home কুকুর সংখ্যা মেমসাহেবের কুকুর ।। শ্রেয়া ঠাকুর

মেমসাহেবের কুকুর ।। শ্রেয়া ঠাকুর

আলমারির বন্ধ করে পাল্লার আয়নায় নিজেকে কিছুক্ষণ দেখলেন সুধাময়ী, তারপর বিড়বিড় করে উঠলেন- সময় কবে হবে? ঊনসত্তর বছর বয়সেও পোক্ত শরীর, বেঁটে, কালো চামড়ায় পরিশ্রমের ঝিলিক। সুধাময়ী জানেন তিনি রূপসী নন, এমনকি পাতে দেওয়ার মতো কোনো সৌন্দর্য তার নেই। বহু যুগ আগের ধুলো পড়া এক বউভাতের রাতে অমলেন্দু পাশ ফিরে ঘুমিয়ে এটা বুঝিয়ে দিয়েছিল। তারপর দিনে দিনে বুঝেছেন সুধা, সাদা চামড়ার ওপর তাঁর স্বামীর লোভের কথা, তার প্রতি অবহেলা এমনকি কখনও ঘেন্নার কথা, আর রেবেকার কথা।

রেবেকা স্মিথ, মধ্য কলকাতার কোনো এক বিখ্যাত বার সিঙ্গার, জাতে অ্যাংলো, স্বভাবে ডেমি মনডেন, রূপে গ্রেটা গার্বো। এসব অবশ্য সুধার উক্তি না। এক এক রাতের জবরদস্তি শরীর যাপনের পর ঘেন্নার সাথে যে তুলনাটা উড়ে আসত সেটা একসময় মুখস্থই হয়ে গেছিলো। ঈষৎ মাতাল অমলেন্দু অপমানটা ছুঁড়ে দিয়ে পাশের ঘরে চলে যেতেন, আর লজ্জায় ঘেন্নায় নিজের শরীরটা গুটিয়ে থরথর কাঁপতেন সুধা। নাহ্ রেবেকাকে চাক্ষুস দেখার সুযোগ কখনোই হয়নি তাঁর, কিন্তু কী অদ্ভুত ভাবে পায়ের পাতায় হঠাৎ নরম ভিজে ছোঁয়ায় চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেলো। টবি এসে নাক ঘষছে, কুচকুচে কালো ফক্স টেরিয়ারটার মাথায় হাত রেখে বাকি চিন্তাটা শেষ করলেন তিনি।

কী অদ্ভুত ভাবে রেবেকার শেষ জীবনের প্রিয় সঙ্গীর শেষ মুহূর্তগুলো তাঁর সঙ্গেই কাটছে। বিয়েটা যে অমলেন্দু বাবা সরিতশেখরের চাপেই করেছিলেন সেটা বউভাতের দিন’ই বুঝে গিয়েছিলেন সুধাময়ী বা, বলা ভালো বোঝানো হয়েছিল। ব্রীড়াবনত নববধূকে সুপুরুষ অমলেন্দু ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল- দেখো, তোমাকে আমার পছন্দ নয়। বংশ আর সম্মান রক্ষার জন্য সদব্রাহ্মণের মেয়ে দরকার ছিলো বাবার, তোমার সাথে সেই সব চাহিদা মিলে গেছে, বিয়ে করেছি। সন্তান ইত্যাদি ছাড়া আমার থেকে আর কিছু আশা কোরো না। অভাবে থাকবে না। এ বাড়িতে কুকুর বিড়ালকেও খেতে দেওয়া হয়, সেখানে তুমি তো কুলপ্রদীপের জন্ম দেবে। তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল অমলেন্দু। আর সুধাময়ী অনুভব করেছিলেন, সমস্ত ঘর জুড়ে একটা ছায়া যেন ঘনিয়ে আসছে। সেই ছায়া তার সারাটা জীবনের সংসারে কায়েমি ভাবে ছিলো। ছায়াটি রেবেকা স্মিথের।

টবির কুঁইকুঁই শব্দে আবার চিন্তাটা এলোমেলো হয়ে গেলো। আজ কেন যেন ভীষণ পুরোনো কথা মনে পড়ছে, আর টবিও যেন অস্থির। মাটিতে বসে পড়লেন সুধা। টবির গলা জড়িয়ে কাছে কোলের কাছে এনে বললেন- কী হয়েছে বাবা? খিদে পেয়েছে? পালটা উত্তরে টবি গাল চেঁটে দিলো। একটু আগেই অবশ্য খেতে দিয়েছেন ওকে। প্লাস্টিকের বাটিটায় যখন ঘাড় গুঁজে দুধভাতের সদ্গতি করছিলো টবি, তখন ওর শীর্ণ পিঠ আর নিজের আঙুলগুলোর মধ্যে অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছিলেন তিনি। আবার খেতে চায়? নাহ, আদর চায় মনে হয়। আদর সুধাও চাইতেন, অমলেন্দু যখন রোজকার সন্ধ্যে কিংবা নিশিযাপন শেষে ঘরে ফিরতেন। ভীতু কাঠবিড়ালির মতো কাছে গিয়ে দাঁড়াতেন সুধা। একটু কথা একটু আদর, না’ই বা ভালোবাসলো, বিয়ে করা বউ, পুরুষ মানুষ একটুও কি মুখ তুলে দেখবে না? হ্যাঁ, দেখতেন অমলেন্দু। এক এক রাতে, প্রমত্ত আর যন্ত্রণাময় সে মুখ তুলে দেখা। তবু কেমন এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিলো তাঁর। অমলেন্দু না থাকায় তাঁর ঘরে ঘুরঘুর করতেন। নিত্য নতুন রান্না করে টেবিলে ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করতেন; স্বামীভক্ত ছিলেন নাকি প্রভুভক্ত?

টবি এতোক্ষণে বেশ জাঁকিয়ে কোলে শুয়ে আদর খাচ্ছে। টবির শুয়ে থাকার মধ্যেও সুধা নিজেকে দেখতে পান। বড় ঘরে পাপোষটার ওপর যখন একদম নিথর শুয়ে থাকে, আউতি যাউতি কাজ করার সময় মাঝে মাঝে সুধার বুক ধড়াস করে ওঠে। মরে গেলো নাকি! তড়িঘড়ি এসে পেটে হাত দেন, ক্ষীণ ওঠানামা অনুভব করে আশ্বস্ত হন। অমলেন্দুর ‘আদরের’ সময় তিনিও এমন নিথর হয়েই থাকতেন, ভয়ে, ‘আগলি ফ্রিজিড ওম্যান’ তকমা এভাবেই জুটেছিলো তার।

সরিত শেখর বেশিদিন বাঁচেননি। শাশুড়ি তো অনেক আগেই মারা গিয়েছেন, তখন সুধা এ বাড়িতে আসেনি। সরিতশেখরের মৃত্যুর পর রেবেকায় আরো মজে গিয়েছিলেন অমলেন্দু, নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে। দক্ষিণের শহরতলিতে ছোট বাড়ি, সেখানে মনের মতো সংসার। রেবেকার কুকুর পোষার বাতিক, কিছুই অজানা ছিলো না। সুধাময়ীর সন্তানের চাহিদায় অবশ্য না করেনি অমলেন্দু, কিন্তু সে সন্তান গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়। আর চেষ্টা করার প্রবৃত্তি হয়নি। সংসার তো আর কিছুই ছিলোনা, ধোঁকার টাটিটুকু ছাড়া। সপ্তাহশেষে দুজনের দেখা হতো, সে তো না দেখা হওয়াই। ফলে আঠেরো থেকে ঊনসত্তর, এই দীর্ঘ সময়টা একাই কেটেছে তার। না, ঠিক একা নয়, রেবেকার ছায়ায়, একটা বয়সের পর শুচিবায়ুতে আর এখন টবির যত্ন আত্তির চক্করে। পাড়ার লোক খুব অবাক হয়। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকা বাতিকগ্রস্ত বুড়ি কিনা কুকুর পোষে! ভীমরতির রকমফের আছে বাপু। ঠিকে ঝি কমলা বলেছে তাকে। টবির দায়িত্ব যখন নিতে হয়েছিলো তখন অবশ্য যারপরনাই বিরক্ত আর সংকুচিত ছিলেন তিনি।

বছরখানেক আগের কথা, সারাজীবনের মধ্যে ঐ বছরখানেক আগের দিনটুকু অমলেন্দুকে নিজের মতো পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ততোদিনে সম্পর্ক শেষ, সব ব্যবহারিক অভ্যেস। ট্যাক্সি থেকে কাঁপা কাঁপা শরীরে নেমে এসেছিলেন অশীতিপর অমলেন্দু। সুধার হাত দুটো ধরে বলেছিলেন- সব শেষ হয়ে গেলো সুধা! বৃদ্ধের কাঁপা স্বরের কোনো প্রভাব পড়েনি সুধার ওপর। শক্ত করে হাত দুটো ধরে বলেছিলেন- এখন ভেঙে পড়ার সময় নয়! তারপর সেই অশীতিপর বৃদ্ধ, তাঁর প্রেয়সীর স্মৃতি আর টবি- এই নিয়ে একটা বছর আবার ঝড় ঝাপটায় কেটেছে তার। সেই ঝড় শেষ হলো, যেদিন বৈকাল সংঘের গাড়িটায় অমলেন্দু নিমতলা রওনা দিলেন। টবির লোমে বিলি কাটতে কাটতে আপন মনে হাসলেন সুধা, মেমসাহেবের কুকুর, মেমসাহেবের প্রেমিক, মেমসাহেবের ছায়া- মনে মনে আওড়ালেন। রেবেকাকে দেখার বড় ইচ্ছে ছিলো তার। কোন মন্ত্রে অমলেন্দুর মতো উন্নাসিক অত্যাচারীকে বেঁধেছিল সে, যে সারাজীবন সেই মন্ত্রের নেশা থেকে মুখ তুলতে পারলেন না আর! শুধুই কি রূপ? নাকি ভালোবাসাও ছিলো? তারপর দুজন চলে গেলো, সুধাময়ী তখনও একা, খেলার বাইরে, এখনও তাই। কিন্তু আর কতদিন?

মৃদু ভুক ভুক করে উঠলো ফক্স টেরিয়ারটা, আহ্লাদের ডাক, তারপর কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে দিলো। দুধভাত ছাড়া কিছু খেতে পারে না টবি। প্রায় পনেরো বছর হয়ে গেলো বয়স, ধুঁকছে সেও। প্রাণে ধরেও ইউথ্যানশিয়াতে সম্মত হতে পারেনি সুধা। এখন টবিকে কোল থেকে তুললেন জোর করে। গলা জড়িয়ে চোখে চোখ রাখলেন, প্রায় ফিসফিস করে বললেন- সময় কবে হবে বলতো? নাকি সময় করে নিতে হবে?

বাইরে তখন বেপাড়ার নেড়িকুকুর কোণঠাসা হচ্ছিলো। তুমুল চিৎকারে কান পাতা দায়।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য