মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সাক্ষাৎকার | আলাপকারীঃ নাজমুস সাকিব রহমান

এ বছরই চিত্রনির্মাণে ২৫ বছর পূর্ণ করছেন বাংলাদেশের প্রতিথযশা নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ২০ জানুয়ারি, শনিবার বিকেল। নির্মাতা, কবি ফারুকীর সঙ্গে পূর্ব-নির্ধারিত আলাপের সময় এলো, নিকেতনে তাঁর অফিসে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার পর সময় মিললো মুখোমুখি বসবার। ‘স্ট্রিট ফটোগ্রাফি’ নিয়ে ব্যস্ত ওমর ফারুক এলেন ছবি-নির্মাতার ছবি তুলতে, পরে অ্যাসাইন্টমেন্টের ফাঁকে শুনে শুনে শব্দে ধরলেন সুমন বৈদ্য। কাকতালীয় কিনা কে জানে, এই নির্মাতার সঙ্গে ‘শনিবার বিকেল’ শব্দদ্বয় জড়িয়ে আছে আবেগে; এই নামে ছবি নির্মাণ ক’রে প্রায় পাঁচ বছর সেন্সরবোর্ডে ঘুরেছেন, কিন্তু হলে মুক্তি দেওয়ার জন্যে সনদ মেলেনি! দেশের দর্শকরা দেখার আগেই শনিবার বিকেল দেখেছে বিদেশের দর্শকরা। সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ে না পেরে এই নির্মাতাকে শেষ পর্যন্ত শনিবার বিকেল মুক্তি দিতে হয়েছে ওটিটি প্লাটফর্মে, এরপর ছবি দেখে দর্শকরা মন্তব্য করেছেন ছবিটি সেন্সরে আটকে না রেখে বরং সারাদেশে প্রজেক্টরের মাধ্যমে সাধারণ দর্শককে দেখানো উচিত ছিলো। শিরিষের ডালপালা সম্পাদককে দেওয়া সময় ছিলো ১৯ জানুয়ারি, শুক্রবার, সেদিন ব্যস্ততার কারণে নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সময় দেবেন পরদিন শনিবার বিকেলে; কবি-সাংবাদিক নাজমুস সাকিব রহমান সময়টাকে দু’হাত ভরে কাজে লাগিয়েছেন, নির্মাতা ফারুকীর সামনে মেলে দেন প্রশ্নের ডালপালা, তিনি উত্তর-ও দিয়েছেন মন খুলে। দু’জনের আলাপ পড়া যাক।


বিঃদ্রঃ এই আলাপচারিতা রেকর্ডের দিন কয়েক পরেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকী গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি শারীরিকভাবে এখনও খুব নাজুক অবস্থায় আছেন। সকলের কাছে এই কবি-নির্মাতার সুস্থতা কামনায় প্রার্থনা/দোয়া প্রার্থনা করছি।


একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকে তখন একটা টেন্ডেন্সি থাকে তাকে বাতিল ঘোষণা করে দেওয়া। আমি ২০১০ সাল থেকে বহুবার বাতিল হয়েছি।


আলোকচিত্রীঃ ওমর ফারুক

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনার প্রথম দিকের একটা কাজ চড়ুইভাতি (২০০২)। উইকিপিডিয়াতে আপনার যে ডেট অব বার্থ আছে (১৯৭৩) ওটা সত্যি হলে (তিনি বললেন, ওটা ঠিক আছে) তখন আপনার বয়স ২৯ বছর। ‘চড়ুইভাতি’ ওই সময়ের জন্য বোল্ড একটা স্টোরি। যেহেতু গল্পটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে। মাউথঅর্গানের একটা পিস ছিল সেখানে (তিনি বললেন, সম্ভবত স্টিংয়ের গান থেকে নেওয়া। তখনকার দিনে কপিরাইটের কোনো ব্যাপার ছিল না)। মিষ্টি একটা ক্লাইমেক্স আছে। আমার প্রশ্নটা হলো, অতো কম বয়সে আপনি এমন বোল্ড স্টোরি ও ক্লাইম্যাক্স কীভাবে ডিল করেছিলেন?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

জানি না। আমি যখন নিজের কাজ নিয়ে কথা কথা বলি— যে ফিডব্যাক আসে তখন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকি। আমার মনে হয় না, আমাকে নিয়ে বা আমার কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে। মনে হয় অন্যের কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে। যেন আমার জীবন না— অন্য কোনো মানুষের জীবন বা কাজ নিয়ে কথা বলছি। কেন তার কারণ জানি না।
একটা কারণ হতে পারে আমি এত বেশি সামনের দিকে তাকাই, এত বেশি আমার চোখ সামনে থাকে— পিছনে কি করছি তার রিভিজিট করার সময় পাই না। আমার অবস্থা হয়েছে এ রকম।

আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম কোনো একসময়। আমার সামনে একেকটা দেয়াল আছে। আমি ওই দেয়ালটা পার হই। সামনের দিকে দেখি আরেকটা দেয়াল। নজর থাকে ওই দেয়ালটা ক্যামনে পার হব। পিছনের কাজ নিয়ে ভাবি না। তবে সেই সব দিন মনে পড়লে নস্টালজিক হয়ে যাই।

হ্যাঁ— অনিশ্চিত জীবন সামনে রেখে একজন ফিল্মমেকার ওই সময় দাঁড়িয়ে তার মতো গল্প বলার চেষ্টা করেছে। সে জানেও না এই গল্প দুইজন লোক দেখবে নাকি ২০ জন লোক দেখবে। তার মাথায়ও নাই। সে সময় আমরা ফিল্মকে কুটির শিল্প হিসেবে দেখতাম। আমরা যখন ফিল্ম বানানো শুরু করি তখন আমাদের দর্শক কম ছিল। তখন বাজারে যেসব সিনেমা চলত চাইলে আমি তাদের একজন হতে পারতাম। কিন্তু আমার কাছে সেটা ম্যাটার করেনি। বোধ হয় ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আমরা যে কথা বলতে চেয়েছি, যে ভালনারেবিলিটি দেখাতে চেয়েছি, ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই দেখাতে পেরেছি। পপুলার হওয়ার দায় ছিল না। ৩০ লাখ মানুষকে সিনেমা দেখতে হবে— এ রকম দায় ছিল না।

আর এই গল্পটার সাফল্যের পিছনে আরেকটা বিষয় কাজ করেছে। তা হলো পিছুটান না থাকা। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই যে আপনি যেটা বললেন, এত সাহস কই পেলাম এ গল্পটা বলতে; এই পিছুটান না থাকাটা।

আরেকটি বিষয় কাজে দিয়েছিল। তা হলো লোভ না থাকা‌। এটা বেশি কাজে দিয়েছিল। কারণ আমি যে সময় ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলাম তখন ডিপজল ভাইদের সিনেমা বেশি চলত। আমার অল্প সময়ে সাকসেস পেতে হবে বা ব্যবসা করতে হবে— এই লোভ বা পিছুটান ছিল না বলে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পেরেছি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

একটু আগেই বললেন, তখন দর্শক কম ছিল। এর মানে আপনি নিজের অডিয়েন্স তৈরি করলেন। এখন অবস্থা বদলেছে। এখন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যখন অভিনয় করেন (যেমন: সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি/২০২৩) দর্শক অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। তারা দেখতে পায় আপনি আর্টিস্টের জীবন যাপন করছেন। ক্যামেরার পিছনে ছিলেন, আবার সামনেও। আপনি নিজের স্টোরি বলছেন একদম প্রথম থেকেই।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আমি সেদিক থেকে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। গল্পগুলো তাদের (অডিয়েন্স) স্পর্শ করতে পেরেছে। তারা হয়তো আমার গল্পগুলোর মধ্যে তাদের জীবনটা খুঁজে পেয়েছে। তাই কাজগুলোর সময় আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা একটা সৌভাগ্য বটে। কিন্তু ধরা যাক আমার কাজ একজন মানুষের ভালো লাগত; তা-ও কি আমি ছবি বানাতাম?

কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা লেখা লিখেছি। শিল্পী কেন ছবি আঁকে? ফিল্মমেকার কেন ছবি বানায়? কবি কেন কবিতা লিখেন? মানে কেন করেন তারা? তারা ওটিটিতে সিনেমা বানালে অনেক টাকা পাবে— এটার জন্যই কি বানায়? বা তালি দিবে এজন্যই বানায়? এটা ঠিক অনেক মানুষের প্রশংসা তার কাছে ম্যাটার করে। আমি যখন মানুষের ভালোবাসা পাই, অনেকে বলে ‘আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক’। তখন আমার চোখে কান্না চলে আসে। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ বোধ করি। আমার ভীষণ ভালো লাগে যখন আমাকে দোয়া করে, প্রশংসা করে, আমার ছবি যখন মানুষ সিনেমা হলে টিকিট কেটে দেখে। কিন্তু শিল্পী কি এটার জন্য ছবি বানায়? পেইন্টিং করে? গান বানায়? এটা অনেকদিন ধরে নিজের কাছে প্রশ্ন ছিল। এটার উত্তর একদিন খুঁজে পেয়েছি রাতের বেলা।

রাত তখন ১টা বাজে। আমি অফিস থেকে কাজ সেরে বাসায় যাচ্ছি। যাওয়ার পথে তিশা (নুসরাত ইমরোজ তিশা) ফোন করে বলল, কি একটা ওষুধ আনতে, নাম মনে নাই। বনানীর ১১ নম্বর রোডে প্রেসক্রিপশনএইড নামে একটি দোকান আছে। ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এখান থেকে আমরা ওষুধ কিনি।

আমি গাড়ি নিয়ে ১১ নম্বর রোডে নামলাম। দেখলাম সুনশান নীরবতা। একটা মানুষও নাই। সব দোকান বন্ধ, শুধু ওই ফার্মেসি খোলা। কোথাও কোনো মানুষ নাই। আমি নামলাম গাড়ি থেকে। নামার পর অদ্ভুত একটা বাঁশির সুর পেলাম। কই বাজাচ্ছে প্রথমে বুঝি নাই। ফার্মেসির দিকে আগানোর সময় সিঁড়িতে উঠতে যাচ্ছি, সেখানেই লোকটা বাঁশি বাজাচ্ছে। আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এতক্ষণ সে বাঁশি বাজাচ্ছিল, তার সামনে কোনো লোক নাই, আসার কোনো সম্ভাবনা নাই। আমি কিছুক্ষণ ভিডিও করলাম। ভিডিওটা ফেসবুকে শেয়ার করেছি। চিন্তা করলাম, কোনো শ্রোতা নাই, পাওয়ার সম্ভাবনা নাই— তবে উনি কেন বাঁশি বাজাচ্ছেন?

তিনি বাঁশি বাজাচ্ছিলেন নিজের মনের অসুখ সারাইতে, সেই বাঁশীওয়ালা এমনটাই জানিয়েছিলেন । শিল্পী আসলে ছবি বানায়, বাঁশি বাজায়, ছবি আঁকে, কবিতা লিখে; হ্যাঁ, এগুলোর মাধ্যমে দর্শকদের সঙ্গে কমিউনিকেট করে। কিন্তু প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে মনের অসুখ সারানো। আই থিঙ্ক, আমি যে অডিয়েন্স পেয়েছি সেটার জন্য সৌভাগ্যবান। আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার ধারণা শিল্পী তো বক্স অফিসের দিকে তাকাইয়া ছবি নির্মাণ করে না।

আমি ২০০২ সালে ব্যাচেলরের শুটিং করি। আপনি এখনো বিভিন্ন প্রোডাকশনে ব্যাচেলরের ছাপ দেখতে পাবেন। ২০০৩-এ ব্যাচেলর রিলিজ করি, আমাদের অবাক করে দিয়ে টিভিতে রিলিজ করে দেওয়ার পরও বক্স অফিসে দারুণ ব্যবসা করেছে এই ছবি। স্বাভাবিকভাবে একই ঘরানার ছবি বানালে ওইটা তো বক্স অফিসে চলার কথা। কিন্তু আমি উল্টা রাস্তায় হেঁটেছি। যেমন আমি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ (২০০৭) বানাইছি, যেটা ওই মুহূর্তে বাজে ব্যবসা করেছে।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আচ্ছা, মেড ইন বাংলাদেশ কি ২০২৪-এ বানাতে পারতেন?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:  

আমি বানাতে পারতাম। কিন্তু রিলিজ দিতে পারতাম কি না ওইটা জানি না। সেটা সেন্সর বোর্ড জানে।

নাজমুস সাকিব রহমান:

১৯৯৯-তে বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল স্ক্রিনে আপনার ডেব্যু। এ বছর নির্মাতা হিসাবে আপনার ২৫ বছর চলছে।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

২৫ বছর হয়ে গেল?

নাজমুস সাকিব রহমান:

হ্যাঁ, ২৫ বছর।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

ও ২০২৪! অলমোস্ট একটা জীবন যাপন করে ফেললাম। ২৫ বছর বেঁচে থাকা কঠিন কাজ। রিলেভেন্ট থাকা আরও কঠিন।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আচ্ছা, টেলিভিশনের কাজগুলোকে আপনি ‘ভিডিও ফিকশন’ বলতেন।  আপনি এখন ওটিটিতে কাজ করছেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

ভিডিও ফিকশন ওই সময় বলতাম। তখন আমরা বলেছিলাম, বেসিক্যালি কি নামে ডাকব তা নিয়েই ছিল গন্ডগোল। এখন আমরা বাংলাদেশের টিভিতে যেটা দেখি ওটা নাটক, আবার কোনো ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হলে ভিডিও ফিকশন। ফেস্টিভ্যালে ফিল্মের দুইটা ক্যাটাগরি থাকে। ভিডিও ফিকশন ও ৩৫ মিলিমিটার। ওখান থেকে ইন্সপায়ারেশন নিয়ে বলতাম।

নাজমুস সাকিব রহমান:

কিন্তু যখন আপনি নির্মাণ করেন, সম্পাদনা করেন, যেমন ধরেন এটা অনেক স্মরণীয় একটা সিন— ব্যাচেলরের ‘ফিসফিস করে কথা বলা’টা। এটা অনেক রোমান্টিক ও ব্যক্তিগত মুহূর্ত। কিন্তু বড় পর্দায় যখন দেখতে পাচ্ছি ৫০০ বা ১০০০ জন মিলে দেখছে।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

দেখুন হলে এক হাজার লোকের সঙ্গে ছবি দেখলেও আপনি একা। যখন বাতি নেভানো হয় তখন আপনি ভিন্ন একটা আইল্যান্ডে। ওই এক হাজার লোক যারা বসে আছেন তারা সকলেই একা হতে চায়। যখনই বাতি নিভে যায় তখন আপনি এক হাজার জনে থাকেন না, একজন হয়ে ওঠেন।

 


এই যে প্রতিদিন বিনা পয়সায় খাইতে পারতেছি এটার জন্য গল্প বানাতে হতো। কারণ গল্পটা না বানালে বলবে এখানে কেন আসছি? তখন বলবে আমি তো খাইতে আসছি। এটা খারাপ দেখায়।

 

নাজমুস সাকিব রহমান:

বাংলা সাহিত্যের দিকে যাই। সুবোধ ঘোষের কোনো একটা গল্প নিয়ে কাজ করেছিলেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:  

‘জতুগৃহ’ থেকে ওয়েটিং রুম করেছিলাম। আনিসুল হকের ‘আয়েশামঙ্গল’ করেছিলাম।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আয়েশামঙ্গল দুইবার করেছেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:  

ওয়েটিং রুমও দুইবার করছি। প্রতিচুনিয়া (আনিসুল হকের লেখা) করেছি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

সে সময় এ ধরনের কাজগুলো আপনি করেছেন। এখন বেশিরভাগ আপনিই লিখছেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আমরা মূলত অথর ফিল্মমেকিং করতে আসছি। অথর ফিল্মমেকার তার প্রয়োজনে অনেক ডিপার্টমেন্টের মানুষের সাহায্য নেয়। কেউ সিনেমাটোগ্রাফি করে, কেউ এডিটিং করে, কেউ মিউজিক করে। আবার কেউ হয়তো তার হয়ে স্ক্রিনরাইটিং করে দেয়। যখন স্ক্রিনরাইটিং করতাম তখন আমি বলতাম কি চাই, কিভাবে চাই। আমি এডিটরকেও বলি, সিনেমাটোগ্রাফারকে বলি। ফিল্মমেকার আসলে প্রিভিলেজড মানুষ। সে বলে, তোমরা প্রত্যেকে আমার এই ড্রিমটা ম্যাটেরিয়ালাইজ করো। অ্যাকটরও তাই করে। ডিরেক্টরের ভিশনও ম্যাটেরিয়ালাইজ করে।
আমি আমার স্ক্রিপ্টে সবসময় ইনভলভড থাকতাম। অ্যান্ড দেন অ্যাগেইন আমি লোকেশনে ইমপ্রোভাইজ করতাম। প্রচুর লেখা থাকত। ওই লেখাটা আরও ইমপ্রোভাইজ করতে গিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যেতাম। আমার রাইটিং কাগজে-কলমে না হলেও ইনস্ট্যান্ট চলত ওখানে। তবে রাইটিংয়ের মধ্যে আমি ছিলাম। একটা পর্যায়ে গিয়ে আমি ‘টেলিভিশন’ (২০১২) থেকে কো-রাইট শুরু করি। তারপর একটা সময় এসে অন এয়ারে আমি লেখা শুরু করি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আমি আসলে জানতে চাই বাংলা সাহিত্য নিয়ে এখনও আগ্রহ আছে কিনা?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

হ্যাঁ, অফকোর্স। আমি লিটেরাচার তো পড়ি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি বেশ কিছু স্মরণীয় বিজ্ঞাপন করেছেন। যেমন ধরেন, আমি সাংবাদিকতা নিয়ে পড়েছি। কালের কণ্ঠের বিজ্ঞাপনটার কথা আমার মনে আছে। অন্ধকে কীভাবে হাতি দেখানো হয় তা দেখিয়েছিলেন। জানতে চাই মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর হাতে যখন একটা বিজ্ঞাপন আসে, কি কি চেঞ্জ আসে?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

দুই রকমের ব্যাপার ঘটে। যেমন ইউনিলিভারের জন্য কাজ করতাম (ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী, ক্লোজআপ)। কখনো কখনো স্ক্রিপ্ট যা থাকে আমি ওটা শুট করি। এ ধরনের বিজ্ঞাপন দুই থেকে তিন পারসেন্ট হবে। সাধারণত বিজ্ঞাপন নির্মাতার কাজই এটা। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এটা কম হয়। আমি স্ক্রিপ্ট যা পেয়েছি তা ম্যাটেরিয়ালাইজ করার চেষ্টা করেছি। আমি সৌভাগ্যবান কারণ ডাইরেক্ট ক্লায়েন্ট আছে। যেমন কালের কণ্ঠ, চাল-ডাল, ইউএসবাংলা এরা। তবে এমন ক্লায়েন্ট না হলেও আমাকে বিশ্বাস করে হয়তো অনেক কিছু ইনপুট দিতে দেয়। যদি তারা দিতে না দেয় তো কিছু করার নাই। তবে বিজ্ঞাপনের জন্য ক্লায়েন্টরা যখন আমার কাছে আসে কিছু ইনপুট প্রত্যাশা করেই আসে। তখন আমি মতামতটা জানানোর চেষ্টা করি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি ব্যাকগ্রাউন্ডে একসময় প্রচুর গিটার সলো ব্যবহার করতেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

বাজাতে পারতাম না দেখে প্রচুর রাগ হত গিটারের ওপর। তাই প্রচুর ব্যবহার করতাম। যেহেতু পারতেছি না, নিজে অন্তত কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করে তার সঙ্গে থাকি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি গানও লিখেছেন…

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যানের (২০২১/ পরজীবী শহরের গান) লিখেছি ঠেকায় পড়ে।

নাজমুস সাকিব রহমান:

বেলাল চৌধুরী নিয়ে শুনতে চাই। আপনি বিভিন্ন ইন্টারভিউতে বলেছেন শুরুর দিকে তার সঙ্গে গল্প শেয়ার করতেন। এখন যখন আপনার কাছে আইডিয়া আসে কীভাবে ডেভেলপ করেন?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

এখন তিশার সাথে শেয়ার করি। তখন বেলাল ভাইয়ের সাথে শেয়ার করতাম কারণ নিবিড় সম্পর্ক ছিল। আমি তখন বেকার। বেলাল ভাই ধানমণ্ডিতে ভারত বিচিত্রা এডিট করতেন। আমার কাছে মনে হতো, ওখানে বসে সময় কাটাই। আমি বেলাল ভাইয়ের কাছে যেতাম। প্রতিদিন তো বিনা কারণে একটা মানুষের কাছে খাইতে পারব না। দুপুরে গেলে ভাত খাওয়াতে নিয়ে যাইতেছে, প্রতিদিন গেলে ব্যাপারটা খারাপ দেখায় না? এ কারণে প্রতিদিন উপলক্ষ বানিয়ে যেতাম।

প্রতিদিনই গিয়ে বলতাম আজকে তো নতুন গল্প পাইছি। স্ক্রিপ লিখছি, স্ক্রিপ্টটা এইরকম হবে। আমাকে বলত, হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো। খুব সিরিয়াস। গল্প শুনে বলত এক্সিলেন্ট, চলো, ভাত খেয়ে আসি। তো অফিসের পাশে একটা বাড়ির নিচতলায় চার-পাঁচটা টেবিল দিয়ে খাবার রেডি করত। ওখানে একজন গৃহিণী এটা করত। কিন্তু খুব ভালো রান্না করত। ঘরের রান্না হত। খাওয়া শেষে আধঘণ্টা চা খেয়ে চলে আসতাম। এই যে প্রতিদিন বিনা পয়সায় খাইতে পারতেছি এটার জন্য গল্প বানাতে হতো। কারণ গল্পটা না বানালে বলবে এখানে কেন আসছি? তখন বলবে আমি তো খাইতে আসছি। এটা খারাপ দেখায়।

নাজমুস সাকিব রহমান:

এটা কি স্টোরি টেলিংয়ে কাজে লেগেছে?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আই থিঙ্ক সো।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি এখন অনেক সহজে গল্প বলছেন। লিটারেচার থেকে বলতে পারি। একজন লেখক যখন প্রথম দিকে লিখতে আসেন তখন লেখায় অনেক আয়োজন থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে লেখা সহজ হতে শুরু করে। সত্যজিৎ রায়ের শুরু ও শেষ দিকের ভূতের গল্পের কথা (অনাথ বাবুর ভয় ও অভিরাম) উল্লেখ করতে পারি। আপনার চেঞ্জটা আপনি কি ফিল করেন?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আপনি এখন বলার পর মনে হচ্ছে আমি তো নিজেকে কখনো বিশ্লেষণ করি নাই। কারণ দেখার সময় পাই না। এখন মনে হচ্ছে আপনি ঠিক বলেছেন। এই অর্থে ঠিক যে, আমি বলছি না খুব দক্ষ হয়ে উঠছি।

 


আমি এখনো নতুন কাজ শুরু করার সময় অস্থির থাকি। ভালনারেবল থাকি। প্রত্যেকটা নতুন দিন।

 

যেমন একদিন শুটিংয়ে ঢুকলাম— খুব টাফ একটা দিন। ওই দিন আমি এত ভালনারেবল থাকি বা টেনশনেও থাকি। আমি আমার কর্মীদের ওপর ছাইড়া দেই চাপটা। ওদের ওপর ছাইড়া দিয়া নিজে উত্তরণের চেষ্টা করি। সো আমি এখনো ভালনারেবল থাকি। এখনো আমি ফিল করি— এই ভবতরী কেমনে পার হব? ইন-জেনারেল যদি মানুষের ক্ষেত্রে বলি শুরুর দিকে আপনি যে ধারণা দিলেন এটা খুব ভালো এনালাইসিস।

শুরুর দিকে একজন লেখক অনেক কিছু করার চেষ্টা করে। অনেক কিছু করবার কায়দা কৌশল করে। আর আস্তে-আস্তে যখন পরিণত হয় তখন তার কায়দা-কৌশলের দরকার পড়ে না। কারণ তখন সে আত্মার খোঁজ পায়। এটা আপনি ফুটবলের উদাহরণ দিলে বুঝবেন। ধরেন যে ছেলেটা ফুটবল খেলে না— ও যদি জীবনে প্রথম ড্রিবলিং শেখে, দেখে মনে হবে ড্রিবলিংয়ের মতো কঠিন কাজ পৃথিবীতে নাই। এত কষ্ট এটা করতে। ও যে কষ্ট করছে, কায়দা করছে সবই আপনি দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু যখন এই ছেলে লিওনেল মেসি হয়ে ওঠে এবং ড্রিবলিং করে তখন মনে হবে এর চেয়ে সহজ কাজ পৃথিবীতে নাই। এত ইজি। তখন এটাকে একদমই এফোর্টলেস দেখায়।

একজন শিল্পী বা ম্যাজিশিয়ান যখন তার খেলায় পারদর্শী হয়ে ওঠে তখন তার খেলাটা সহজ লাগে দেখতে। দেখতে মনে হয় এটা খুব সহজ। ওর দক্ষতার কারণে ব্যাপারটিকে এর্ফোটলেস দেখায়। ওই এফোর্টলেস কাজটা যে এক্সপার্ট না তার কাছে ১৫ বছরের ছেলের মতো কঠিন মনে হবে। মনে হবে, জীবন বের হয়ে যাচ্ছে ড্রিবলিং করতে। কিন্তু এটা আমার জন্য প্রযোজ্য না হলেও আমি মনে করি ইন-জেনারেল শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই কথা সত্য। পরিণত কবির কবিতায় আপনি কবিতার কৌশলটা দেখতে পাবেন না। দেখবেন, জলের মত বয়ে চলেছে। বিনয় মজুমদারের কবিতার দিকে দেখেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতার দিকেও দেখেন— জলের মতো বইছে। আর পরিণত হওয়ার আগের অংশে বুঝতে হবে সে এখনো এক্সপার্ট হয়ে ওঠেনি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি এখন পর্যন্ত যতগুলো ফিল্ম বানিয়েছেন এর মধ্যে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারে (২০০৯) রুবা বোধ হয় চরিত্রটার নাম, একইসঙ্গে কয়েক বয়সে চলছে। আবার পিঁপড়াবিদ্যায় (২০১৪) নায়িকা চরিত্রের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় ছেলেটা ভাবছে দুই রকম। প্রায় সব ফিল্মেই এ রকম পাওয়া যাবে। আপনি দ্বন্দ্বে ফেলেন— এটা আমরা জানি। ধরে নিচ্ছে একটা সিগনেচার। এই যে দ্বন্দ্বে ফেলেন, প্রথমত কেন ফেলেন? দ্বিতীয়ত, আপনি যখন প্রথমদিকে কাজ করেতেন, স্ক্রিপ্ট দিতেন না। এজন্য কথা শুনতে হতো। কিন্তু এটাও একটা ওয়ে। আবার ভাষা নিয়ে আপনি গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করেছেন, যার সুবিধা আমরা সবাই ভোগ করছি (তিনি বললেন, আমাকে ভাষাসন্ত্রাসী বলা হতো)। একটা দীর্ঘ সময় প্রায় প্রতিটি ইন্টারভিউতে আপনাকে এ বিষয়ে উত্তর দিতে হতো, এখন হয়তো সেই সমালোচনাগুলো হচ্ছে না। এখন কেমন সমালোচনা শুনতে হচ্ছে?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

দুইটাই কঠিন প্রশ্ন। উত্তর দিতে হবে সময় নিয়ে। আচ্ছা আমি কি সমালোচনা শুনি ? এটা নাকি দ্বন্দ্ব আগে দিব? … আমি সিনেমা কেন বানাই তা নিয়ে ছোট লেখা লিখেছি ফেসবুকে। আমি সিনেমা বানাই এজন্য না যে আমার মানুষকে অনেক কিছু বোঝানোর আছে। তাকে জ্ঞান দিতে চাই, বোঝাতে চাই— তা না। সম্ভবত সিনেমা বানাই কারণ আমি যে জীবনটা যাপন করছি বা আশপাশের যে জীবন দেখি এটা নিয়ে প্রশ্নের উদয় হয় আমার মনে। বোঝাতে চাই কোনটা কে? বুঝতে চাই। বুঝতে চাওয়ার প্রচেষ্টাই হচ্ছে আমার সিনেমা। এই যে বুঝতে চাই, চাইতে গিয়ে বাস্তবতা কিন্তু আমাদের দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। বাস্তব জীবনে সবকিছুর উত্তর পাই না। বাস্তবতা কখনো কখনো ভালনারেবল মুহূর্ত তৈরি করে। যেমন আপনি ব্যাচেলরের যে কথাটা বললেন— ফিসফিস ফিসফিস। এটা নিয়ে অনেক গালিগালাজ খাইতে হইছে। আমি ব্যাচেলরে ফোন সেক্স দেখাইছি, এই দেখাইছি, সেই দেখাইছি। বাট যেটা দেখাইছি ওইটা আমাদের জীবনে আছে। আমি পর্দায় দেখাইছি। এখন এটা খুব ভালনারেবল মানুষের জীবনে। সংকটময় মুহূর্ত পর্দায় দেখাইছি। এটাই পার্থক্য।

এখন একজন ফিল্মমেকার হিসাবে, আমার কাজ এই জীবনটা বুঝতে চাওয়া। এই বুঝতে গিয়ে, জীবনটা দেখাতে গিয়ে কখনো আমি নিজে দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। তাই দর্শকদেরও দ্বন্দ্বে ফেলতে চাই। কারণ এইটা জীবন বোঝানোর প্রক্রিয়া। জীবন বোঝার প্রক্রিয়াতে সাফল্য আছে। ফলে এটা ডিনাই করতে পারতেছি না। যেহেতু আমি ডিনাই করতে পারি না, তো এটা আমার সিনেমা থেকে কেমনে বাদ যাবে? বাদ দেওয়ার রাস্তা আমি জানি না।

নাজমুস সাকিব রহমান:

এবার সমালোচনা।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

সত্যি বলতে একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকে তখন একটা টেন্ডেন্সি থাকে তাকে বাতিল ঘোষণা করে দেওয়া। আমি ২০১০ সাল থেকে বহুবার বাতিল হয়েছি। আমি যখন থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার করি— ওইটা যখন রিলিজ হয়; তখন বেশিরভাগ পত্রিকায় অনেকে রিভিউ লিখে বলেছিল, উনি ফুরিয়ে গেছে, উনাকে দিয়ে হবে না, উনি বাতিল। এরকম করে প্রত্যেকবার আমাকে একবার একবার করে বাতিল করে দেওয়া হয়। এর কারণ আমি বুঝতে পারি। এতদিন ঘাড়ের ওপর সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসে আছি।  আর কত? এবার রিটায়ারমেন্টে যা। এরকম একটা ব্যাপার। দ্রুত তাকে ডিনাই করে ডিনার করার মতো আনন্দ পাওয়া যায়। সো, একজন ছিল। উনাকে দিয়ে আর হচ্ছে না। এটা আমি ২০০৭ থেকে শুনছি। মেড ইন বাংলাদেশের কথা বলছি। ও গন! এত বছর ধরে আমাকে বাতিল করার চেষ্টা হয়েছে। তারপর যখন আমি টিকে গেছি তখন আর চেষ্টা করা হয় না। তখন ওরা বুঝতে পারে এই সিন্দাবাদের ভূত মাথা থেকে যাবে না। এখন সমালোচনা যেটা হচ্ছে সেটা যৌক্তিক আছে। আপনার কাছে ‘৪২০’ বা ‘ব্যাচেলর’— এই টাইপের হিউমারগুলো আর দেখছি না; এই সমালোচনা আছে। আরেকটা সমালোচনা আছে— আপনি ইদানিং ফেস্টিভ্যালের জন্য কাজ করেন। বাস্তবে ফেস্টিভ্যালের জন্য কিছু করা যায় না।

আলোকচিত্রীঃ ওমর ফারুক

 


আমার বিপদটা হচ্ছে আমাকে এইদিকে শুনতে হয় আপনি ফেস্টিভ্যালের জন্য কাজ করেন। ফেস্টিভ্যাল বলতে মনে করে ইউরোপের জন্য কাজ করি। আর ইউরোপ মনে করে ‘ইউ আর টু বাংলাদেশি’।

 

আমি বোঝাতে পারতেছি? ইউরোপ আমার সিনেমাটা ইউরোপের উপযোগী মনে করে না। আবার এখানে কেউ কেউ বলে আপনি বেশি ইউরোপ হয়ে যাইতেছেন। আমি আসলে কোনোটাই হই নাই। তবে এটা সত্য,  ফিল্মমেকার তো একেকবার একেক খেয়ালের মধ্যে ঘোরে। একেক রকম জিনিস করার চেষ্টা করে। কোনো জিনিস হয়তো দর্শকের সঙ্গে কমিউনিকেট করে, কোনোটা না-ও করতে পারে। এটা হয়। জীবন তো …. আমি তো বক্স অফিসের দিকে তাকিয়ে ছবি বানাইতে আসি নাই। আমার মন চাইতেছে— শিশু কি করে? পুতুল কাদামাটি নিয়ে একবার টেপা পুতুল বানায়, একবার ঘোড়া বানায়। নানা কিছু করার চেষ্টা করে। কখনো ঘোড়া করতে গিয়ে ঘোড়ার এক পা ভাইঙ্গা যায়, কখনো হয়তো সে ভুল করে না। এ কারণে আমি নানান কিছু করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ফেস্টিভ্যালের জন্য কোনো কিছু করা যায় কি না এটা জানি না।

কারণ কোনো ছবি বানানোর পর এটা জানি না ফেস্টিভ্যালে নেবে নাকি রিজেক্ট করবে। সো আমি আসলে ফেস্টিভ্যালের জন্য ছবি বানাই ব্যাপারটা মোটেই তা না। একটা উদাহরণ দিলে আরো পরিষ্কার হবে। আমি ‘টেলিভিশন’ বানাই ২০১২ সালে। এই উদাহরণটা বিভিন্ন বক্তৃতায় আগেও দিয়েছি। ছবিটি বানানোর পর ইউরোপের বিখ্যাত একজন প্রেস এজেন্টের কাছে পাঠাই। উনি ছবিটা দেখেন। উনি আব্বাস কিয়ারোস্তামিদের মতো বিখ্যাত লোকজনের সাথে জীবনে এক দুইবার কাজ করছেন। তাকে পাঠাই প্রযোজকের সূত্রে। তো উনি এটা দেখে খুব পছন্দ করেন। আমি এর মধ্যে আশা খুঁজে পাই। কারণ উনাকে পেলে আমার বড় ফেস্টিভ্যালে যাওয়া সহজ হয়।

তো উনি দেখে বলল— সবকিছুই ভালো, মোস্তফা। কিন্তু আমার… উনি ঠোঁট কাটা টাইপের মানুষ ছিলেন। আমি বাংলাদেশ থেকে গেছি, আমি তো অভ্যস্ত না। উনার মতে তিনটা জিনিস বদলাইতে হবে। তারপর রিচার্জেবল পারসনকে রেফার করবে। ওরা দেখবে। তো কোন তিনটা জিনিস? একটা হচ্ছে, নায়ক হচ্ছে চেয়ারম্যানের ছেলে চঞ্চল চৌধুরী। সে বাপের সঙ্গে বিদ্রোহ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। সে আমাদের নায়ক। কিন্তু আজকে সে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে গেছে, পরের দিন দেখাচ্ছে বাপের পা ধরে কাঁদতেছে। তাহলে কি হচ্ছে? স্টোরি তো রিওয়ার্ক করবে না। আমার ক্যারেক্টার প্রগ্রেশন হলো না। এটা বদলাতে হবে। সেকেন্ড উনি বললেন, কেন ফিল্মের মধ্যে এরা একটু পরপর কাঁদে। পোলা কাঁদতেছে, চেয়ারম্যান কাঁদতেছে। হোয়াই দে আর ক্রায়িং? তৃতীয় হচ্ছে ছবির শুরুতে একটা ডায়লগ আছে। ফরাসি দেশে হিজাব নিষিদ্ধ করছে আপনি হেয়ানে যান ন কিল্লাই? ওই যে ইন্টারভিউ নেয় চেয়ারম্যানের … একজন টিভি রিপোর্টার। এইটা শুরুতে থাকাটা একটু অ্যাগ্রেসিভ। যদি রাখতে হয় পরের দিকে রাখো, না রাখলে ভালো। এই যে তিনটা নোট আসলো, তখন আমি বাছুর। আমি এখনো বাছুর। আমি এটা কি করে সামলাবো? উত্তরই বা কি দিব?

ঘটনাচক্রে টেলিভিশন এশিয়ান সিনেমা ক্যাটাগরিতে একটা ফান্ডিং পাইছিল। ফেস্টিভ্যাল প্রধান আমাকে চিনতেন, যেহেতু ফান্ডিং করেন। আমি তখন তাকেসহ দুইজনকে চিঠি লিখলাম। এটার উত্তর কি দিব? তারা একইরকম উত্তর দিলেন। বললেন, তোমার মন কি বলে? আমি বললাম, এই তিনটার একটাও আমার শুনতে ইচ্ছা করছে না। কারণগুলো ব্যাখ্যা করলাম। বললাম, দেখো কেন কাঁদে? কারণ কান্না বাংলাদেশের মানুষের ফেভারিট পাস্টটাইম। আমরা কারণে-অকারণে কাঁদি। আমাদের একটা আটর্ফম (কান্না) আছে। জগতের এত জ্বালা, এত অপ্রাপ্তি এগুলো কি দিয়ে ঢুকাব না কাঁদতে পারলে? যে ক্যারেক্টার ডিল করছি এরা গ্রামীণ মানুষ। তারা অনেক কাঁদে, প্রচুর হাসে, তারা  কাজ করে বেশি, পরিশ্রমও বেশি। সব বেশি বেশি । তো এটা বাদ দিব ক্যামনে? আর হিরোর ক্ষেত্রে যেটা হচ্ছে তার ফ্রেঞ্চ-আমেরিকার ব্যাকগ্রান্ড থেকে আসছে (সমালোচক)। সেজন্য এটা মনে হচ্ছে। আর আমার রিয়ালিটি, যেদিন বাপের সাথে বেয়াদবি করে বাসা থেকে বের হয়ে গেছি ওইদিন রাতে ঘুমাতে পারি নাই। কারণ আমার বাপের সাথে বেয়াদবি করছি। কত ছোট এগুলা সমাজের কাছে। এভাবেই আমরা জীবন কাটাই এবং এটাই আমাদের পারিবারিক জীবন।

আমি যদি চঞ্চলকে দেখাই বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, ইলেকশন করছে। সমস্ত অজ্ঞতা দূর করে বিপ্লবী বীর ….। তোমার হয়তো উদ্দেশ্য  ভিন্নরকম কিন্তু আমি তো ক্যারেক্টার চিনি। যে চরিত্রটাকে আঁকতে চাই— এটা আমার … বদলে ফেললে একটা ভৌগোলিক প্রতারণা হবে। আমি সেটা করি নাই। আমি যখন বলেছি করব না— তখন তার চেয়ে বেটার জিনিস হয়েছে। বুসান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ক্লোজিং ফিল্ম হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। হয়তো এটার কারণে নির্বাচন করেছে তা না।

এটার উদাহরণ দিলাম কারণ আমি নিজের জন্য ছবি বানাই। তবে কিছু কিছু ছবি মানুষকে কমিউনিকেট করতে পারে। আবার কিছু কমিউনিকেট করতে পারে না। যেমন ‘ডুব’ আর ‘৪২০’ দুটো এক হবে না। ৪২০ বেশি মানুষকে কমিউনিকেট করবে। ডুব অত বেশি করবে না। কারণ দুইটার নির্মাণভঙ্গি আলাদা। প্রকাশভঙ্গি আলাদা। তাই যারা এই অভিযোগটা করে, তারা তাদের জায়গা থেকে ঠিক। আমি অনেকদিন হিউমার নিয়ে কাজ করি না। কিন্তু সামনে অভিযোগ করতে হবে না। হিউমারের কাজ আসতেছে।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এই যে ২৫ বছর ধরে নির্মাণ করছেন, আপনি লাউড অ্যাকটিং ব্যবহার করেন নাই (তিনি বললেন, এখন যদি দেখি কেউ লাউড অ্যাকটিং করলে সেটাকে মাস্টার অ্যাকটিং বলতেছে। পরক্ষণে যুক্ত করলেন, একবার করেছেন। মেড ইন বাংলাদেশে শহীদুজ্জামান সেলিমের চরিত্রটা লাউড ছিল)। ঢাকাই সিনেমার অনেকে আপনার সঙ্গে কাজ করেছে। আপনি সেদিকে যান নাই। আপনি মেইনস্ট্রিম সিনেমার কথা বলছিলেন, ওই পরিচালকরা এখন নাই। এখন আর্টসেলও যেমন আন্ডারগ্রাউন্ড নাই, মেইনস্ট্রিম হয়ে গেছে, আপনারাও নাই।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

হ্যাঁ আমরা মেইনস্ট্রিম হয়ে গেছি।

নাজমুস সাকিব রহমান:

এফডিসি প্রসঙ্গে বলেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

এফডিসি কেবল একটা প্রতিষ্ঠান। যারা ওখানে আড্ডা মারেন, উনারা ফিল্মমেকার। আমরাও ফিল্মমেকার। প্রবলেম হচ্ছে তাদের বেশিরভাগ সিনেমা আসলে কপিক্যাট বা নকল। বলিউডের ওইরকম করে বানানোর চেষ্টা করতেন। তবে সব না। এই এফডিসিতে ছুটির ঘণ্টার মতো সিনেমা হয়েছে, আজিজুর রহমান বানিয়েছেন। একটা নিউজ পেপার থেকে গল্প নিয়ে, কিন্তু দুর্দান্ত গল্প। উনারা ছিলেন ব্যতিক্রমী পরিচালক। কিন্তু ইন-জেনারেল, একটু নকল করার প্রবণতা ছিল। সে প্রবণতা শেষের দিকে এত এত বাড়ছিল যে ধ্বংসই অনিবার্য ছিল। শেষের দিকে নকল ছাড়া উনারা কিছু করতেন না। উনারা সময় থেকে আরও ছিটকে গিয়েছিলেন যখন নিজেরা কাজ না করে যারা নতুন ফিল্মমেকার তাদের কীভাবে ডিস্টার্ব করা যায় এই রাস্তা বানাতেন।

 


এই যে এফডিসি অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার হতে হবে, মেম্বার হতে ইন্টারভিউ দিতে হবে। আমি তিনবার ইন্টারভিউ দিয়ে ফেল করছিলাম।

 

নাজমুস সাকিব রহমান:

কি কি প্রশ্ন করেছে ওখানে?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আমারে একবার জিজ্ঞেস করছিল ওভার দ্য উইকেট ক্রিকেট কাকে বলে? আমি চুইংগাম খাইতে খাইতে বলছি— ফিল্মের সাথে ক্রিকেটের কী সম্পর্ক? আমারে ফেল করাইয়া দিছে। আরেকবার জিজ্ঞেস করছে শিকাগো (২০০২) ছবি কয়টা অস্কার পাইছে? আমি এবারও বলি এটার সঙ্গে ফিল্মের কী সম্পর্ক? আমারে আবার ফেল করায় দিছে। থার্ড টাইম আমারে সাগর ভাই (ফরিদুর রেজা সাগর) বলল, কোনো ঝগড়া-ঝাটি কইরো না ওদের লগে। যা জিগায় তার উত্তর দিয়ে চলে আসো। থার্ড টাইম পাস করছি। যে লোকগুলো করাইছে আমার কাছে ট্র্যাজেডি, তুমি যদি নিজেকে আর্টিস্ট মনে কর, তাহলে কিভাবে সার্কাসটা করলা। আমার কাছে মনে হয় ট্রেড ইউনিয়নের নেতা।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি ক্যারিয়ারের প্রথম থেকে মিডিয়া ফ্রেন্ডলি ছিলেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আমি তো জানি মিডিয়া আমাকে ঘৃণা করে।

নাজমুস সাকিব রহমান:

না, অল্প কয়েকজন হতে পারে। সবাই না।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আমার চেয়ে বেশি গালিগালাজ এবং নেগেটিভ রিভিউ মিডিয়ায়, ফেসবুক গ্রুপে মনে হয় না কেউ পাইছে। এই জীবনে কেউ পায় নাই। আমি ইন্টারভিউ দিছি অনেক। এ কারণে যে আমার বিরুদ্ধে এত গালিগালাজ করা হতো মিডিয়ায়। এমনকি বিখ্যাত লোকেরাও গালিগালাজ করতেন। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরাও। তখন গালিগালাজের উত্তর দেওয়ার জন্য মিডিয়াকে দখল করতে হয়েছে।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি এখন খুব পরিচিত একজন মানুষ। যেখানেই যান না কেন, হয়তো মুড থাকে না, কিন্তু ছবি তুলতে বা কথা বলতে হয়।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আমি যেখানেই যাই, যত চাপের মধ্যে থাকি, কেউ যদি এসে ছবি তুলতে চায় আমি পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলি। খুব ভালো আচরণ করার চেষ্টা করি সবসময়। এটা আমি অন্তর থেকে করি। আমি কৃতজ্ঞ বোধ করি কেউ যদি এসে দোয়া করে, ছবি তুলতে চায়। আমার কোনো সমস্যা নাই। আমার সমস্যা তখনই যখন তারা কেউ আর ভালোবাসবে না। এর চেয়ে দুঃখের দিন আর হতে পারে না।

নাজমুস সাকিব রহমান:

বাংলাদেশের এই সময়ের প্রধান অভিনেতা মোশারফ করিম এবং চঞ্চল চৌধুরী শুরুর দিকে আপনার সঙ্গে কাজ করেছেন। ক্যারাম প্রথম পত্র ও গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপন করেছিলেন এ দু’জন। তাদের সঙ্গে পরেও কাজ করেছেন। নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী কাজ করেছেন আপনার সিনেমায় (নো ল্যান্ডস ম্যান, ২০২১)। ইরফান খান (ডুব, ২০১৭) করেছেন। যতদূর জানি, আপনার পিঁপড়াবিদ্যা ইরফান খান খুব পছন্দ করেছিলেন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

আসলে এটা অনেকে জানে না ইরফান খান পিঁপড়াবিদ্যার হিন্দি রিমেক রাইটস নিয়েছিলেন। অর্ধেক টাকা পে-ও করেছিলেন। অভিনয়শিল্পীর ক্ষেত্রে একেকজনের সাথে একেক রকম অভিজ্ঞতা হয়। অভিনেতার সাথে পরিচালকের যে কোলাবরেশন হয় এটা ইন্টারেস্টিং জার্নি আমার কাছে মনে হয়। শুধু কাজ না, আমি কারো কারো সাথে কাজের বাইরেও সম্পর্কটা উপভোগ করি। যেমন তিশার সঙ্গে, ইরফান ভাইয়ের সাথে, নওয়াজ ভাইয়ের সাথে। ইভেন রাহমান ভাইয়ের (এ আর রাহমান) সঙ্গে। চঞ্চল ভাই, মোশাররফ ভাই যারা আছে। একেক জন আর্টিস্ট কিন্তু একেকটা আলাদা আলাদা দেশ।

ভিন্ন দেশে গেলে কি হয়, ওই দেশের ভাষা শিখতে হয়। একেক জায়গায় অভিনয়শিল্পীকে অ্যাপ্রোচ  করতে গেলে তার মাথায় বসবাস করতে হবে। আবার আমার মাথায় তাদের স্পেস দিতে হবে। এই যে একটা মিথস্ক্রিয়া, এটা ভেরি ইন্টারেস্টিং প্রক্রিয়া। তাদের ক্ষেত্রেও। যেমন ফারিনের ক্ষেত্রে (লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান)। আমি মনে করি প্রত্যেকের সাথে ইন্টারেকশনের প্রসেসটা  ইন্টারেস্টিং। আমার কাছে এক একটা বীজ গড়ে তোলার মত। মানে একটা লার্নিং প্রসেস বলা যায়। জীবন চেনা, শিল্পী চেনার ক্ষেত্রেও।

নাজমুস সাকিব রহমান:

আপনি সবসময় বলেন আপনার সিনেমা আপনার ব্যক্তিত্বের অনুবাদ। কিন্তু আপনি যখন কবিতা লিখেন, মানে কবিতার ক্ষেত্রে এটা লুকিয়ে রাখেন। মনে হয় খুব লাজুক একজন ব্যক্তি। সে বলতে চায় না আমি কবিতা লিখি, এটা কেন?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

লজ্জা লাগে নিজেরে কবি বলতে। তা কেন, আমি জানি না। এটা মধ্যবিত্তদের আড়ষ্টতা হতে পারে। আমি যখন গান গাইতাম তখনও কবিতা লিখতাম গোপনে। কিন্তু আমার কবিবন্ধু বলতে পারত না আমি কবিতা লিখছি। এটা আড়ষ্টতা হতে পারে। এইরকম আড়ষ্টতার সাথে সংসার করতে করতে একসময় ঘরণী আপন হয়। তখন ওই ঘরণীকে ডিভোর্স দিতে পারেন না। তাই এখন আমার সাথে আমি আছি আর কি।

নাজমুস সাকিব রহমান: 

পরের কবিতা পড়েন?

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী:

অবশ্যই। আমি আজকেও ইনস্টাগ্রামে কবিতা পড়েছি। আমি কবিতা পড়ি র‌্যান্ডম। যখন যেটা ছাপা হয় এখনকার কবিদের, তারা ফেসবুকে যেরকম শেয়ার করে। নিউজ ফিডে ভাসে, ওখান থেকে পড়ি। আবার ইদানিং অভ্যাস কমে গেছে কারণ বই পড়া হয়ই বা কখন? ইলহাম আসার পর থেকে সে একমাত্র বই যেটা পাঠ করি। ফিল্মের বাইরে পড়ার সুযোগ নাই। তবে কবিতা পড়ার চেষ্টা করি, জানার চেষ্টা করি কোথায় কে কে লিখছে, জানি-ও।


অডিও ট্রান্সক্রাইব করেছেন সুমন বৈদ্য

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading