আমার অচিন আমি | রিফাত আনজুম পিয়া

সোয়া আটটা বেজে গেলে এক্সিবিশন বন্ধের তোড়জোরে চারতলার গ্যালারি থেকে দর্শনার্থী হাওয়া। দর্শনার্থী না হোক, শরণার্থীর মতো এখানে কিছুক্ষণ আশ্রয় চাচ্ছি আমি। ভার্সিটির হলে না-ফেরার ইচ্ছাটা যেভাবে আঠার মতো আটকে রেখেছে, তাতে কেউ আমাকে বেঁধে-ছেদে হল-সীমানায় ছুঁড়ে দিয়ে আসলে ভালো হয়!

এতদিন পরীক্ষার চাপে বই-খাতার ভাঁজে চ্যাপ্টা হওয়ায় যে লোকসান হয়ে গেছে, সব সুদে-আসলে উসুল করতে আজ আমি শাড়ি পরে, সেজেগুজে শিল্পকলায়— বার্ষিক চিত্রপ্রদর্শনীতে। এখানে ঘোরাঘুরি সেরে সাড়ে সাতটায় এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটক, নাটক শেষে চানখাঁর পুলে নান্নার মোরগ পোলাও— ক্ষতি পূরণের নিখুঁত পরিকল্পনা! পরিকল্পনামাফিক ঠিক ছ’টায় কায়েসের এখানে হাজির থাকার কথা। কিন্তু দুপুরে মড়ার মত ঘুমিয়ে ফোলা চোখমুখ আর জ্যামের রেডিমেড অজুহাত হাতে সে হাজির হলো এক ঘণ্টা পরে। এই এক ঘণ্টা গ্যালারির নানা মেজাজের ছবিতে বুঁদ হয়ে থাকা সম্ভব ছিল; কিন্তু সময় কাটানোর শ’খানেক ব্যবস্থা থাকলেও অপেক্ষা চিরকালই বিরক্তিকর। ফলে, কায়েস হাজির হওয়া মাত্র চোটপাটের ব্রাশফায়ার শুরু করে দিলাম। ওর দু’জন সহকর্মীও যে এখানে উপস্থিত আর ব্যাটারা খুব মজা নিয়ে আমাদের নাটক দেখছে, সে খেয়াল আমাদের কই! কায়েস হঠাৎ ওদের দেখতে পেয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গট গট করে বেরিয়ে গেল। আমি আটকাতে গেলে কনুইয়ের ঠ্যালায় প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল।

সেই ছ’টা থেকেই একা একা ঘুরছি, এক তলা থেকে আরেকতলা, এক ঘর থেকে আরেক ঘর। এত সাধের সন্ধ্যা এভাবে মাটি হয়ে যাবে— মনকে মানানো মুশকিল! কোনো কোনো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছি, অর্থের খোঁজে তলিয়ে গিয়ে গিলে ফেলছি ভেতরের তিক্ত স্বাদ; কিন্তু কিছুদূর এগোনোর পর রাগ উথলে উঠে সব ভণ্ডুল করে দিচ্ছে! গনগনে হলকায় কান-মুখ লাল, কিন্তু এখানেই থেকে যাবার বেয়াড়া জেদ!

এই বন্ধ হবে-হবে মুহূর্তে আমি শিল্পী সামিউর রহমানের তিনটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে। চক্কর দিতে দিতে চতুর্থবার। চুম্বন, আলিঙ্গন আর এক নারীর প্রতিকৃতি। আধা-বিমূর্ত ছবির গলিত রঙের ঔজ্জ্বল্য থেকে প্যাশন ঠিকরে বেরোয়। পত্রিকা মারফত জানি, পোর্ট্রেটটা শিল্পীর স্ত্রীর। এই রংজীয়ন্ত নারী শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়ে, ঘ্রাণ ছড়ায়। মুগ্ধতা আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকে দেখি, এই মনমরা নির্জীব মুহূর্তে সঞ্জীবনী উত্তাপ খুঁজি তার উষ্ণতায়। আহা, কি ভাগ্যবতী রে! এত বড় একজন শিল্পীর স্ত্রী— যিনি জানেন কোন মুহূর্তে স্ত্রীর সৌন্দর্য অলৌকিকতা স্পর্শ করে, তার সাথে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তাহারে করেন রচনা! আহা, আমার প্রেমিক যদি আর্টিস্ট হতো! কায়েসের মধ্যে এসবের লেশমাত্র নেই! অপরিচিত শিল্পীর সামনে সিটিং দিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ছবি আঁকিয়ে নেওয়ায় আগ্রহ হয় না। কোন বেখেয়াল মুহূর্তে হঠাৎ প্রেমিক বলে উঠবে, ‘এ্যাই তোমার ছবি আঁকবো এখন, নোড়ো না!’ – এই আমার ফ্যান্টাসি!

‘হ্যালো!’

পুরুষকণ্ঠে চমকে গিয়ে দেখি পেছনে স্বয়ং সামিউর রহমান! অপরিচিত, তায় আবার বিখ্যাত শিল্পী— ঘাবড়ে গিয়ে গলার স্বর সংকুচিত হতে হতে একেবারে বুঁজে গেলে মুখে বোকা বোকা হাসি ফুটিয়ে রাখি।

‘কাউকে এই ছবির সামনে এত মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি! তাও আবার পুরুষ-দর্শক হলে হতো! ওহ্ স্যরি, আমি অবশ্য জানি না, ইফ ইউ আর মোর ইন্টারেস্টেড ইন উইমেন!’

যিনি রাশভারী হতে পারতেন, তার কৌতুকপ্রবণতা ‘চিচিং ফাঁক’ মন্ত্রের মতো আমার গলা খুলে দেয়, ‘উইমেনে ইন্টারেস্টেড হলেই বা কি? উনি আপনার ওয়াইফ, আমি জানি!’

‘তাই!’

‘হ্যাঁ, উনি খুব সুন্দর! আর আপনার ছবিগুলো খুব সেনশুয়াল!’

‘থ্যাংকস! তা এক্সিবিশন তো শেষ! আপনি যাবেন না?’

‘হ্যাঁ, যাবো এখনি।’

‘রাতে কি চা খান, না ঘুমের সমস্যা হয়?’

‘না, খাই তো!’

‘চলেন, তাহলে নিচে চা খাই।’

আমরা পাশাপাশি বেরোতে থাকলে শিল্পীর কিছু বন্ধুবান্ধব এগিয়ে আসে। উনি তাদের দিকে হাত নেড়ে ‘কালকে দেখা হবে’ ছুঁড়ে দিয়ে হনহন করে পালাতে থাকেন। আমরা শিল্পকলার নিচে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পড়ি। এইবার আমার মনে হয়, না, সন্ধ্যাটা জলে যাবে না!

চিত্রশিল্পীদের নিয়ে আমার বরাবর গাঢ় কৌতূহল, কিন্তু যেচে পরিচিত হবার সাহস নেই। ফলে রক্তমাংসের শিল্পী আমার অধরা। আর্ট এক্সিবিশনে যাই, চিত্রকরদের জীবনী আর সাক্ষাতকার পড়ি, খুঁজে খুঁজে বায়োপিক দেখি। এসবের সাথে চারুকলার শিক্ষার্থীদের ‘উড়াধুরা’ লাইফস্টাইল নিয়ে বাজারে চালু মিথ জুড়ে দিয়ে দিয়ে চিত্রশিল্পীর ডিএনএ বানাই! আমার গণ্ডিতে গড়পড়তা মানুষের বাঁধাধরা নিয়মী জীবন। শিল্পীর বৈচিত্র্য এখানে আঁটবে না। গোপনে ইচ্ছা পুষি— যদি কোন আপাদমস্তক শিল্পীর কাছাকাছি চলে যেতে পারি, হয়ত সেই জীবনের শাঁস-সুবাস খানিকটা ছিটকে আসলেও আসতে পারে এইদিকে!

ফলে এই বেলা আমার প্রশ্নেরা এক খ্যাতিমান শিল্পীকে নাগালে পেয়ে কাড়াকাড়ি করতে থাকে। উনি সংক্ষেপে খানিকটা হেঁয়ালি করে উত্তর দিতে দিতে একসময় ভুরু কোঁচকান,

‘আচ্ছা, আপনি কি সাংবাদিক নাকি? বিকালেই একটা লম্বা সাক্ষাতকার দিলাম। আর এনার্জি নাই!’

আমি কাঁচুমাচু করি, ‘না, না, সাংবাদিক না আমি। জাস্ট কৌতূহলী! আপনার জীবন খুব ইন্টারেস্টিং তো।’

আশপাশের মানুষদের চমকিয়ে (কারো কাপের চা ছলকিয়ে) জোরে জোরে হাসেন সামিউর রহমান,

‘এইসব ভক্তমার্কা কথাবার্তা বাদ দেন তো! এইভাবে আলাপ চালালে সহজ হতে পারবেন না। এখন থেকে আপনার কাছে আমি কোন বিখ্যাত শিল্পী না, ওকে?’

আমি একটু দমে যাই। সাধারণ অপরিচিতদের জন্য বরাদ্দ—আপনার ফ্যামিলিতে কে কে আছে, কোথায় থাকেন, এখন কোথায় যাবেন— এসব জিজ্ঞেস করবো? শিল্পীরা বেশ অভিমানী, সংবেদনশীল প্রজাতির হয় বলেই তো জানি, কোন কথা যে কোথায় লাগে!

সামিউর সহজ করে দেন,

‘আপনার কথা বলেন। থাকেন কই?’

‘রোকেয়া হল।’

‘তাহলে আনম্যারিড তো? বয়ফ্রেন্ড আছে?’

‘হ্যাঁ, আছে।’

‘ভালো। প্রেম করা ভালো। প্রেম হচ্ছে এনার্জি, ফুয়েল! প্রেম-ট্রেম ছাড়া জীবন হলো কোনমতে ধুঁকধুঁক করে চলা লক্করঝক্কর বাস! হা হা হা!’

সন্ধ্যার ঘটনা তেড়ে আসে— কিসের এনার্জি, কিসের ফুয়েল! ঝগড়া করতে করতে জীবনীশক্তি নিঃশেষ!

আমাকে চুপ থাকতে দেখে সামিউর আবার আলাপের বীজ ছড়ান,

‘বিয়েটিয়ে করবেন নাকি সামনে?’

‘আপাতত কোন প্ল্যান নেই।’

‘হুম, বিয়েটিয়ে দেরিতে করাই ভাল। একেবারে না করা আরো ভাল!’

‘আপনি তো করেছেন!’

‘কত বয়সে জানেন? পঞ্চাশের পর! আর আমরা ঠিক টিপিক্যাল কাপলদের মত না!’

আমি হেসে কৌতূহলের সীমানা টেনে দেই। তাদের অন্যরকম দাম্পত্যের রহস্যভেদ করতে ষোলআনা উৎসুক, কিন্তু প্রথম সাক্ষাতেই এসব প্রাপ্তবয়স্ক আলাপের সাহস পাইনা। তাছাড়া ওনার চাউনিতে, গলার স্বরে ফ্লার্টিং-এর গন্ধ পাচ্ছি। উসকে দিতে ভয় লাগে!

সামিউর আমার নীরস নিষ্ক্রিয়তায় ভুরু কোঁচকান,

‘আর্ট নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করলাম জন্য আর কিছুই বলবেন না?’

‘না, তা না…আমার আসলে ফ্রি হতে একটু সময় লাগে!’

‘সিগারেট খাবেন নাকি একটা?’

‘না, না, আমি স্মোক করি না।’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে, নীতু। একদিন আমার স্টুডিওতে আসেন, আড্ডা দেই, ফ্রি হই। আমার নাম্বারটা রাখেন। আর আপনার নাম্বার থেকে একটা কল দেন, সেভ করে রাখি।’

হলে ফেরার পর মাথার ভেতর চা-দোকান-পর্ব ঘুরে ঘুরে চলে, লাগাতার। স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় চিত্রকরের কথা-স্বর-চাউনির অর্থ অনুসন্ধান। কায়েসের রাগ এতক্ষণে পড়তি, বেচারা পাগলের মতো কল দিয়ে যাচ্ছে—কথা বলে স্বস্তি চায়। কিন্তু আমার মন এখন ফুরফুরে, ঝগড়া মিটমাট করে হালকা হওয়ার প্রয়োজন কি! তাছাড়া যে ভাবনায় আমি নিমগ্ন, সেখানে সে উটকো ঝামেলা। কয়েকবার কল কেটে দিয়ে শেষে ফোন বন্ধ করে শুয়ে পড়ি। কল্পনা আগাপাশতলা দখল নিয়ে নেয়; ঘুম ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারে না। সীমানা গুঁড়িয়ে ফ্যান্টাসির ক্যানভাস বাড়তে থাকে দ্রুততায়, বন্যতায়। কল্পনার মতো সাহসী শিল্পী আর কে আছে!

শিল্পী, একটা পোর্ট্রেট আঁকবেন আমার?

 

মেসেঞ্জারে সামিউর রহমান আর আমি দৈনন্দিন হালহকিকত বিনিময়ের এক পরিসর খুলে বসি। কায়েস জানে, তবে ওই বিন্দুবিসর্গ পর্যন্তই। আমি কায়দা করে চিত্রকর আর তার সুন্দরী স্ত্রীর সুগভীর ভালোবাসার গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে ওকে চিন্তামুক্ত রাখি।

আমাদের দৈনিক আগড়ম-বাগড়ম আলাপের ভেতর আমি চিত্রকলা নিয়ে দুয়েকটা সিরিয়াস প্রশ্ন গুঁজে দিলে সামিউর বেশিরভাগ সময়ই হ্যাঁ-না নয়ত এক কথায় উত্তর দিয়ে দেন। এই দায়সারা ভাব-ভঙ্গিতে রাগ হয় আমার। আমি মেয়ে বলে কি আমার সাথে খালি ইটিশপিটিশই উপযুক্ত, আর শিল্পকলার সমঝদারি আলাপ পুংলিঙ্গদের জন্য! শোধ নিতে, সামিউর যখন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে আমার অনুভূতির আকারপ্রকার জানতে চান, আমি ধাঁধাধাঁধা উত্তরে ধন্দে ফেলে দেই। তার স্ত্রী সুমনার সম্মোহনী সৌন্দর্যের কথা ভাবলে মানুষের চির-সতৃষ্ণ বহু ঘাটের জল খাওয়ার প্রবৃত্তি আর দাম্পত্যের ভান-ভণিতা নিয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে যাই।

কিছুদিন হালকা চালে কথার খেলা খেলেটেলে একদিন সামিউর লেখেন,

‘পরশু ফ্রি আছেন? আমার স্টুডিওতে চলে আসেন।’

কোন আর্টিস্টের স্টুডিও ঘুরে দেখার শখ আমার বহুদিনের। রঙ গোলানো সরা…ঝাঁকড়া ব্রাশ…তার্পিনের বোতল… অর্ধ-সমাপ্ত পেইন্টিং…আধ-খাওয়া কফির মগ…স্তূপ করে রাখা অব্যবহৃত ক্যানভাস…রঙ মাখা ন্যাকড়া…দেয়ালে ঝোলানো পেইন্টিং…নিমগ্ন শিল্পী আঁকছেন, ঘরে দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি ভূতের মতই অশরীরী…এমন দৃশ্যে শিল্পীর উদাসীনতা, অমনোযোগ পাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তিটা হওয়ার খুব সাধ আমার!

কিন্তু আমি সাথে সাথে উত্তর দিতে পারি না। এই আহ্বান কি স্রেফ নির্ভেজাল আড্ডার উদ্দেশ্যে?

কায়েসকে কল দেই। দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অস্বস্তি, অস্থিরতা নিয়ে নিজেই পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে থাকি, কিন্তু কায়েসের সামনে সামিউরকে সাধুসন্ত পর্যায়ের নিষ্কাম নির্লোভ মানুষ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা।

কায়েস সোজা বলে দেয়, ‘স্টুডিও মানে বাসা তো? নাহ্, যাওয়া হবে না। বড়জোর রেস্টোরেন্টে গিয়া এক কাপ কফি খাইতে পারো!’

‘আরে, তুমি তো জানো উনি ম্যারিড! ওনার ওয়াইফও থাকবেন। আমার খুব দেখার ইচ্ছা মহিলাকে। আর স্টুডিওতে গেলে একটা আর্টিস্টকে কত কাছাকাছি জানতে পারবো!’

‘এত অন্তরঙ্গতার তো দরকার নাই! গিয়া দেখবা একটা অজুহাত বানায়ে বলতেছে যে তার ওয়াইফ বাসায় নাই। শিল্পী-সাহিত্যিকদের মরালিটি সাধারণ মানুষের মতো না। এদের ওপর ভরসা নাই।’

‘আরে না, উনি এরকম না। উনি তো জানেনই যে আই অ্যাম ইন আ কমিটেড রিলেশনশিপ! আর তাছাড়া আই ক্যান হ্যান্ডল মাইসেলফ।  ’

‘আমার সন্দেহ হচ্ছে…তুমি কি আসলে শুইতে যাচ্ছ, নীতু?’

‘আরে তোমার মাথা খারাপ! আমি তোমাকে এতদিন ধরে ঠেকায় রাখছি যখন, ওই বুড়া লোকের বিছানায় যাবো কোন দুঃখে!’

‘তোমার লক্ষণ ভাল ঠেকতেছে না। আই ওন্ট অ্যালাউ ইট!’

আমি কল কেটে দিয়ে দোতলায় ২৪ নম্বর রুমে হিমির তালাশে যাই। শুধু হিমিকেই বলা যায়, কারণ সামিউরবৃত্তান্ত শোনার পর চেনাজানাদের মধ্যে কেবল ও-ই আমাকে ‘খারাপ মেয়ে’ ঠাওরাবে না। হিমির গায়ে বাজে মেয়ের ছাপ্পড় লাগা, ওর সাথে আমার ওঠাবসায় ‘ভালোমেয়েরা’ অবাক হয়। আড়ালে হিমি সম্পর্কে তাদের অগুণতি প্রশ্ন। আমি এসময় ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আলগোছে হিমি-প্রসঙ্গ থেকে ছাড়িয়ে নেই নিজেকে।

ওকে নিয়ে হলের মাঠে ফোনে প্রেমরত মেয়েদের নাগালের বাইরে গিয়ে সব খুলে বলি।

হিমি আমার পিঠ চাপড়ে বলে,

‘আরে যা যা, এত সুবোধ বালিকা হয়ে কি করবি? তুই তো চিট করতেছিস না! ওনাকে ক্লিয়ার কর যে তুই ফ্রেন্ড হইতে পারিস বড়জোর, আর কিছু না!’

‘উনি যদি জোর করে কিছু করে বসে?’

‘নামিদামী মানুষেরা তোর মতো নীতু-মিতু-ঋতুদের নিজের গরজে সময় দিবো কেন? তাদের কি লাভ? আমার বাবা এত ট্যাবু নাই। শুইলে ওনাদেরও লাভ, আমারও লাভ। আমার লাভ ডবল, শোয়ার মজা আর উনাদের চোখ দিয়া দুনিয়া দেখার মজা। ইন্টারেস্টিং মানুষজনের সাথে সম্পর্ক পাতলে বুঝবি লাইফের কত ইন্টারেস্টিং দিক তুই জানস না! তখন তোর নিজের চোখও ফুটব।’

‘তুই তো ভয় আরও বাড়ায় দিলি!’

‘উনি মলেস্টেশন করবে বইলা মনে হয় না। উনার এইরকম রেকর্ড নাই। থাকলে আমার কানে আসত। কনসেনশুয়ালভাবেই করতে চাইবো, একটা রেপুটেশন আছে না! বেশি ভয় পাইলে আমার কাছ থেকে ছুরি নিয়া যাইস। জিন্সের পকেটে রাইখা দিবি।’

‘অ্যাঁ! একটা আর্টিস্টের সাথে দেখা করতে ছুরি নিয়ে যাবো!’

‘ওরে কুয়ার ব্যাঙ, তুই ভয় পাইলে আমারে নিয়া যা। শোন, এইসব ক্রিয়েটিভ মানুষের সাথে যোগাযোগ থাকা ভালো। উনাদের ছোঁয়াচ লাইগা তোর নিজেরও চলন-ফিরন-দেখনের ব্যাপক উন্নতি হইবো! অনেক বই পইড়াও যা হয় না!’

এই দাবির পক্ষে জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিমি নিজেই। মফস্বলের চঞ্চল পাগলি-পাগলি মেয়েটা, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত যার দৌড় ছিল একটা ভাঙ্গাচোরা পাঠাগারের গুটিকয় বই আর জি-সিনেমা-স্টার গোল্ডের বলিউডি সিনেমা পর্যন্ত, সে এখন লেখালেখি করে, শর্ট ফিল্ম বানায়; রাজধানীর শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের বড় বড় অনুষ্ঠানে, এমনকি ঘরোয়া আয়োজনেও দাওয়াত পায়। অথচ ঢাকায় আসার আগে হিমির কোন গুণের কথা ওর নিজেরও বোধহয় জানা ছিল না!

কিন্তু হিমির বগলদাবা হয়ে যেতে চাই না আমি। যদি সব মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেয়?

অনেক সাধ্যসাধনা করে শেষমেশ কায়েসকে রাজি করাই। সে আমাকে ওইদিন দুপুর বারোটায় খিলক্ষেতে সামিউর রহমানের ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে রেখে আসবে। বিকাল চারটায় আসবে নিতে। ওর ধারণা, আমি কোন ‘নষ্টামি’ করলে তার প্রমাণ ফুটে থাকবে আমার মুখে, শরীরের গন্ধে।

 

খিলক্ষেতের এদিকটা এখনো জমজমাট হয়ে ওঠেনি। আশপাশের সব এলাকাই ডেভেলপারদের দখলে।

সামিউর রহমানের ছোট্ট ডুপ্লেক্স বাড়িটার গেটে বাগান বিলাসের ঝাড়। সামনের সামান্য জমিতে জংলী পুটুশের ঝোপ। প্রাচীরে লতানো অপরাজিতা। গেট খুলে দিয়েছিল যে ছেলেটা সে খবর দিতে ভেতরে চলে যায়। আমি সেই ফাঁকে জাদুঘরের নিদর্শন দেখার কৌতূহলে ড্রইংরুমের জিনিসপত্র দেখি। ছিমছাম, বাহুল্যহীন, কিন্তু প্রত্যেকটা জিনিস যেন কোন শিল্পীর হাতের সূক্ষ্ম কাজ! ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে, কিন্তু অসুন্দর—এমন জিনিস নেই একটাও। ইশ, এর পাশে আমার বাড়ির মখমল মোড়ানো ঝকমকে লাল সোফা আর বারো রকম শো-পিস ঠাসা ড্রইংরুম কি খ্যাত দেখাবে! এই হীনম্মন্যতার পাশাপাশি, অদ্ভুতভাবে, আমার গর্বও হয়; এরকম নান্দনিক রুচির মানুষদের থেকে ডাক পাওয়া মানে যেন তাদেরই দলে ঢুকে পড়া!

সামিউর রহমান সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার চোখেমুখে মুগ্ধ আভা খেয়াল করেন,‘কি খবর নীতু! তুমি তো জ্বলজ্বল করছ!’

তার আপনি থেকে তুমিতে আসা খেয়াল করে আমার মনে হতে থাকে আমি যেন নিজের সাধারণত্বের বেড়া ভিঙিয়ে শিল্পের অন্দরমহলে ঢুকে পড়লাম।

‘আপনার বাসাটা এত সুন্দর করে গোছানো! এত আর্টিস্টিক! শিল্পীর বাসা তো এরকমই হবার কথা!’

‘উঁহু! আমি এত সংসারী না যে ঘর সাজায় রাখবো! এইসব নিয়ে মাথা ঘামাই না একদম! সবকিছু সুমনা ঘুরে ঘুরে কিনছে। আমার বাসা এত পরিপাটি থাকে না। সুমনা এই সপ্তাহটা ঢাকায় ছিল, ঘরদোর ঠিকঠাক করছে। কালকের মধ্যেই আবার নোংরা হবে! আচ্ছা, চলো, ওপরে আমার স্টুডিওতে চলো!’

‘উনি কোথায় এখন?’

‘খাগড়াছড়িতে। হিল ট্র্যাকসের তিনটা জেলাই ওর ওয়ার্কস্টেশন।’

বিশাল হলঘরের মত স্টুডিওতে আমার চোখ ঘোরে পেন্ডুলামের মত— এমাথা থেকে ওমাথা, ওমাথা থেকে এমাথা। রঙের টিন, দইয়ের খোরা। সারি সারি বয়ামে বালি, মাটি, ইট-কাঠ-নীলের গুঁড়া।

আমি ইজেলে টাঙানো অসমাপ্ত ক্যানভাসের দিকে ইশারা করি, ‘আঁকবেন এখন? চুপচাপ দেখবো!’

‘সিরিয়াস কাজ কারও সামনে করতে পারি না। তুমি চাও যখন, একদিন খেলার ছলে কিছু একটা আঁকা যাবে দুইজন মিলে। আজকে থাক। তুমি আঁকতে পারো?’

‘ছোটবেলায় একটু আধটু আঁকতাম। আঁকাআঁকির টেকনিক্যাল দিক অত বুঝি না।’

বরাবর নিজেকে নির্গুণ হিসাবে গুটিয়ে রাখলেও এইবার আমার ভেতর আত্মপ্রচারের বাসনা ফড়ফড় করে।

‘আপনাকে একটা ঘটনা বলি। আমি তখন ক্লাস টেনে। আমাদের ক্লাস টিচার জয়ন্ত স্যারের ফেয়ারওয়েলে ক্লাসের সবাই একটা করে ছবি এঁকে দিছলো। আমাদের ক্লাসে বেশ কয়েকজনের আঁকার হাত খুব ভালো ছিল। কি সুন্দর সুন্দর সব ছবি! স্যার সব ছবি পাওয়ার পর একটা ছবি ক্লাসে উঁচু করে ধরলেন— ‘এটা কার আঁকা? ছবিটার মধ্যে একটা হাহাকার আছে! পাওয়ারফুল!’ ওটা ছিল আমার আঁকা। আমি স্যারের প্রেমে পড়ছিলাম। উনি চলে যাবেন, ওনাকে আর দেখবো না— এটা আমাকে খুব অ্যাফেক্ট করছিল। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছবিটা আঁকছিলাম। নিশুতি রাত। নদী। নদীর ঘাটে একটা নৌকা বাঁধা। আবছা চাঁদ। কোথাও কেউ নাই, কিছু নাই। কোন ছবি দেখে আঁকিনি। মন থেকে আঁকা। মনপ্রাণ ঢেলে আঁকছিলাম তো, ভেতরের হাহাকারটা ছবিতে ছড়ায় গেছলো!’

‘বাহ্! আর আঁকোনি?’

‘নাহ্! আঁকার ওইরকম ইচ্ছা হয়নি কখনো।’

‘শুরু করে দেখো। আমাকে ভেবে আঁকো, দেখি কেমন প্যাশনেট হয়!’

আমি হাসি, যেহেতু হাসি সম্মতি ও অসম্মতি দুয়েরই লক্ষণ।

‘আর্টক্যাম্পে যাবা নাকি? হাওর অঞ্চলে যাবো এবার।’

‘আমার তো ইচ্ছা। কিন্তু…’

‘কিন্তু বয়ফ্রেন্ড যেতে দেবে না, তাই তো?’ সামিউর হো হো করে হাসেন। ‘শোনো, বয়ফ্রেন্ডকে অত পজেসিভ হতে দিবা না। তুমি একটা ইনডিপেন্ডেন্ট মানুষ!’

এবারও মৌন হাসিই নিরাপদ!

‘এত জড়সড় হয়ে আছো! রেড ওয়াইন খাও। দো-চোয়ানি আছে, কাঞ্জি আছে—পাহাড়ি জিনিস। খাবা?’

আমার মনে পড়ে যায়, কায়েস আমাকে চারটায় নিতে আসবে, আপাদমস্তক তল্লাশি করে দেখবে কোথাও কোন অবিশ্বস্ততার আলামত পাওয়া যায় কিনা!

‘আমি আসলে এখান থেকে একটা সেমিনারে যাবো। চারটায় চলে যেতে হবে।’

সামিউর চমকে ওঠেন— ‘কি বলো! চারটায় যাবা মানে? তাহলে আসছ কেন? আমি ভাবলাম অন্তত ৮টা-৯টা পর্যন্ত থাকবা! সেমিনার বাদ দাও! এখানে ইউ উইল হ্যাভ বেটার টাইম, আই ক্যান গ্যারান্টি ইট!’

মিথ্যাই আমার শেষ ভরসা— ‘এই সেমিনারটা একটা কোর্সের পার্ট। অ্যাটেন্ড করা ম্যান্ডাটরি!’

সামিউর চোখেমুখে অসন্তোষ নিয়ে উঠে গিয়ে রেড ওয়াইনের বোতল নিয়ে আসেন।

‘একটু খাও। ভাল ব্র্যান্ডের। অ্যালকোহল খুব কম। তোমাকে সামনে বসায় রেখে একা একা তো খেতে পারি না। আর গন্ধ নিয়ে ভয় পেলে যাওয়ার সময় লিস্টারিন দিয়ে কুলি করে যেও!’

আমি ইতস্তত করতে করতে শেষে গ্লাসে চুমুক দেই।

‘খাও, খাও! খেলে তোমার ইনহিবিশন একটু কমবে। রেড ওয়াইনে অবশ্য আমার চলে না! ১৫% অ্যালকোহলে কিছু হয়?’

আমি আলাপের মোড় সুখী-সাংসারিক পরিমণ্ডলে ঘুরিয়ে আনতে বলি, ‘আপনার স্ত্রীর আর কোন পোর্ট্রেট নাই? ওনার ব্যাপারে আমার খুব কৌতূহল!’

‘আছে, পরে দেখাবো। আজকে তো তুমি সময় নিয়ে আসোনি।’

‘শি ইজ ভেরি গ্রেসফুল!’

‘হার হার্ট ইজ ইভেন মোর বিউটিফুল, ইয়াং লেডি! খুব উদার, একদম পজেসিভ না। এই যে আমি মাঝেমধ্যে অ্যাফেয়ার-ট্যাফেয়ার করি, ওর এসবে আপত্তি নাই।’

‘ওনারও কি অ্যাফেয়ার আছে?’

‘নো নো! আমি ছাড়া আর কেউ নাই ওর! বউয়ের কথা বাদ দাও। লেট মি টেল ইউ অ্যাবাউট মাই গার্লফ্রেন্ডস! ইউ উইল ফাইন্ড দেম ইন্টারেস্টিং!’

এক হাতে সিগারেট, আরেক হাতে ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে সামিউর সোফায় জাঁকিয়ে বসেন।

‘ফ্লোরেন্সে আমার একটা গার্লফ্রেন্ড ছিল। ও অবশ্য ইটালিয়ান না, আমেরিকান। উইকেন্ডে আমি ওর বাসায় যেতাম নাহয় ও আমার বাসায় আসত। লিভ-ইনের চেয়ে এই ব্যবস্থা ভালো। হোয়েন ইউ হ্যাভ ইট ওনলি ইন ইয়োর মাইন্ড, ইট গেটস ইনটেন্স! আমরা খুব স্পেশালি সেলিব্রেট করতাম ডেট নাইট। একেক সন্ধ্যায় ও একেকটা লঁজারি পরত। বেবিডল, রম্পার, গার্টার বেল্ট, জি-স্ট্রিং—হোয়াট নট! স্ট্রিপটিজ করত…ইট ওয়াজ সেক্সুয়ালি মাই মোস্ট স্যাটিসফাইং রিলেশন!’

আমার কান দু’টো গরম হয়ে যায়। উনি কিসের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চাইছেন বেশ আন্দাজ করা যায়। কিন্তু বাইরে আমি নির্বিকার, শক্ত চোখমুখ; যেন কোন নীরস বিষয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছে। সামিউর দ্বিতীয় গ্লাস শেষ করে এখন তৃতীয় গ্লাসে। আমি প্রথম গ্লাসেই পড়ে আছি, একটু ঝিমঝিম করছে মাথা। ঘোরের মধ্যে কানে কথা ঢুকছে ভেঙ্গেচুরে।

সামিউর নিজের প্রশংসাপত্র মেলে ধরেন,

‘আমার বহু লাভার ছিল। ওয়াইড এক্সপেরিয়েন্সড! আই নো হু ওয়ান্টস হোয়াট, বুঝলা! বিশেষ করে আমার দেশী প্রেমিকারা আমাকে ফিডব্যাক দেয় আমি নাকি খুব সেনশুয়ালি আদর করতে পারি, উইথ লটস অফ সেনসিটিভিটি। দে হ্যাড দেয়ার বেস্ট এক্সপেরিয়েন্স উইথ মি! তুমি কখনো বডি মাসাজ করিয়েছ? প্যারিসে আমার প্রেমিকা ছিল—এমা। ওর কাছ থেকে আমার মাসাজ টেকনিক শেখা। আই ক্যান মাসাজ লাইক প্রফেশনালস!’

আমার অযৌন নির্লিপ্তিতে পঁয়ষট্টি বছরের রমণীমোহন আরেক পুরিয়া ওষুধ ঢালেন,

‘আই হ্যাভ ডান আ লটস অফ ন্যুডস ইন মাই লাইফ! প্রেমিকাদেরগুলো সেল করিনি, রেখে দিয়েছি। ওয়ান্ট টু টেক আ লুক?’

একটা মোটা বড়সড় খাম বের করে আনেন তিনি, সেখান থেকে উন্মুক্ত করেন একেক নগ্নিকার একেক গড়ন, দেহমাধুর্য।

‘সাবিহা— ওর বোন স্ট্রাকচার একটু হেভি, কিন্তু ফেস সেই তুলনায় খুবই ছোট। আমার ছাত্রী ছিল। এখন আর আঁকাআঁকির ধার ধারে না। বেচারী সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বন্যা— মেয়েটার চেহারায় যেমন বন্যতা, বাস্তবেও সেইরকম। পিঠের এই ক্ষতগুলা লাভবাইট। এমা— খুব স্কিনি। চেহারায় একটা রুডনেস আছে, কিন্তু মেয়েটা আসলে খুব সফট, খুব সেনসিটিভ। বুক ছোট হলেও শি ওয়াজ ভেরি সেক্সি! গ্রেটা—ভেরি টল, আমার চেয়ে সাড়ে চার ইঞ্চি বেশি। ওর সাথে ব্যালান্স রাখা মুশকিল ছিল! হানা— দেখো, মেয়েটা হেলদি কিন্তু খুব সেক্সি, র’ আনরিফাইন্ড বিউটি। জাস্ট লুক অ্যাট হার অ্যাস! চৈতী…ওর চুল দেখছ? পা ছুঁইছুঁই! কোমর এত চিকন—দুই হাত দিয়ে ধরা যায়!’

সামিউরের জ্বলজ্বলে চোখে নস্টালজিয়ার বিষাদ নেই, শুধুই ধিকিধিকি উত্তেজনা। ‘আর এটা সুমনা— ওর বডির প্রোপরশন পার্ফেক্ট!’

এই ছবিটা আমি হাতে নিয়ে দেখি। কি স্বাভাবিক উন্মুক্ততা, যেন নগ্নতাই প্রাকৃতিক। কি মায়াবী মুখ!

‘শি ইজ ভেরি বিউটিফুল!’

‘হ্যাঁ…ওর শরীরটা প্রায় নিখুঁত!’

‘ছেলে হলে একদম প্রেমে পড়ে যেতাম!’

‘মেয়ে হয়েও প্রেমে পড়তে পারো! দর্শকের পার্সপেক্টিভ থেকে বলতে পারি লেসবিয়ান সেক্স ইজ মোর বিউটিফুল দ্যান হেটারোসেক্সুয়াল সেক্স!’

সামিউর গাঢ় দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকান, নিজের কামার্ততার ছায়া খোঁজেন। আমি তার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে মোবাইল স্ক্রীনে পড়ে থাকি। হঠাৎ চোখে পড়ে সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। আমি নড়েচড়ে বসলে তারও খেয়াল হয় আমি আর বড়জোর আধ ঘন্টা থাকবো।

‘শোনো নীতু, লেট মি বি স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। তোমার আইজ অ্যান্ড লিপস খুব সেনশুয়াল। আই অ্যাম অ্যান আর্টিস্ট। আমি বুঝতে পারি, ইউ আর আ সেনশুয়াল পার্সন। ইউ নো, আই অ্যাম অ্যাট্র্যাক্টেড টু ইউ। তোমাকে আদর করতে দিবা না, নীতু?’

আমার শরীরে গরম হলকা বয়ে যায়, ভেতরে থরথর কাঁপি। ঢোক গিলতে গিলতে বলি, ‘আমি আপনার বন্ধু থাকতে পারি। কম্প্যানি দিতে পারি…কিন্তু… ফিজিক্যালি ইন্টিমেট হতে পারবো না, স্যরি!’

‘আরে, তুমি একটা মডার্ন মেয়ে! এত শাই হলে হয়? আমার বন্ধুর কি দরকার! অনেক আছে তো!’

‘স্যরি, তাহলে আপনি শুধু শুধু আপনার সময় নষ্ট করলেন! আমি উঠবো এখন। ওয়াশরুমটা কোনদিকে?’

সামিউর রহমান চোয়াল শক্ত করে ওয়াশরুম দেখিয়ে দেন।

আমি লিস্টারিন দিয়ে কুলি করে বেরিয়ে আসি। সামিউরের মুখ গম্ভীর। আমার ‘স্যরির’ বিপরীতে শুকনো মুখে বলেন, ‘ভালো থেকো।’

বাইরে বেরিয়ে দেখি কায়েস তখনো আসেনি। ওকে কল দিয়ে একা-একা হাঁটতে থাকি।

কায়েস রাস্তায় আমাকে খুঁজে নিয়ে কোরবানীর প্রাণীর খুঁত খোঁজার মতো খুঁটিয়ে দেখে আপাদমস্তক।

‘মুড অফ কেন? হোয়াট হ্যাপেন্ড?’

‘নাথিং হ্যাপেন্ড!’

আমার মাথা তখন ধীরগতিতে চলছে। ওয়াইনের প্রভাব, তার ওপর এক বেলা যা যা ঘটল…! রিকসায় উঠে কায়েস আমার দিকে ঘুরে থাকে। আমার চোখ সামনের দিকে, শূন্য দৃষ্টি।

ও উসখুস করতে করতে বলে, ‘ওই ব্যাটা তোমাকে অ্যাবরাপ্টলি কিস করার চেষ্টা করেনি তো?’

আমি মাথা নাড়ি ডানে-বায়ে।

এদিকে রাস্তা ফাঁকা, মানুষজন তেমন নেই। কায়েস এবার আচমকা আমার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। তারপর মুখ সরিয়ে নিয়ে বলে, ‘তোমার মুখে মাউথওয়াশের গন্ধ কেন? ঘটনা কি?’

ন্ধ্যায় হলে ফিরে চুপচাপ শুয়ে থাকি কিছুক্ষণ। মাথার একটা অংশ পাথরের চাঙড়ের মতো ভারী, নিঃসাড়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমার সরলসিধা অভিজ্ঞতারা সব জড়িয়ে-পেঁচিয়ে জটিল গিঁট লাগিয়ে ফেলল।

হিমির রুমে গিয়ে দেখি ও তখনো ফেরেনি। হলের মাঠে বসে থাকি। শরীর জুড়ে অবসাদ— বমিবমি ভাব, পেটের ভেতর ভয়ানক অস্বস্তি।

রাত সাড়ে ন’টার দিকে হিমি হল-গেট দিয়ে ঢুকলে ওকে নিয়ে মাঠে বসি। সব শুনে আমার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে ও বলে,

‘এত টেনশন করতেছিস কেন? যা হইছে বাজে কিছু হয়নি। তোদের মধ্যে ক্লিয়ার হইল সবকিছু। তুই তো আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারছিলি।’

‘আমার খুব আশ্চর্য লাগে রে হিমি! ওনার বউ এত সুন্দরী, এত সুন্দর মানসিকতা, এত কোয়ালিফায়েড, এত রুচিশীল, তারপরও আমার মতো সাধারণ মেয়েদের পেছনে ঘুরতে হয়!’

‘এত সরলভাবে মানুষের সাইকোলজি দেখলে তো হবে না বাচ্চা মেয়ে! মানুষের বিচিত্র সব জিনিসের বাসনা হয়! সামিউর রহমান আর উনার বউ দুইজনরেই আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগতেছে! তুই এত ভদ্র মেয়ে না সাইজা একবার শুইয়া পড়লে পারতি! এক্সপেরিয়েন্স হইত!’

‘আরে মাথা খারাপ! কায়েসের সাথেই আমার কিছু হয় নাই! আমার ভয় লাগে! আমি নিজেই কখনো আমার ভ্যাজাইনা ছুঁয়ে দেখি নাই, জানিস!’

‘কস কি! ধাড়ী মাইয়া, এখনো নিজের শরীরই চিনস না! তুই কি অশরীরি বায়বীয় নাকি রে? আরে বাবা, তুইও তো একটা অ্যানিমেল!’

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবি, এই দিনটা এক ধাক্কায় আমার মনের বয়স বাড়িয়ে দিল! প্রাপ্তবয়স্ক হবার এত বছর পরও আমার নিজের সাথেই যেন নিজের সংযোগ নাই। নিজের শরীরে নিজেই কান পাতি না, নিজের চোরাগলি কি কানাগলি নিজেই চিনি না। স্বামী মহোদয়ের জন্য তুলে রেখেছি, নিজের আঙুলেও দূষিত করি না।

সেদিনের পর আমি আর সামিউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করিনি। নিজে থেকে যোগাযোগ করা মানে সবুজ-সংকেত দেওয়া। সাবধানী-সাধারণ মানুষ আমি, নৈতিকতার সরল পথে থাকাই ভালো। অত জটিলতা পোষাবে না। তবু মাঝেমাঝে গলায় কাঁটা ফুটে থাকার খচখচ অস্বস্তি।

মাসখানেক সামিউর রহমানের কোন হদিস ছিল না। হঠাৎ একদিন তিনি মেসেঞ্জারে হাত নাড়েন। আমি এবার সরাসরি জানিয়ে দেই,

‘আপনি তো জানেনই, আমি আসলে ফ্রেন্ডশিপ ছাড়া অন্য কিছুতে জড়াতে পারবো না!’

‘টেক ইয়োর টাইম। কোন জোরাজুরি নেই আমার তরফ থেকে।’

‘ভাবাভাবির কিছু নাই আসলে।’

‘শোনো, কাল আসতে পারবা আমার স্টুডিওতে?’

‘মনে হয় না।’

‘চেষ্টা করো। দেখো, আমি একজন আর্টিস্ট। জবরদস্তির মতো নোংরামিতে আমি নাই। তোমার সাথে সামনাসামনি একটু গল্প করতে ইচ্ছা করছে, তাই।’

এইবার আমি কায়েসকে কিছু বলি না। যাওয়ার আগে শুধু হিমিকে জানিয়ে রাখি।

স্টুডিওতে ঢুকে দেখি সামিউর রহমান অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে টেবিলের ভারী কাঁচের ওপর রঙ ছেটাচ্ছেন। গম্ভীর চোখ-মুখ। আরেক হাতে স্বচ্ছ তরলের গ্লাস। আমাকে দেখে মিনারেল ওয়াটারের বোতল থেকে খানিকটা তরল গ্লাসে ঢেলে বলেন,

‘সুমনা নিয়ে আসছিল বান্দরবান থেকে। প্রাইং। টেস্ট করে দেখবা?’

‘অল্প একটু।’

‘আমি জানি, তোমার মধ্যে অভিজ্ঞতা নেওয়ার একটা ভীতু ভীতু শখ আছে।’

খানিকটা পানি মিশিয়ে আমার হাতে গ্লাস ধরিয়ে দেন সামিউর। নাকের কাছে আনতেই উগড়ে দেওয়ার উপক্রম হয় আমার; তবু ‘অতিমাত্রায় নাজুক’ ধরনের ছাপ্পর থেকে বাঁচতে বেশ অভ্যস্ত ভঙ্গিতে চুমুক দেই।

‘আজকে দেখাবেন না আপনার স্ত্রীর পোর্ট্রেটগুলো?’

‘হ্যাঁ, দেখাবো। ওর ছবি দেখার জন্যই আসছ তুমি, তাই না?’ সামিউর রহমান মলিনভাবে হাসেন, ‘সুমনার ছবি দেখাতেই তোমাকে ডাকছি।’

একটা কাঠের বাকশো থেকে বের করে আনেন একতাড়া ছবি।

‘এটা ওর প্রথম পোর্ট্রেট। বান্দরবানে বসে আঁকছিলাম। আমাদের পরিচয়ের দ্বিতীয় দিনে।’

স্নিগ্ধ, মিষ্টি একটা মুখ; হাসি শুধু ঠোঁটে না, চোখেও।

‘ওনার চেহারায় মায়ামায়া একটা ব্যাপার আছে।’

‘হ্যাঁ। দেখলে আপন-আপন লাগে, না? ওকে যখন প্রথম দেখি আমার বয়স তখন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। আর ওর ছাব্বিশ। ওকে দেখে মনে হইছিল—ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়।’ সামিউরের গলা হঠাৎ যেন ধসে যায়, ‘প্রায় পনের বছরের সংসার আমাদের। কত মেয়ের সাথে আমার প্রেম হইছে, এরকম আপন কাউকেই লাগে নাই, জানো!…ও বোধহয় আমার আর আপন থাকবে না…’

‘কেন? কী হইছে?’

কাঁচের ওপর রঙের ছিটায় যে বিমূর্ত দৃশ্য তৈরি হয়েছে, চিত্রকর সেদিকে তাকিয়ে থাকেন চুপচাপ। আমি টেবিলে পড়ে থাকা পোর্ট্রেটগুলো দেখি। বিষণ্ণ উদাস সুমনা, হাসিতে লুটিয়ে পড়া সুমনা, খোঁপা বাঁধতে থাকা সুমনা, রান্নারত সুমনা, ঘুমন্ত সুমনা।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় নীরবতা। আমি উসখুস করি। সামিউর হঠাৎ স্বগতোক্তির মত বলতে শুরু করেন—

‘ইউরোপে বছর পনের কাটায় দেশে আসার পর বান্দরবানে এক মারমা বন্ধুর বাড়িতে গেছলাম। পাহাড়ের ওপর বাড়ি। কাছেই নদী। বন্ধুর বউটা এমন লক্ষ্মী; এমন মজার মজার মারমা খাবার রান্না করে খাওয়াত! ঝকঝকে তকতকে, সরল, শান্তিশান্তি ঘরদুয়ার। ওদের সংসারে কয়েকদিন কাটানোর পর আমারও একটা সংসারের লোভ হলো। সেই সময়ই সুমনার সাথে দেখা। ও একটা এনজিওর কাজ নিয়ে তখন বান্দরবানে। শখের আঁকাআঁকি করে। পাহাড়ি বাচ্চাদের আঁকতে শেখায় ছুটির দিনে। আমি ওখানে আছি এই খবর পেয়ে এক বিকালে আসল দেখা করতে। রিকোয়েস্ট করল একদিন বাচ্চাদের ছবি আঁকার কর্মশালা করতে হবে। আমার না করার কোন কারণ ছিল না। কোন কাজ নিয়ে তো আসি নাই। টুকটাক পাহাড়, নদী, জলপ্রপাত, পাহাড়ি মানুষ— এইসব আঁকছিলাম। আর সুমনার মতো মেয়েকে না করা যায়? ওর সৌন্দর্য কোমল, ওর মনটা সেনসিটিভ, কিন্তু একই সাথে ও ভীষণ সাহসী, উদার। একদম অনিবার্যভাবে আমি সুমনার প্রেমে পড়ে গেলাম! ওকে মুগ্ধ করতে উঠেপড়ে লাগলাম। ছবি আঁকার নামে ওকে বসায় রাখতাম সামনে। ওর একটা গেরুয়া রঙ শাড়িতে পাহাড় আর নদী আঁকলাম একদিন। একসাথে ঘুরতে ঘুরতে দুর্গম নির্জন সব জায়গায় চলে যেতাম! একদিন হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে হঠাৎ একটা ঝিরি খুঁজে পেলাম আমরা। কি যে আনন্দ আমাদের! ঠান্ডা পানিতে হাত-পা ডুবিয়ে বসতে না বসতেই বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেল হঠাৎ! আমরা হাঁ করে বৃষ্টির পানিতে জিভ ভেজালাম। ঝিরির পানিতে ভেসে আসা জবা ফুল ওর চুলে গুঁজে দিলাম। সেই অবিশ্বাস্য সুন্দর প্রকৃতিতে একগোছা ভাঁটফুল ছিঁড়ে ওকে প্রেমের প্রস্তাব না, সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলাম আমি। পরিবেশের একটা ঘোর থাকে না! ও হ্যাঁ বলে দিল কিছুক্ষণ পর। আমরা দুইদিন পর বিয়ে করে ফেললাম।’

‘আমরা দুইজনই জানতাম, দমবদ্ধ দাম্পত্যে আমাদের পোষাবে না। তাই ঠিক করলাম, নিজেদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেবো, স্পেস দেবো, কিন্তু কারও কাছে কিছু গোপন করবো না। শুনলে আশ্চর্য হবা, এত মেয়ের সাথে বিয়ের বাইরে শুইছি আমি, কিন্তু সুমনার সাথে আমার প্রথম সেক্স বিয়ের রাতে। আমার অসাধারণ সুন্দরী বউ, প্রাণভরে আদর করলাম ওকে। এত যত্ন নিয়ে—যেন মোমের পুতুল, যেন মখমলে মোড়ায় রাখা দামী রত্ন। আমার বউও আদরে থিরথির কাঁপছিল। অনেকক্ষণ ধরে আমাদের লাভমেকিং চলল। ক্লাইম্যাক্সে আমি কেঁপে কেঁপে তীব্র শীৎকার দিয়ে ঢলে পড়লাম ওর ওপর। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস শুনতে শুনতে, শরীরের গন্ধ নিতে নিতে হঠাৎ আমার খেয়াল হলো, ফোর-প্লের সময়টা বাদে ও কোন শব্দ করেনি। কোন জান্তব সুখে ওর শরীর নাচেনি। নিজে তীব্র সুখ পাওয়ার পরও আমার একটু মন খারাপ হলো। ওকে জিজ্ঞেস করলাম—তোমার শেষ হইছিল তো? ও ফ্যালফ্যাল করে তাকায় থাকল। আচ্ছা, প্রথমবার নাও হতে পারে!

‘বিয়ের ছয় মাস গেল। কিন্তু একবারও ওকে সেই সুখে থরথর করতে দেখলাম না, যেই সুখ চিলের মত ছোঁ মেরে আকাশে তুলে সব ভুলায় দেয় কয়েক মুহূর্তের জন্য। আমি ভীষণ মুষড়ায় গেলাম। কত নারী অর্গাজম ছাড়া জীবন কাটায় দিচ্ছে… বেশিরভাগ স্বামীই বউয়ের সুখ নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু আমি বরাবর নিজের চাইতে পার্টনারের কথা বেশি ভাবি। আমার প্রেমিকাদের সবারই, প্রতিবার না হলেও, বেশিরভাগ সময়ই অর্গাজম হতো। অবশ্য কেউ কেউ ভান করত কিনা তা জানি না। আমি যে আমার সুখের আগে ওদের সুখটা দেখি, এ জন্য সবাই আমাকে খুব পছন্দ করত। সুমনার ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছাতে না পারাটা আমার মনে হলো পুরুষত্বের অপমান! ওর সাথে খোলাখুলি আলাপ করলাম। ফোরপ্লে-তে ওর খানিকটা শিহরণ হয়, কিন্তু ভ্যাজাইনাল সেক্সে কিছু হয় না। ক্লিটোরিস মাসাজে কখনো কেঁপে কেঁপে ওঠে, কিন্তু কোথায় যেন আটকে থাকে, কোথায় যেন একটা বাধা। সেটা ডিঙায়া চূড়া পর্যন্ত পর্যন্ত আর পৌঁছায় না। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমার সেক্সি বউ কি ফ্রিজিড? কি অপচয়! কয়েকজন ডাক্তারের কাছে গেলাম। এই আলাপে আমাদের চেয়ে তারাই যেন বেশি বিব্রত। এক গাদা টেস্ট দিলেন, কিন্তু রিপোর্টে তেমন কোন অ্যাবনরমালিটি পাওয়া গেল না। ডাক্তারদের কি দোষ, ওনাদের তো অভিজ্ঞতা নাই তেমন। এই দেশে মেয়েদের প্লেজার নিয়ে কয়জন মাথা ঘামায়? সাইকোলজিস্টের কাউন্সেলিংয়েও তেমন কোন উন্নতি হলো না। সেক্স আমার কাছে একঘেয়ে লাগা শুরু হলো। যেই আনন্দ আসক্তির মতো মানুষকে পাগল করে, সেটা ও পাচ্ছে না, আমি একতরফা স্বার্থপরের মতো সুখ নিচ্ছি, এটা আমার ভালো লাগত না। ও স্যাক্রিফাইসিং, কেয়ারিং স্বভাবের মেয়ে— আমাকে খুশি করতে অর্গাজম পাওয়ার ভান করাও ওর পক্ষে অসম্ভব ছিল না। কিন্তু এটা একতরফা যৌনসেবা দেওয়া ছাড়া আর কি! বছরখানেক পর অনিয়মিত হয়ে গেল আমাদের সেক্স। কিন্তু আমার পক্ষে এভাবে চলা অসম্ভব। ইটস লাইক মাই ফুয়েল! আমার কাজকর্ম আগাচ্ছিল না। শেষে ও-ই সমাধান দিল, আমি অন্য মেয়েদের সাথে শুইতে পারি। ওর আপত্তি নাই। গভীর প্রেমের সম্পর্কে না জড়ালেই হবে। আমি ভাবলাম, ও কি অভিমান করে এই সিদ্ধান্ত নিল? আমি নির্বিচারে শুয়ে বেড়ালে ওর কষ্ট হবে না? নাকি ও অন্য পুরুষের সাথে শুয়ে দেখতে চায়, আর সেটার পারমিশন আদায় করতে আগে আমাকে লাইসেন্স দিয়ে দিলো? কিন্তু না, ওর মধ্যে কোন রাগ-অভিমান দেখলাম না, কারও সাথে ঘনিষ্ঠ হতেও দেখলাম না। বরং এই ব্যবস্থায় যেন খানিকটা স্বস্তি পেল। ও নিজের কাজে তুমুল ব্যস্ত হয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমাদের দাম্পত্যে সেক্স হয়ে গেল বছরে দুই-তিনবার সেলিব্রেট করার মতো কোন ঘটনা, যেখানে ইরোটিক তাড়নার চেয়ে মায়া-মমতা বেশি। এভাবেই আমাদের পনের বছরের সংসার। আমরা একসাথে পার্টিতে যাই। বন্ধুবান্ধবরা আমার বউকে দেখলেই কাঁত হয়ে যায়। এত সুন্দরী বউ থাকতে আমার ছোঁকছোঁকানি কমে না— লোকে টিজ করে। ও বেশিরভাগ সময় হিল ট্র্যাকসেই থাকে, কাউকে বাসায় আনতে ঝামেলা হয় না। আর ও যখন বাসায় থাকে তখন অন্য কারও আসা নিষেধ। ওই ক’দিন কোন মেয়ের ফোনও ধরি না আমি।’

এতক্ষণে নেশা ভালমতো চেপে ধরেছে সামিউরকে। টেনে টেনে কথা বলছেন। শুয়ে পড়লেন ডিভানে।

‘গত সপ্তাহে ঢাকা এসে সুমনা বললো ও একজনের প্রেমে পড়ছে। কলিগ। চাকমা ছেলে। অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি করে এসে এখন খাগড়াছড়িতে কাজ করে। আমি ভাবতেই পারতেছি না নীতু! আরেকজনের সাথে প্রেম করলে ও কি আর আমার এত আপন থাকবে? আমি তো কারও সাথে জড়াইনি। ও তো জড়ায় যাচ্ছে। কেন? ওই ছেলেটা কি শেষপর্যন্ত ওকে অর্গাজম দিয়ে ফেলছে?’

সামিউর চোখ বোঁজেন। বন্ধ পাতা থেকে পানি গড়িয়ে তার কানের লতি ভিজে যায়। আমি অপেক্ষা করি; হয়ত কথা শুরু করবেন হঠাৎ।

আধ ঘণ্টা পরও সামিউরের চোখের পাতা কিংবা ঠোঁট নড়ে ওঠে না। ঘুমিয়ে পড়েছেন নিশ্চয়ই। ঘুমন্ত মানুষের চেহারাও এত যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়!

নিঃশব্দে বেরিয়ে আসি। আমি বহুক্ষণ নীতু থাকি না— প্ল্যানচেটে মিডিয়ামের মানুষটার ওপর মৃতের আত্মা ভর করলে যেমন তার নিজের চেতনা থাকে না।

হঠাৎ এক ভয়ের বিস্ফোরণে আমূল কেঁপে উঠি। সাথে সাথে কায়েসকে কল দেই,

‘কক্সবাজার যাবা? হোটেল বুক করো!’

রচনাকাল: মার্চ, ২০১৯


রিফাত আনজুম পিয়া

গল্পকার।
প্রকাশিত একমাত্র বই ‘তখন গল্পের তরে’ বেরিয়েছে ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতে, পেন্ডুলাম পাবলিশার্স থেকে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading