নির্বাচিত ২৫ কবিতা | সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ


ভালবাসা


আমি তারে ভালবাসি খুব,
                    সে আমারে বড় ভালবাসে,
তাই সে যখন মদ খায়,
মাতলামি করে আর গালাগালি করে আর ভীষণ চেঁচায়
          তখনও আমার মনে আসে :
                    তারে আমি ভালবাসি খুব,
                              সে আমারে বড় ভালবাসে।

দিনে-দিনে বেড়ে চলে মদের চাহিদা ক্রমাগত,
          সুস্থতা উধাও ধায় বিয়ারের বুদ্বুদের মতো—
আমি তার সব ঝড় বুকে নিয়ে নোনা
                              আঁধিয়ার দরিয়ার প্রায়
                    কখনও বলি না কিছু, ফ্যাদমে-ফ্যাদমে থাকি চুপ!
       এখন আমার মনে আসে:
আমিও মাতাল হ’ব, যতটা মাতাল হওয়া যায়,
          মদ খাব, মদ খাব, মদ খাব আমিও, কেননা
                    আমি তারে ভালবাসি খুব,
                              আমারে সে বড় ভালবাসে।

ঢাকা, ১৯৮৭


ধ্রিয়মাণ

(প্রেস্তো)


আমি ভাবি আমি করি, কিন্তু আমি করি না।
নিজেই করে নিজে-নিজে। তবু-তো এই ভাবনা
ততখানিই সত্য, যত সত্য গোটা ঘটনা।
সে আমারে ভাবনা করায় রে!

অধিকাংশ কোষগুলিই গ্রহীতা কোষ। অবশ্য
কোনোকিছুই ‘ধারক’ নয়, তায় ঠিকমতো না-বসালে।
উল্টে-রাখা বাল্টিতে-তো একবিন্দুও ধরে না।
কাজেই, কিছু কোষ-তো আছেই, যারা বিলকুল অযোগ্য;
আরও কিছু, যতই কম হোক, গ্রহীতা কোষ যারা না।

এই দু’জনের মধ্যে-যে কার শক্তি বেশি— কে পারে
আসলেই এই রাস্তা দিয়ে চালিয়ে নিতে আমারে?
রাস্তাটিরও আছে একটা নিজের রাস্তা, আর একটা
রাস্তা আছে আমার জন্যি। সে-কি পারে হাঁটাইতে
আমারে দুই রাস্তা দিয়েই? কিংবা আমার দু’জনেই
যুগপৎ-কি হাঁটতে পারে যুগ্মমাত্রিক রাস্তাতেই?
সে আমারে ভাবনা করায় রে!

ঢাকা, রিকশায়, ১৯৮৯


কাছিমেরা


“আহ্! সরাও এ’ বিষের পেয়ালা, আমার রক্তের পেয়ালা, ঊষর
মেঘের পেয়ালা… নিজের মাজার জেয়ারত! শহিদের
চেয়েও শহিদ! শহিদের শহিদ! আহ্! সরাও কনক-বরন
এই চন্দ্রঘোণা কুকরি, বরমাল্যের লকেটে লটকানো!”

এইমতো কাতরাল সে আপাদমস্তক, ঘণ্টাচারেক। ততক্ষণে বেজে
উঠেছে পাঞ্চজন্য শাঁখ, আর আদিমতম শিশুর কাঁসর-
-চিৎকার। প্রত্যালীঢ় সাতটি রাইফেলে মুহ্যমান শেষ-বিকালের
বাদামি-করুণ দৃশ্যচ্ছটা। প্রধান সিনাগগে, আহা, লাল

পর্দা ফর্দাফাঁই।— “এই শির্কা এসেছে সাতবার কাফেলা
বদলে, সুদূর উর থেকে।”— রক্তের তার, আহা, বারোটি জিহ্বায়
নোনতা হ’য়ে আছে… “রক্তের তার— তোমার রক্তের কড়া
কিক্— আহ্!” ঋতে সমুদ্রাদন্য কো বিভর্তি বাড়বানলম্?

ঐ লোকগুলোর উচ্চতা নাই, উহারা সমতল; শুধু মাঝে-মাঝে
বালিয়াড়ি-ফাঁপা ফেঁপে ওঠে— গণশ্বাসকার্যে যেন; উহাদের
গভীরতা ফ্যাদমহীন, আর ইন্দ্রিয় বলিতে খালি নাক…
পপির ক্রিসেন্ট-লেকে কাছিমেরা নিজ-মাংস কদাচ খায় না।

ঢাকা, ১৯৯০


পুলিপোলাও


১৪


বামাচারী আত্মাদের প্যান্ডেমোনিয়ামে

একদিন শরিক আমি শুধু নিয়তিকে
মেনে না-নে’য়ার ছলে। সঙ্গীতের শুদ্ধ সঙ্ঘারামে
ছিলাম আরেকদিন, আরেক পলায়নের দিকে

স্বপ্নকে চালনা ক’রে। অতঃপর দু’পথের মেলবিন্দুটিতে
দাঁড়িয়েছি, জীবনে প্রথমবার, মুখোমুখি সমূহ সত্যের—
তরল আলোর মতো, অখিলের অবধূতিকায়,
যে-সত্যের ঊর্ধ্ব-ঋতি সরল শিখায়,

যে-সত্য প্রজায়মান জ্যোতিষ্কের মস্তিষ্কের শুভ্র নিদুটিতে,
অলকানন্দায়,— যার প্রতিভাস বিম্বিত মর্ত্যের
বিশাল বীপ্সার পটে। যে-বিস্ময়ে “তারাভরা রাত”
সুরশ্রেষ্ঠ শিল্পীর তুলিকে

দিয়েছে অপরিমেয় শক্তির প্রঘাত—
যে-আলোক চিরযায়ী অমাময়ী মৃন্ময়ীর দিকে…

 

 

১৫

প্রসীদ আমায় তুমি দক্ষিণায়নের রানি, হে দেবী চটুলা,
চতুরা ধুতুরা অয়ি, তুমি, যার কাছে
শারদ শশীও ছত্রখান হ’য়ে আছে,
পদনখে প’ড়ে তব আছে কতগুলা।

হে দেবী, এসেছি আমি বঙ্গের লঙ্গরখানা থেকে
তোমার প্রসাদে পুষ্ট করতে এই চর্মসার প্রাণ—
এবং, দেখেছি অন্তে, সকলের মূলে একই অঙ্গারাম্লজান:
দেখেছি, আদ্যন্ত চেখে-চেখে।

আমারে দিয়ো না গোর এ’ দূর উজানে,
ভাটির মানুষ আমি, ভাটিয়ালি মন,
তুমি-তো জানো না, দেবী, (ত্রিভুবনে কে-ই-বা তা জানে?)
অনাদর দিতে পারে নদীও এমন!

ক্ষম মম গর্তগত বর্তমান ভূত ভবিষ্যৎ
সাদার্নক্রসের নীচে হাসিয়া ঈষৎ…

 

 

২১


কও, তোতা, কাহিনি তোমার বাখানিয়া,

টক্কা টরে টরে টক্কা টক্কা টরে টরে
কেমনে আইলা তুমি আধখানা পোড়া পাখা নিয়া
উড়িতে-উড়িতে আর পুড়িতে-পুড়িতে এই কদলী নগরে?

আহা ও কিসের দাগ লেগে আছে ঠোঁটে
আরক্তিম? জ্যোৎস্নার ঝিলিক্ বুঝি চোখের কোনায়
এক কণা? অথচ তোমার কণ্ঠ বুজে গেছে ঝড়ের ঝাপটে,
কনীনিকা জ’মে গেছে সমুদ্র-নোনায়!

টক্কা টক্কা টরে টরে টক্কা টরে টরে
ক্যান্ বা আইলা, পাখি, কদলী নগরে?
কোন্ বা নমাজ তুমি করেছিলে কাজা,
নতুবা সাবাথে কোন্ করেছিলে আমিষভোজন,

যে, তোমারই  শিরে শুধু নেমে এল আকাশের সাজা,
তোমারই  জেনিথে শুধু ফুটো হ’য়ে গেল-যে ওজোন?

 

 

২৩

এই পূতিগন্ধময় মৃতদেহ নিয়ে
আমি ভেসে এসেছি অনেক দূর, অনেক বন্দর।
আমিই বেহুলা, আর আমি লখিন্দর।
নিজেরে সুবিধামতো গাঙুড় বানিয়ে

নিজেরই মান্দাসে আমি চলেছি ভাসান।
এক ঘাট— দুই ঘাট— বত্রিশ ঘাটার
পরখ করেছি আমি শান:
অতঃপর ঠেকে গেছি, ফেঁসে গেছি, ঝরোকা-কাটার

এই চরে, এ-হাটায়— কারিগরগণ যেথা সারিবদ্ধ, স্তব্ধ অপেক্ষায়,
জুরাসিক যুগ থেকে; আমার প্রেক্ষায়
তারা ঠুকে ঢুকিয়েছে অদ্ভুত প্রিজম—
জীবন-মরণ, তথা দুঃখ-সুখ, সাদা কিংবা কালো

অগত্যা খশিয়া গিয়া, অন্য-এক আগন্তুক-আলো
পাঁজরের মাঝখানে খুঁড়েছে কী-গূঢ় জমজম…

 

 

৩৪

কী-গূঢ় ফিলিগ্রি-ঘেরা তোর বাতায়ন,
রে সোদরা! শ্বেতাম্বরা শঙ্খিনী কুমারী!
স্ফটিক-স্তম্ভের ঝাড় আলো ক’রে আছে তোর খাঁড়ি,
মোড়ে-মোড়ে পাহাড়ায় শত ওরায়ন!

ফিবাসের নিবাসের অধিকার যে-হর্ম্যে রহিত,
সেখানে, আমার এই আপতিক জন্মের সনদ
জোটাল দাওয়াত, আহা, বুঝে নিতে পৈতৃক সম্পদ্—
হেলায় হারাব হিরে, তত আমি স্বাধীন নহি-তো!

তত আমি নই পরাধীন।
সুতরাং অবধূতি-সূত্র ধ’রে অবধূত এক সূত্রধর
তুরপুন সান্ধায়ে যায়, অন্যতর জন্ম-মরণের আলাদিন,
সে-মানস সরোবরে, গর্ভে যার ডুবে যায় ধরণির প্রভূত ভূধর,

উঞ্ছলোভী দেবতার প্রতিলোম উচ্চাকাঙ্ক্ষা যত… আহ্! আমার বহিন
কেয়সের সমুদ্রের চেয়েও গহিন!


সনেট


এ কোথায় আমি আজ, এ আমি কোথায়?
এ কোন্ দিনের আলো ধাঁধায় দ্যুলোক?
এ কোন্ রুপার নদী বইছে শতধারে?
আতশি আকাশ থেকে মান্নার আসার…
এদিকে আমার চোখে বিহ্বলতা নাই,
বিস্ময় শিঁটিয়ে আছে কোথায় শৈশবে,
এ-আকাশ, এই নদী, অসহ্য পুলক,
আমার দশম দশা তারা তো জানে না!
এ আমি কোথায় আজ, আমি এ কোথায়?
এই দিকে হেঁটে চলি এই অনুভবে :
আমার চলার কথা যেখানে, আঁধারে
সে-দিকে তারার মুখে কোনো কথা নাই।
সেখানে রক্তাভ ঘাসে ব’সে করে জেনা
দুই চারি নর নারী গাভী আর ষাঁড়।

সিডনি, ১৯৯৫


ফিরে এসো


কোথা সেই নর-পিরামিড
যাকে আমি “কুমার” ডাকতাম?
ছিল না যে কবি বা কোবিদ,
শুধু এক অপূর্ব বাদাম—

এমন কিছুই সে বেচারা
করে-নি এ-ধরণিতে, যার
উল্লেখে পাড়ার বখাটেরা
ক’রে দিত তার ডেরা বা’র।

আজীবনে তাকে আমি সেই
মায়ার আয়ামে একবার
দেখেছি সবুজ জামাতেই
হেঁটে যেতে হৃদয়ে আমার।

মানুষ কখনও জানে নাই
কে সে হয়, কী সে হয়, তবু
বুঝে যেত গভীর প্রাণেই:
নিকটেই আছে তার প্রভু!

আজ কোটি-কল্প পরে ফের
আমি খুঁজি সবুজ জামাটি
আঁতিপাঁতি, মনের মাঠের
পুঙ্খে পুঙ্খে— কিন্তু সব মাটি!

সব মাটি, সব পানি, বায়ু,
সব দ্রোহ, সব অঙ্গীকার,
এই সমস্তরই পরমায়ু
নিয়ে এসো, সূর্যের কুমার!

ফিরে এসো এদেশে আবার
এ-আকালে, মাঘে বা নিদাঘে—
ও আমার রাজার কুমার,
কী-তৃষ্ণা ভুবন জুড়ে জাগে!

বিতৃষ্ণা ভুবন জুড়ে জাগে!

সিডনি, ১৯৯৭


হাইড পার্কে অপেক্‌খা


লালঝুঁটি, কেশরফোলানো মেঘ, রিরংসায় থরোথরো মেঘ,
          আকাশে-আকাশে-দামি-জামিয়ার-খুলে-দে’য়া অন্যতর মেঘ,
এসময় কে আছে তোমার তলে মর্ত্যের-বীতংস-বন্দি, হায়,
          টর্নেডো-মন্থনদণ্ড ওপড়াতে পারে না যারে আর?
তোমার বাজের চোখে কে আর এমন অসহায়
          ধর্ষণশঙ্কিতসংজ্ঞা? ঐ-তো ঐ-তো তব ওল্টানো টাওয়ার
নেমে আসে… হায় রে শম্বূক!
          কোথায় লুকাবি তোর তুলতুলে বুক?

উড়ে যায় বেশুমার বালিহাঁস (অথবা বাঘের ভয়ে সন্ত্রস্ত শশেরা),
          প্রকৃতি খশায় তার বাৎসল্যের খোশা ধীরে-ধীরে,
যেন এক এপিফ্যানি ঘ’টে যাচ্ছে এই ম্লান প্যারাম্যাটা-তীরে,
          এই পার্কে শুরু হ’ল সময়ের দ্বি-দ্বাদশ দশার দশেরা,
মাশুক মুখোশ যত উবে যাচ্ছে বুনো-ডুমুরের আর মেকি-মেপলের,
          ঘাসে-ঘাসে কেঁপে যাচ্ছে যৌন শিহরন—
হোক তবে, আজই হোক জানকী-হরণ,
          জয় হোক জয় হোক হিংস্র প্রবলের!

ঐ-যে রক্তমুহূর্ত— যা এক শিশ্নাগ্রসম ক্রম-অগ্রসর
          আমার নিয়তিরন্ধ্রপানে, তার তাতা লাল লালা,
আত্মপরভেদহীন ব্রহ্মজ্ঞান, উগ্র রতিজ্বর,
          তার মহামহিম নির্বেদ,
তার যত ঘৃণা, গ্লানি, খেদ,
          আমি তার একটি-একটি পুঁতি দিয়ে গেঁথে নেব নব মুণ্ডমালা,
আমি তার তেজ নেব, প্রেম নেব, নেব তার আশীর চুম্বন,
          আমি তার শুক্রবৃষ্টি শুষে নেব ওডিনের শিঙার মতন!

            সিডনি, ১৯৯৮


অধ্বনীন হাপু


ও আমার প্রাণ-সজনি, দিন-রজনি তোমার দিকে চলি,
পথের পরে পথ বেড়ে যায়, গলির পরে গলি,
          এ-পথের অন্ত কোথায়!

এ-পথের অন্ত কোথায়, কী পাব তায় এত যোজন হেঁটে?
সাঁত্রে এত আঁধার আলো, ভূতের মতন খেটে
          শেষে-কি গোল্লা খাব?

শেষে-কি গোল্লা খাব, ঢোল বাজাব নিজের সর্বনাশে?
দেখব, ওরা পোড়ারমুখো বিশ্বজোড়া হাসে
          আমাকে সঙ্ সাজিয়ে?

আমাকে সঙ্ সাজিয়ে শিস্ বাজিয়ে নাচবে ঘুরে-ঘুরে
সাতশ’-কোটি খোট্টা, এবং পাঁচশ’-কোটি উড়ে—
          তবু-তো চলতে থাকি!

তবু-তো চলতে থাকি ঘোর একাকী, চাই নে ডাইনে বাঁয়ে,
হাতেই হাঁটি, যখন আমার খিল ধ’রে যায় পায়ে,
          রাস্তার কোনো বাঁকে—

রাস্তার কোনো বাঁকে যদি থাকে মরণ ঘাপটি দিয়ে,
অতর্কিতে হিরের ছুরি দেয় বুকে বিঁধিয়ে
          তথাপি পাব না টের।

তথাপি পাব না টের, প্রেক্ষাপটের বদল যদি ঘটে,
এক-গিরিসঙ্কট পেরিয়ে আর-গিরিসঙ্কটে,
          আকাশের পাড়ায়-পাড়ায়—

আকাশের পাড়ায়-পাড়ায় ধূমকেতু-প্রায় আমি যাব চ’লে—
আমার মরণ, আর, এমনকি, তোমার মরণ হ’লে
          তখনও শশব্যস্ত!

তখনও শশব্যস্ত এই অগস্ত্যযাত্রা-পথের শেষে
আগের পথটা লেগে যাবে পিছের পথে এসে।

সিডনি, ২০০০


ভাটিয়ালি


          ব’য়ে চলে ঢিমা স্রোতে
                    রক্তের ইছামতি
                              অজানা উজান হ’তে
                    অজানা ভাটির প্রতি

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে

          ব’সে আছি হাল ধ’রে
                    বিশ্বের বিচখানে
                              স্বপ্নের পাল ওড়ে
                    জানি না কে গুন টানে

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে

          ঢেউয়ে ঢেউয়ে বুদ্বুদ
                    ক-খ-গ-ঘ-ঙ আর
                              কত মর্মন্তুদ
                    অশ্রুত চিৎকার

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে

          কোলাহলগুলি সব
                    আসমান দেয় ঢেকে
                              কাফনে যেমন শব
                    অথবা আত্মা ত্বকে

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে


শাহ্ মখদুম


রাত : সমনামবুলিস্ট ট্রেনটা ছুটে যায়, সুনসান
   শূন্যমার্গে; যেন মর্গের দেরাজে-দেরাজে লাশ
বার্থে-বার্থে হিমায়িত ঘুম-গুমসুম ইনসান;
   রাতকানা এক টিকেট-চেকার করে খানাতল্লাশ।

      উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
      শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিঞ্জ্ ব্রিজ পার।

রাত : ছাইচাপা আপার-বার্থে ধূমপিণ্ডের মতো
   গুলে-যাওয়া কোনো প্রত্যঙ্গের করি অনুসন্ধান,
চোখ-কান-হাত-চুল-নখ-দাঁত ছড়ায়ে ইতস্ততঃ
   ঢুঁড়ি লাপাত্তা আত্মা আমার— হৈহৈ হয়রান।

      উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
      শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিঞ্জ্ ব্রিজ পার।

তিরিশ পাখির মতো উড্ডীন এক-ট্রেন খণ্ডতা,
   মহান্ সেমুর্গ্ আর কত দূর? পোড়াদহ জংশন
আর কত পথ? শত-শত প্রাণ শুষে নিয়ে, অন্ধটা
   কই আমাদের নঞ্ হ’য়ে, হায়, ব’য়ে যায় শন্ শন্?

      উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
      শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিঞ্জ্ ব্রিজ পার।

রাত : তকরার— একবার যদি পড়শি আমায় ছুঁতো!
   গলন্ত-লোহা-বহা যমুনায় খেয়া দেয় নিশি-কানু;
শরীর পালায় শরীরীকে ফেলে; সময়ের চেয়ে দ্রুত,
   একটা মানুষ হবে ব’লে, ছোটে এক-ট্রেন শুক্রাণু!

      উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
      শাহ্ মখদুম দুম দুম হয় হার্ডিঞ্জ্ ব্রিজ পার।

সিডনি, ২০০৪


আরশি


গায়ক সবাই শোনে, আমি শুনি গানের প্রম্পটার,
সাইডস্ক্রিন থেকে যে সব গায়কের মুখে ভাষা দেয়
তুমি বলতে পারো তার নাম বিশ্বকর্মা, তার নাম
নাদব্রহ্ম, মানে কীনা ঈশ্বর, বলতেকি আমি নিজে

এ-নামেই ডাকি তাকে, অর্থাৎ ডাকতাম এই সেদিন
অব্দি, মানে গত পরশু পর্যন্তও, যেদিন আমি সেই
কালান্তক আয়নাটায় পয়লাবার তাকিয়েছি আর
পয়লাবার সাইডস্ক্রিনের কাচ ফুঁড়ে ঢুকে গেছি এক

অদৃশ্য আলোকে এক অবাক্ অ্যালিস— আমি জানি
কেবল নাম নয়, তার পরিচয়ও, সেদিন যেদিন
দেখেছি কবন্ধ ধড়ে চিরে-ফেলা বুকের ভিতরে
একটা ভীষণ লাল হৃৎপিণ্ড তিনতালে তিলবাড়ায়

আল্ট্রাসোনিক বলছে ধাধিনধিননা নাধিনধিননা স্টেজে
গায়ক থাকুক যে-ই, কিংবা যদি না-ও থাকে কেউ,
সব গায়েনেরে গায়, নৈঃশব্দ্যেরে, যে গায় আমারে,
আয়নার ভিতরে দেহ, হায় হায়, মাথাটা বাইরে!


প্রতিমার প্রত্যাবর্তন


ভাঙা     আয়নার ফাঁক গ’লে
আমি    আবার নাজেল হলেম
           ইছামতির তীরে
বইল    পাষাণে সুধাধারা
          আকাশভরা তারা
ওগো    আকাশভরা তারা
এবার    নেমে এসো ধীরে
          আমি আবার আমার মন্দিরে

ছিলাম   ফ্যাকাশে বিদেশে
নীলচে   কাচের পিরামিডে
        কালো-পাথর নিদে
          ছিলাম বাক্যহারা
আমি    ছিলাম চক্ষুহারা
          আকাশভরা তারা
ওগো    আকাশভরা তারা
          হায় কী খেদ কী খিদে

          পাথর-স্বপন-শেষে
ফিরি     উদ্দাম বুররাকে
          হিরার আলোর ডাকে
          শিরায় শুনছি সাড়া
অতল   জলের কড়ানাড়া
          আকাশভরা তারা
এবার    নেমে এসো ধীরে
          আমি আবার আমার মন্দিরে

২০ মার্চ ২০০৮


কালো-জল


আমি তার রায়বার গাই দশ মুখে :
সে যদিও কদাচন টানেনি স্ব-দলে,
নরুনই চুনেছে নিত্য নাকের বদলে,
শিথিল করেনি পর্দা আমার সম্মুখে,
তবু তারই রেক্তা এই হিবাচির ধারে
ধুনার ধোঁয়ায় আর তেলের আলোয়
গেয়ে যাই, যেসময় আমার আলয়
ফুট-ফুট ডুবে যায় তরল আঁধারে।
এই একটিবারই আমি পেয়েছি যে তাকে—
নিজ-হাতে তার সাদা-ঘোমটা ঘোচালাম!
বলো একে শুভদৃষ্টি, বা বলো চেহলাম,
আমারই আয়েশে সে-তো চোখ বুজে থাকে
আমারই গায়ের নীচে আবেশ-নিথর…
আমরা দু’জনেই কালো-জলের ভিতর।

৩ আগস্ট ২০০৮


খাত


            কা! আমার কা!
আমায়    চিনতে পারছ না?
আমার    আকাশ ছিলে তুমি,
আমি     ছিলাম তোমার ভূমি
কয়েক   হাজার হিজরি আগে
তখন     সৃষ্টি জাগে-জাগে,
           দৃষ্টি জাগে-জাগে।

           কা! আমার কা!
তুমি     এমন স্বচ্ছতা!
আমি    দেখি না তোমায়,
আমি    চোখ খুলে ঘুমাই,
          অন্ধ ফুলের মতো
আমার   নীরব পরাগ-ব্রত,
আমি    আমার চেহারার
একটা   কফিনে নিঃসাড়।

          এক রাজা দুই রানি
খুলল    ক্ষৌমবস্ত্রখানি,
খুলল    আমায় তোমার থেকে,
নদীর    মতন এঁকেবেঁকে
তুমি     উধাও হ’য়ে গেলে
একটা   খামে আমায় ফেলে,
          উত্তুরে নীল-স্রোতে
মধ্য-    সমুদ্রে পৌঁছোতে।

আমি    ব্যান্ডেজে মোড়ানো
একটা   গবেষণাগার,
আমার   ভাল্লাগে না আর,
হয় না   মরণের মরণও।

          কা! আমার কা!
আমায়  দেখতে পাচ্ছ না?
          হায় কী স্বচ্ছতা!

২২ আগস্ট ২০০৮


মমি ও মোড়ক


আমি খুলছি তোমার মোড়ক!
আমি খুলছি তোমার মোড়ক!
ভিতরে কি তুমি হচ্ছ, নাকি
তুমি হচ্ছ তোমার বাইরে?
আমি ঢুকছি তোমার ভিতর,
না বেরোচ্ছি তোমার বাইরে?
নাকি তুমি আমার মোড়ক?
তুমি খুলছ আমার মোড়ক?

১৩ নভেম্বর ২০০৮


শিশু


যদি তুমি দীর্ঘ হ’তে দীর্ঘ হ’তে, দীপ্র বালুচর,
এই দ্বিপ্রহর যত তেতে উঠতে পারে
যদি হ’ত তত তপ্ত আমাদের রক্তের লবণ!

অভীপ্সার টি-জংশনে আমাদের মন
ট্র্যাফিক লাইটের দিকে তাকানো, হলুদ
হলুদই, কখন হবে সবুজ বা লাল?

আমরা কি সঙ্ঘর্ষে যাব? আমরা কি একবার
চ্যালেঞ্জ নিয়েই ফেলব, রুগ্‌ণ বালুচর?
আমরা কি রাতের গালে তারা হ’য়ে যাব?

ফলের মতন ফোলা আমাদের মন
বোমার মতন ভোমা পাপী অপেক্ষায়—
আমরা আমাদের দেখব, ভাঙব পরস্পর।

১৯-জানুয়ারি-২০১৩


আমার ঘুম-ভাঙানো চাঁদ


রক্তবৃষ্টি হয় রে, আমার রক্তে বৃষ্টি হয়
এই কবিতা আমি কই নে, অন্য কেহ কয়
মাথাতে তার দুইটা টিক্কি, আমার মাথায় কয়
জানতে পারলি কাইটে যেত নাড়ি কাটার ভয়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়

বৃষ্টি পড়ে ভাটির দ্যাশে, পড়ে না উজানে
ডাইনে-বাঁয়ে ঘুঘু-ডলক, খটখটা মাঝখানে
গড়াইয়ে খায় গড়াগড়ি ইছামতির ভাঙ্গা তরি
রক্তপাথার সন্তরি রে সপ্তবিশ্বময়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়

ভিন্ বাতাসের অশরীরী, ভিন্ আকাশের চান
কী আলেয়ায় আঁধার ধাঁধাও, না জান না পহ্‌চান
আমার বুকের কাছে একজন জোনাক জ্বইলে আছেন
আমার চোখের কাচে তিনি তিন-তিরিক্ষি নয়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়

আরবার ফিরিয়া এয়েছে মাহে ফেব্রুয়ারি
ঘরে-ঘরে শুক্কুর-শনি তারকা-শুমারি
যে-নারী তার দুইটা ছায়া, আলোর সুতার শাড়ি-সায়া
আয় মেসায়া, নবির বাবুই, আমার কোলে বয়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়

নোতুন চাঁদের জন্ম হল নোতুন রাহুর ক্রোড়ে
আমরা মিছে ভিজে মলেম বধ্যভূমির ফ্লোরে
বৃষ্টি পড়ে সামনে-পিছে, বৃষ্টি পড়ে উপ্রে-নীচে
রক্তে রক্ত তরঙ্গিছে, বিষে বিষক্ষয়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়
          ও গো মা কেমনো বিস্ময়

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০১৩


লাল চাঁদ



আমার আকাশে নিভে যেয়ো না গো, চাঁদ!
ওগো চাঁদ, চাঁদ, তুমি হৃৎপিণ্ডের চেয়ে লাল চাঁদ!
সকল গোধূলি আর সকল প্রভাতে
তুমি ল’য়ো আমার সংবাদ
আমার নিষ্প্রভ দিন, আমার কুহেলিধুধু রাত
ধুয়ে দিতে তোমার প্রভা-তে।


খুলি খুলে ব’সে আছি, নিউরনে ঝরিছে লানত;
আমি একলা কালো ঘুঘু, ছায়াহারা ফরগেট-মি-নট—
যতদূরে জ্যোৎস্না যায়, যত দূরে থামে
ততদূর দূরবর্তী তবু সন্নিকট
ঈশ্বরের আব্রহ্মাণ্ড বামে
আমারে পাথর ক’রে রাখিয়াছ তোমার হারামে…


তুমিহীন আমি শুধু মৃত্যু নয়, জন্মরোধ নয়,
জন্মপূর্ব মৃত্যু আহা, সে যে এক দ্বিতীয় অন্বয়
অন্য কোনো ঈশ্বরের, ভিন্ন কোনো আকাশে, রাতুল,
সেখানে ঢাউস ঢেউয়ে কোনো চোখা রুপালি মাস্তুল
ক্রমশঃ বাবেল হ’য়ে উঠিতেছে আমার জন্যই:
বিপরীত গূহ্যদ্বারে বিপরীত শূল!


সে-ছবিও দেখেছিনু মায়ের জঠরে,
চোখে নয়— সারা গায়ে টক্কা টরে টরে
বেজেছিল আতঙ্কের পারা—
তৎক্ষণাৎ তোমার ইশারা!
তৎক্ষণাৎ রিরংসার জোনাকিরা মাথার ভিতরে,
তারাখচা আকাশের আরেক চেহারা…


বেরিয়ে এলেম বাইরে। ঈশ্বর, অবিনশ্বর শাপ,
আমাদের মধ্যে তুমি ইথারের মতো ফুলে আছ;
সব-আলো-বাঁকিয়ে-দেওয়া কাচও
এহেন অরাল নহে; এমন করাল নহে সাপ:
আমার চাঁদেরে তুমি শূন্যে ধর্ষিয়াছ,
তার খসমেরও আবরু লুণ্ঠিয়ো না, বাপ!


ভিড় ক’রে আসে জল, আন্ধারের গন্ধকের পানি,
দিগন্তের চক্রব্যূহ ব্যেপে তীব্র, অম্ল কলকলানি,
তারল্যের তেজাব-আক্রোশ—
আমারে শুষিয়া লহো, অয়ি শশীরানি,
চৌচির করো আরশিখানি,
ঝুরঝুর ঝরিয়া যাক পঞ্চকোণ আল্লাহ্-র আরশ।

০৯-অগাস্ট-২০১৩


ভিতরে সাজ্জাদ


কবিতাটা লিখতে দাও, যেটা লিখতে আসা।
সিম্পোজিয়ামের বাইরে রাইসু বইসা হাসে,
তারে তারা ঢুকতে দেয় না, ধুতি নাই, তাই।
আমি বলি, রাইসু, চলো, আমরা চইলা যাই।

রাস্তায় হাঁটি-গা। হাঁটলে, আমরা কবিতাই।
কবিতা তো হাঁটে, রাস্তা-ঘাটে, গঞ্জে-হাটে,
কবিতার জন্য কেন এত মাইক্রোফোন?
মহার্ঘরা পাঞ্জাবিতে ইত্রে-হিনা দিউন,

আমরা ভাঙ্গি ভাঙ্গা-পথ, স্পঞ্জের স্যান্ডেল
ছিঁড়তে-ছিঁড়তে চইলা যাই ভিড়তে-ভিড়তে ভিড়ে
বাটে পড়ি, জ্যামে বইসা ঘামতে-ঘামতে ব্যাগে—
কাগজটা? তোমারে দিছি? গেল চাইরটা লাইন!

বলছিলাম? মনে আছে? লীসাদের বাসা
ঠাণ্ডাপানি পাওয়া যাবে, ফ্রিজ আছে-তো, বড়-
লোক ওরা, কাজের মেয়েরা থাকলে পুরা র-র-
ঢুকতে না-দিতেও পারে। সিলাই করায়া

ল’ন মুচি থাকতে-থাকতে। কবিতাটা নিয়া
কোনো মাথাব্যথা নাই সিম্পোজিয়ামের।

১৯-জানুয়ারি-২০২০


 সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

জন্ম : ঢাকায়, ১৯৬৫ সনে। ১৯৯৫ থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: তনুমধ্যা (১৯৯০), পুলিপোলাও (২০০৩), কবিতাসংগ্রহ (২০০৬), ঝালিয়া (২০০৯), মর্নিং গ্লোরি (২০১০), ভেরোনিকার রুমাল (২০১১), হাওয়া-হরিণের চাঁদমারি (২০১১), আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ (২০১২), Ragatime (২০১৬), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৮), ইশকনামা (২০১৯), দশ মহাবিদ্যা (২০২০), ছুরিতে ঠিকরানো আঁধিয়ার (২০২০), ডাকা ঢাকে (২০২১)।

গদ্যগ্রন্থ: কালকেতু ও ফুল্লরা (উপন্যাস ২০০২, পুনঃ ২০১৯), মাতৃমূর্তি ক্যাথিড্রাল (গল্প ২০০৪, পুনঃ ২০১৯), চণ্ডীদাস দ্যাখে যুগ যুগ (প্রবন্ধ, প্রকাশিতব্য)।

অনুবাদ: অন্তউড়ি (চর্যাপদের পদ্য-রূপান্তর, ১৯৮৯, পুনঃ ২০২৩), নির্বাচিত ইয়েটস (ডব্ল্যু বি ইয়েটসের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ, ১৯৯৬) এলিয়টের প’ড়ো জমি (টি এস এলিয়টের ‘দ্য লাভ সং অব জে. অ্যালফ্রেড প্রুফ্রক’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর অনুবাদ, ১৯৯৮) কবিতা ডাউন আন্ডার (নির্বাচিত অস্ট্রেলিয় কবিতার অনুবাদ, অংকুর সাহা ও সৌম্য দাশগুপ্ত-র সাথে, ২০১০), স্বর্ণদ্বীপিতা (বিশ্ব-কবিতার অনুবাদ ২০১১)।

সম্পাদনা: প্রসূন (যৌথ), অগ্রবীজ (যৌথ)।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading