যেখানে ঝরা পাতা নিজের শব্দে বন | হাসান রোবায়েত | পর্ব ১

০১

কখনো এমন হয়—অনেক কালের সেই নিভে যাওয়া তারার থেকে আলো আসে। তখন পৃথিবীর ধুলা ও ক্রমলীন আলেয়ায় ধীরে ধীরে জেগে ওঠে মাধুডাঙা। তার পানির কিনার ঘেঁষে বৌ-পুঁটিদের ঝাঁক। এখানে প্রায়ই সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা হাঁস নলখাগড়ার বনে ডিম দেয়। পাকুড়ের গাছ বেয়ে পুরনো বিলের খাদ। ট্যাংরা, শিং, কই আর সাপের মতো হিলহিলে কুচা মাছ ঘাঁই মারে। অনেক রাতে যদি কেউ সাইকেল চালিয়ে দশ নম্বর বাঁধ অথবা হরিখালির দিকে যায়, সেও শুনতে পাবে মণ্ডলপাড়ায় কারো না কারো শিশু কাঁদছে। উঠানে ভেড়ার পাল। পুবদিকে বিস্তীর্ণতার ফাঁকা ঢেউ। মাঝে মাঝে বিরাট শিমুল গাছ। চিলের বাসায় ছানাটির নতুন পাখার হাওয়া। দশ নাম্বার থেকে সোজা পশ্চিম দিকের যে কাঁচা রাস্তা, দুই ধারে প্রাচীন শূন্যতার হু হু বাতাস নিয়ে চলমান সেই রাস্তাই হিন্দুপাড়ার ভিটা, মণ্ডলপাড়ার বাঁশবন, কবরের আধো ভাঙা খাদ, আটাশরির ঘন ঝোপ হয়ে সোজা তালতলা। পশ্চিমের হরিখালি, সাতবিল আর দও পার হয়ে আরেকটা রাস্তা। সরলিয়ার নদীভাঙা মানুষেরা যেখানে গড়ে তুলেছে ‘হঠাৎপাড়া’ তার মধ্য দিয়ে আরেকটা রাস্তা এসে চলে গেছে দুই দিক। বায়ে কাচারি বাজার ডানে মুন্সীপাড়া। ঊর্ধ্বের অনেক দূর থেকে মনে হবে—যোনীর আকার। তারই সুক্ষ্মকোণের ফাঁকে তালতলা। তালতলা মানে শুধু একটা গ্রাম না। যদিও বহুকাল আগের ছাতিম আর পিতরাজ গাছটির মাঝখানে এক বিঘৎ প্রস্থের সিমেন্টের চৌকোনা বেদী এই স্থানটিকে আলাদা মহত্ত্ব দিয়েছে তবুও তালতলা পুরাযুগের মহামৃত্যু পেরিয়ে আজকের গ্রাম। 

 

আদিতে এখানে ছিল তালবন। রাতে, দূর থেকে কোনো একলা পথিক অথবা গরুর গাড়িসমেত অন্য গাঁয়ের যাত্রিরা খুব সহজে পার হতে পারতো না ঘন জঙ্গলের এই তালবন। নানান রকম বাঁধা আসতো ছাতিম আর তালগাছ থেকে। এখানে মৃত মাছ আচমকাই জীবন্ত হয়ে লাফিয়ে উঠতো। গরুরা কী সব দেখতে পেয়ে থমকে যেত। তখন ছইয়ের ভেতরে থাকা মূর্ছা যেত নতুন বউ। শুধু কি নতুন মানুষ! যারা অনেক বার এই পথ পার হয়েছে তারাও দেখতে পেত এমন সব আলামত এতদিন গল্প শুনেছে যাদের। এমন জাদুবাস্তবতায় ভরা ছিল তালতলা। এসব গা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ঘটনার থেকে রেহাই পেতে গাঁয়ের কেউ কেউ এর একটা বিহিত করতে চাইলে অনেকেই বাধা দেয়। অজানা আতঙ্ক ভর করে। এর আগেও এখানকার তালগাছ কাটতে গিয়ে বেশ কয়েকজন রক্তবমি করে মারা গেছে। তালগাছগুলো যেন সাক্ষাৎ জ্বিন। গ্রামের হিন্দুরা পুজা দেয় নিয়মিত। তাদের বিশ্বাস এখানে কালি থাকেন। ঢালাই করা চৌকোনা বেদিটাতে [কালির থান] দুধ, সিঁদুর, জগতবা ফুল, মানত করা জীবন্ত কবুতরের বাচ্চা দিয়ে পুজা দেয় তারা। ছাতিম আর পিতরাজের উন্নাসিক মূলে সিঁদুরের ছড়িয়ে দেয়, বেঁধে দেয় সুতা। কিন্তু মুসাফিদের মুসিবৎ কমে না কিছুতেই। একবার সিদ্ধান্ত হলো তালগাছ কেটে ফেলা হবে। সাহসে কুলায় না কারো। অন্যগ্রামের কাঠুরেরাও কলিজা ছোট করে ফেলে। অনেক দূরের একজন কাটতে রাজি হলো। পরিবারের সবাই ভয় দেখাল, সতর্ক করলো, কিন্তু কে শোনে কার কথা। তার মাথায় তখন করাত আর কুড়ালের হাওয়া উড়ে বেড়াচ্ছে। প্রথম দুই দিন মহাসমারোহে তালগাছ কাটার আয়োজন চললো। এ সময় রাতে স্বপ্নে দেখলো কে একজন গাছ কাটতে নিষেধ করছে। তবুও সাবধান হয় না সে। তারপরের দিন দুপুরে বাড়ি থেকে খবর এলো তার পরিবারের বড় ছেলে রক্তবমি করছে। কিছুতেই সারে না। এক এক করে বউ মরলো, ছেলে মরলো। কিছুদিন পর খবর এলো সেই কাঠুরেও রক্তবমি করতে করতে ধরাধাম ত্যাগ করেছে। এই কিংবদন্তীর পরে আর কারো সাহস হয় নি তালগাছগুলো কাটার। সেই থেকেই তালতলা। 

 

এই মহামৃত্যুর আগে এ গ্রামের নাম কী ছিল কেউ জানে না। হয়তো মধুপুর অথবা শুধুই তেকানী। কে জানে! যে মানুষগুলো জানতে পারতো আজ তারা গভীর মাটির এক কোনে আতাগাছটির পাতায়, মাকাল ফলের রঙে খেলা করা সূর্যের আলোর সাথে কথা বলে। অনেকেই শ্মশানের উল্টানো কলসির পাশে ফুটে আছে বুনোঘাস হয়ে। তারপর, হেমন্তের গোল গোল হাওয়া যেমন পৃথিবীর মাঠ পার হয়ে দূরের কোনো এক ঘরে মুমূর্ষু কুপির উপর হঠাৎ আছড়ে পড়ে নিভিয়ে দেয় কেরোসিনের আলো তেমনই একদিন এ গ্রামের সমস্ত তালগাছ অকস্মাৎ ভেসে যায়। তালতলা নামটাই শুধু থেকে গেছে পুরনো কাঁশার মতো। 

 

এই গ্রামে শ দুয়েক পরিবারের বসবাস। তালতলার দক্ষিণে মুন্সীপাড়া। উত্তরে বামেশ ডাক্তার, মৃণাল ডাক্তারদের বাড়ি। একসারি হিন্দু পরিবার। সারিটির মাঝে মাঝে মুসলিম পরিবারও আছে। কাচারি যাবার রাস্তায় একটা মসজিদ। তালতলার পশ্চিমে হঠাৎপাড়া। যখন কামারজানির ব্রিজ ছিল না। শুধু চাপালিশ গাছ আর দওপাড়ার উঁচু ঢিবির উপর চারপাশ ঘেঁষে কয়েকটা নারকেল গাছ আর বাঁশ ঝাড়, তখনও হঠাৎপাড়া হয় নি। সরু একটা মাটির রাস্তা সোনাখালির উপর দিয়ে চলে গেছে হরিখালির দিকে। ওপারে যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নৌকা। ডানেই সাতবিল, বায়ে কয়ার বিল। তালতলার পুবে ধানী জমি, একটু পরেই কোমর পর্যন্ত নামা। সারাবছরই পানি জমে থাকে। শালুক আর নানান জলজ উদ্ভিদে ভরে থাকা শ্যাওলায় ছাওয়া পানি।  

 

এই গ্রামেই মালেক সরকার [ভাইদের সবার ছোট] আর তার দুই ভাই শোল্লের [সরলিয়া] যমুনায় তাদের বাপদাদার ভিটা, জমিজিরাত, আমজামনিমনারিকেল, ঝাউবন, শত বছরের প্রাচীন বৃক্ষ, শালের থাম, দোনলা বন্দুক, কলের গান, বসন্তের ধুলায় ওড়া পায়ে হাঁটা পথ সব কিছু ভাসিয়ে দিয়ে চলে আসে প্রায় কপর্দকহীন। কোনো এক ভাদ্রের রাতে এ নদী বহুদূরের স্রোতে ডুবিয়ে দিয়েছিল বন্ধন। আজন্ম একসাথে ছিল যারা, সেদিন কে কোথায় চলে গেল তার হয়তো তথ্যমূলক স্মৃতি ছিল, কিন্তু দিনশেষে দুই একটা ঈদ আর কারো মৃত্যু ও বিবাহের আয়োজন ছাড়া সেসব তথ্যের কোনো প্রয়োজনিয়তাই থাকবে না। দিনাজপুর, গাইবান্ধা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, লালমনিরহাট, ঢাকা আরো আরো জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো তারা। এ গ্রামে পূর্বে কোনো জমিজিরাত ছিল না তাদের।  হাফিজ মহুরির থেকে তেইশ হাজার কত যেন টাকায় কেনা ৬৪ শতাংশ জমিতেই মাত্র কয়েকজন থেকে গেলো তালতলায়।  

 

মালেক সরকারের ষষ্ঠ সন্তাল আমার আব্বু। আব্বুর শৈশব-কৈশোর নিয়ে নানান রকম গল্প শুনেছি। তার জন্ম সরলিয়ায়র পুরনো বাড়িতে। তিন মেয়ের পর কালো নাদুসনুদুস আমার পিতার জন্মে নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিল সবাই। শিউলি ফুপু (আব্বুর পিঠাপিঠি বড় বোন) সবচে বেশি, আদর করেই ‘নাডু’ নামে ডাকতো ছোট ভাইকে। পড়াশোনার চেয়ে গরু, মহিষ, কবুতরই ভালো লাগতো তার। কে যেন বলেছিল—‘তুই যদি ম্যাট্টিক পাশ করিস তালে গরুও মুখোত টোপা দিয়ে ঘাস খাবার পাবি’। এই দ্বৈরথের ফলাফল কী হয়েছিল আমি জানি না। তবে ঢাকা হোমিওপ্যাথিক কলেজ থেকে পাশ করেছিল আব্বু। সে কী—‘যার নাই কোনো গতি সেই পড়ে হোমিওপ্যাথি’ এমন লোককথার প্রমাণ হিসাবে! তাও জানি না আমি। 

 

দাদুর বাড়ি থেকে এক চিৎকার পরিমাণ উত্তরে মণ্ডলপাড়া। গ্রামের সবচেয়ে উঁচু ভিটা। আটাশির বন্যায় যখন পাকুল্যার বাঁধ ভেঙে এ গ্রামেও যমুনা এসেছিল, তখনো মণ্ডলপাড়া বিস্তীর্ণ পানির মাথায় জেগে ছিল উড্ডীন ভূভাগ হয়ে। যেন মহাজলধির কপালে এক টুকরা সবুজ প্রদীপ। শুধু কি মানুষ আর গরু-ভেড়া নানান পদের সাপ ও সরিসৃপ জায়গা করে নিয়েছিল এখানে। সেবারই জাত গোমার ছোবলে মারা যায় ধীরেনের বাবা। এই ঘটনার পর তার মাথার চুল টানলে উঠে আসতো গোছায় গোছায়। যে গল্প বহুদিন থেকে যাবে এ গ্রামের নলখাগড়ার ঝারে। পেছনে নির্বোধ বাঁশবন। ছোট ছোট মালিকানা নিয়ে একই পরিবারের ভাগীরা অনেক কাল ধরে ভোগ করে আসছে যাকে। যে কারোর, বিশেষ করে ছেলেদের, হাতে টান পড়লেই আদিম যুগের মতো অন্ধকার থেকে লুকিয়ে কাটা বাঁশ বিক্রি করে দেয় তারা। কেউই জানে না। শুধু কয়েকটা বকের বাসা ভেঙে যায়। সেদিনের রান্নায় যোগ হয় নতুন মাংসের স্বাদ। কিছুদিন পরেই আবার নিরেট শূন্যস্থান পুরে যায়। এইসব বাঁশঝাড়েই কবর হয় তাদের। বয়সী কবরের খোঁজ নেয় না কেউই। বুনো গুল্মের লকলকে ছায়ায়, পচে যাওয়া পাতা আর বৃষ্টির ঢালে একদিন সব কবরই হারিয়ে যায়। জায়গা চেনানোর সময় কেউ হয়তো তার সন্তানকে বলে—’উ যে যেটি তোর দাদার গোর ওটি থেকে শিমুল গাছ পন্ত হামাগোরে ভিটে’। এখানে প্রায় সবই ছোট ছোট ঘর। একটু অবস্থাপন্নের বাড়ি টিনের, বাকিদের বাঁশের বেড়া। আরও গরিবের ঘর খড়ের। একই ভাগি-দাদিদের ঘর সাধারণত এক সার ধরে। শোওয়ার ঘরের সারি যেমন আলাদা তেমনি রান্না ঘরেরও ( ঘর না বলে ছাপড়াই বলা যায়। চারটা খুঁটির উপর টিন অথবা খড়ের ছাউনি।) অন্যদের ঘর হয়তো কোনো সারির সাথেই মেলে না। তারার খুলি থেকে শুরু হয়ে ফিরোজা, নান্টু, মুন্টু, মমিন এভাবে এক এক করে দুদু মণ্ডলের বাড়ি গিয়ে শেষ হয় মণ্ডলপাড়া। এদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী দুদু মণ্ডল। পাকা বাড়ি। বারান্দায় বসার জন্য শান বাঁধানো বেঞ্চি আছে এক পাশে। বাইরের উঠানে একটা পাকা কবর যেকোনো পথিকের নজরে পড়ে। মণ্ডলপাড়ার আজিজার মণ্ডলের তৃতীয় কন্যাই আমার মা।     

 

এখানে রাত অনুতপ্তের মতো অন্ধকার নিয়ে ফিরে আসে। সেখানে ন্যাম্পুর আলোয় ঝিরঝির করে কাঁপতে থাকে বউদের হাঁসিকান্নার গল্প। বাচ্চাদের কোমরে ও ড্যানায় কালো কারের তাবিজ। পুরুষেরা সবল কৃষক। মাঠে ও বিলেই সারাদিন কেটে যায় তাদের। সন্ধ্যার পরে কেউ কেউ কাচের বোতলে বাঁধা রশি আঙুলে পেঁচিয়ে কেরোসিন তেল আনতে চলে যায় রঞ্জুর দোকানে। গ্রামের জমে থাকা গল্প আর হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠে তিনমাথার মোড়।


চলবে

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: