রক্তপুকুরে ফাঁদ ।। মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

ভবিষ্যতে যা ঘটবেঃ

দেশের কোনো এক মফস্বলের মহাসড়ক। এন্ট্রি পয়েন্ট। শহরের সব যানবাহন ঢোকার একমাত্র মুখ। নগরে ঢোকার মুখে বাসযাত্রীরা যদি খেয়াল করে তবে দেখতে পাবে প্রকান্ড মেহগনি গাছের নিচে, যেখানে মোড়টা একটু বাঁক নিয়ে ঢুকে গেছে শহরের পেটের ভেতর, ঠিক সেখানে দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি সাধারণ নয়, যেন কিছু একটা ঘটবে বলে অপেক্ষায় আছে। অনেকটা ভাইভা পরীক্ষার আগে যেমন আঁটোসাঁটোভাব দেখা যায় তেমন অবয়ব ফুটে আছে তাদের শরীরে। বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত চারপাশে, আছে পথের পাহারাদার মেহগনি, জারুল গাছ। নিঃসন্দেহে এমন মনোরম জায়গায়  কোনো জাঁদরেল শিক্ষক তাদের ফেল করাতে আসবেন না। তবে, মানুষ এতকিছু খেয়াল করে না। এমনকি গাছের উপরে কিংবা তার থেকে একটু দূরে যে বিলুপ্তপ্রায় শকুন উড়ে বেড়ায় তাও তাদের নজরে আসে না। ছেলে দুজনের ভেতর একজন, কখনো দু’জনেই আড়চোখে শকুনের দলকে পর্যবেক্ষণ করে। তাদের আড়ষ্টতার পেছনে, এই উড়ন্ত অভিযাত্রীর একটা ভূমিকা থাকতে পারে, এটা বলে দেয়া গেলেও পুরোপুরিভাবে আচরণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না।

ছেলেরা সমবয়সী নয়। একজনের বয়স পনের কিংবা ষোল, আরেকজন তার চাইতে বছর দুয়েকের ছোট। খুব কাছে গিয়ে বসলে তাদের চেহারায় এক ধরনের বিষণœতা দেখা যাবে। তবে এটিও একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয় দেখে মানুষের খুব একটা পাত্তা পায় না তারা ।

বয়সে বড় ছেলেটি বলে, ‘জায়গাটা শান্ত হইসে। আমরা বরং ভেতরে যাই।’

‘উঁহু, আপনার অভিজ্ঞতা কম। আমি এই কাজে আপনার আগে আসছি, বুঝলেন। এইটা হাইওয়ে। শান্ত হওনের সুযোগ নাই। যত শান্ত, তত বিপদ।’

‘মানলাম, তোর কথা। কিন্তু তারপরেও আজকে সরকারি কলেজে নাকি দুই দল একসাথে প্রোগ্রাম ফেলাইসে। ঐখানে গেলেই মনে হয়, ভালো। তাছাড়া শেষ কয়দিন একটা খবরও পৌঁছাইতে পারলাম না। ’

ছোটজন হাসে। বলে, ‘এইটা তো একদিক দিয়া ভালো।’

তাদের ভেতর এই ধরনের কথোপকথন হতে থাকে। তারা চলে যায় সরকারি কলেজের পাশে। সেখানে গিয়েও সুবিধা মতো একটা জায়গা খুঁজে নেয়। এখানে তারা ঠিক অপরিচিত নয়। কেউ কেউ তাদের চিনে ফেলে।

বড়জনকে উদ্দেশ্য করে বলে,‘ রাস্তার ছেলেপেলের সাথে মিশা বাদ দাও।’

এ কথা শুনে, ছোটজনের খানিকটা মন খারাপ হলেও অপরজন খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করে না। কখনো কখনো এভাবে সারাদিন প্রতীক্ষায় থাকার পরেও ফল মেলে না। তাদের আড়ালেই হয়ে যায় বেওয়ারিশ দাফন। আবার আচমকাই হয়তো মহল্লার সবচেয়ে সুরক্ষিত গলিতে মুখ থুবড়ে থাকে একটি লাশ। কেউ কথা বলে না। এই দুজন ছুটে যায়। এই ছুটে যাওয়াই তাদের ধ্যান-স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা।

 

অতীতে যা ঘটেছিলঃ

সরু গলিপথ ধরে খবরবাহক ছেলেটি ছুটছে । হালকা পাতলা, জট পাকানো কোকড়া চুলের ছেলেটির পরনে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের জার্সি, অনেকদিনের ব্যবহারে মলিন। মফস্বলের ছোট গলি, দুদিক থেকে চলমান রিকশার ফাঁক গলে এগিয়ে যাচ্ছে সে। ছেলেটির পা যেন চলন্ত সাইকেল । দু একজন ধাক্কা খাচ্ছে। ধমক দেয়ার জন্য মাথা তুলে ছেলেটিকে আর দেখতে পাচ্ছে না তারা। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ততক্ষণে সে চলে গেছে দৃষ্টিসীমার বাইরে। এক সময় মাঠের কাছে পৌছে যায় ছেলেটি। একটি ট্রাক তার শরীরের কাছ দিয়ে হুঁশ করে চলে গেলে ছেলেটি বুঝতে পারে, অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। নাহয় তার খবর পৌছে দেয়ার জন্য, এই মুহূর্তে আশেপাশে পরিচিত কেউ নেই। ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু নিঃসন্দেহে ভয়াবহ, চেহারাও প্লাস্টিকের মতো দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয় ! বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন হয়ে যাওয়াটাও তাই বিচিত্র নয়। এই নগরে জীবিত মানুষদের ঠিকমতো চিনতে পারে না মানুষ, মৃত মানুষদের ঠিকুজি বের করার সময় কোথায় তাদের? ট্রাকটি চলে যাবার পর ছেলেটি গতি কমায়।

দূর থেকে মাঠের বাউন্ডারির আমগাছ, মেহগনি গাছ দেখতে পায় সে। বড় একটি রাস্তা পার হতে হবে তাকে। হাইওয়ে। মাঝে গোলচত্বর। স্টিলের বল আর তিনটি লাঠি দিয়ে বানানো একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে সেখানে। পথঝরনা বানানো হয়েছিল। এখন কেবল রয়েছে বাড়তি অলংকরণের চিহ্ন। প্রাণ নেই স্মৃতিস্তম্ভের। অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল এখানে। দুটো বাস- কেউ কাউকে দেখতে পায়নি, সংঘর্ষ বেঁধেছিল। কত মানুষ মারা গিয়েছিল, মনে করতে পারে না ছেলেটি। সেদিন দুপুরবেলায় দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাস্তায় এসে ছেলেটি দেখতে পেয়েছিল পিচঢালা রাস্তার রঙ বদলে লাল হয়ে গেছে। বাতাসে বাতাসে আহাজারি, চিৎকার। নিহত বাসের খুব কাছেই চলে গিয়েছিল সে। বাসের পেছনের জানালায় একটা হাত রক্তে ভিজে থাকলেও কনুই থেকে বুড়ো আঙুল পর্যন্ত মোটাকালো দাগ চোখ এড়ায়নি তার। চেনা হাত। পাশের বাসার বড় ভাইয়ের। সেইদিন থেকে শুরু। এরপর থেকে  আততায়ী মৃত্যু যেন ছেলেটির আশেপাশে ঘোরে। তাকে ছুটে আসতে দেখলে মহল্লার পরিচিত মানুষজন ভয় পেয়ে যায়। এই বুঝি, কোনও খারাপ সংবাদ নিয়ে আসছে ছেলেটি!

সাগর ভাইয়ের বাবার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে আজও সে যাচ্ছে। ভালো ক্রিকেটার সাগর ভাই। সেই সূত্রে খবরবাহক ছেলেটির সঙ্গে তার ভালো পরিচয়। তাছাড়া ওনার বাবা তাদের স্কুলের প্রিন্সিপাল। জনপ্রিয় শিক্ষক। এমন একজন মানুষের মৃত্যুসংবাদ বহন করে নিতে হচ্ছে দেখে বুক ফেটে কান্না আসে ছেলেটির। যতই কাছে যেতে থাকে মাঠের তত বুকের ভেতর দাবানলের উত্তাপ বাড়ে। ভয়াবহ খবরটির কথা কিভাবে বলবে সে? অবশ্য এতক্ষণে যদি খবর পৌঁছে গিয়ে থাকে, তবে বেঁচে যায় সে। খারাপ খবর বাতাসের আগে ছোটে। স্যার শহরের পরিচিত মুখ। তার খ–বিখ- লাশ পাওয়া গেছে, মাথা আলাদা হয়ে আছে- এমন বীভৎস হত্যাকা- তো শহরে প্রতিদিন ঘটে না।

সাগরকে ক্রিজের ব্যাটিং প্রান্তে দেখতে পায় সে। দুঃসংবাদ তাকেই দিতে হবে। বুঝতে পেরে গতি খানিকটা কমিয়ে আনে। কদিন পর না শহরের আজরাইল উপাধি পেয়ে যায়! ইতিমধ্যে যে কানাঘুষো শুরু হয়েছে, তা জানে ছেলেটি। চাইলেও নিজেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে না। আজ যেমন পারেনি। অথচ তার এভাবে ছুটে আসার কোনো দরকার ছিল না। কেউ না কেউ এই গুরুদায়িত্ব পালন করেই ফেলত।

মাঠে চরম উত্তেজনা। বার বলে সতের রান লাগবে। দলের সেরা ব্যাটসম্যান সাগর। খুব সহজেই জিতে যাওয়ার কথা। ছেলেটি মাঠে ঢুকতে গিয়ে কোচকে দেখে থেমে যায়। লাল রঙ এর ট্র্যাকস্যুট পরনে। মুখে চিন্তাযুক্ত হাসি। পায়চারি করছেন। ফুটবল কোচদের মতো তিনি বাউন্ডারির পাশে এভাবেই হেঁটে থাকেন। খবরবাহক ছেলেটি তাকে চেনে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে কোচের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কোচ তাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী ব্যাপার? হাপাচ্ছিস কেন? আবার কার খারাপ খবর নিয়ে এলি?’

ছেলেটি জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলে, ‘সাগর ভাইয়ের আব্বার। কারা জানি কুপায় গেছে স্যারকে।’

ছেলেটি এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। অশ্রু নেমে আসে বাধাহীনভাবে। থম মেরে যান কোচ। চারপাশে তাকালেন তিনি। সবাই ম্যাচ নিয়ে ব্যস্ত। ফিল্ডিং দেখে নিচ্ছে সাগর। প্রতিপক্ষ দল রণকৌশলে ঠিক করতে নিচ্ছে। এই ম্যাচ জিতলে প্রথমবারের মতো প্রথম বিভাগে চলে যাবে তার দল । দুই ওভার পর সাগরকে দুঃসংবাদ জানালে খুব বেশি কি খারাপ দেখাবে? ভয়াবহ ঘটনাটির চাইতেও নিজের ম্যাচ জেতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে কোচের কাছে।

আবার তাগাদা দেয়ছেলেটি। কি হইল, ডাকেন না ক্যান ভাইকে। ডাকেন। লাশ এতক্ষণে বাসায় চইলা গেছে তো।

ইতস্তত ভঙ্গিমায় হাত তোলেন কোচ। কার দিকে ঠিক বোঝা যায় না। মাঠ লাগোয়া কৃষ্ণচূড়া গাছের ডাল থেকে একটি শালিক উড়াল দেয়। তোলা হাতের দিকে নজর এলো না সাগরের। বোলার দৌঁড় শুরু করেছে। দৌঁড়াতে শুরু করেছে খবরবাহক ছেলেটিও।

আম্পায়ারকে অতিক্রম করে বোলার । ত্রিশগজ বৃত্তের কাছে চলে এসেছে ছেলেটি । সীমানার কাছে দাঁড়ানো ফিল্ডার চেঁচামেচি শুরু করলেও তাতে কান দেয়ার সময় নেই ছেলেটির। সে চিৎকার দেয়, সাগর ভাইইই…।

শেষ মুহূর্তে চোখ সরিয়ে নেয়ায়  বলের লাইন মিস হয় সাগরের। বলের স্ট্যাম্প খুঁজে নিতে কোনও অসুবিধেই হয় না। কটমট করে খবরবাহকের দিকে তাকায় সাগর। ছেলেটি এবার ‘স্যার’ বলে চিৎকার দিলে প্রতিপক্ষ বোলারদের উল্লাসে চিৎকার মিশে যায়, উল্লাসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে যায় ঘাসবিহীন মাঠে। এক বিন্দু সবুজ নেই। ধুলোমাখা শক্ত মাটিতে ‘স্যার’ শব্দটি এক নিমিষে মাটির ভেতর ডেবে যেতে চাইলে, খবরবাহক ছেলেটি আবার বলে, ‘স্যার…’

শুনতে পায় না সাগর। ‘এটা কী কা- করলি? তীরে এসে তরী ডুবল।’

খবরবাহকের মুখে তালা লেগে যায়। দলের ছেলেরা ডেড বল, ডেড বল বলে চেঁচাচ্ছে।

মাঠ থেকে নামিস না সাগর। ‘এই উজবুকটা কী করতেছে এখানে?’

কুঁকড়ে যায় খবরবাহক।

সাগর আবার বলে, ‘এটা একটা কাজ করলি তুই?’

গ্লাভস ও প্যাড খুলে বাউন্ডারির পাশে দাঁড়ায় সাগর। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। চোখের অশ্রু ঘামের সঙ্গে মিশে যাবার জন্য অপেক্ষা করছে। শেষ বিকেলের সূর্য আকাশে। খোচা খোচা টিনএজ দাড়িতে ঘাম আটকে যাচ্ছে। খানিকটা দূর থেকে সাগরকে দেখে খবরবাহকের মনে হল সেখানে চিকচিক করছে স্বপ্ন। স্বপ্নভঙ্গের দায় তার উপরে বর্তাবে না, জানে সে। তারপরেও বহুবারের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও শব্দ হারিয়ে যায়। অসহায় দৃষ্টিতে কোচের দিকে তাকায়।

কোচের দয়া হয়। কাছে গিয়ে তিনি বললেন, ‘বাড়ি যাও সাগর।’

এতক্ষণে হুঁশ হয় সাগরের। একবার কোচের দিকে তাকাল, একবার ছেলেটির দিকে, একবার বাঁকা চোখে মাঠের দিকে। দশ বলে ষোল রান প্রয়োজন এখন। রুমাল বের করে ঘাম মোছে। হাতে যে পানির বোতল ছিল, তার ছিপি খুলে দূরে ছুড়ে মারে- যেন বাউন্ডারি থেকে ডাইরেক্ট থ্রো করছে উইকেট লক্ষ্য করে। ঢকঢক করে পানি গিলে বোতলটাও ছুড়ে মারে। তারপর জানতে চায়, ‘কী হইছে?’

খবরবাহক ছেলেটি আচমকা দৌঁড় দেয়। তারপর সাগরের মনে হয়, ছেলেটির বিশেষত্বের কথা। সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হয় ছেলেটির আসল নাম তার মনে পড়ছে না, অনেকে তাকে যমদূত বলে ডাকে আড়ালে- কখনো প্রকাশ্যে।

এবার কোচের দিকে তাকিয়ে জানতে চায় সাগর, ‘কি হইছে স্যার?’

‘তুমি বাড়ি যাও, সাগর।’ পূর্বের কথাই প্রতিধ্বনিত হয় কোচের কণ্ঠে।

মুহূর্তেই বোধশূন্য হয়ে যায় সাগর। মাঠের থেকে আবার উল্লাসের শব্দ ভেসে আসে। উইকেট পড়েছে কিনা দেখার জন্য দাঁড়ায় না আর সে। বুঝতে পারে মাঠের খেলা শেষে জীবনের কঠিন কোনো প্রতিপক্ষ তার জন্য অপেক্ষা করছে।

মাঠ পেছন দিকে রেখে রাস্তার দিকে পা বাড়ায় সাগর। কোলাহল মিলিয়ে যায় বাতাসে। ভেতরের শূন্যতা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হয়ে বাতাসে মিশে যেতে থাকে। বড় রাস্তার জ্যাম, গাড়ির হর্ন সাগরের কানের কাছে নিঃশব্দ হয়ে যায়। হাঁটার গতি একবার বাড়ে, একবার কমে। কে হতে পারে? বাবা? নাকি মা? নাকি ছোট ভাই?

বাবার সঙ্গে সাগরের স¤পর্কটা খুব একটা সুখের নয়। শিক্ষক মানুষ। শহরে বেশ নামডাক আছে তাঁর। তাঁরই ছেলে স্কুল পালিয়ে ক্রিকেট খেলে বেড়ায়, টেনেটুনে পাশ করে। কেউ যখন বলে, স্যার তো নিজের ছেলেকেই মানুষ করতে পারছে না তখন সাগরের খারাপ লাগে। সে প্রায় ভাবে, সব ছেড়েছুড়ে বাবার বাধ্য ছেলে হয়ে যাবে। বাবা যে তাকে খুব একটা ধমক দেয়, তাও নয়। তবু কেমন যেন একটা ভয়ে কুঁকড়ে থাকে সাগর। বাবা ছাড়া জীবন চলবে না। মাথার উপর ছাদ তিনি। আশ্রয়Ñ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত; অস্বীকার করার যেমন উপায় নেই, না বোঝার মতো অবুঝ নয় সাগর। বাবার কিছু হয়েছে? ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। সুস্থ মানুষ। বুদ্ধি হবার পর থেকে কোনোদিন ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছে কিনা মনে করতে পারে না। তবে কি অ্যাক্সিডেন্ট? তাই বা হবে কী করে? হেঁটে আসা যাওয়া করেন। বাসা থেকে স্কুল হেঁটে গেলে পনের মিনিটের পথ। এর ভেতরে কোথায়,কিভাবে দুর্ঘটনা ঘটবে?

মা কয়েকদিন ধরে বলছিলেন, শরীর দুর্বল লাগে। আর দুর্বল লাগবে না কেন? ঘরের সমস্ত কাজ একা সামলাতে হয় তাকে। বয়স যে হচ্ছে তা তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই। দুর্বলতার জন্য একটা মানুষ মরে যেতে পারেন? মরে যাওয়ার কথা মাথায় টোকা দেয়া মাত্র সাগরের বুক কেঁপে ওঠে। মনকে প্রবোধ দেয় এই ভেবে, হয়তো মা’র জ্বর এসেছে কিংবা কোথাও যাবেন- তাকে বাসায় রেখে, এজন্য জরুরি তলব।

হেঁটে যেতে যেতে সাগরের মনে হয় শহরটা অচেনা। পার্কের গলিটার মুখে টং দোকান নেই। এলাকার ছেলেপেলের হৈ-হুল্লোড় নেই। কতদিন ধরে এই পথ ধরে আসা যাওয়া করছে এমন কোনোদিন হয়নি। রিকশার জ্যাম লেগে থাকা রাস্তা ফাঁকা হয়ে আছে। মানুষজন কম। চেনা কাউকে চোখে পড়ছে না। অথচ অন্যান্য দিন হেঁটে যাবার সময় মনে হতো শহরজুড়ে কেবল রয়েছে তার পরিচিত মানুষ। সত্যি তবে কিছু একটা হয়েছে? বাড়ি পৌঁছাতে আর মিনিট পাঁচেক লাগবে। উত্তর পেয়ে যাবে তখন। যাই হোক রাস্তায় আজ এতটা নির্জনতা থাকার কথা নয়। তাছাড়া পুরো শহরের শোক প্রকাশের দায় তো নেই। এভাবে সে নিজেকে প্রবোধ দেয়।

দূর থেকে পুকুর লাগোয়া নিজেদের একতলা বাসাটি দেখতে পায়। গতি শ্লথ হয়ে যায় সাগরের। মানুষের ভিড়। রাস্তা বন্ধ। কোনো গাড়ি চলছে না। বাড়ির উলটোদিকে ফুটপাতে খবরবাহক ছেলেটিকে দেখতে পায়। বসে আছে। সমস্ত পৃথিবীর ভর পায়ে এগিয়ে যায় সাগর। থেমে যাবার উপায় নেই। জটলার কাছে পৌঁছে সে নিজ পরিবারের কাউকে দেখতে পায় না। ভাই কোথায়? মা কোথায়? বাবা কোথায়? তাদের বাড়িতে এত অচেনা মানুষের ভিড় কেন?  সমস্ত বিশ্বাস ভেঙে পড়তে চায় তার।

‘আরে, সাগর এসে গেছ! কই ছিলা বাবা এতক্ষণ? ’এলাকার কমিশনার মঈন প্রশ্ন করে।

‘কোথায় ছিলাম?’ বিড়বিড় করে বলে সাগর।

‘কী কইলা?’

ততক্ষণে বাড়িকে কেন্দ্র করে থাকা ভিড় সাগরের চারপাশে এসে জমে গেছে। পাশের ফুটপাতে খবরবাহক ছেলেটি চোখের আড়ালে চলে যায়। ভিড়ের মাঝে নিজ বাসায় উঁকি দিতে চেষ্টা করে সাগর।

সে জানতে চায়,‘ কী হইছে এখানে?’

‘আহারে! কিছু হয় নাই বাবা, কিছু না। এই যে তোমাদের বাসা এইটা। এইখানেই থাকবা তোমরা। তোমার বাপ ছাড়া ভাড়া দিতে পারবা না। জানি। কিন্তু আমি মঈন কমিশনার থাকতে কোনও সমস্যা নাই। তোমার একটা চাকরির ব্যবস্থা কইরা দিমু। বুঝলা? চিন্তা কইরো না।’

লোকটার কথা ধরতে পারে না সাগর। চারপাশের গুঞ্জন জোরালো হয়। একজন বলে, ‘তা তোমার বাবাকে কই দাফন করবা, সিদ্ধান্ত কিন্তু তোমারেই নিতে হবে।’

‘মা কই?’ সাগরের গলা দিয়ে কথা বের হয় কি হয় না- সে পরিচিত মুখ দেখার আশায় ছটফট করে।

কমিশনার গলার স্বর নিচে নামিয়ে ধীরে ধীরে বলে, ‘ শোনো বিচারের কথা বইল না আবার। তোমরা তো হিন্দু। দেখলা যে বিচার চাইতে গেলা তোমার মা কিংবা ছোটভাইরেও কেউ কুপিয়ে গেল। হইতে পারে না? মানুষ খারাপ অনেক, বুঝলা না? বয়স তো হইছে খানিকটা, নাকি?’

‘আমি মনে হয় ভুল জায়গায় আসছি, আপনিও ভুল করতেছেন। বাবার কিছু হয় নাই। আর আমাদের তো নিজেদের বাড়ি। বাবা কত কষ্ট কইরে বানাইল। এইটা তো ভাড়া বাড়ি না। আমাকে ভাড়া দিতে হইব কেন?’

দৌঁড় দেয় সাগর । এ বাড়ির কেউ একজন মারা গেছে। খুন হয়েছে। লোকটির পরিবারের কেউ নেই। খবরবাহক ছেলেটির মতো সাগর ছুটতে চাইলে দেখে সহস্র হাত তার গলা চেপে ধরছে।

‘শালা, মালাউন! বাপ মরছে তাও উলটাসিধা কথা।’

খবরবাহক ছেলেটি তাকে টেনে বের করে আনে। নিঃশ্বাস ফিরে পায় সে।

সাগর যেন স্পষ্ট দেখতে পায়, একতলা বাসাটি ডুবে যাচ্ছে রক্তের পদ্মপুকুরে। নিশ্চয় কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে।

 

বর্তমান যা ঘটছেঃ

‘রাব্বি, বাসাটা কার?’

নিজের মা-বোন কাউকে না পেয়ে, মানুষের ভিড় থেকে ছুটে একটু দূরে চলে এলে, সাগরের ছেলেটার নাম মনে পড়ে। যমদূত নামের আড়ালে, আসল নাম হারিয়েই ফেলেছে সে।

কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না রাব্বি। বাসাটা কার- সে তো সবাই জানে। হুমকি দেয়া মঈন কমিশনার জানে, প্রতিবেশি জানে, পুলিশ জানে। সে নতুন করে কী বলবে?

স্কুল মাঠের কাছে এসে পড়েছে। দেবদারু গাছের ছায়ায় বসে দুজন। সাগর তার করণীয় ঠিক করতে চেষ্টা করে।

অনিশ্চিত কণ্ঠে সাগর বলে, ‘যে মানুষটা মারা গেছে বলতেসে, তার পরিবারের মানুষ খুঁজে বের করতে হবে।’

রাব্বি ধাঁধায় পড়ে যায়। একবার মনে হয়, আসলেই তো ঠিক। স্যারের মতো নিরীহ মানুষকে কে মারবে? স্যার বেঁচে আছে, সে ভুল করেছে। আবার মনে হয়, নিজের চোখ এভাবে মিথ্যা বলতে পারে? তার মনে হয়, শাশ্মান ঘাটে যাবার কথা। সেখানে নিশ্চয় স্যারের লাশ নিয়ে যাওয়া হবে। সাগর যে এভাবে সবকিছু অস্বীকার করে বসে আছে, সেটাও বোঝানোর সাহস পায় না সে। এতদিন ধরে মৃত্যুর খবর বয়ে বেড়াচ্ছে, এমন ঘটনার সামনে পড়েনি কখনো।

কিছুক্ষণ সময় যাবার পর, গাছের ছায়া আরো লম্বা হলে, সাগরের কাঁধে হাত রাখে রাব্বি। বলে,  ‘সাগর ভাই, বাসায় চলেন।’

‘বাসা তো নাই। ঐখানে রক্ত।’

কান্না পায় রাব্বির। তাই সে সাগরকে বলে, ‘আপনি একটু চোখের পানি ফেলেন।’

বয়সে ছোট হলেও, সে জানে অশ্রুপাতের শক্তি অগ্রাহ্য করার নয়, মাঝে মাঝে ভেতরের জমে থাকা বা®প এমনভাবে হালকা করে দেয় যে, জলবর্ষণের কারণও মানুষ ভুলে যেতে সক্ষম হয়।

উলটো হেসে ফেলে সাগর। নামই যার সাগর তার আলাদা কান্নার কী প্রয়োজন? এমন ভাবনা তার মাথায় আসে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। সে বলে, ‘মা কোথায়, মা?’

‘চলেন যাই, মা’র কাছে নিয়া যাই।’

‘তুই বড় স্বার্থপর হয়েছিস। একটা মানুষ মরে গেল, কেউ জানে না সে কে। আগে, লোকটির পরিবারকে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর অন্যসব কাজ।’

রাব্বি ভাবে, নিজেকে খোঁজার মতো জটিল কাজের পরিপক্কতা সে এতদিনেও অর্জন করতে পারেনি। কেউ কি পারে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading