বর্ণালী সাহার সাক্ষাৎকার | আলাপকারীঃ রুহুল মাহফুজ জয়

মার সমসাময়িক যেসকল লেখক কথাসাহিত্য করছেন, তাদের মধ্যে আমি পাঠক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ বর্ণালী সাহা-তে; তাঁর লেখার বিষয়াবলি এবং অতি অবশ্যই লেখায় ক্রাফটের আভিজাত্যের ব্যাপারগুলি এই মুগ্ধতার জন্ম দিয়েছে। বর্ণালী সাহার একমাত্র উপন্যাস ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ এবং দু’টি গল্প সংকলন ‘আম্মা ও দূরসম্পর্কের গানগুলি’ ও ‘জবরখাকি’-তে তিনি যেসব গল্প বা আখ্যান হাজির করেছেন, সেসব আখ্যানে যেসকল চরিত্র, তা অতীতচারী নয়, একেবারে অত্যাধুনিক সময়ের—অর্থাৎ বর্ণালীর সাহিত্যকে আপনি তখনই ধারণ করতে পারবেন, যখন দুনিয়ার হালচাল সম্পর্কে আপনার যথাযথ ধারণা থাকবে, যখন আপনার মধ্যে একইসঙ্গে রসবোধ ও মেলানকোলিয়ার মিলমিশ থাকবে। সাহিত্যে বর্ণালীর কথনভঙ্গি ও ভাষা জীবন্ত, যেন পুকুরে খইলশা মাছ দল ধরে সাঁতার কেটে চলে—এতটাই স্পন্টেনিয়াস। বর্ণালীর চরিত্ররা চিন্তার বহুমাত্রিক উন্মোচন, দুনিয়াকে দেখার ভিন্ন ভিন্ন চোখ নিয়ে হাজির হয়। আমি পাঠক হিসাবে এই সময়ে যা পড়তে চাই, বর্ণালী সাহার সাহিত্যরচনায় তা হাজির পাই। তাঁর সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে যৎসামান্য আলাপ রইলো এখানে।

— রুহুল মাহফুজ জয়


বাংলায় লেখা, মূলত বাংলাতেই লেখা, এবং ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার জন্য ব্যস্ত না-হওয়া আমার নিজস্ব রাজনীতির অংশ


রুহুল মাহফুজ জয়:

সিডনির (নাকি মেলবোর্নে বাস করেন আমাদের লেখিকা?) দিনকাল এখন কেমন? লন্ডনে এই তাপমাত্রা বাড়ে, এই কমে, কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই।

বর্ণালী সাহা: মেলবোর্ন থাকি আমি। দিনকাল চলনসই। ২০২৪ আরেকটু ধীরে, আরেকটু স্থিরতার মধ্যে দিয়ে যেতে পারতো আমার জন্য। তবে নিজের জীবন নিয়ে বড়ো কোনো অভিযোগ নাই। নিজের ‘সময়’ নিয়ে সন্তুষ্ট নই, তবে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছি এই সময়ের দুষ্পাচ্য বিষয়গুলিকে, এবং এই সময়ের যেই বিষয়গুলি নিজেকে নিজের কাছে অসহ্য করে তোলে, সেইগুলিকে তাদের আসল আকারের তুলনায় অবয়বে বেশি বড়ো করে না ভাবতে।

জয়:

আপনার কৃষিকাজের খবর কী?

বর্ণালী:

দেড়-দুই বছর আমি ফুল-টাইম চাষবাস করেছি।  এই বছর হওয়ার কথা ছিল “এল নিনো” বছর – মানে চরম বৈশ্বিক খরার বছর। দক্ষিণ গোলার্ধে এখন গ্রীষ্ম শেষ হবে সবে শরৎ এলো। আমরা সবাই ভেবেছিলাম গ্রীষ্মের তাপমাত্রা রেকর্ড স্পর্শ করবে, এবং আমরা যারা মূলত শৈত্যপ্রধান আবহাওয়ার এই শহর মেলবোর্নের আঙিনায় গরমের সবজি লাউ, করলা, মরিচ আর শিম গজাই, তারা (বুশফায়ারের ভয় সত্ত্বেও) খুশিই হয়েছিলাম। তা হয় নাই। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির যেই উষ্ণতার ফলে খরার ঘটনা ঘটে, তাকে কাটাকাটি করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় পূর্ব-দক্ষিণ উপকূলের পানির তাপমাত্রা। টানা তিনদিনের বেশি গরম আবহাওয়া পাই নাই। গ্রীষ্মের শুরুর অংশটা ঢাকায় কাটিয়েছি। এতে এই ঋতুতে বাগান খানিকটা অবহেলিত ছিল। ফলন মন্দ নয়, তবে আরো ভালো আশা করেছিলাম। প্রতিটা গাছ বীজ থেকে গজাই আমি। শীতে যখন বাইরে হাড়-জমানো ফ্রস্ট আর চামড়া-ছ্যাঁদা-করা বৃষ্টি পড়ে, আমার বাড়ির অফিসঘরে তখন লম্বা ট্রে-তে বালি গরম করে আর সূর্যের আলোর লুমেন গ্রেইডের সমান বাতি ঝুলিয়ে আমি বীজের অঙ্কুরোদ্গম সমাধা করি। ১০-১২ সপ্তাহ ধরে চারাগুলিকে মুরগির বাচ্চার মতো যত্নে বড়ো করি। বসন্তের শুরুতে শীতরোধী কাপড়ের ঘের দিয়ে মাটিতে বসাই। বসন্তের মাঝামাঝি থেকে শরতের শেষতক ফল-ফসল পাই। শামুক, স্লাগ, ইয়ারউইগ, পসাম, ইঁদুর, পাখি, বিধ্বংসী শুঁয়াপোকা – এতোসব ইবলিসের সাথে ইম্পসিবল যুদ্ধ করি। এত পাগলামি করি দেখেই হয়তো ফলন ভালো না হলে একটু মুষড়ে পড়ি।

জয়ঃ

বাহ্! আপনি কৃষক হিসাবেও চমৎকার। কৃষিকাজের এই যে প্রক্রিয়ার কথা বললেন, লেখালেখির কাজও একই রকম মনে হয় আমার। একজন লেখকও আসলে প্রকৃত কৃষক।

একাডেমিক স্কলার হয়ে থাকতে পারতেন, কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বিজনেস প্ল্যানিংয়ে থাকতে পারতেন কিংবা সঙ্গীতেও ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন, সব ছেড়ে লেখালেখিটা ক্যানো বেছে নিলেন?

বর্ণালী:

যা-যা বললেন, তার সবগুলিই আমি করেছি জীবনে। শতভাগ দিয়েই করেছি – ক্লান্তি, অন্তঃসারশূন্যতা কিম্বা ফিউটিলিটির সেন্স ভর করার পরও করেছি, তবে মোটিভেশন বা মানসিক উদ্যমের রস যেইমাত্র ফুরিয়েছে, ছেড়ে দিয়েছি। আমি ‘ক্যারিয়ার’ স্কুল অভ থটে বিশ্বাস করি না। মানুষ দিন-দিন ফ্যাক্টরির বস্তুই হচ্ছে হয়তো, গায়ে তার বারকোড লাগছেই হয়তো; তবে যা কালের নিয়মে অর্থাৎ এমনিতেই হচ্ছে, তার বেশি তো করার দরকার নাই। সব শব্দকে আমি আমার মনের উপর অধিকার কায়েম করতে দেবো না।

সঙ্গীতকে – বা বলা ভালো, আমার সঙ্গীতকে – আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম, এমন একটা বোধ আমার আছে। বিস্তারিত অন্যত্র বলা যাবে, তবে আনন্দের উৎসকে ট্রমার উৎস থেকে আলাদা করতে পারার যাত্রা সহজ নয়। এই যাত্রা প্রায় এক দশককাল ধরে আমাকে ভুগিয়েছে। রেয়াজ চালু রেখেছি। মেলবোর্নে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সিরিয়াসভাবে চর্চা করছে, এমন একটা বৃত্ত ধীরে-ধীরে গড়ে তুলছি। সামনে কখনো গান নিয়ে প্রকাশ্যে (ছোটো আকারে) আসতে পারব হয়তো।

লেখালেখির মতো সহজ আমার জন্য দুনিয়ার আর কোনো কাজ নয়। “জাত লেখক” এখন ক্লিশে শব্দবন্ধ হয়ে গেছে, তবে আমি সত্যিকার অর্থে তা-ই। এই সময়ে যখন লোকে বই-ই পড়ার সময় পায় না, তখন “কেন লিখি?” এই প্রশ্ন  নিজের প্রতি একটা অভিযোগের মতোই হয়তো আসে। এই প্রশ্ন নিয়ে ডিল করে বুঝেছি যে, আমি এই ধাতুতেই গড়া, ক্ষুধার্ত শিশুর মতো প্রবৃত্তির চাপে আমি এই পাতেই থাবা দেবো, এবং আজ পর্যন্ত আমি এই সমস্যার বিশেষ উপশম পাই নাই।

চাকরির পথে এখনো আছি। চাকরিজীবনের শুরু এবং বিকাশ ‘মাল্টিন্যাশনালেই’, এখন ওই বস্তুর উপর কোনো স্পেশাল মূল্যমান আরোপ করি না। আমার প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সাথে সুবিচার করে, এমন চাকরি করতে পারলেই আমি খুশি। ভরপেট খেয়ে লিখতে বসার আনন্দের সাথে খুব কম আনন্দেরই তুলনা চলে।

জয়:

আশা করি কখনো লাইভ আপনার গান শুনতে পাবো। এমন এক দেশের আর ভাষার পাঠকের জন্যে লিখছেন, সাহিত্যের পাঠক কম, সিরিয়াস সাহিত্যের পাঠক তো খুবই কম, এরপরে আছে লেখক-মিডিয়ার দলাদলি, স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য— আফসোস হয়?

বর্ণালী:

যখন বলতাম “আফসোস হয়”, শুরু-শুরুতে, তখন সকলে কনসার্নড হয়ে যেতেন। বোঝাতে বসতেন, “না, বর্ণালী। এইসবে কেন দমবে তুমি?” ভয়ও পেতেন অনেকে, পাছে বাংলা থুয়ে ইংরেজি লেখা শুরু করি। কিন্তু এখন, এর মাঝেই এতবার বলেছি “আফসোস হয়”, ‘প’-বর্গীয় তৃতীয় বর্ণ দিয়ে শুরু হয় যেই শব্দটি – সেই শব্দটি এতবার বলেছি, আর তারপর এতবার বাংলা লেখার কাছেই ফিরে গেছি যে, এখন নিজের কাছেই নিজে মিথ্যাবাদী রাখাল হয়ে গেছি। যা হোক, নিজেকে এইরকম মোটাদাগের ব্যাকহ্যান্ডেড কমপ্লিমেন্ট না-দিতে চাইলে সোজাসাপটা বলা যায় যে, কখনো-কখনো নিঃসন্দেহে রাগ হয়, কষ্ট হয়, লেখার ‘এন্টারপ্রাইজ’টিকে অন্যায্য লাগে, তবে আমার নিজের লেখা নিয়ে আমার যেই আনন্দ আর আত্মবিশ্বাস, তার কাছে বেশিরভাগ সময় বাকি সবকিছু সামান্য হয়ে পড়ে।

বাংলায় লেখা, মূলত বাংলাতেই লেখা, এবং ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার জন্য ব্যস্ত না-হওয়া আমার নিজস্ব রাজনীতির অংশ। এই দায়ের কাছে মোটামুটি পরিষ্কার থাকতে পারায় আমার আফসোস আরেকটু কম হয়। So, there’s that.

জয়:

প্রকাশকরাও তো তেমন পেশাদার না। বইয়ের প্রচার-প্রচারণাও সব লেখকেই করতে হয়।

বর্ণালী:

মোটের উপরে আপনার কথাই ঠিক। তবে যত আমি আমার কাজের সংখ্যা বাড়িয়েছি, প্রকাশক বিষয়ে আমার নিজের অভিজ্ঞতা খারাপ থেকে ভালোর দিকেই গেছে। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় কড়া নাড়ার একটা ভূমিকা আছে আমার নিজের ক্ষেত্রে, একই সঙ্গে আছে সঠিক সময়ে বেঠিক জায়গায় কড়া নেড়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা (বেঠিক সময় নিয়ে কথা বলা অবান্তর, কারণ লেখার জন্য সকল সময়ই সঠিক সময় – বই প্রকাশের জন্য সঠিক সময় থার্ড ড্রাফট পর্যায়। এইসব আমার নিজের জন্য রুল অভ থাম্ব। না-মানতে চাইলে না-মানুন)। তদুপরি, অনেকেই জানেন যে, লেখকবৃত্তীয় অহঙ্কারে আমার মাটিতে পা পড়ে না। আমি এমনকি আমার প্রথম বইটিও পয়সা দিয়ে ছাপি নাই। সৌভাগ্যবশত আমি স্পষ্টবাদী এবং যাঁর যেই কাজটি করার কথা, সেই কাজটি তিনি না করলে অত্যন্ত সরাসরি এবং অত্যন্ত বিনীতভাবে আমার বিরক্তিটি প্রকাশ করি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তি লেখকের শক্ত হাতে নিজের কাজটির কাস্টোডিয়ান হওয়া ছাড়া, নিজের জায়গা থেকে প্রকাশককে তাঁর কাজটি করতে অনুরোধ করা ছাড়া, তেমন কোনো গত্যন্তর নাই। এই বিষয়টি নিদারুণ দুঃখের ও লজ্জার (লজ্জাটি আমার নয়, অর্থাৎ লেখকের নয়)।

জয়:

‘মাইয়া মানুষ, কি আর সাহিত্য করবে’ টাইপ ব্যাপার-স্যাপার ফেইস করেছেন?

বর্ণালী:

করেছি। বাংলাদেশে কোনো মেয়ে একটা আস্ত ‘সসেজ ফেস্ট’-এর মাঝখানে গিয়ে নিজের জায়গা দাবি করেছে এবং এই “মাইয়ামানুষ” গোছের কথা শোনে নাই, এমন কথা কেউ দাবি করলে আমি তাকে মিথ্যা বলার জন্য পুলিশে দেবো।

জয়:

আপনার উইটকে নমস্কার… হা হা হা। আপনার লেখালেখি বা সাহিত্যিক-জীবনের সবচেয়ে বড়ো জ্বালানি কী? লেখালেখির শুরুর সময়টা সম্পর্কেও জানতে চাই।

বর্ণালী:

সবচেয়ে বড়ো জ্বালানী আমার গল্প বলার ক্ষুধা আর আমার কল্পনাশক্তি আর আমার বইময়, সাহিত্যময় শৈশব। লেখালেখির শুরু নিয়ে আপনার সাথে সাহিত্য আড্ডায় (ফেইসবুক লাইভ “জয় স্পীক্স” নাম ছিল কি সেইটার?) বিস্তারিত বলেছি। সংক্ষেপে বললে, পাঠের পরিবেশ এবং মনের একটা নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তোলার উৎসাহদায়ী পরিবার – এই দুই ছিল আমার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত প্রিভিলেজ। অনেক বড়ো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না যে “আউট বই” নামে একটা জিনিস আছে – মানে বইয়ের জগতে আশরাফ-আতরাফ থাকতেই পারে – তবে ব্যবহারিক উপযোগের বিচারে যে বই দুই বা তিন রকম শ্রেণীর হয়ে থাকতে পারে, এই জ্ঞান আমার ছিল না। আমি ছিলাম চানাচুরের ঠোঙ্গা থেকে শুরু করে রাজশেখর বসুর বাল্মিকী-রামায়ণ পাঠ করা শিশু। ওই বয়সে “বোঝা/ না-বোঝা”র চাপ নিতে হয় না, হয়তো সেইটা একটা বড়ো কারণ। পড়তে-পড়তে যখন বোরড হয়ে যেতাম, যা পড়তে মন চাইছে, তা যখন পেতাম না, তখন নিজে লিখতে বসতাম। আমার বাবা (তখনও এক সন্তানের জনক হওয়ায় নিদারুণ আদিখ্যেতাময়) খুব গর্ব করে বলতেন যে, রবীন্দ্রনাথ প্রথম কবিতা লিখেছিলেন নয় বছর বয়সে, আর তাঁর মেয়ে লিখেছে পাঁচ বছর বয়সে। আমার মা (আদিখ্যেতা নাই বললেই চলে, কিন্তু আমার বাবা যা বলবে, তার ভুল তো ধরা চাইই চাই) বলেছিলেন, “তাও তো রবীন্দ্রনাথের ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ নকল করে লেখা”। যা হোক, দুনিয়ার নিয়ম এমন যে, গাছে চড়লে নামতেও হয়। শুরুর দিকে আমার লেখা স্কুলে নিয়ে গেলে অপমানিত হতাম। শিক্ষিকারা বলতেন, “কোথা থেকে চুরি করেছ এই লেখা? তুমি কী করে এইসব শব্দ জানো? নিশ্চয়ই তুমি লেখাচোর। বল বল বল!” মা’কে ডেকে একবার জানানো হলো যে, তাঁর মেয়ে একে তো লেখাচোর, তার উপর প্যাথোলজিকাল লায়ার। বাড়ি ফিরে মা আমাদের সেই সুবিশাল ‘লাইব্রেরি’ তন্নতন্ন করে ঘাঁটলেন, খুঁজলেন আমার সেই কবিতার সাথে সাদৃশ্যময় কবিতা। আমি ব্যথিত আর প্রায়-প্রতারিত মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম নীরবে। কিছুই খুঁজে না-পেয়ে আমার মা আমাকে জড়িয়ে ধরে অল্প একটু কেঁদেছিলেন – শিশুদের কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার চল আজও নাই আমাদের সমাজে, তাই অতটুকুকেই আমি যথেষ্ট অ্যাপোলজি ভেবে নিয়েছিলাম। এই বিষয়টা নিয়ে আমার মা আজও অপরাধবোধে ভোগেন। যা হোক, লেখার সাথে বিজড়িত অপমানের স্মৃতি আমার এতই পুরানো।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাক্ষাৎকারগ্রাহী কবি-সাহিত্যিকগণ শিশুবয়সের লেখাকে “লেখালেখির শুরু” মানতে চান না – এই প্রবণতাটি আমাকে আশ্চর্য করে। আমি লেখালেখির শুরু বলতে কখনোই “প্রথম যেইদিন কখগ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক আমার লেখা ছাপতে রাজি হয়েছিলেন” গোছের কিছু বুঝি না। এইরকম কথা শুনলে আমার বেদম রাগ হয়। যেন ছাপা হওয়ার আগে লেখকের একটা যাত্রা নাই; ছিল না কোনোকালে। লেখকের লেখালেখির যাত্রাকে ভ্যালিডেশন দিতে পারার যোগ্যতা সমাজে কতজনের থাকে, যে এই ভ্যালিডেশন-প্রাপ্তিগুলিকেই আমাদের মাইলস্টোন বলে মানতে হবে?

জয়:

এইসব মাইলস্টোনের ভ্যালিডেশন আশলে এক প্রকারের ছোটোলোকি আর নিজের লেখালেখির জার্নির প্রতি আত্মবিশ্বাসহীনতাই মনে হয় আমার। যাই হোক, আপনি দীর্ঘকাল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সাধনা করছেন। লেখালেখিতে কোনোভাবে কী এই সঙ্গীতচর্চা আপনাকে সহায়তা করছে?

বর্ণালী:

করেছে। আমার ভাষা সাঙ্গীতিক। নির্ভরযোগ্য সমালোচকেরা বলেছেন, আমার গদ্য (ডেনস হলেও) বেসুরা নয়। আমার কান মারাত্মক প্রখর – তাই শব্দকে কানে মাপতে পারি আমি; এই সকলই প্রশিক্ষণ মারফত পাওয়া। লেখার কাঠামো এবং গল্পের বিস্তার ও তদ্‌সংক্রান্ত পরিমিতি – এই দুইয়ের ক্ষেত্রেই আমি খেয়াল গানের শিক্ষার্থী হওয়ার ফায়দা নিই।

লেখার বিষয়বস্তুতে সঙ্গীত বারবার এসেছে, আসে, আসবে – তবে তার জন্য সাঙ্গীতিক প্রশিক্ষণ লাগে না। মোটামুটি সংবেদনশীলতা আছে, এমন শ্রোতা হওয়া কিম্বা বিষয়বস্তুতে আগ্রহী হওয়াই হয়তো যথেষ্ট।

জয়:

সঙ্গীতের মানুষ লিখতে এলে কবিতা লেখার কথা, নেরুদার সনেট অনুবাদও করেছিলেন আপনি। নিজে কবিতা লিখতেন বা এখনও লিখেন?

বর্ণালী:

লিখেছি। নিজের কাছে মোটামুটি লেগেছে। ফেইসবুক ছাড়া কোথাও দিই নাই। গদ্যে আমি মানের যেই কনসিস্টেন্সি ধরে রাখতে চাই, কবিতায় তা পারি নাই। একটা সময় গেছিল বছর সাতেক আগে, যখন ইংরেজি কবিতা লিখেছিলাম বেশ কয়েকটা। এই মুহূর্তে আমার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার মতো কোনো কবিতা নাই।

জয়:

আপনার কবিতা পড়তে ইচ্ছা করতেছে আমার। আচ্ছা, বাংলা ডায়াসপোরা সাহিত্যের হালচাল কেমন আপনার মতে? দেশে থেকে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চাকারীরা ডায়াসপোরা সাহিত্যিকদের কীভাবে দেখে মনে হয়?

বর্ণালী:

ডায়াসপোরা সাহিত্য কাকে বলে, আমি সেই বিষয়ে নিশ্চিত নই। সত্যি কথা বলতে, এইসব বর্গায়নকে খুব ভালো মনে করি না। তবে প্রবাসজীবন নিয়ে যাঁরা লিখছেন (বিষয়বস্তুর বিচারে?), তাঁদের বেশিরভাগই প্রতিবেদন লেখা বা ডায়েরি লেখা বা ‘স্লাইসেস অভ লাইফ’ লেখার কায়দায় লিখছেন। দেশে এর একটা ‘বাজার’ আছে হয়তো, until the novelty wears off. যা হোক, এইরকম লেখা বই পড়তে আমার ভালো লাগে না। সাহিত্যের কাজ এর চেয়ে আরেকটু বেশি। আকাট বাস্তবতা একটা হৃদমনোবৃত্তিক ট্রান্সফর্মেশনের মধ্যে দিয়ে না-গেলে তাকে আমি সাহিত্যজ্ঞানে পড়ি না। রুচিগত দূরত্ব অনুভব করি। আমি সাহিত্যে যেই ফর্ম ও শৈলীর আভিজাত্য আশা করি, যেই স্বর ও অভিঘাত আশা করি, তা এর থেকে ভিন্ন।

 


দেশে বসে যাঁরা লিখছেন, তাঁদের লেখাতেও এই গুণগত দুর্বলতাগুলি শতভাগ উপস্থিত থাকতে পারে (আছেও)। অতএব কে কোথায় বসে লিখছে, সেই ভিত্তিক বর্গায়ন সাহিত্যের খুব উপকারে আসবে বলে মনে হয় না।

 

নিঃসন্দেহে অন্য ভূমিতে বসে বাংলা লেখা, এবং সাহিত্যের ছাঁচে বাংলা লেখা, কঠিনতর। অগভীরভাবে বললে এইটুকু বলা যায়। আরেকটু কম-অগভীরভাবে বললে আবার উল্টাদিকে এইটাও বলব যে, বিদেশে বসে লেখালেখি আমার জন্য সহজতর হয়েছে; আমার পক্ষে একটা লেখার প্রকল্পকে লজিস্টিকালি যথাসম্ভব কম বাধার ভিতর দিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। আমি নিজে জানি, মেলবোর্নে আমি শৃঙ্ক্ষলায় থাকতে পারি, মন বসাতে পারি।

জয়:

আপনার সাহিত্য পড়লে বোঝা যায় আপনি ঢাকায় বড়ো হয়েছেন। নাগরিক কোলাহল আর যন্ত্রণা দুটিরই উপস্থিতি থাকে। সাহিত্যিক বর্ণালী সাহাকে তৈরি করতে ঢাকার ভূমিকা কেমন?

বর্ণালী:

আমি ঢাকার সন্তান। এই পরিচয় ঘুচবে না। আমার জীবনে ঢাকা না-থাকলে আমি এই সাহিত্যিকটি হতাম না। এখনো ঢাকা আমার মানসী, আমার মিউজ। ঢাকার উপরে আমি প্রবল অধিকার বোধ করি।

জয়:

সেই অধিকারবোধটা প্রবলভাবে টের পাওয়া যায়। আপনার গদ্যভাষাটা ঢাকায় প্রচলিত শব্দ, চলিত ভাষার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে। আপনার গদ্যের স্বর, মিউজিকও চমৎকার। এই গদ্যভাষা কী আপনি সচেতনভাবেই গড়ে তুলেছেন?

বর্ণালী:

আমার গদ্যভাষাটি আমার কাছে আসে। নাজিল হওয়া অর্থে আসে না, মকশো করতে-করতে আসে। আসার অব্যবহিত আগ পর্যন্ত যা লিখেছি, তাকে আমি এই ‘আগত’ ভাষাটির সাপেক্ষে নতুন করে লিখে থাকি। এতে আমার কোনো একটি লেখার কাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। আমি ভাষাকে হালকাভাবে নিতে পারি না। সম্পাদনা করতে বসলে আমি ভাষার বেতনভুক কর্মচারী হিসাবে বসি, এবং যথাসম্ভব কঠোর হই। লেখার কাজ তো সচেতন কাজই, অন্তত যেই অংশটুকু ভাষার ঘাড়ে চেপে চলে। অচেতন বা অবচেতন হয়তো – খুব স্পেয়ারিংলি এসে, নিজের ছাপটুকু কদাচিৎ রেখে যায়। এর বেশি নয়।

জয়:

আপনার লেখায় ঢাকায় তরুণ-তরুণীদের ব্যবহৃত সাম্প্রতিকতম শব্দও পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে কীভাবে আপডেটেড রাখেন নিজেকে?

বর্ণালী:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সব বয়সের বন্ধুবান্ধব (অফলাইনে)। এইটা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।

জয়:

দ্যা নর্থ এন্ড উপন্যাসের মূল গল্পটা একদিন, এক রাতের। সেখানে ঘটনাক্রমে নানান সময় ঢুকে পড়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কোপেনহেগেন, ব্রিস্টল, রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে এনজিওদের আনাগোনা, আন্তর্জাতিক প্রেম, বন্ধুত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ঢাকার মানুষের বিবিধ সংকট… অনেক ব্যাপার ডিল করেছেন; শেষ পর্যন্ত প্রোটাগনিস্ট নারী চরিত্রটা (নাম মনে করতে পারছি না) বন্ধু রাহাতের থেকে সহায়তাও পাইলো আবার অদ্ভুত আচরণও পাইলো শেষে, মনে হইলো ডেনমার্কে প্রেমিকের কাছে যাবে না, শেষ পর্যন্ত কী মেয়েটা দায়বদ্ধতার কাছে হেরে গেলো? অই বাস্তবতাটা আমাকে বেশি পীড়া দিছে যে একজন নারী যতই স্বাবলম্বী আর আধুনিক হোক অনেক বিষয়েই একা কিছু করতে পারে না।

বর্ণালী:

জয়ী মানুষের গল্প নয় ‘দ্যা নর্থ এন্ড’। দিকে-দিকে নারীদের এবং নারীচরিত্রদের এত জয়-জয়-জয়ধ্বনির বাধ্যতা অমানবিক, অসাহিত্যিক এবং অবাস্তব। নারীবাদের জন্যও ক্ষতিকর।

জয়:

উপন্যাসটি পড়া শেষে আমিও এটাই ফিল করেছিলাম।  আপনার রিমার্কেবল লেখাগুলির ( উপন্যাস দ্যা নর্থ এন্ড, লিম্বো- জবরখাকি গল্পসংকলের বড়ো গল্পটা) প্লট আসলে পৃথিবী, চরিত্ররা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালিরা। নিজে দেশের বাইরে থাকেন বলে এদেরকে চরিত্রে এনে বেশি ভালো ডিল করতে সুবিধা হয়?

বর্ণালী:

আমাকে যে কোনো চরিত্র এনে দিন। ভালো ডিল না-করতে পারলে প্রকাশ করব না। তবে লেখার প্লট বাছার ক্ষেত্রে দৈবের একটা হাত থাকে নিশ্চয়ই। আমার কোলে টুপ করে পড়বে যেই গল্পটা, তা আমার পরিপার্শ্বের কারো গাছের গল্পই হবে, এ আর আশ্চর্য কী?

জয়:

দ্যা নর্থ এন্ড, লিম্বো’র চমৎকার চিত্রনাট্য হতে পারে; সিনেমার কথা ভেবেছেন কখনো?

বর্ণালী:

কেউ-কেউ ভেবেছেন। শেষমেশ ব্যাটে-বলে হয় নাই। সিনেমা বহু মানুষের টীমওয়ার্ক; বহু লগ্নীর, বহু ঝুঁকির কাজ। সব নক্ষত্র এক রেখায় সুসজ্জিত হওয়াও তো বিরল ঘটনা।

জয়:

সেই বিরল ঘটনা তো ঘটতেই পারে, নাকি! আপনি অনেক সিনেমা দেখেন। আপনার চিত্রনাট্য লিখতে ইচ্ছা করে না?

বর্ণালী:

এই অভিপ্রায় আপাতত গোপন রাখি। প্রস্তুতিবিহীন শুধু ইচ্ছার কথা বুঝি এমনি-এমনি বলা যায়?

জয়:

আচ্ছা, অভিপ্রায়টা গোপনই থাকুক তাহলে। রিসেন্টলি কোন সিনেমা, উপন্যাস দর্শক-পাঠক আপনাকে বেশি আক্রান্ত করেছে?

বর্ণালী:

ইয়র্গোস ল্যান্থিমোস পরিচালিত ছবি প্রায় সবগুলিই আগে দেখা হয়েছিল। ‘ডগটুথ’টা বাদ পড়ে ছিল। বড়ো পর্দায় এমা স্টোনকে দেখে (‘পুওর থিংস’) ফিরে এসে বাসায় বসে কয়েকদিনে ল্যান্থিমোস রিভিশন দেওয়া গেল। সেই সূত্রে দেখলাম ডগটুথ। কলিজার ভিতরে ভোঁতা আঘাত দিতে পারে, এমন ডিস্টোপিক একটা গল্প। এই ক্যালিবারের ছবি দেখলে বা বই পড়লে ঈর্ষা হয়, ভালো প্রতিযোগী হতে পারার খিদা চাগাড় দেয়, দাঁত-নখ বেরিয়ে আসে।

জয়:

ডগটুথ আমারও পছন্দের একটা সিনেমা। পুওর থিংস আপনার সাজেশনেই দেখলাম। চমৎকার। আচ্ছা, কখনো কোনো লেখকের প্রেমে পড়েছেন, বইয়ের কোনো চরিত্রের? তাদের প্রতি প্রেমের জন্যে সর্বোচ্চ কী করতে পারতেন প্রেমিকা হিসাবে?

বর্ণালী:

রক্তমাংশের মানুষ ছাড়া প্রেমে পড়তে পারি নাই কখনো। পাঠক হিসাবে আমি সেরিব্রাল। হৃদয়সঞ্জাত কোনো বস্তু মারফত আমার সাথে লেখকদের ও তাঁদের সৃষ্টির কোনো সংযোগ ঘটে না। এই বিষয়টা আমার জন্য দুঃখেরই।

জয়:

দুঃখ করে আর কী হবে! হা হা হা…

আমাদের সাহিত্যে সেক্সুয়াল ডিজায়ারকে তীব্রভাবে উপস্থাপন করা হয় না। এই ট্যাবু ভাঙার সময় এসেছে মনে হয়?

বর্ণালী:

আমাদের দেশের লেখকদের বড়ো ভয়। এমনকি পাশের বাসার রতনের ফুপু প’ড়ে কী বলবে, সেই চিন্তা না-করে তাঁরা গল্প উপন্যাস লিখতে পারেন না। ট্যাবু-ফ্যাবু কোনো বিষয় নয় মনে করি। আগেও অনেক আসরে জানতে চেয়েছি, সিরিয়াস সাহিত্য পড়ে কে? আমরা এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্দিষ্ট অথচ বিশালসংখ্যক দর্শকের সামনে নিজেদের জীবনকে যতখানি নগ্ন করি, নিজেদের অস্তিত্বকে যতখানি ভালনারেবল করি, সিরিয়াস লেখালেখির কাছ থেকে যৌনতা নিশ্চয়ই তার চেয়ে অনেক কম, অনেক মোলায়েম, অনেক নরম দাবিই করে? কোনো সিরিয়াস সাহিত্যের নিবেদিত পাঠক আজ পর্যন্ত যৌনতা নিয়ে বালখিল্যতা করেছেন বলে দেখি নাই।

 


যৌনতাকে বিশেষ বিবেচনায় সেলফ-সেন্সর করা লেখকদের কলিজা কোথায় থাকে, আমি জানি না। সম্ভবত তাঁদের সতীচ্ছদে (কাল্পনিক)।

 

জয়:

সাহিত্য কী পাঠকের ব্যক্তিচরিত্র, ব্যক্তিত্ব গড়ে দিতে পারে? প্রভাবের মাত্রাটা কেমন হতে পারে?

বর্ণালী:

মনে হয় না সাহিত্য তেমন কিছুই পারে। নিবিড় পাঠকের ক্ষেত্রে মহৎ সাহিত্য হয়তো একটা সংবেদনশীল মন তৈরির কিছু উপাদান দিতে পারে, তবে সেই সংবেদনশীলতার কতখানি সত্য হৃদয় ও সত্য এসেন্সের অংশ, আর কতখানি পারফর্মেটিভ – তা আমার জানা নাই। “বই পড়ুন, সুন্দর জীবন গড়ুন” প্ল্যাকার্ডওলা মানবসভ্যতার প্রতি সাহিত্যের অবদান নিয়ে আমি সন্দিহান। সাহিত্য কোনোদিন “ওয়ার্ল্ড পীস” আনতে পারবে না; তবে এমনকি সুন্দরী প্রতিযোগিতার প্রতিযোগীরাও যে “ওয়ার্ল্ড পীস” কোনোদিন আনতে পারবে না, সেই সত্যটা নরমে-গরমে জানিয়ে দিতে পারবে। এইটুকু সাহিত্যের ক্ষমতার মধ্যে পড়ে।

জয়:

আপনি যখন উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি নেন, প্রস্তুতি পর্বে কী কী প্রক্রিয়া থাকে, প্রথমে প্লট মাথায় সাজান তারপর লিখতে শুরু করেন নাকি যেকোনো জায়গা থেকে শুরু করেন? আমরা জানি যে মুরাকামি শরীরকে ফিট রাখতে সাঁতরান, ঘণ্টাখানেক দৌড়ান, কারণ লেখালেখি পরিশ্রমের কাজ। ছয়মাস প্রস্তুতি নেন, তারপর লিখেন।

বর্ণালী: 

উপন্যাস বা বড়ো গল্পের বেলায় পাতার পর পাতা নোট নেওয়া হয় কয়েক বছর ধরে। যেই জগৎটা আমি তৈরি করব, তার কণিকাগুলি, ডিটেইলগুলি এইভাবে আগে হাসিল হয়। দুইটি বা তিনটি চরিত্রকে বিস্তার করি, আরো-আরো চরিত্র গল্পের প্রয়োজনে আসে, প্লট খোলে অনেক-অনেক পরে। এইটা হয়তো লেখার সবচেয়ে এফিশিয়েন্ট উপায় নয়। তবে আপাতত আমার প্রক্রিয়াটা এমন।

আমি বড়ো এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজে নামার আগে শৃঙ্ক্ষলার অংশ হিসাবে মানুষকে অনেক ‘না’ বলি। পত্রিকায় লেখা দেওয়া বন্ধ করি। কেউ গল্প চাইলে অপেক্ষা করতে বলি। অ্যান্থোলজিতে কিছু ছাপতে দিই না কখনো। এমনিতেও যেহেতু লেখা না-চাইলে লেখা না-দেওয়ার পুরাতন দস্তুরে আমি বিশ্বাস করি, এই শৃঙ্খলাটুকু মানতে আমার খুব ক্লেশ বা পরিশ্রম হয় না। ‘জবরখাকি’ যেই এক-দেড় বছর ধরে লিখেছি, সেই সময়টা সোশ্যাল মিডিয়া ডিএকটিভ রেখেছিলাম। পরবর্তী বড়ো কাজের ক্রিটিকাল ধাপে গিয়েও তা-ই করব। আমার মধ্যে বহুপ্রকাশিত হওয়ার ডেসপারেশন নাই। প্রতিদিন লেখ্য শব্দসংখ্যা নিয়ে নিজেকে যেই টার্গেট দিই, তা পূরণ করতে দিনের রুটিন ও কাঠামো খুব জরুরি বলে মনে করি। সকালে এক থেকে দুই ঘণ্টা রেয়াজ করলে মধ্যদুপুর নাগাদ লেখার খুব সুন্দর ফ্লো টের পাই।

জয়:

মানুষ ও সমাজকে দেখা এবং বোঝার জন্যে আপনি কী কী পদ্ধতির আশ্রয় নেন? চরিত্র সৃষ্টি করতে তো লেখককে মানুষ, সোসাইটির দিকেই তাকাতে হয়, নাকি?

বর্ণালী:

আমি ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্রী। বিপণন ও কনজ্যুমার সাইকোলজির তত্ত্বে খুব ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব ভালো শিক্ষকদের ট্রেনিং আমার আছে। বিজ্ঞাপনশিল্পকেও অন্তরঙ্গভাবে দেখেছি। এর সাথে আমার রাজনীতির বোঝাপড়া ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে পাঠ আরেকটা ভিন্ন রেফারেন্স-কাঠামো দেয়। হয়তো এইভাবে বলা ঠিক হচ্ছে না (ট্রেড সিক্রেট বলে দিচ্ছি?), চরিত্রদের নিয়ে আমি একাধিক থট এক্সপেরিমেন্ট করি। চরিত্রকে চট করে এই মানবিকতা-বিবর্জিত, ম্যানিপুলেশন-যোগ্য, প্রায়-তাত্ত্বিক ফ্রেইমে বসিয়ে এক পলক দেখে নিই, তারপর ফ্রেইমসহ চরিত্রটিকে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিই। আমি মনে করি, এই কাজটা করার কারণে আমার চরিত্রদের ক্যারিকেচারে পর্যবসিত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। বলছি না, এইটা সবসময়ই আমাকে বাঁচায় কিম্বা বাঁচাবে। তবে আপাতত এই পথের শরণ নিয়েছি।

জয়:

লেখালেখির জন্যে অনেকে ড্রাগের আশ্রয় নেন। আপনি এটাকে কীভাবে দেখেন? নিজে কখনো চেষ্টা করেছেন বা ভেবেছেন?

বর্ণালী:

অন্যদের ব্যাপারে মন্তব্য নাই। নিজে কোনো সিরিয়াস কাজকেই কখনো সাবস্ট্যান্সের মুখাপেক্ষী না-করার পক্ষপাতী। আমি নিজের জন্য স্বচ্ছতা ও লুসিডিটি ভালোবাসি। যতটুকু উদ্ভটত্ব বা পাগলামি সৃষ্টিশীলতার জন্য দরকার, তা আমার স্বাভাবিক, ফাংশনাল মাথাই স্বয়ং ধারণ করে।

জয়:

সম্প্রতি সিডনিতে একটা ছোট বইমেলা হলো। অনেকের বই দেখলাম। সুব্রতদা (কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ) আর আপনার বই দেখলাম না!

বর্ণালী:

আয়োজকরা আমাদের “চেনেন না” শুনেছি। বিষয়টা অতটুকুই নিরীহ। এর মধ্যে ‘অজ্ঞতা’ আছে (তাও ‘অজ্ঞতা’ অনেক বড়ো একটা শব্দ, আমাকে চেনার জন্য; সুব্রতদাকে চেনার ক্ষেত্রে লাগসই), আশা করি কোনো রাজনীতি নাই।

জয়:

সাহিত্যে রাজনীতি, সিন্ডিকেট এসবকে কীভাবে দেখেন?

বর্ণালী:

ভালোভাবে দেখি না। আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী লেখকরা এইসব করেন না বলে মনে করতে চাই।

জয়:

আপনার লেখাপত্র দৈনিকের সাহিত্যপত্রিকায় দেখি না। তারপরেও আপনি পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। কীভাবে দেখেন ব্যাপারটাকে?

বর্ণালী:

পত্রিকা ও সনাতনী সংবাদমাধ্যমের জগৎজোড়া পতনের শব্দ হিসাবেই শুনি ব্যাপারটাকে। এইটা একটা আর্থসামাজিক প্রপঞ্চের চেয়ে বেশি কিছু নয়। লোকের কাছে পৌঁছে যাওয়া এমন কোনো বিষয় নয় যা দিয়ে কোনো লেখকের পক্ষেই নিজের লেখার বিষয়ে উচ্চ ধারণায় বাগবাগ হয়ে যাওয়ার কিছু আছে।

জয়:

এখনও মনে হয় পুরুষ সাহিত্যিকরা, আমাদের সাহিত্যসমাজ নারীদের লেখাকে, তাদের স্বীকৃতিকে আড়ালে রাখতে চায়। সুমন রহমান, মশিউল আলমরা কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরিজে শর্ট লিস্টেড হলে যেরকম হৈচৈ হয়, সাগুফতা শারমীন তানিয়াদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না। এই বৈষম্য ফিল করেন?

বর্ণালী:

কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরিজ নিয়ে বেশি বলতে চাইব না। এইরকম ‘প্রকল্প’চালিত সাহিত্য প্রতিযোগিতা, যা আবার লেখার অনুবাদযোগ্যতা  (অবশ্যই ইংরেজিতে) ও অনুবাদকের দক্ষতার উপর এতখানি নির্ভরশীল, তার সীমাবদ্ধতাটা আমি দেখতে চাইব – সাহিত্যিক না হোক, অন্তত রাজনৈতিক বোঝাপড়ার জায়গা থেকে। তাই এই উদাহরণটাকে আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসাবে নিতে চাইছি না। যেই তিনজন সাহিত্যিকের নাম বললেন, প্রত্যেককেই আমি সমাদৃত সাহিত্যিক হিসাবেই জানি। কমনওয়েলথ সাহিত্য প্রতিযোগিতার তুলনায় তাঁদের নিজেদের শক্তির মাপ বড়ো।

 


বড়ো অর্থে, বাংলা সাহিত্যে এই মুহূর্তে এই প্রজন্মের যাঁরা ভালো লিখছেন, তাঁদের একটা বিরাট অংশ নারী। কতদিন তাঁদের কাজের স্বীকৃতি না-দিয়ে থাকতে পারেন আমাদের প্রতিষ্ঠানেরা ও আমাদের মহীরূহরা, তা আমি একান্ত কৌতূহলের সাথে দেখতে চাই।

 

এর ভিতরেও “মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকারকারিণী” নারী, টোকেন নারী, কুইন বী নারী ইত্যাদি বিশিষ্ট নারীদের দেখা আমরা পাবো, কেননা পুংতন্ত্র এইসব রাজনীতি দিয়ে ঘোল না খাইয়ে এত সহজে আমাদেরকে জায়গা ছাড়বে না বোধ হয়। সেইসবকেও একটা ঐকান্তিক কমেডির জায়গা থেকে আমাদের দেখতে পারতে হবে। ওইটুকু রস না-থাকলে সাহিত্য করব কি?

জয়:

আপনার পার্টনার একজন বিদেশী (বাঙালি না অর্থে), তাঁর সাথে আপনার প্রেম সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার লেখালেখি নিয়ে ওনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

বর্ণালী:

এই মুহূর্তে ‘বাসার শাদাটা’ কর্মসূত্রে গুয়াতেমালায় আছে। পুরা বছরটাই থাকবে। গত বছরও একটা বড়ো অংশ সেইখানে ছিল। এতে আমাদের সম্পর্কের মাঝখানে একটা দীর্ঘমেয়াদী ছেদ-কে জায়গা করে দিতে হয়েছে। সেইভাবে ভাবলে আমরা ‘একসাথে’ নাই। আমার লেখালেখি সে কিছুই পড়ে নাই – শুধু কিছু প্লটভিত্তিক গল্প তাকে প্যারাফ্রেইজিং করে শুনিয়েছি। সে চমৎকৃত হয়েছে (বা চমৎকৃত হওয়ার ভালো অভিনয় করেছে)। মূলত আমার শিল্পবোধের ব্যাপারে সাধারণভাবে একটা উচ্চধারণা থাকার কারণে সে আমার লেখালেখির কাজ বা সাধনাকে অত্যন্ত সমীহ করে। আমার কাছ থেকে লাগাতার নিরুৎসাহ সহ্য করেও সে নিজে-নিজে বাংলা শব্দ ও বেশকিছু চলনসই বাংলা অভিব্যক্তি শিখেছে। তার ভালো লাগে ফেলুদা, ব্যোমকেশ, নতুন বাংলা ছবি ও স্ট্রীমিং কনটেন্ট, পোলাও-মাংশ-বিরিয়ানি রান্নার ইউটিউব ভিডিও ইত্যাদি। এইগুলি আমার ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত খুব ইভলভড বা সফিস্টিকেটেড পছন্দ নয়, তাই আমি এইসব প্রবণতাকে খুব মহান করে দেখাতে চাই না। আমার হয়তো আরেকটু উদার ও ওপেনমাইন্ডেড হওয়া উচিত।

জয়:

এসব ব্যাপারে আরেকটু উদার আর ওপেনমাইন্ডেড হইলে ক্ষতি নাই মনে হয় হা হা হা। আপনার পার্টনারের মায়ের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো আপনার। ভদ্রমহিলা গত বছর মারা গেছেন। বাংলার বউ-শাশুড়ির রসায়ন নিশ্চয়ই আপনাদের ছিলো না। আপনাদের সম্পর্কের রসায়নটা কী কারণে এত জমেছিলো?

বর্ণালী:

না, রসায়ন “জমা”র জন্য যথেষ্ট সময় আমরা পাই নাই। ওনার প্রতি আমি একটা গভীর ও বিষণ্ণ টান অনুভব করতাম। ওনার নিউজিল্যান্ডে বেড়ে ওঠার গল্প (বেশিরভাগটাই ওনার ছেলের মুখ থেকে শোনা) আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করতো। ওনার জীবনের দারিদ্র্য, বঞ্চনা, সংগ্রাম ও হারানোর গল্প আমার নিজের মায়ের অনুরূপ গল্পের থেকে খুব ভিন্ন নয়। ওনার শয্যার পাশে আমি জীবনে প্রথমবারের মতো মৃত্যুকে বসে থাকতে দেখেছি, মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছি। সেই অবস্থায় সেই মৃত্যুগন্ধী খালি বাড়িতে আমি ওনার হাত-পায়ের নখ কেটে দিয়েছি শেষবারের মতো। অনভ্যাসে নেইলকাটারের কোপ দুই-একবার ফেলেছি ওনার নখসংলগ্ন মাংশের উপর – অতটুকু ব্যথায় ওনার বার-বার কেঁপে ওঠার স্মৃতি কখনো মুছবে না। এইরকম সিভিয়ার সমাপ্তির বন্ধনে যাঁদের বাঁধা যায়, তাঁদেরকে আর ছাড়ানো যায় না।

জয়:

ভবিষ্যতে ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য করার ইচ্ছা আছে? অনুবাদেও তো আপনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছুই দিতে পারেন।

বর্ণালী:

ইংরেজিতে লেখার অভিপ্রায়টিও আপাতত গোপন রাখতে চাইছি। ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ চলছে। বড়ো একটা কাজ আসছে শিগগিরি।

জয়:

এখন কী নিয়ে কাজ করছেন, মানে কথাসাহিত্যে আপনার পরবর্তী প্রজেক্ট কী?

বর্ণালী:

এখন পরবর্তী উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত। একটি দৈনিক পত্রিকার ঈদসংখ্যায় এর অংশবিশেষ ছাপা হবে, আশা রাখি। অনুবাদের কাজ এগোচ্ছে। ডেরেক ওয়ালকটের ‘স্টার অ্যাপেল কিংডম’ থেকে সব কবিতা প্রথমবারের মতো বাংলায় অনুবাদ হয়ে আসছে। আপাতত এই দুইটি কাজ নিয়েই জাগ্‌ল করছি।

জয়ঃ
পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। আলাপের জন্যে ধন্যবাদ আপনাকে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading