home সমালোচনা সাহিত্য এক অন্ধ সুরঙ্গখনকের জবানবন্দি ।। গৌতম চৌধুরী

এক অন্ধ সুরঙ্গখনকের জবানবন্দি ।। গৌতম চৌধুরী

কবিতার বয়ান কি গদ্যে পেশ করা যায় নাকি? তাহা লইয়া কিছু বলিতে গেলে, ফিরিয়া একটি কবিতাই লিখিতে হয়। তাই বলিয়া কবিরা যে গদ্যেও কবিতার মোকাবিলা করেন না তাহা নয়। অনেক মহা মহা কবিই তাহার নমুনা রাখিয়াছেন। তবে, বলিতে কি, সেসবের বেশির ভাগ হইল কবি-র কথা, কবিতা-র কথা নয়। অর্থাৎ কবিতাকথার বকলমে নানা কবির নানা কিসিমের আত্মকথাই আমাদের আমলে লইতে হয়।  এবাদে, কিছু ইতিহাস বা দর্শনের মনোময় আলোচনা, বা উচ্চস্তরের সাহিত্যতত্ত্ব, বা অত্যন্ত চমকপ্রদ সব সূত্র এবাবদে আমাদের লাভের কড়ি হইয়াছে। যেমন, কবিতা হইল সেরা শব্দের সেরা বিন্যাস। বা, ভালো কবিতা বোধগম্য হইবার আগেই ভালো লাগে। বা, যতটুকু অনুবাদ করা যায় না ততটুকুই কবিতা। ইত্যাদি। কখনও কখনও অবশ্য কবিরা গদ্য লিখিবার অছিলায় কবিতাই লিখিয়াছেন। যেমন, যখন মোমের মতো জ্বলিয়া উঠে হৃদয়, ইত্যাদি। সম্প্রতি, আমাদের সাতকেলে বুড়ার একটি অবলোকনে নতুন করিয়া জব্দ হইয়া আছি। কবিতাকে উদ্দেশ করিয়া সেই যে ৩১ বছর বয়সী এক তরুণ লিখিয়া ফেলিলেন – তুমি এই পৃথিবীর প্রতিবেশিনীর মেয়ে (মানসসুন্দরী, ৪ পৌষ ১২৯৯), কবিতা লইয়া ইহার অধিক কোনও কথা হইতে পারে বলিয়া সহসা মালুম হইতেছে না।

     তবু বন্ধুজনের হুকুমনামা উপেক্ষা করা যায় না। কারণ হুকুমের আড়ালে ভালোবাসা আছে। একের ভিতর দিয়া অনেকের ভালোবাসার আভা আসিয়া পড়িতেছে ঠাহর হয়। সেইসব অদৃশ্য অনুকম্পা সহায় করিয়া, না হউক আত্মকথাতেই সামিল হইতে হয়। তবে, কথা খুবই সামান্য ও অগোছ বলিয়া, শরম।

     কবিতা, তুমি কোথা হইতে আস? কথা পাড়িতে গিয়া পহেলাই কেন যেন বিদ্যুৎবাহী একটি প্যাঁচানো তারের কথা মনে ভাসিল। তারের ওই বিসর্পিত অভিমুখেই কি তবে কবিতা? কিন্তু তারটি যদি সিধা হইত, তড়িৎলহরী তো তাহাতেও থমকাইত না। কুণ্ডলি পাকাইয়া থাকুক বা লম্বালম্বি শুইয়া থাকুক, ফণা তুলিয়া ছোবল মারিলে, বিষধরের বিষ সটাং আমাদের শরীরে। তবে কি তারের সেই রহস্যময়তাতেই কবিতা, যাহা বাহির হইতে কিছুই টের পাইতে দেয় না, অথচ ভিতর দিয়া হুহু বহিয়া যাইতেছে ঘনঘোর বিদ্যুৎ?

     হইবেও বা। দৃশ্যমান তারের ভিতর দিয়া, প্যাঁচানো বা সিধা নানা কিসিম তারের ভিতর দিয়া, ছুটিয়া আসিতেছে কত না কণাতরঙ্গ। দৃশ্যের ভিতর দিয়া ছুটিয়া আসিতেছে অদৃশ্য। অদৃশ্য, কিন্তু ধারণাতীত নয়। ঢেউয়ের ধাক্কায় ওই তো হৃদয়ের নিভৃত মৌজায় কোথাও ধ্বনিয়া উঠিতেছে আওয়াজ। নড়িয়া উঠিতেছে গোপন কলকব্জা। অন্ধকার ছিঁড়িয়া জ্বলিয়া উঠিতেছে ম্যাজিক লন্ঠন।

     বাঃ, এই তাহা হইলে ধরিতে পারা গেল কবিতার কুদরত। দৃশ্যমান জগজ্জীবন বাহিয়া ছুটিয়া আসা অদৃশ্য তরঙ্গ তাহা। আর কবির কাজ হইল সেইসব ঢেউলহরীদের গ্রেফতার করিয়া, পাঠকদের দূর দূর হৃদয়ে পৌঁছাইয়া দেওয়া। যদি কোথাও বাজিয়া উঠে কোনও মৃদুতম ঘণ্টা, চলিতে শুরু করে কোনও তাঁত, জ্বলিয়া উঠে কোনও ক্ষীণতম ফুলকি।

     আচানক শুনিলাম – খামোশ! স্রেফ তারের ভিতর দিয়াই তরঙ্গ আসে, কে বলিল? যোজন যোজন শূন্যতা টপকাইয়াও তো ছড়াইয়া পড়িতেছে কত না হাজার তড়িত-চৌম্বক ঢেউ। তার কই! সেইসব ঢেউয়ের ত্রিসীমানায় তো তারের কোনও ঠিকঠিকানা নাই। শূন্যতা বাহিয়া বহিয়া আসা ঢেউই বরং চারিদিকে কেবলই কিলবিল করিতেছে। তার, সে প্যাঁচানোই হউক বা সিধা, ঢেউ বহিবার কাজে লাগে বটে, কিন্তু তাহাদের কায়কারবার আর কতটুকু?

     কথা সহি। কিন্তু একথার ইশারা কি এই যে, কিছু কবিতা এই দৃশ্যমান দুনিয়াদারির ভিতর দিয়া আসিয়া পঁহুছিলেও, তাহার বাহিরে পড়িয়া থাকা যে-অপার শূন্যতা, আখেরে তাহাই অধিকাংশ কবিতাকে বহন করিয়া আনে? কিন্তু শূন্যতা তো ধারণাতীত। ধারণাতীতের ভিতর দিয়া কীভাবে ধারণায় উপস্থাপনযোগ্য কবিতা আসিয়া হাজির হয়! তবে কি সেইজন্যই কবিতাকে শেষতক ধারণার ভিতর নিরঙ্কুশভবে স্থাপন করা যায় না?

     প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, মাফ করিয়া দিবেন, এইসব প্রশ্ন ঘাড়ে করিয়া কস্মিনকালেও কবিতা লিখিবার খোয়াব দেখি নাই। আজও দেখি না। কথা বলাও তো এক ধরনের চলা। আজিকার এই আলাপের চলনে, পায়ে পায়ে এইসব আষাঢ়ে প্রশ্নের জটাজটিলতায় আসিয়া হাজির। নিজের কবিতা লিখার কোশেশ নিয়া যদি বলিতে হয়, তবে মানিতে হইবে, কোনও না কোনও নিরুপায়তা হইতেই এই আকামের পিছনে পড়িয়া থাকা। নিরুপায়তা এইরকম যে, যখন বোধ হইতে থাকে, অধরা একটি বিন্যাসকে নিষ্ক্রান্ত না করিয়া দেওয়া অবধি নিস্তার নাই। আশৈশব জানিয়া-চলিতে-থাকা একটি  ভাষার শব্দ দিয়া গঠিত এযাবৎ সম্পূর্ণ অজানা একটি বিন্যাস। মানে, আমার নিজের কাছে অজানা। লিখিতে লিখিতে যাহা জানা হইয়া উঠে। জানা হয়, তবে বুঝা হয় না। যেমন এই লিখাটিও আমি লিখিতে লিখিতে জানিতেছি বটে, তবে যেহেতু এইটি গদ্য, জানিতে জানিতে ইহা বুঝিতেছিও। কবিতার ব্যাপারে তেমন কোনও কথা হলফ করিয়া বলিতে পারি না। তবে বুঝা না-গেলেও, কবিতা টের পাওয়া যায়।

     মানিতে হয়, এই টের পাওয়া ব্যাপারটি খানিক ধোঁয়াটে। ইহার ব্যাখ্যা লইয়া প্রিয়জনদের ভিতর ধারণার এক দ্বিমেরুবিশ্ব দেখিতে পাই। কেহ কেহ মনে করেন, যেসকল কবিতার মর্মার্থ লিখা যায় না, তাহারা শব্দের স্বেচ্ছাচারিতা মাত্র, কবিতা নয়। অপরেরা বলেন, যুক্তির দিন ফুরাইয়াছে, এইবার অযুক্তি দিয়া কবিতাকে জায়েজ করিতে হইবে। পহেলার রক্ষণশীলতায় মজা পাই। দোসরার নৈরাজ্যবাদে রোমাঞ্চ অনুভব করি।

     উপরের দুই বিশ্বাসকে যথাক্রমে ডানে ও বামে রাখিলে, আকৈশোর সংস্কার অনুযায়ী বামদিকের প্রতিই আমার স-তর্ক টান। ভিতরে অবশ্য একটি আলগোছ বাহাস চলিতে থাকে। বাম দিকে তাকাইয়া বলি – যুক্তির রণপায় দৌড়মারা ভাবনাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করিয়া লইলেও, শব্দের ভিতর দিয়া মনের উড়াল আটকাইবে কে! এক লপ্তে উচ্চারিত শব্দরাশির ভিতর দিয়া আমাদের মনই তো ধরা খায়। অপর মনে এই মনই গিয়া পৌঁছায়, শব্দের হাড়গোরমাত্র নয়। মনের সেই প্রক্ষেপণ যত বিমূর্তই হউক, সামান্য কথায় প্রকাশের অযোগ্য হউক, তাহার একটি আস্বাদন আছে। মুরুব্বিরা যাহাকে রসাস্বাদন বলিয়াছেন। এইটি না-ঘটিলে তো কবির কারিকুরি ষোল আনাই মাটি। কৌতুকের বিষয়, নিজেই আবার ডান দিকে ফিরিয়া বলি – জমাট বাঁধা একটি ভাবনার টুকরা ছুঁড়িয়া দিলেই যে রসাস্বাদন ঘটিবে, ইহা কুসংস্কার মাত্র। তবে তো চমকপ্রদ কিছু ভাবনার উপস্থাপনা ঘটাইতে পারিলেই তাহা কবিতা হইয়া উঠিত। সেই সূত্রে বুদ্ধিদীপ্ত কিছু কৌতুক বা ধাঁধা বা অন্ধেরা কীভাবে ব্যাঙ্কডাকাতি করিয়াছিল তাহার রোমাঞ্চকর অনুশীলনের বিবরণও কবিতা হইতে পারিত। কবিতা হইয়া উঠিতে এইসবের কাহারওই অবশ্য বাধা নাই। কিন্তু নিছক ভাবনা দিয়া যে কবিতা লিখিত হয় না, লিখিত হয় শব্দ দিয়া – এমন প্রবচনটির এখতিয়ারও বহুদূর অবধি বহাল থাকে।

     শূক ও সারির মতো এই দ্বান্দ্বিকতাকে দানাপানি দিতে দিতে খেয়াল করি, বাংলাকবিতার হাল আমলের আদিকবিও বুঝি শব্দকেই জয়মাল্য পরাইয়াছেন। আর তাই, কবির সংজ্ঞা নিরূপণ করিয়াছেন এইভাবে – শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণ কি ঠিক হইল? উপরের বয়ানটি তো এহেন বিবৃতির ভিতর দিয়া শেষ হয় নাই। আখেরে তাহা একটি সংশয়ে আসিয়া থামিয়াছে। মধুসূদনের কবিতাটি হইতে প্রাসঙ্গিক অংশটি একবার পড়িয়া লইলেই কবির সেই ধন্দের কথা সাফ সাফ বুঝা যায় – কে কবি – কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,/ শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,/ সেই কি সে যম-দমী? (কবি, চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী)। কবিতাটি ধরিয়া আরও একটু আগাইলে আরও ধরা পড়ে, শব্দবাদী পূর্বাচার্যদের নিদান তাঁহাকে বড় একটা খুশি করিতে পারে নাই। ফলে তিনি নিজেই কবির একটি সংজ্ঞা অবিনির্মাণ করিয়াছেন। আর তাহা করিতে গিয়া এস্তেমাল করিয়াছেন এক নতুন নিরিখ। তাহা হইল কল্পনাশক্তি – সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী/ যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন। পরে পরে রবীন্দ্রনাথ (কবিতা কল্পনালতা) এবং জীবনানন্দও (কল্পনাপ্রতিভা) সেই কল্পনাসুন্দরীর উপরেই নিজ নিজ সিলমোহর চড়াইয়াছেন।

     তাহা হইলে? কল্পনাশক্তি আমার আছে কি নাই, সেই কথা আমি বলিব কেমনে! আমি শুধু নিজেকে এক অন্ধ সুরঙ্গখনকের মতো জ্ঞান করি। অপর প্রান্তে পঁহুছিলে চোখে আলো ফুটিবে এই নিরুপায় ভরোসায়, কখনও দাঁড়াইয়া কখনও বসিয়া কখনও বুকে হাঁটিয়া, সুরঙ্গ কাটিতে কাটিতে চলি। অন্ধের আর অন্ধকারকে কী ভয়! 



মাঘ ১৪২০

গৌতম চৌধুরী # gc16332@gmail.com

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য