আমার পড়ালেখা । ভিএস নাইপল ।। সপ্তম পর্ব ।। ভাষান্তর : মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

                                                   (পর্ব ৭)

 

যা হোক, যাবতীয় ভুল-ভাল সত্বেও, প্রথম দিককার লেখা উপন্যাসগুলোর মতোই, এই বইটাও আমার জ্ঞান আর অনুভূতি বৃদ্ধির কাজে যথেষ্ঠ সাহায্য করেছে। বইটা লিখতে গিয়ে যা কিছু শিখেছি তা আর কখনো ভুলিনি। ফিকশন হচ্ছে ব্যক্তির বর্তমান পরিস্থিতিকে আবিষ্কারের পথ। এটি আমাকে এই পথে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। বাড়তি হিসেবে পাওয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও আমাকে সমৃদ্ধ করে আরো সামনে পৌঁছে দিয়েছে।

    ৬.

ঘটনাক্রমে আরো একবার নন-ফিকশন বই লেখার সুযোগ পেয়ে গেলাম। যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রকাশক ভ্রমণকাহিনীর একটা সিরিজ বের করছিলেন। তিনি আমাকে ঔপনিবেশিক কলোনির উপর কিছু লেখা পাঠাতে অনুরোধ করলেন। প্রথমে কাজটাকে খুবই সহজ মনে করেছিলাম। ভেবেছিলাম স্থানীয় এলাকার ছোটখাট বর্ণনা, কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিময় মুহূর্তের বর্ণনাসহ কাব্যিক কিছু ছবি ফুটিয়ে তুললেই লেখা হয়ে যাবে। এক ধরনের অদ্ভুত সরলতার কারণেই ভেবেছিলাম যে পৃথিবীর সমস্ত সংরক্ষিত জ্ঞানই সহজলভ্য, মানবজাতির সমস্ত ইতিহাস কোথাও না কোথাও সংরক্ষিত আছে, প্রয়োজন পড়লেই সেগুলো খুঁজে বের করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। অনেক চেষ্টা করেও ঔপনিবেশিক কলোনির স্থানীয় এমন কোন ইতিহাস খুঁজে পেলাম না যা পর্যালোচনা করে লেখা সম্ভব। পাওয়ার মধ্যে পাওয়া গেল কিছু গাইড বই যেখানে কয়েকটি কিংবদন্তীতূল্য কাহিনীর একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোন কোনটায় ইতিহাসের বর্ণনা খুবই হাস্যকর। উদাহরণস্বরূপ একটি বইয়ে বলা হয়েছে ১৫৯৫ সালে বৃটিশ অভিযাত্রী স্যার ওয়াল্টার রেলেইগের আগমনের পর এসব এলাকায় তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি!

 

শেষমেষ রেকর্ড বিভাগে খোঁজ নিতে গেলাম। এখানে পর্যটকদের রিপোর্ট পাওয়া গেল। বৃটিশ সাম্রাজ্যের কিছু প্রশাসনিক কাগজপত্রও খুঁজে পেলাম। বৃটিশ মিউজিয়ামে খুঁজে পেতে ঔপনিবেশিক কলোনি সম্পর্কিত স্প্যানিশ লেখ্যপ্রমাণের সংকলন বের করলাম। ১৮৯০ সালে বৃটিশ গায়েনা এবং ভেনিজুয়েলার সীমান্ত সংঘাতের সময়কালে ইংরেজ সরকার এসব বিবরণ স্পেনীয় দলিল দস্তাবেজের মহাফেজখানা থেকে উদ্ধার করেছিল।

 

কিন্তু এগুলোতে আমি সন্তুষ্ট হলাম না। আমার উদ্দেশ্য ছিল ঐ এলাকার সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন গল্প সম্পর্কে জেনে তা নিয়ে লেখা সাজানো। বস্তুত লেখার উপাদানগুলোকে সুন্দরভাবে সাজানোর এই একটি উপায়ই আমার জানা ছিল। এভাবে লেখা সাজানোটা বেশ জটিল একটা  কাজ। নথিপত্র ঘেঁটে পাঁচ ছয় প্রকারের ভিন্ন ভিন্ন দলিল দস্তাবেজ নিরুপণ করে হয়তো এক প্যারা লেখা যেত। এভাবে যে বই কয়েক মাসের মধ্যে লিখে ফেলতে পারবো ভেবেছিলাম, তা শেষ করতে আমার পাক্কা দু’বছর লেগে গেল।

 

নথিপত্র ঘেঁটে লিখতে গিয়ে আমাকে পুরনো ইতিহাস নতুন করে আবিষ্কার করতে হল। লেখার জন্য  গবেষণা করতে গিয়ে আমি খুঁজে পেলাম সাগর আর নদী চষে ফেলা আদিবাসী মানুষদের যারা নিজেদের জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। গত কয়েক শতাব্দী ধরে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার জন্য যে সব দক্ষতা প্রয়োজন তার সবই তাদের নখদর্পনে ছিল। কিন্তু নবাগত মানুষের আধুনিকতার সামনে তারা ছিল একেবারেই অসহায়। এর সুযোগ নিয়ে পরবর্তী দুশো বছরে আধুনিক মানুষেরা এই আদিবাসীদের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন করে দেয়। এ সময়টাতে আদিবাসীদের  মাদক, মিশনারিদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর মৃত্যুর সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে। মানুষের তৈরি আধুনিক বন্য জীবনের হিংস্রতায় ক্ষতবিক্ষত এইসব মানুষগুলিকে এরপর দাস বানানো হয়েছে, তাদের রক্তাক্ত করে ফসল আবাদের জমি গড়ে তোলা হয়েছে। আর এভাবেই আঠারো শতকের শেষ ভাগে এখানে স্পেনীয়দের নব্য শহরের সূচনা ঘটে।

 

স্কুলে আমাদেরকে যে ইতিহাস পড়তে হয়েছে সেখানে দাসপ্রথাকে শুধুই একটি শব্দ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একদিন স্কুলের উঠানে ওয়ার্ম স্যারের ক্লাসে এই ব্যাপারে কিছু আলোচনা হবার পর আমি মনে মনে দাসপ্রথার একটি অর্থ দাঁড় করিয়েছিলাম। শহরের উত্তর প্রান্তের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে আমি নিজে নিজেই ভেবে নিয়েছিলাম যে একসময় ঐ পাহাড়গুলোর দিকে আমার মতোই কিছু মানুষ তাকিয়ে থাকতো। সেই মানুষগুলো ছিল পরাধীন। স্বাধীনতা বলতে তাদের কিছু ছিল না, এটা চিন্তা করতেও তখন আমার খুব কষ্ট লাগত।

 

এবার এই নথিপত্রগুলো বহু বছর আগে স্কুল চত্বরে দাঁড়িয়ে আমার যে অনুভূতি হয়েছিল তাকে বাস্তবে রূপ দিল। দাস যুগের ফসল আবাদী এলাকায় পরিশ্রমরত পরাধীন মানুষগুলোর জীবনচিত্র এবার আমার সামনে একেবারে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। আমার স্কুলের খুব কাছেই এমন একটি আবাদী এলাকা ছিল। ওখানকার একটা রাস্তা ওই এলাকার বৃটিশ বংশদ্ভূত ফরাসি মালিকের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। সেই আঠারো শতক থেকে আজ পর্যন্ত রাস্তাটা ঐ নামেই পরিচিত। নথিপত্রগুলোতে প্রায়ই শহরের কারাগারের বর্ণনা পেতাম। ঐ কারগারের ফরাসি দাসপ্রধান এবং তার দাস সহকারির প্রধান কাজ ছিল নানা উপায়ে বন্দী দাস-দাসীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। কারাগারের কিছু বিশেষ কুঠুরির কথা জেনে আমি শিউরে উঠতে বাধ্য হলাম। ছাদের ঠিক নিচে এই কুঠুরিগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে তা সারাক্ষণই আগুনের মত গরম থাকে। জাদুবিদ্যা ব্যবহার করার অপরাধে সন্দেহভাজন দাসদের এখানে আটকে রাখা হত।

 

দলিল গুলো থেকে আমি এক অস্বাভাবিক খুনের মামলা সম্পর্কে জানতে পারলাম। মামলাটি, কোন এক স্বাধীন শেতাঙ্গ মহিলার প্রেমে পাগল হয়ে এক কালো দাস অন্য এক দাসকে খুন করেছে এই সংক্রান্ত। এই ঘটনা থেকে আমি ১৭৯০ সালের শহরের রাস্তায় দাসদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেয়ে গেলাম। সেই সময়কার নগর জীবন, রাস্তাঘাটের মানুষজন সম্পর্কে গবেষণা করে একটা বিষয় বুঝতে পারলাম যে, ছেলেবেলায় বহিরাগত হিসেবে বাস করে আমি যে সমাজকে পর্যবেক্ষণ করেছি তার সাথে দেড়শ বছর আগের সমাজ ব্যবস্থার তেমন কোন পার্থক্য নেই। নতুন এই শহরের পুরাতন পথঘাট, জনজীবনের ইতিহাস জানতে পারাটা আমার জন্য বিরল এক অভিজ্ঞতা। দলিলপত্র ঘাটতে ঘাটতে ঔপনিবেশিক কলোনির ইতিহাস সম্বন্ধে যে জ্ঞান আমি অর্জন করলাম তার কাছে এ সম্পর্কিত আমার আগের জ্ঞানকে অতি সাধারণ, অগোছালো আর অপ্রয়োজনীয় অতীত স্মৃতি বলে মনে হল। (চলবে)



ষষ্ঠ পর্ব

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading