home আলাপচারিতা হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকার (শেষ পর্ব) ।। অনুবাদ: পৌলমী সরকার

হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকার (শেষ পর্ব) ।। অনুবাদ: পৌলমী সরকার

“আজকাল লেখার কাজে বর্ণনার একটা বড় ভূমিকা থাকে। আমি তত্ত্বকথায় বিশেষ বিশ্বাসী নই, শব্দের ব্যবহার নিয়েও নই। আমার কাছে যেটা সব থেকে গুরুত্ব পায় তা হলো বর্ণনাটি যথাযথ কীনা।”


প্রশ্ন: আপনি আগে একবার ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রোনিকল’ এর কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আপনি আপনার বাবাকে নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহী। ওনার এবং ওনার পুরো প্রজন্মের সাথেই যা যা ঘটেছে – কিন্তু আপনার গল্পে কোন ‘পিতৃ চরিত্র’ নেই, সত্যি কথা বলতে আপনার কোন গল্পেই থাকে না। তাহলে আগ্রহটা কি সাময়িক?

মুরাকামি: আমার প্রায় সব উপন্যাসই প্রথম পুরুষে লেখা। আমার কেন্দ্রীয় চরিত্রটির প্রধান কাজ হলো তার চারপাশে ঘটা প্রতিটা জিনিস লক্ষ্য করা। যা তার দেখা উচিত বা যা তার দেখলে ভাল হয় – তার সবই সে সঠিক সময়ে লক্ষ্য করে। যদি আমি এভাবে বলি তাহলে সে ‘The Great Gatsby’ এর ‘Nick Carraway’ – এর কথা মনে করাবে। সে নিরপেক্ষ এবং তার এই নিরপেক্ষতা পালনের জন্য তাকে অবশ্যই যে কোন প্রকার আত্নীয়তা সম্পর্ক বা পারিবারিক বন্ধনের ঊর্ধ্বে বিরাজ করতে হবে।

আমার এই কথা প্রসঙ্গে আসতে পারে যে পরিবার সব সময়ই জাপানি সাহিত্যের বেশ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। আমি আমার প্রধান চরিত্রকে একজন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং একান্ত স্বতন্ত্র এক ব্যক্তিত্বরূপে দেখতে চেয়েছি। একজন শহুরে বাসিন্দা হিসাবেও এক্ষেত্রে তার কিছু ভূমিকা থাকে। সে এমন একজন মানুষ যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিনিময়ে স্বাধীনতা এবং একাকীত্ব খোঁজে।

প্রশ্ন: আপনার শেষ গল্প সংকলনের ‘সুপার ফ্রগ সেইভস টোকিও’-টা যখন পড়ছিলাম, যেখানে এক দানবীয় পোকা টোকিও শহরের নিচ থেকে সবকিছু ধ্বংস করে দেবার ভয় দেখাচ্ছিলো, তখন আমি ‘মাঙ্গা’ বা পুরনো দিনের জাপানি রাক্ষসের সিনেমার কথাই ভাবছিলাম মনে মনে। তারপর একটা রাক্ষুসে মাছকে নিয়ে যে পৌরানিক গল্প আছে যেখানে মাছটি টোকিও উপসাগরের ধারে ঘুমিয়ে থাকে এবং প্রতি পঞ্চাশ বছরে একবার ঘুম ভেঙে ভূমিকম্প ঘটায় এদের মধ্যে থেকেই কি আপনার গল্পের ভাবনা এসেছিল?

মুরাকামি: আমি তা মনে করি না। আমি মাঙ্গা কমিকসের খুব একটা ভক্ত ছিলাম না। তাই এদের থেকে কোনভাবেই অনুপ্রাণিত নই আমি।

প্রশ্ন: জাপানি রূপকথা সম্পর্কে কিছু বলুন।

মুরাকামি: যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন আমাকে অনেক জাপানি রূপকথা আর পুরনো দিনের গল্প শোনানো হতো। সেই গল্পগুলিই বড় হয়ে জটিল হয়ে যায়। সেই দানব ব্যাঙটির ভাবনা হয়তো আমার মনে এসেছিল সেরকমই কোন গল্পের স্রোত থেকে যেগুলোর সাথে শৈশবে আমার পরিচয় ছিলো। আপনাদের যেমন আমেরিকান লোককথার সম্ভার আছে, জার্মানদের আছে, রাশানদের আছে। তবে কোথাও একটা আমাদের সবারই পারস্পরিক লোকগাথা তৈরি হয় যা মূলত ‘দ্য লিটল প্রিন্স’, ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ অথবা ‘দ্য বিটলস’-কে ঘিরে।

প্রশ্ন: বর্তমান লোকগাথা?

মুরাকামি: আজকাল লেখার কাজে বর্ণনার একটা বড় ভূমিকা থাকে। আমি তত্ত্বকথায় বিশেষ বিশ্বাসী নই, শব্দের ব্যবহার নিয়েও নই। আমার কাছে যেটা সব থেকে গুরুত্ব পায় তা হলো বর্ণনাটি যথাযথ কীনা। ইন্টারনেটের বদৌলতে এখন আমাদের লোকগাথার ধরণটাই পাল্টে গেছে। এটি রূপকাশ্রয়ী। ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ ছবিটি আমি দেখেছিলাম – এটি সমসাময়িক সময়ের লোকগাথা। তবে সবাই এখানে ছবিটিকে একঘেয়ে মনে করেছে।

প্রশ্ন: হায়ায়ো মিয়াজাকির কমিক্যাল মুভি ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ দেখেছেন? আমি আপনার বইয়ের সাথে অনেক মিল পেয়েছি। সেখানে তিনিও লোকগাথাকে সমসাময়িকতার আঙ্গিকে নতুন মোড়কে পরিবেশন করেছেন দর্শকের সামনে। ছবিটি আপনার কেমন লেগেছে?

মুরাকামি: না। কার্টুন ছবি আমি বিশেষ একটা পছন্দ করি না। কেবল একটুখানি দেখেছিলাম ছবিটির, তবে এরকম ছবি আমার ভাল লাগে না। এই বিষয়গুলোতেও আমি একেবারেই আগ্রহী নই। যখন আমি লিখি, তখন যে ছবি আমি লেখার জন্য পাই তা যথেষ্টই সুগঠিত।

প্রশ্ন: আপনি প্রায়ই কি সিনেমা দেখতে যান?

মুরাকামি: অবশ্যই। প্রায়ই। ফিনল্যান্ডের একজন পরিচালক ‘Aki Kaurismäki’ এর কাজ ভীষণ প্রিয়। ওনার ছবির প্রত্যেককেই খুব ভালো লাগে।


“আমার গল্প অনেক বাস্তবঘেঁষা, সমসাময়িক এবং আধুনিকোত্তর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এটিকে যাত্রাপালার মঞ্চসজ্জার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছেদ, দেয়ালে রাখা বই, আলমারি, সবই সাজানো; সবই মিথ্যা।”


প্রশ্ন: আপনি আগে বলেছিলেন যে, হাস্যরস অপরিবর্তনীয়। অন্যভাবেও কি এটি উপকারী?

মুরাকামি: আমি আমার পাঠকদের কখনো কখনো হাসাতেও চাই। জাপানের অনেক পাঠকই আমার লেখা ট্রেনে যেতে যেতেও পড়েন। সেজন্যই আমি বড় উপন্যাসগুলিকে দুটি খণ্ডে প্রকাশ করি। একটি খণ্ডে প্রকাশ পেলে ওই পাঠকদের জন্য তা যথেষ্টই ভারী হয়ে যেতো। অনেকে আমাকে চিঠি লেখেন। বলেন যে ট্রেনে তারা আমার বই পড়ে ট্রেনেই হেসে ফেলেন! তাদের জন্য সেটা অসম্মানজনক। এই চিঠিগুলিই আমি বেশি পছন্দ করি। আমি জানি যে তারা আমার বই পড়ে হাসেন। এটা ভালো ব্যাপার। আমি প্রতি দশপাতা পরেই আমার পাঠকদের হাসাতে চাই।

প্রশ্ন: এটিকে কি আপনার গোপন রহস্য বলা যায়?

মুরাকামি: সেভাবে কখনো হিসাব করি না। কিন্তু যদি সেভাবে ভাবতে পারতাম, তাহলে মন্দ হতো না। যখন কলেজে পড়তাম, তখন Kurt Vonnegut এবং Richard Brautigan এর লেখা পড়তে ভালবাসতাম। তাদের লেখায় হাস্যরস থাকতো। আবার তাদের লেখার বিষয়বস্তু ছিলো রাশভারী। আমি এই ধরণের বই পড়তে বেশি ভালবাসি। প্রথম যখন Vonnegut এবং Brautigan এর লেখা পড়ি, তখন রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম! তিনটি বই-ই এমন ছিলো। অনেকটা নতুন এক জগৎ আবিষ্কারের অনুভূতি।

প্রশ্ন: আপনি কখনো এরকম লেখা লেখার জন্য উদ্ধুদ্ধ হননি?

মুরাকামি: আমি মনে করি এই জগৎটা নিজেই একটা হাস্যরসের উৎস। বিশেষ করে এই শহুরে জীবন। ৫০টি টিভি চ্যানেল আর সরকারী স্তরে হাস্যকর কিছু ব্যক্তিত্ব – সবটাই হাস্যকর। আমি গম্ভীরভাবে বিষয়টি গ্রহণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু যত বেশি গম্ভীরভাবে বিষয়টা ভাবার চেষ্টা করি, তত বেশি হাসি পায়। আমরা ১৯৬৮-৬৯ এই সময়ে খুব গম্ভীর থাকতাম। তখন আমার ১৯ বছর বয়স। সময়টাও বেশ গম্ভীর, রাশভারী ছিলো যেন – সবাই ছিলেন খুব আদর্শবাদী।

প্রশ্ন: আপনার নরওয়েজিয়ান উড বইটিও সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা এবং সব বইয়ের মধ্যে ওটাইতেই সম্ভবত সবচেয়ে কম হাস্যরসের উপস্থিতি। ঠিক কীনা?

মুরাকামি: সেভাবে দেখতে গেলে বলা যায় যে, আমাদের প্রজন্মটাই ছিলো গম্ভীর, রাশভারী। কিন্তু সেই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে মনে হয় কী ছেলেমানুষি ছিলো তখন! এক অস্থির সময়। আমরা, আমাদের প্রজন্ম তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি বলে আমার মনে হয়।

প্রশ্ন: কল্পবাস্তবতার একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কল্পিত মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে গুরুত্ব না দেয়া। কিন্তু আপনি আপনার লেখায় প্রায়ই সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন। আপনার চরিত্ররা প্রায়ই অবাস্তব কল্পনার সীমারেখায় দাঁড়িয়ে কথা বলে। এর পেছনে কি বিশেষ কোন পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য থাকে?

মুরাকামি: এটি বেশ মজার প্রশ্ন। এ্ই ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে আমার ভাল লাগে। আসলে এটা আমার খুব সৎ পর্যবেক্ষণ যে এই পৃথিবী কতটা আশ্চর্যের। লেখা চলাকালীন সময়ে আমি যতরকম অভিজ্ঞতা লাভ করি, আমার কেন্দ্রীয় চরিত্ররাও তাই করে। যখন পাঠকরা সেটি পড়েন, তাদের মধ্যেও সেই অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হয়। কাফকা বা গার্সিয়া মার্কেজ – তারাও যা লেখেন তার মধ্যে সাহিত্যরস অনেক বেশি থাকে। আমার গল্প অনেক বাস্তবঘেঁষা, সমসাময়িক এবং আধুনিকোত্তর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এটিকে যাত্রাপালার মঞ্চসজ্জার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছেদ, দেয়ালে রাখা বই, আলমারি, সবই সাজানো; সবই মিথ্যা। সেখানে আছে কেবল কাগজের দেয়াল। প্রথাগত বাস্তবতায় কিন্তু এই দেয়াল, বই এই সবই সত্যিকারের হতো। যদি আমার গল্পে কিছু সাজানো বা মিথ্যা হয়, আমি তাদেরকে মিথ্যা বলতেই পছন্দ করি, সত্যিকার নাটকে মুড়ে রাখতে চাই না।

প্রশ্ন: আপনার যাত্রাপালা, রঙ্গমঞ্চের উদাহরণ ধরেই বলি, ক্যামেরা কি স্টুডিওর কর্মপদ্ধতি নির্দেশ করে?

মুরাকামি: আমি দর্শকদের সামনে সবকিছুকেই সত্য বলে তুলে ধরতে চাই না। যেটি যেমন সেটিকে তেমনভাবেই উপস্থাপন করতে চাই। তাই আমি পাঠকদের বুঝিয়েই দেই এটি কেবল একটি গল্প – মিথ্যা ঘটনা। কিন্তু যখন আপনার কোন এক মিথ্যা ঘটনাকেও সত্য বলে মনে হবে, তখন তা সত্য হলেও হতে পারে! তখন সেই ব্যাপারটিকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে না।

ঊনবিংশ এবং বিংশ শতকের প্রথমার্ধে লেখকরা সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখতেন। যেমন তলস্তয় তার ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এ যুদ্ধক্ষেত্রটিকে এত কাছ থেকে, এত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে পাঠকরা ভাববে এটা সত্যি ঘটনা। কিন্তু আমি তা করি না। আমি কখনোই গল্পকে সত্যি বলে দেখাতে চাই না। আমরা এক মিথ্যার জগতেই বাস করি, নকল সান্ধ্যখবর পড়ি, নকল লড়াই করি। আমাদের সরকার নকল। কিন্তু আমরা এই নকলের দুনিয়াতেই সত্য খুঁজে পাই। তাই আমাদের গল্পগুলিও এক রকম হয়। আমরা মিথ্যা রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করি। কিন্তু আমাদের কাছে, যেহেতু আমরা নিজেরাই অভিনয় করছি তাই সেটি সত্যি বলে মনে হয়। অবস্থাটি সত্যি এই কারণে যে, এটি একটি দায়বদ্ধতা, এক সত্যিকারের সম্পর্ক। আমি এগুলোই আমার লেখায় তুলে ধরতে চাই।

প্রশ্ন: আপনি আপনার লেখায় বেশ কিছু সূক্ষ্ন সূক্ষ্ন জাগতিক বিষয়কে প্রায়ই তুলে ধরেন।

মুরাকামি: আমি বিস্তারিত বিবরণ দিতে খুবই পছন্দ করি। তলস্তয় সমস্তকিছুর বিবরণ পরিবেশন করেছিলেন তাঁর লেখায়। আমি একটা ছোট জায়গার উপরেও বিবরণ দেই। যখন আপনি খুব ক্ষুদ্র একটি বস্তুর বিস্তারিত বিবরণ দেবেন, আপনার মনোযোগ আরো বাড়তেই থাকবে। এবং তলস্তয়ের লেখার বিপরীত অবস্থায় পৌঁছাবেন – যখন আপনার সবকিছুকেই অবাস্তব বলে মনে হবে। আমি এটাই করতে চাই।

প্রশ্ন: অর্থাৎ তখন আপনি কোন একটি ক্ষুদ্র বিষয়ে এতোটাই মনোনিবেশ করে ফেলেন যে তা বাস্তবের থেকে অনেক ভিন্ন হয়ে পড়ে। এবং দিনের পর দিন ব্যবহৃত জিনিসগুলিকে কি আবার নতুন বলে মনে হয়?

মুরাকামি: যত কাছে আসে, তত আরো কম বাস্তব বলে মনে হয়। এটাই আমার লেখার ধরণ।

প্রশ্ন: আগে আপনি বললেন যে গার্সিয়া মার্কেজ আর কাফকার লেখনীর চেয়ে আপনার লেখার কায়দা একেবারেই আলাদা। আপনি কি নিজেকে তথাকথিত সাহিত্যিক মনে করেন না?

মুরাকামি: আমি একজন সমসাময়িক সাহিত্যিক, যে এইসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যে সময়ে কাফকা লিখতেন, সে সময়ে কেবল গান, বই আর যাত্রা ছিলো। এখন আমরা ইন্টারনেট, সিনেমা, ভিডিও আরো কতকিছুর সুবিধা পাই। আমাদের প্রতিযোগিতাও তাই বেশি। প্রধান সমস্যা হলো সময়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মানুষ – আমি মূলতঃ অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের কথাই বলতে চাই – তাদের হাতে ছিলো অফুরন্ত সময়। তাই অনেক বড় বড় বই পড়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হতো। তারা যাত্রা দেখতে গিয়ে তিন-চার ঘণ্টাও বসে থাকতে পারতেন। কিন্তু আজকাল প্রত্যেকেই এতোটা ব্যস্ত যে কারোরই আর অবসর বলে কোন সময় নেই। মোবিডিক বা দস্তয়ভস্কির লেখা পড়তে এখনো খুব ভালোই লাগে কিন্তু সময়ের বড় অভাব। তাই কাহিনীগুলিও নিজেদের আমূল বদলে ফেলেছে। আমাদের সাহিত্যিকদের প্রায় পাঠকদের ঘাড় ধরে গল্প শোনাতে হয় এখন। তাই সমসাময়িক লেখকরা কাহিনী-বিন্যাসে ভিডিও গেমস, জ্যাজ এসবেরও সাহায্য নিচ্ছেন। আমার মতে ভিডিও গেমসই আজকাল কল্পনার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে।


“বই লেখা গান গাওয়ারই মতো: প্রথমে আমি মূল বিষয়টিকে বাজাই, তারপরে সেটাকে আরো ঘষামাজা করি তারপরই সুন্দর একটা পরিসমাপ্তি আসে।”


প্রশ্ন: ভিডিও গেমস?

মুরাকামি: আমি নিজে ভিডিও গেমস খুব একটা খেলি না। কিন্তু আমি মিলটা অনুভব করতে পারি। কখনো কখনো আমার নিজেকে কোন একটি ভিডিও গেমসের স্রষ্টা মনে হয়। যখন আমি লিখি, তখন যেন আমি একজন খেলোয়াড়ও। যেন আমি একটি প্রোগ্রাম বানালাম এবং নিজে এখন তার মধ্যে আছি এবং আমার বাঁহাত জানছে না আমার ডানহাত কি করছে। এটা এক রকমের পৃথকিকরণ অনুভূতি।

প্রশ্ন: এর মানে আপনি কি এটা বোঝাচ্ছেন যে যখন আপনি লেখেন তখন যেমন জানেন না পরবর্তীতে ঠিক ঘটতে চলেছে, তেমনি আবার আপনারই একটা অংশ জানে কি ঘটবে?

মুরাকামি: আমার অজ্ঞাতসারে তাই-ই ঘটে। যখন লেখায় সম্পূর্ণ ডুবে যাই, আমি জানতে পারি যে একজন লেখক কি চাইছেন। এবং সেই মুহূর্তে এটাও জানতে পারি যে পাঠক কি ভাবছেন। এটি ভালো – এটি আমার লেখায় গতি এনে দেয়। কারণ আমিও পাঠকদের মতো জানতে চাই এর পরে কী ঘটবে। কিন্তু সেই গতি কখনো কখনো থামাতেও হয়। কারণ ঘটনাগুলি যদি খুব দ্রুত ঘটতে থাকে, পাঠকের ক্লান্ত ও একঘেয়ে লাগবে। তাই গল্প বলার সময় আপনাকে মাঝেমাঝে গতি কমাতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি তা কি করে করেন?

মুরাকামি: আমি কিভাবে যেন বুঝতে পারি, এবার একটু থামা প্রয়োজন।

প্রশ্ন: জ্যাজসঙ্গীত এবং গানের ব্যাপারে কিছু বলুন। তারা কিভাবে আপনার কাজে সাহায্য করে থাকে?

মুরাকামি: আমি ১৩-১৫ বছর বয়স থেকে জ্যাজ শুনছি। গানের একটা বড় প্রভাব থাকে আমার লেখার উপর: সুর, তাল, ছন্দ, কথা এবং সর্বোপরি সেসব অনুভূতিই আমাকে অনেকাংশে লিখতে সাহায্য করে। আমার খুব ইচ্ছা ছিলো সুরকার হবো। কিন্তু আমি বাদ্যযন্ত্র বিশেষ ভালো বাজাতে পারি না, তাই আমার পথে লেখাকেই বেছে নিলাম। বই লেখা গান গাওয়ারই মতো: প্রথমে আমি মূল বিষয়টিকে বাজাই, তারপরে সেটাকে আরো ঘষামাজা করি তারপরই সুন্দর একটা পরিসমাপ্তি আসে।

প্রশ্ন: চিরাচরিত জ্যাজসঙ্গীতে প্রাথমিক বক্তব্যটিই আবার শেষে ফিরে আসতে দেখা যায়। আপনিও কি আপনার লেখায় সেটা করেন?

মুরাকামি: কখনো-সখনো। জ্যাজ আমার কাছে একটা যাত্রাপথের মতো। এক মানসিক যাত্রা। লেখার থেকে তা বিন্দুমাত্র আলাদা নয়।

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় জ্যাজ গায়ক কারা?

মুরাকামি: অনেকে আছেন। স্টান গেটজ এবং গেরি মুলিগ্যানকে পছন্দ করি খুব। আমার কৈশোরকালে তারা ভীষণ জনপ্রিয় গায়ক ছিলেন। মাইলস ডেভিস এবং চার্লি পার্কারকেও খুব পছন্দ করি। যদি এখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে কাকে আমি সবার প্রথমে রাখবো? তাহলে আমার উত্তর হবে মাইলস। মাইলস নিজে একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তিনি এমন একজন মানুষ যিনি নিজস্ব এক ধারা গড়ে তুলেছিলেন। আমি তাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি।

প্রশ্ন: জন কলট্রেনকে পছন্দ করেন না?

মুরাকামি: উমমম। ঠিকঠাক। যদিও তার কাজও কখনো কখনো অনুপ্রেরণা দেয়।

প্রশ্ন: অন্যান্য গানের ক্ষেত্রে আপনার কি মতামত?

মুরাকামি: আমি পুরনো দিনের গান খুব ভালোবাসি; বিশেষত Baroque সঙ্গীত। এবং আমার বই ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এ যে কেন্দ্রীয় চরিত্র, সেই ছেলেটি রেডিও শোনে। যখন বেশকিছু রেডিওপ্রিয় পাঠকও আমার বই পছন্দ করেছিলেন, তখন আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম।

প্রশ্ন: আমার তো বিশেষ অবাক লাগছে না! ‘কাফকা অন দ্য শোর’ বিষয়ে কিছু বলুন না!

মুরাকামি: এটি আমার লেখা সব থেকে জটিল বই – ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রোনিকল’-এর চেয়েও জটিল। এটিকে এভাবে বুঝিয়ে বলা খুব মুশকিল। এখানে দুটি গল্পকে সমান্তরালভাবে চলতে দেখা যায়। এখানে আমার কেন্দ্রীয় চরিত্র এক পনের বছরের কিশোর। তার নাম, তার প্রথম নামটি কাফকা। অন্য গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এক ষাট বছরের প্রৌঢ়। তিনি অশিক্ষিত। পড়তে বা লিখতে পারেন না। কিছুটা স্থুলবুদ্ধির মানুষ। কিন্তু তিনি আবার বিড়ালদের সাথে কথা বলতে পারেন। কাফকা ছেলেটিকে তার বাবা অভিশাপ দিয়েছিলেন – অনেকটা অয়েদিপাসের মতো অভিশাপ: তুমি তোমার পিতাকে হত্যা করে মায়ের প্রেমে পড়বে। সেই অভিশাপের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য সে তার বাবার কাছ থেকে অনেক দূরে এক জায়গায় পালিয়ে গিয়েছিল। সেখানে সে খুবই অদ্ভুত এক পৃথিবীর সাথে পরিচিত হয়, অনেক অবাস্তব এবং স্বপ্নীল বস্তুর সাথেও।

প্রশ্ন: গঠনশৈলীর দিকে ভাবতে গেলে এটা আপনার ‘হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ –এরই মতো। এখানেও এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে এক গল্প থেকে আরেক গল্পে মিলে যায়?

মুরাকামি: ঠিক। প্রথমে আমি হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ডেরই পরবর্তী অংশ লিখতে শুরু করেছিলাম। পরে ঠিক করি সম্পূর্ণ আলাদা গল্প লিখবো। কিন্তু কায়দা ওই একই, অনেকটাই সাদৃশ্য আছে। কারণ মূল গল্প এবং গল্পের আত্মা একই। মূল বিষয় হলো এই পৃথিবী এবং অপর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে। তার মাঝের এক যাতায়াতের গল্প এটি।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি তো এখানেই থাকেন। তাই না?

মুরাকামি: কারণ এখানে আমি অনামী ব্যক্তি। ঠিক নিউ ইয়র্কে থাকাকালীন সময়ে যেরকম ছিলাম। এখানে আমাকে কেউ চেনে না। আমি যেখানে ইচ্ছা সেখানেই যেতে পারি। আমি যদি ট্রেনে চড়েও যাই কোন জায়গায়, তাতেও কারো কিছু আসে যায় না। টোকিওর এক ছোট্ট শহরতলীতে আমার বাড়ি, সেখানে সবাই চেনে আমায়। যখনই হাঁটতে বেরোই, কেউ না চিনতে পারেই। কখনো কখনো এটি যথেষ্ট বিরক্তিকরও বটে।

প্রশ্ন: Ryu Murakami এর কথা আগেই বলেছিলেন। উনি নাকি এক ভিন্ন বিষয়বস্তুকে ওনার লেখায় তুলে ধরেন?

মুরাকামি: আমার লেখার ধরণ খানিকটা আধুনিকোত্তর; ওনার লেখা আরো বেশি মূলধারার। কিন্তু যখন প্রথমবার ‘কয়েন লকার বেবিজ’ পড়েছিলাম, আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমিও এরকম কিছু উপন্যাস লিখবো, যা পাঠকের মনে ভীষণভাবে রেখাপাত করবে। তখনই আমি ‘আ ওয়াইল্ড শিপ’ লিখতে শুরু করি। এটা খানিকটা প্রতিদ্বন্দ্বীতাই বলা যায়।

প্রশ্ন: আপনারা কি বন্ধু?

মুরাকামি: আমাদের সম্পর্ক ভালোই। অন্তত আমরা শত্রু নই। ওনার এক নিজস্ব, স্বাভাবিক প্রতিভা আছে। ঠিক যেন মাটির নিচেই তেলের একটা খনি আছে। আমার ক্ষেত্রে, সেই তেলই এতো গভীরে থাকে যে তার সন্ধান করতে গেলে আমাকে ক্রমাগত মাটি খুঁড়তে হয়। এতে প্রচুর পরিশ্রম হয় এবং যথেষ্ট সময়সাপেক্ষও। কিন্তু সেই অবস্থায় আমি যে মুহূর্তে পৌঁছে যাই, নিজের মধ্যে যথেষ্ট দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস জন্মায়। আমার জীবনও অনেক বেশি শৃঙ্ক্ষলাবদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই মাঝেমাঝে এরকম আত্মবিশ্বাস একেবারেই মন্দ নয়।

জন রে: আপনাকে ধন্যবাদ।
হারুকি মুরাকামি: আপনাকেও ধন্যবাদ।


আগের পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব

 

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য