গাসান কানাফানির সাক্ষাৎকার | ভাষান্তর : মাসিয়াত জাহিন

গাসান ফায়েজ কানাফানি ফিলিস্তিনের বিখ্যাত কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালের ৮ এপ্রিল ফিলিস্তিনে; ইসরায়েলি গোয়েন্দাসংস্থা মোসাদ তাঁকে লেবাননের বৈরুতে গুপ্তহত্যা করে হত্যা করে ১৯৭২ সনের ৮ জুলাই। মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে তিনি সাহিত্য ও জন্মভূমির স্বাধীনতা আন্দোলনে এমন ভূমিকা রেখেছেন যে, আজও তিনি ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অভ প্যালেস্টাইনের সম্মুখসারির নেতা ছিলেন। এই সংগঠনের পত্রিকা আল-হাদাফের সম্পাদনা পর্ষদে কাজ করেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। Men in The Sun (1962), All That’s Left to You (1966), Umm Sa’ad (1969), Return to Haifa (1970) তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ১৯৭০ সালে বৈরুতে কানাফানির এই সাক্ষাৎকারটি নেন  রিচার্ড কারলেটন। ১৯৭০ সালে বলা কানাফানির কথাগুলো ফিলিস্তিন ও বিশ্বরাজনীতিতে আজও প্রাসঙ্গিক। ফিলিস্তিন বিষয়ক এই বিশেষ সংখ্যার জন্যে সাক্ষাৎকারটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন কবি মাসিয়াত জাহিন।


ফিলিস্তিনের লোকেরা হেরে যাওয়ার বদলে দাঁড়িয়ে মরতেও খুশি

ফিলিস্তিনের দেয়ালে কানাফানির গ্রাফিতি

সাক্ষাৎকারগ্রহীতার নোটঃ কিছু ব্যাকরণগত ভুল ঠিক করা ছাড়া, লেখক সাক্ষাৎকারটিতে কোন সংযোজন বা অতিরঞ্জন করেননি। যেহেতু বক্তা স্থানীয় নন তিনি কিছু ব্যাকরণগত ভুল করেছিলেন এবং বিষয়বস্তু ভালমত বোঝা যায় এমনভাবে বাক্যগুলিকে ঠিক করেননি। 

ইন্টারভিউয়ারঃ গাসান কানাফানি পপুলার ফ্রন্টের (পিএফএলপি, পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন) বৈরুতের নেতা। তিনি প্যালেস্টাইনে জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু ১৯৪৮, তার ভাষ্যমতে, জায়োনিজমের সন্ত্রাস থেকে পালিয়ে যান। তারপর থেকে তিনি জায়োনিস্ট এবং প্রতিক্রিয়াশীল আরবদের ধ্বংস পরিকল্পনা করছেন। 

গাসান কানাফানিঃ আমি যা স্পষ্টভাবে জানি, পৃথিবীর ইতিহাস সবসময়ই সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের লড়াইয়ের ইতিহাস। সেই ন্যায্যতার লড়াই করা দুর্বল লোকদের, শক্তিশালী লোকদের বিরুদ্ধে, যারা তাদের শক্তি ব্যবহার করে দুর্বলদের শোষণ করার জন্য ।

ইন্টারভিউয়ারঃ জর্দানে বর্তমানে যে যুদ্ধটি চলছে তা নিয়ে কথা বলি। আপনার সংগঠন এই যুদ্ধের একটি পক্ষ। এটি কি অর্জন করেছে?

কানাফানিঃ একটা জিনিস। যে আমাদের লড়াই করার জন্য একটা কারণ রয়েছে। এটা অনেক বড় ব্যাপার। ফিলিস্তিনের লোকেরা হেরে যাওয়ার বদলে দাঁড়িয়ে মরতেও খুশি। আমরা কি অর্জন করেছি! আমাদের অর্জন হলো আমরা রাজাকে ভুল প্রমাণ করেছি। আমাদের অর্জন হলো আমরা প্রমাণ করেছি এ জাতি বিজয়ের আগ পর্যন্ত লড়াই করবে। আমাদের অর্জন হলো আমাদের লোকদের কখনো হারানো যাবে না। আমাদের অর্জন হলো দুনিয়ার প্রতিটা লোককে জানানো যে আমরা একটা ছোট সাহসী জাতি যারা তাদের রক্তের শেষ ফোঁটা দিয়ে লড়াই করবে, আমাদের ন্যায্যতা পাওয়ার জন্য যেটা পৃথিবী আমাদেরকে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এটা অর্জন করেছি। 

ইন্টারভিউয়ারঃ আসলে মনে হচ্ছে যে এই যুদ্ধ, এই গৃহযুদ্ধটা নিষ্ফল হচ্ছে….

কানাফানিঃ (কথা থামিয়ে দেন এবং রাগতভাবে বাঁধা দেন) এটা গৃহযুদ্ধ না। এটা মানুষের লড়াই, নিজেদেরকে একটা ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে রক্ষার– যা আপনারা সমর্থন করছেন শুধু রাজা হুসাইনের একটা আরব পাসপোর্ট আছে বলে। এটা গৃহযুদ্ধ না।

ইন্টারভিউয়ারঃ অথবা একটা দ্বন্দ্ব?

কানাফানিঃ এটা কোন দ্বন্দ্বও নয়। এটা ন্যায়ের লক্ষ্যে স্বাধীনতার লড়াই।

ইন্টারভিউয়ারঃ সেটা যাই হোক, কিন্তু…

কানাফানিঃ (রেগে বাধা দেয়) এটা মোটেও যাই হোক না। কারণ এখানেই সমস্যাটা শুরু হয়। আমাকে প্রশ্ন করার সময় আপনি এগুলোই মাথায় রাখেন। ঠিক এখানেই সমস্যাটা শুরু হয়। এরা সেই লোক যারা বঞ্চিত, যারা তাদের অধিকারের জন্য লড়ছে। এটা ঐতিহাসিক। যদি আপনি বলেন এটা গৃহযুদ্ধ, তাহলে আপনার প্রশ্ন ঠিক মনে হবে। আপনি যদি বলেন এটা সংঘর্ষ, অবশ্যই যা ঘটছে তা আপনার জন্য চমক হবে। 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনার সংগঠন কেন ইজরায়েলিদের সাথে শান্তি আলোচনা করছে না?

কানাফানিঃ আপনি আসলে শান্তি আলোচনা বোঝাচ্ছেন না, আপনি বোঝাচ্ছেন শর্তাধীন আত্মসমর্পণ, আত্মসমর্পণ। 

ইন্টারভিউয়ারঃ কেন আলোচনা নয়?

কানাফানিঃ কার সাথে আলোচনা?

ইন্টারভিউয়ারঃ ইসরায়েলি নেতাদের সাথে।

কানাফানিঃ আপনি যা বলছেন তা হলো তলোয়ারের সাথে গর্দানের আলোচনা!

ইন্টারভিউয়ারঃ যখন ঘরে তলোয়ারও নেই বন্দুকও নেই, আপনারা কথা বলতে পারেন।

কানাফানিঃ না, আমি কখনো উপনিবেশবাদী পক্ষ আর জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনা দেখিনি।

ইন্টারভিউয়ারঃ তা সত্ত্বেও কথা কেন নয়?

কানাফানিঃ কি বিষয়ে কথা? 

ইন্টারভিউয়ারঃ যুদ্ধ না করার সম্ভাবনা নিয়ে?

কানাফানিঃ কি নিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করব?

ইন্টারভিউয়ারঃ যা কিছুর জন্যই হোক, কোনভাবেই যুদ্ধ যেন না হয়।

কানাফানিঃ মানুষ সাধারণত কিছু একটার জন্য লড়াই করে এবং কিছু একটার জন্য লড়াই বন্ধ করে। আপনি আমাকে বলতে পারবেন না কেন আমাদের কথা বলা উচিত এবং কি নিয়ে। কেন যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে? কেন আমাদের তা করা উচিত?

ইন্টারভিউয়ারঃ যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে কথা বলা উচিত এই মৃত্যু, দুর্দশা, ধ্বংসযজ্ঞ, যন্ত্রণা বন্ধ করার জন্য।

কানাফানিঃ দুর্দশা, ধ্বংস, যন্ত্রণা কাদের?

ইন্টারভিউয়ারঃ ফিলিস্তিনি, ইসরায়েলি ও আরবদের।

কানাফানিঃ ফিলিস্তিনি লোক যাদেরকে উৎখাত করা হয়, ক্যাম্পে পুরে ফেলা হয়, অনাহারে রাখা হয়, বিশ বছর ধরে যাদের হত্যা করা হয়েছে এবং যারা ‘প্যালেস্টেনিয়ান’ নামটাও ব্যবহার করতে পারে না?

ইন্টারভিউয়ারঃ তাহলে মৃত্যু বন্ধের জন্য যুদ্ধ বন্ধ করাই তো ভাল।

কানাফানিঃ আপনাদের কাছে হতে পারে, আমাদের কাছে নয়। আমাদের জন্য আমাদের দেশকে স্বাধীন করা, সম্ভ্রম, সম্মান, আমাদের ন্যুনতম মানবিক অধিকার, জীবনের সমান গুরুত্বপূর্ণ। 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনি রাজা হুসেইনকে ফ্যাসিস্ট বলেছেন। আরবের আর কোন নেতাদের আপনি সম্পূর্ণ বিরোধী।

কানাফানিঃ আমরা আরব সরকারদের দুই ভাগে দেখি। একদল হলো প্রতিক্রিয়াশীল, যারা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে পুরোপুরি যুক্ত; রাজা হুসাইনের মত, সৌদি আরব সরকার, মরোক্কান সরকার, তিউনিশিয়ান সরকারের মত। এরপর আরব সরকারদের মধ্যে আরও আছে মিলিটারি পেটি বুর্জোয়া সরকার, যেমন, সিরিয়া, ইরাক, মিশর, আলজেরিয়া ইত্যাদি।

ইন্টারভিউয়ারঃ শেষ করার আগে বিমান হাইজ্যাক করার ব্যাপারটিতে ফিরে যাই। আপনার কি এখন মনে হয় এটি ভুল ছিল?

কানাফানিঃ আমরা  হাইজ্যাক করে কোন ভুল করিনি। তারা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। আমরা সারাজীবনের সবচেয়ে শুদ্ধতম কাজগুলোর মধ্যে একটি করেছি।


মাসিয়াত জাহিন

কবি

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading