস্বরূপ হানাদারদের গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে ফেলা।

গল্পটির ছোট দেহেই যুদ্ধের আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যায় এরপর, বলশালী হয়ে দাঁড়ায় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ। মাস্টার কিন্তু তার বউয়ের আশ্রিত পাকিস্তানী সৈন্যটিকে মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার সাহস করে উঠতে পারে না, এখানে তাকে অসহায়তা দেয় তার মানসিক অবস্থা ও বাস্তববোধ। দেশের অমন পরিস্থিতিতে একজন মিলিটারির জান বাঁচাতে যদি সে মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে—রাজাকার হিসেবেই তার বিচার হবে, বোঝা যায় যে যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই রাজাকার নিধন শুরু হয়েছিল, মাস্টার সে ভয়েই অসার হয়ে পড়ে—আবার দেশের এত বড় শত্রুপক্ষের কাউকে কেনই বা সে বাঁচাতে যাবে? মূলত এ মানসিক দোটানাই গল্প’র মূল বিন্দু: দেশের সাথে প্রবঞ্চনা মাস্টার করতে পারে না, মুক্তিবাহিনীর কাছে নিরস্ত্র সৈন্যটিকে সে ধরিয়ে দেয়—কিন্তু মাস্টার পরাজিত হয় নিজের বিবেকের কাছে, এটিই মূলত পাপ, যে পাপবোধ তাকে তাড়িয়ে ফিরছে আজন্ম। ন্যারেটরের মুখ দিয়ে এই প্রথম সম্ভবত লেখক নিজেকে প্রকাশ করেন যখন মাস্টার বলে: যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস। যুদ্ধে শুধু পাপের চাষ হয়।

সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে যুদ্ধোত্তর যেসব গল্প রচিত হয়েছে, যুদ্ধকালীন সময়টিতে ফোকাস করা হয়েছে আদতে মানুষের বেদনাবোধের উপরে—‘পাপ’সেই বিবেচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ, যুদ্ধের দিনগুলোতে অন্যভাবে তাকানোর ইশারা গল্পটি আমাদের দেয়।

 

মধ্যবিত্তের কথাকার হিসেবে হুমায়ূনের যে খ্যাতি, তার ছোটগল্প পড়তে গিয়ে আবিষ্কৃত হয় নিতান্ত গেঁয়ো চোর-ডাকাত, পাগল ও কামলা শ্রেণীর অভাজনেরা স্বমহিমায় এসবে প্রবেশ করেছে। প্রসঙ্গত কিছু কথা বলা যেতে পারে ‘চোখ’ গল্পটি নিয়ে।

গঞ্জের বাজারে ধরা পড়া এক কুখ্যাত চোরের গল্প করা হচ্ছে। চোর মতি বসে আছে ধোলাইয়ে বিধ্বস্ত অবস্থায়, সারা গ্রাম ভেঙ্গে লোক জড়ো হয়েছে—তার চোখ উপড়ে নেয়া হবে। মতি অপেক্ষা করছে, এত এত লোক—কেউ নিশ্চয় এক সময় করুণা করে বলে উঠবে, থাক থাক চোখ উপড়ে কী লাভ? কিন্তু সময় যত গড়ায়, দেখা যায় চারপাশের লোকজনের মাঝে বন্য তাড়না বাড়ে, কখন মতিকে অন্ধ করা হবে? এখানে শিক্ষিত স্কুল মাস্টার আছে যেমন অপেক্ষায়, গ্রামের মাতব্বরেরা আছে, বলতে গেলে সর্বশ্রেণীর লোকজনই আছে, তাদের সকলের চাওয়া এই ভয়ানক তষ্করের নয়ন উপড়ে নেয়া হোক। রূপকার্থে এ গল্প মানব সমাজের অপরাধ প্রবণতা ও অন্ধকার দিকের কথাই বলে, এই যে দুর্বলকে নির্যাতিত হতে দেখার লালসা—সেটা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের রজ্জুগত, গল্পের গোটা আবহাওয়া আমাদের সে অনুভব দেয়, এর কৌতুকময় বর্ণনার আড়ালে দুঃসংবাদটি তীব্রভাবে পাঠককে ধাক্কা মারে।

‘শিকার’ গল্পটির নায়কও প্রান্তিক মানুষ আজরফ। সে বকের মৌসুমে বক শিকার করে। পুরো গল্পের শরীরে ঝিরঝিরে একটা আতংকের রেশ আছে, আসলে শেষ পর্যন্ত কে শিকারি? যেহেতু বক শিকারির দুটো চোখই বকের ঠোকরে নষ্ট হবার মিথ ঐ অঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করে, যা আজরফের মনস্তত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নিয়তি হিসেবে। আজরফ নিয়তিকে এড়িয়ে যেতে চায় নাকি সে শুধু নিয়তির জন্যেই অপেক্ষা করে বক ধরার মোহন নেশায় বুঁদ হয়ে? এই দার্শনিক প্রশ্ন উঠিয়ে শিকারের যবনিকা টানেন লেখক।

শেষ যে গল্পটি নিয়ে আলাপ করব, তার নাম ‘খাদক’।

খাদকের কাহিনী শুরু হচ্ছে সমাজের নিচুশ্রেণির একজন মানুষকে উপজীব্য করে। আমরা দেখি, খাওয়াটাই খাদক লোকটির পেশা, তার খাওয়া দেখে লোকে মজা পায়, ডেকে নিয়ে তাকে খাওয়ায়—বাজি ধরে লোকজন, রেকর্ড পরিমাণ খাওয়ার বিনিময়ে মানুষের থেকে খুব সামান্য অর্থই পায় সে—এ দিয়েই সংসার চলে, খাদকের জন্য আমাদের মনে করুণার উদ্রেক হয়। গল্প যত এগোয়, আমরা দেখি সে খেয়ে চলে গ্রাসের পর গ্রাস মানুষের মনরঞ্জন করতে এবং পিতার গ্রাসের দিকে বুভুক্ষু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার ক্ষুধার্ত ও রুগ্ন সন্তানেরা—কিন্তু তাদের পিতার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত নেই। পুঁজিবাদি সমাজে আমাদের সমাজপিতারাও খেয়ে চলেন এবং ভারসাম্যহীন হয়েও খেতে থাকেন—তাদের বিশ্বাস কি এই গল্পের খাদকের মত না? এই ভক্ষণেই তার প্রতিভা, এর ফলেই সমাজের মঙ্গল সে করবে এমনি তার দৃঢ় ধারণা!

 

হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্পে সবচে’ উল্লেখযোগ্য থিম—নানান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শোষক ও শোষিতের বর্ণনা। কোন নিজস্ব লেখকীয় মতামত এসব গল্পে আরোপ হয় অল্পই। গল্পগুলোয় কে শোষক, কে শোষিত এটা আগে-ভাগে নির্ধারণ করা দূষ্কর হয়ে পড়ে এবং এসবের সবচে’ বড় সাফল্য এখানেই, যা তার ছোটগল্পকে বিশ্বসাহিত্যের অগ্রযাত্রায় উচ্চাসনে দাখিল করে। হুমায়ূন মানব চরিত্রের সকল দিকে পরিভ্রমণ করতে চান—দেখতে চান, মানুষকে যে চোখে আমরা দেখছি, এ দেখাটা পৃথিবীকে চিনে নিতে অধিকাংশ সময় ভুল তথ্য দেয়, শ্রেণিগতভাবেও মানুষের বিবেচনা ভুল বিবেচনা। তার ছোটগল্পের যে ধূসর জগত, তা প্রকৃত অর্থেই বড় ও জান্তব—স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের লোকজন এমন জীবন্ত হয়েছে খুব অল্প গল্পকারের কলমেই।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য