ভূগোল ক্লাসের পিওন ।। রোহণ ভট্টাচার্য

মাঝেমধ্যে নিজেকেই চিঠি লেখা ভালো। উত্তরের জন্য অপেক্ষা করাও। শহর থেকে দূরে বসে নিজের ঠিকানায়। আমি ও আমার চিঠি। একই বাড়ির দিকে রওনা হব আমরা দুজন। আলাদা পথে। একে অপরের যাত্রাপথ নিয়ে চিন্তিত থাকব কিছুদিন। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে রেললাইন আত্মহত্যাপ্রবণ। গরমদিনের ছুটি আমাকে আটকে রেখেছে কলকাতা থেকে দূরের এক গ্রহে। ফিরতে দিচ্ছে না। বাথরুমের দরজা এমনভাবে নড়ছে, যেন বহুদিন ভিতরে বন্ধ রয়েছে কেউ। অনর্গল জলের ঝগড়া, সিগারেটের গুঁড়ো ভালো লাগছে না তার। বাইরে এসে জানলায় বসতে চায়। একেকসময় জানলা ছাড়া কিছুই চাওয়ার থাকে না মানুষের। শুকনো পাতায় আগুন ঘষে দিয়ে কারা যেন উধাও হয়ে যায় ভোরবেলা। দেখতে ইচ্ছে করে। পাতাপোড়া ধোঁয়া নারীশরীর হয়ে যাচ্ছে। এমন এক নারী, সভ্যতা বলতে যে বুঝেছে একফালি কাপড় আর একমনে দাঁতমাজা। দাঁড়িয়েছে বাইরে। আঙুলে ছোটো গাছের প্রশাখা। বাকি অংশ মুখের ভিতর। পৌঁছে গিয়েছে অন্তরাত্মা অবধি। ঘষে দিচ্ছে তাকে। খুঁজছে গতজন্ম। যেখানে তার কানের লতি, পায়ের রোম, আঁচলের ভাঁজ কিংবা পিঠের ঢাকা অংশ নিয়ে মাথা ঘামায়নি কেউ। শুধু চেয়েছে সে এভাবেই অনন্তকাল থেকে যাক। দাঁত মাজুক। থুতুর মতো সাদা ফেনা ছড়িয়ে দিক চারপাশে। এই দাঁত ঘষা যেন না থামে। থামলেই কিছু একটা ঘটে যাবে। বাতাস ফেটে যাবে। কিলবিল করে বেরিয়ে আসবে চরিত্ররা। গল্প বলবে। বড়োদের রূপকথা। ভুগোল বই খুলে ঝাঁপিয়ে পড়বে পিওন। সমস্ত আয়ু ছুটে বেড়াবে সেইসব গল্পচিঠি নিয়ে। তার নিজের কোনো বাড়ি নেই। ফুরসত নেই। কেবলই দৌড়ে যাওয়া আছে অপরের ঠিকনার দিকে।

 

ভাড়াবাড়ি
মানুষের ঘরে যেভাবে আলো ঢোকে, সেভাবে আর কেউ ঢোকে না। চাদরে মাখানো অদ্ভুত দুঃখরঙ। আমার ছায়াকে শুয়ে রেখেছে আমারই পাশে। যেন কালো আত্মা। দেহ ছেড়ে বেড়াতে এসেছে। সে দেখছে, বাইরে গতকালের ঝড়ে ছিঁড়ে পড়েছে পাখির বাড়ি, ভাড়াবাড়ি। বাড়ির ভিতর মাথা ঢুকিয়ে গবেষণা করছে পাখি। বুঝে নিচ্ছে, আত্মীয়স্বজন থেকে গেছে কিনা। এবার সে উড়ে যাবে। পুরনো বাসা দিয়ে যাবে নতুন পিঁপড়েকে।
কালো আত্মা নড়েচড়ে বসছে। এখন সে পিঁপড়েদের শরীরে আতসকাচ হতে চায়। বড়ো করে দেখতে চায়, শ্রমিকশ্রেণি কোথা থেকে শুরু। জানতে চায়, তাদের কোনো বাড়ি আছে কিনা। পিঁপড়ে যাযাবর। বলছে নিমাই মাইতির কথা। বাড়ি নেই এদেশে। অথচ আজ প্রায় ষাট বছর হল, তিনি ভারতীয়। এসেছিলেন যৌবনে। ফিরে যাননি। একেক বয়সে একেক গ্রামেশহরে থেকেছেন। বাড়ি করেননি। কিছুদিন থেকেছেন, সহ্য করেছেন আবহাওয়া। প্রশ্রয় দিয়েছেন মানুষকে। তারপর ভেসে গিয়েছেন অন্য জলে ও বাতাসে। শেষজীবন কলকাতায় কাটাবেন। এখনও ভাড়াবাড়ি। গড়িয়াতে। বয়স আশি। সাদা তুলো চুল। হাতে বাঁকানো লাঠি, যাতে সোজা থাকে পিঠ। অন্যহাতে ছোটো বাজারের থলি। রঙচটা। ফাঁকা। হাওয়ার বন্ধুত্বের দিকে দোলে।

নিমাই মাইতি লিখতেন। যখন যেখানে থেকেছেন, লিখেছেন। অথচ বয়ে বেড়াননি। সেই পরিবেশ, গাছপালা, মানুষজনের সঙ্গে লেখাদের ছেড়ে এসেছেন। এরকম কেন করেছেন জিজ্ঞেস করলে বলেন- ছেলেবেলায় শুনেছি জায়গার জিনিস জায়গায় রাখতে হয়। তাহলে কোনোদিন হারিয়ে যায় না।

কলকাতায় আসার পর এ বয়সে হাত কাঁপে। অতএব লেখা বন্ধ। দুপুরের দিকে মুদিখানার সামনে বসে পুরনো বাড়িদের গল্প বলেন। কেমন ছিল এই দেশ। কেমন পালটে যাচ্ছে মানুষের ভাবভঙ্গি। আজকাল লোকে নাকি কথা বলার সময় আগের তুলনায় হাত নাড়ে কম। এমন কথাও বলেন।
আমরা কথা বলেছিলাম কিছুদিন। ভয় করত ওনাকে দেখে। গাড়ির হর্ন শুনতে পান না। পেলেও বুঝতে পারেন না। কিছুদূর হাঁটলে বিশ্রাম নেন। আবার উঠে পড়েন। তবু রিক্সায় চাপেন না। কেউ বাড়ি অবধি এগিয়ে দিতে চাইলেও রাজি হননি।
প্রায় একমাস তার দেখা নেই। বাড়ি চিনি না। সেদিন বৃষ্টিশেষ। ফিরছি। সেবাশ্রম থেকে স্বর্গরথ ছুটে চলেছে শ্মশানের দিকে। যে গলির ভিতর থেকে বেড়িয়ে এল শববাহী গাড়ি, সেই গলিতেই শেষবার নিমাই মাইতিকে মিলিয়ে যেতে দেখেছি।
সব অঙ্ক না মেলাই ভালো। বরং ইতিহাস পড়া যাক। ভাবা যাক, উনি কলকাতা ছেড়ে চলে গেছেন কোথাও। হয়ত সেই পুরনো লেখাদের খুঁজতেই গিয়েছেন আবার। হয়ত তরুণ কবি তাকে সন্ধান দিয়েছে সেই আশ্চর্য কলমের, যাতে হাত কাঁপে না।
সেই কালো কালিও তো কলমের আত্মা। সেও নিশ্চয় কোনো এক ভারতীয় জানলায় অন্য কারো ছায়া হয়ে বসে আছে এখন। দেখছে ঝড়ে যে বাসা খসে পড়েছে সেই নিয়ে বিশেষ দুঃখ নেই পাখির। রুটির টুকরো মুখে সে বসেছে কার্নিশে। সে জানে, একটু পরে জমাদার এসে এইসব আবর্জনা ঝাঁট দিয়ে ফেলে দেবে।

 

বাঁশিওয়ালা
জামার শেষ অংশ হাত হয়ে গিয়েছে। হাতের শেষ অংশ হয়ে গিয়েছে ঝাঁটা। পেশায় ঝাড়ুদার। হুইসিল দিলেই ময়লার বালতি নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন বিভিন্ন বয়সি মহিলারা। বাঁশিতে একটা ফুঁ। পাড়ার সকল মহিলাকে সংসার থেকে টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে সূর্যালোকে। আমরা বলতাম হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। দূর থেকে শোনা যায় ডাক। বাঁশিই তার স্বর ও ভাষা। কথা বলেন বছরে একবার। পুজোর আগে। বখশিস চাইতে এসে।

বখশিস চাইতে আসতেন বেলায়। স্নান সেরে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে। বারবার বললেও উঠোনের বেশি এগোতেন না। বসতেন বারান্দার সিঁড়িতে। জল খেতেন সংকোচে। যেন অপরাধ হয়ে যাচ্ছে। গেলাসে ঠোঁট না ছুঁইয়ে। ঢোক গেলার সময় স্পষ্ট দেখা যেত গলার ভিতর ওঠানামা করছে এক চাকতি। ওইখানে আছে যাবতীয় সুর। বাঁশির ডাক। বখশিসের টাকা নিয়ে শিস দিতে দিতে গলিপথে অদৃশ্য হয়ে যেতেন।

একবার পুজোর আগে বলেছিলেন— দেশে চলে যাচ্ছি। আর ফিরব না। আমার নাতিকে পাঠিয়ে দেবো। জোয়ান ছেলে। চটপটে। শিখিয়ে পড়িয়ে নেবেন। জ্যোতিষী হাত দেখে বলেছে। আমাদের বংশে সকলেই ঝাঁটা পিটাবে।

নাতি এলো যথাসময়ে। এই বাঁশিতে ডাক নেই। বিরক্তি আছে। মাটিতে ঝাঁটা আর বেলচা ঠোকার আওয়াজে তীব্র রাগ। মনে হবে কোথাও যেন যুদ্ধ লেগেছে। মানুষ মরছে অবলীলায়। সেইসব অশান্তির শব্দ সে বয়ে এনেছে ঝাঁটায়। নিস্তরঙ্গ, নির্বিকার লোকজনের বিরুদ্ধে ঝাঁটা হাতে জেহাদে নেমেছে সে। বাসি খাবারদাবার প্লাস্টিকে মুড়ে ময়লার গাড়িতে ফেলে দিলে ঝাঁঝিয়ে ওঠে নাতি। ঘ্যাসঘ্যাসে ভাষায় বলে— কুকুর বিড়ালকেও তো দিতে পারতেন, মানুষের কথা ছেড়েই দিলাম! নাতি জলও চায় না, শুধুই বখশিস চায়। মহরমে চায়।

জানাজানি হয়ে গেল এ লোক সেই নাতি নয়। অন্য কেউ। তাকে কেউ জিজ্ঞেসও করেনি। করার সাহস ছিল না। দাদু পুজোয় বখশিস চাইলে নাতি মহরমে চাইতে পারে না। এই যেন পৃথিবীর নিয়ম! এমনকি সে জল খায় যখন রাস্তার কলে মুখ লাগিয়ে, অবিকল তার গলায় একইরকম গোল চাকতি ওঠানামা করে। হাত বেয়ে মুখে নেমে আসে জল। দেখা যায় সেই ভাগ্যরেখা, জলে ভেজা, যা নিয়ে জ্যোতিষী কিছু বলেছে কিনা কখনই জানা হবে না।

 

রেখা
এসেছিল সুন্দরবন থেকে। আমাদের বাড়িতে কাজ নিয়েছিল খাওয়া-থাকা-পরার। গলায় লাউডস্পিকার নিয়ে জন্মেছে। হাঁড়ির খবর এমনিই পাচার হয়ে যেত পড়শির কাছে। অথচ, হাঁড়ির খাবার পাচার হত না পেটে। কোনোদিন নুন কম, কোনোদিন পোড়ালাগা। চাল থেকে তৈরি সমস্ত খাবারই রেখার মতে পায়েস। তিনদিনের খাবার রান্না করত একদিনে। এত খাবে কে? জিজ্ঞেস করলেই বলত— কিচ্ছু অসুবিধে নেই। বেশি হলে আমি খেয়ে নেবো।

আমাদের গৃহশিক্ষক ছিলেন অমিতাভবাবু। তিনি এলেই পর্দা সরিয়ে চায়ের প্লেট সমেত হাজির হত রেখা। আমরা জন্মফিচেল। কানাকানি করতাম— কালকের শিরোনাম, রেখা চা খাওয়ালেন অমিতাভকে। অঙ্কস্যার আমাদের এই পরচর্চার কথা টের পেতেন না। এদিকে রেখার দেওয়া বিস্কুটকে দুই গোলার্ধে ভেঙে অর্ধবৃত্ত বুঝিয়ে দিতেন।

রেখা থেকে থেকেই সুন্দরবনের কথা বলত। সুন্দরবন মানে শুধুই বাঘের গল্প নয়। চাষবাসের গল্প, জমিজমা, আয়েলা সবকিছুই। সেখানে নাকি তাদের জমি আছে। সে চলেও যাবে চাষের মরসুম এলে। আবার পরের বছর ফিরে আসবে কলকাতায়, বাড়িতে কাজ করতে।

চলে যাওয়ার আগে রেখা তার সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে যেতে চেয়েছিল। আমরাই রাজি হইনি। আমরা বলেছিলাম— তুমি যে এই এতগুলো মাস থাকবে না, ততদিনে তো আমাদের নতুন লোক দেখতেই হবে। তুমি বরং তোমার জিনিস নিয়েই চলে যাও।

লাউডস্পিকার বাজানো গলায় হাঁউমাঁউ করে কেঁদে ফেলেছিল রেখা। সুন্দরবন নিয়ে ওর বলা শেষ গল্পটা শুনিয়ে জল মুছতে মুছতে চলে গিয়েছিল। রেখার স্বামী ছিল দিনমজুর। এসেছিল কলকাতার কারাখানায় কাজ করতে। সেইসময় তীব্র আয়েলা ঝড় আসে সুন্দরবনে। একবাড়ির চাল উড়ে গিয়ে পড়ে অন্যবাড়িতে। গাছ এসে পড়ে মানুষের পরিবারে। খেতের ফসল ছন্নছাড়া হয়ে যায়। ঝড় ঢুকে পড়েছিল ওদের জীবনপ্রবাহেও। কলকাতার কারাখানায় কাজ করতে আসা দিনমজুর স্বামী যন্ত্র চালাতে গিয়ে যন্ত্রের অংশ হয়ে গিয়েছিল। শুধু শরীরটা পাওয়া গিয়েছিল সকালে। প্রাণ উড়ে গিয়েছে ঝড়ে। সেইসময় সরকার ঘোষণা করে আয়েলায় মৃতদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

রেখার শেষ বাক্যগুলো মোটামুটি এরকম— বুড়ো বুড়ো লোকগুলো মরল ঝড়ে। তাদের পরিবার টাকা পেল। আমার জোয়ান বরটা, দিনমজুরটা তো আয়েলায় মরতে পারত গো। তাহলেও কিছু টাকা পেতাম!

 

দিনমজুর
ভেলোর। পাহাড় দিয়ে ঘেড়া। চেন্নাইয়ের বাসে বসলে দেখা যায় আশেপাশে ছুটে যাচ্ছে পাহাড়ের পর পাহাড়। বাসের জানলা দিয়ে চারকোণা রুমালমাপের আকাশ। একটা বয়সে পাড়ায় পাড়ায় ফুটপাথে স্টোনচিপস আর বালির স্তুপকে পাহাড় বলে বিশ্বাস করেছিলাম। গাছের ডালে জড়ানো কাপড়। সেই ছিল পতাকা। নিয়ম ছিল বালির পাহাড়ে চড়ে পতাকা লাগিয়ে আসতে হবে। ভেলোরের কালো পাহাড় সেই স্টোনচিপস পাহাড়েরই বড়োবেলা। অবিকল এক। আকারে বড়ো।

হোটেল ছিল ছোটো। একতলায় ওষুধের দোকান আর গায়ে লাগোয়া পানের দোকান। দোতলায় হোটেল। একই ঘরে আমরা পাঁচ বন্ধু। পরিবার সমেত এলে এসব হোটেলের ধারপাশ মাড়ায় না কেউ। অল্প হিন্দিজানা মালিক। মাঝেমধ্যেই এসে জিগেস করে আলাদা ঘর লাগবে কিনা। আমরা জানিয়েছিলাম অসুবিধে হচ্ছে না। এতেই হবে।

ব্যাপারটা পরে বোঝা যায়। আলাদা ঘর বলতে লছমির জন্য। নাম লক্ষ্মী। উচ্চারণের দোষে লছমি হয়ে গিয়েছে। লছমির সঙ্গে রাত কাটালে আলাদা ঘর দেবে মালিক। লছমিকেও সে-ই ফোন করে কথাবার্তা জানিয়ে দেবে। শুধু আমাদের কিছু টাকাপয়সা দিয়ে দিতে হবে তাকে। এ ছাড়া লছমির জন্য আরাইশো টাকা প্রতি ঘণ্টা।

ছিপছিপে দক্ষিণী মহিলা। ভাঙা হিন্দি। সঙ্গের পুরুষটি ঘরে ঢুকলেই লছমি পলক ফেলতে না ফেলতেই আলগা করে ফেলত শায়ার গিঁট। তার চেয়েও দ্রুত নোট মুড়িয়ে ব্লাউজের ভিতর চালান করে ফেলত বেরোনোর আগে। হেঁটে যাওয়ার মধ্যে যেটুকু কোমরের দোলনা তাতে মনে হত এই হাঁটা ওর নিজের নয়। বড়োপর্দার দান। সিলিংফ্যানের দিকে দুইপা তাক করে, লছমির ঘড়ির কাঁটা ঘুরে যেত পুরুষ থেকে পুরুষে। দুই কাঁটা যতদিন না আলাদা হচ্ছে ততদিন যেন মুক্তি নেই লছমির। এভাবেই সে থেকে যাবে একটি কাঁটার মতো। আর বারেবারে অন্য কাঁটার মতো বিভিন্ন পুরুষ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে ঘুরে ঘুরে ছুঁয়ে যাবে তাকে; পোশাকের পিছনে এমনই এক তীর্থাঞ্চল সে পুষে রেখেছে। ঘণ্টা পার করে দিলেও লছমির ঘর থেকে কোনোরকম শব্দ বাইরে আসবে না।

ভেলোরে গিয়েছিলাম ডাক্তারি কারণ। কানের সমস্যা। ফেরার দিন নিচের ওষুধের দোকান লাগোয়া পানের দোকান থেকে স্থানীয় তামাক কিনছি। একটা স্বর ভেসে এলো কানে। কানের ডাক্তার যে কান কোনোদিনও সারবে না জানিয়ে ইস্তফা দিয়েছেন। সেই কানেই স্পষ্ট শুনলাম “আন্না মুন সেরেল্যাক”। বাংলায়, “দাদা একটা সেরেল্যাক দিন।” সেরেল্যাক নিয়ে পাশ কাটিয়ে মহিলা চলে যাওয়ার সময় দেখি, তার কোমর দুলছে। টেলিভিশনের লাস্যময়ী ঢঙে। ছিপছিপে শরীর। আশেপাশের সময় যেন থেমে গিয়েছে। যে যেমন অবস্থায় ছিল আটকে গিয়েছে সেখানেই । দেখছে। লছমি।

আবার সময় চালু হল। পানের পিক ঘেন্নায় আছড়ে পড়ল ফিল্মের পোস্টারে। নায়কের বুকে এমনভাবে পড়েছে টাটকা পানের পিক, যেন রক্ত। ঝকঝকে থ্রিডি পোস্টার। মানুষজন বিনামূল্যে লছমিকে অভিশাপ দিয়ে গেল কিছুটা। সেরেল্যাকের বাক্সে বাচ্চার ফটোর দিকে তাকিয়ে দু-একটা বাছাই বিশেষণ।

মনে পড়ছে, অনেক আগে শিখেছিলাম, যারা প্রতিদিনের ঘামের মূল্য প্রতিদিন বুঝে নেয় তাদের দিনমজুর বলে।

 

মেয়েটি যখন দাঁত মাজা থামিয়েছিল তখন ওজোনস্তর ফুটো করে এইসকল অতিবেগুনী মানুষজন ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। শহরের বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং ছিঁড়ে একটি মেয়ে কোথায় যেন নিখোঁজ হয়ে গেছে। এখন রাতের হাওয়ায় ছেঁড়া হোর্ডিং দেখলে মনে হয় কার যেন ছিন্নভিন্ন শাড়ী। ভিতরে শরীর নেই কোনো। আমাদের পিওন তাদের খুঁজতে বেড়িয়েছে। তার ব্যাগে রয়েছে মুছে যাওয়া ভাষার হরফ। রয়েছে জলের বোতল। স্কুলমাস্টারের মেয়ের গোপন হাতের লেখা। দলিত ছাত্রের সুইসাইড নোট। আর অজস্র চিঠি যারা আলাদা ঠিকানায় যাবে। যাওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে দু-একটা অক্ষর বদলাবদলি করে নেবে। এভাবে যতটা খবর পাচার করা সম্ভব সেই চেষ্টা করছেন আমাদের পোস্টম্যান।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading