home বাংলাদেশের সমকালীন ছোটগল্প সংখ্যা ব্ল্যাক মিউজিয়াম ।। তানিম কবির

ব্ল্যাক মিউজিয়াম ।। তানিম কবির

একটা বিষণ্ন পৃথিবীর কথা ভাবি আমি, যেখানে দিনরাত বলে কিছু নেই; — আছে এক অনড় সন্ধ্যা আর অনন্ত টেক্সটাইল মিল। ফিরোজা রঙের টানা আকাশজুড়ে অজস্র বেগুনি কালারের মেঘ আটকে থাকা সেই পৃথিবীতে হাফপ্যান্ট পরা বাচ্চারা নিজ নিজ ঘুড়ি আর নাটাই হাতে অপেক্ষমাণ। তাদের মা আর বাবারা প্রত্যেকেই মিল শ্রমিক, কবে তারা কোন অজ্ঞাত সাতসকালে যার যার টিফিন ক্যারিয়ার সাথে নিয়ে মিলের ভেতর ঢুকেছিল—সেসবের কিছুই আর মনে করতে না পারা বাচ্চাগুলোর ধূলিধূসরিত গালে চিরসূর্যাস্তের মলিন আলো পড়ে আছে। কর্মব্যস্ত সেই টেক্সটাইল মিলের বন্ধ গেইটের সামনে অসংখ্য জালালি কবুতর হেঁটে বেড়ায়, কখনো বা গম্ভীর বাকবাকুম হাকিয়ে আলসে উড়াল পেড়ে আগে পিছে জায়গা বদল করে তারা। যেন ওই মিল শ্রমিক, তাদের বাচ্চার দল আর জালালি কবুতরগুলোর প্রত্যেকেই এক ফুঁ বাঁশির অপেক্ষা করে আছে, কেউই তারা জানে না অফুরান এই সন্ধ্যা আসলে সময় নিরপেক্ষ; এর সমস্ত সাতসকালই কল্পিত স্মৃতি। যাপনহীন কিছু আরোপিত সংলাপের রোমন্থন ছাড়া কিছুই নেই সেই পৃথিবীতে।

 

“সকাল হয়েছে হয়ত, রাত পোহায়নি”— বলছিল রুশাই।

মাথা নেড়ে সায় দিই।

“মাথা নাড়াও?” প্রশ্ন আসে।

বলি “হুঁ।”

“কিন্তু তোমার ওয়েবক্যাম নষ্ট, আমরা অডিও কলে তাশা!” — শুধরে দেয় রুশাই।

গেয়ে উঠি, “ওয়েবক্যাম ওয়েবক্যাম সোনা দিয়া হাত কেন বান্ধাইলি”…

হি-হি করতে থাকে রুশাই, সত্যি করে জানতে চায়, “ব্লুু ফিল্ম দেখতেছো তুমি, রাইট?”

“উঁহু” অস্বীকার করি।

“তাহলে! মনোযোগ নাই কেন?” জানতে চায় সে।

বলি, “আচ্ছা রুশাই, বুয়া যদি হঠাৎ এসে বলে সে মা হতে চলেছে! কী করব তখন?”

একটা চড় খাব আমি— জানায় সে। মেনেও নিই।

আবার বলি, “বাচ্চাটার নাম রাখব তারু।”

লাথি মেরে আমাকে খাট থেকে ফেলে দেয়া হবে— ক্ষেপে গিয়ে রুশাই বলে।

“কিন্তু বিশ্বাস করো রুশাই, বুয়ার সাথে সত্যিই আমার অনেক ধরনের ফষ্টিনষ্টি আছে”— জোর দিয়ে বলি।

“অনেক ধরন আর কী? ফষ্টিনষ্টির একটাই ধরন হয়”— জানায় সে।

অন্যমনষ্ক ভঙ্গিতে বলি, “ওর পেট ফুলে উঠছে, কান পাতলেই টেক্সটাইল মিলের শব্দ শোনা যায়।”

 

দুই.

অনেক অনেকদিন— মানে প্রায় পৌনে একযুগ আগে শশীদলে আমাদের ট্রেনের ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেল। রাত প্রায় দেড়টা, ঝড় থামা লোডশেডিংয়ের কালো স্টেশনে ছড়িয়ে পড়েছি আমরা একট্রেন যাত্রী। দূরে, সম্ভবত পরের কোনো স্টেশন থেকে একটা শেয়ালের অবিরত ডাক ভেসে আসছিল। আমি একটা গাছের গুঁড়িতে বসে সিগারেট খাচ্ছি, আর টানমারা সিগারেটের আলোয় দৃশ্যমান আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। চুললম্বা একটা লোক নাকি লোকটার ছায়া এসে সামনে দাঁড়ায়,

“আগুনটা প্লিজ?”

“শিওর” বলে লাইটারটা এগিয়ে দিই আমি। সিগারেট জ্বালিয়ে লোকটা লাইটার নিয়ে হাঁটা দেয়, আর মুহূর্তেই, কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকারে অন্য আরসব যাত্রীজটলায় মিলিয়ে যায় সে। অবাক লাগল, হাসিও পাচ্ছিল, ভাবলাম কবি কিংবা মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ানো কোনো পাগল বোধহয়। স্টেশন থেকে জানানো হলো, লাকসাম লোকোশেড থেকে বিকল্প ইঞ্জিন আনানো হচ্ছে। যাত্রীদের প্রতি ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করবার অনুরোধ রাখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। আরেকটা লাইনে বিকট শব্দে শশীদল স্টেশনে না-থামা একটা ট্রেন চলে যাচ্ছিল। কানে হাত চেপে ধরলাম। বেশ অনেকক্ষণ পর হাত সরাতেই ট্রেনের শব্দ পাল্টে সেটা মানুষজনের একটা সংগঠিত হট্টগোলে পরিণত হলো। এগিয়ে যাই আধোন্ধকার সেই শোরগোলের দিকে। একটা পাগলমতো লোক ট্রেনের তলায় কাটা পড়েছে বলে জানা গেল। উঁকি দিতেই এক বীভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি হই।

তারপর? লাইটারটা ফিরে পেলে? — চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করে মার্গার। ওর বাদামি চোখের ক্রমবিলুপ্ত মণির দিকে তাকাই।

বলি, “নাহ!”

“কী এমন অভিশাপ দিলে যে লোকটাকে মরতে হলো? একটা লাইটারই তো ছিল!”

যেন আমিই লোকটাকে মেরে ফেলেছি—এমন ভঙ্গিতে বলল সে। নৌকার মাঝিও শুনছিল গল্পটা, বলল “ঠিকই আছে” উচিত শিক্ষা নাকি দিয়েছি! “আই থিঙ্ক লোকটা শিরিষ বাবার মাজারে যাওয়া আসা করত।”

আমি শীতলক্ষ্যার হাওয়ায় সিগারেট জ্বালানোর ট্রাই করতে করতে বললাম, “আমারও সেরকমই ধারণা!”

“শিরিষ বাবাটা কে?”— বিস্মিত জিজ্ঞাসা মার্গারের।

বললাম “আছে একজন, লাইটার চোরদের নিয়েই তার কাজ কারবার!”

 

তিন.

প্রতিটা নারী শরীরেরই নিজস্ব ক্যালেন্ডার থাকে, মাস-সপ্তাহ-বার ইত্যাদি থাকে। আলাপরত, দূরালাপরত সকলেরই তারিখ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী আমি। এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আপত্তি তোলা আমার সঙ্গে মিশবার প্রাথমিক অযোগ্যতা বলে বিবেচিত। জানতে আমি চেয়ে ফেলি, আর জানতে চাওয়ার কারণে নিজেও অনেকের কাছে অবান্তর হই। তবু জানবার এই স্পৃহা দমিয়ে রাখতে পারি না। নিজের যত বিষণ্ন জানাশোনা— সেসবের ব্যাপারে যেমন স্নেহ আছে, তেমনি ওসব জানাশোনাকে আরো সমৃদ্ধ করার দায়ও ফিল করি আমি। গার্লফ্রেন্ডদের অনেকেরই, যাদের সাথে পরবর্তীতে আর যোগাযোগ থাকে নি, যাদের কোনো খোঁজই আজ আর জানি না— তাদের প্রায় সকলেরই বার-তারিখ রয়ে গেছে আমার সংগ্রহশালায়। সংগ্রহশালা বলতে আলাদা কোনো ডার্করুমে টাঙিয়ে রাখা ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখা কিছু তারিখ। আমার মনে থাকে— তবে এতদিনে বৈজ্ঞানিক উপায়েই সেসব তারিখের এদিক-সেদিক হয়ে গেছে।

 

“এসব আমাকে বলছেন কেন?” জানতে চায় মারিয়া।

বলি, “এজন্য যে, আপনিই একমাত্র যার তারিখ সম্পর্কে আমি আপনা আপনিই ওয়াকিবহাল হই, কোনো প্রকার সম্পর্ক স্থাপন ছাড়া।”

“মানে!” বিস্মিত মারিয়া।

গম্ভীর স্বরারোপ করে বলি “হুঁম, আপনার আজ শুরু হলো।”

চোখের ভেতর থেকে মার্বেল খুলে পড়ার উপক্রম হয় ওর।

সামলে নিয়ে বলে, “ওকে! আই নো এবাউট দিস টার্ম। চোখ বন্ধ করে ঢিল ছুঁড়েছেন, সবার সাথেই ছোঁড়েন, একটা দুটো মিলে যায়। ঠিক?”

“না না! ঢিল ছুঁড়ব কেন? বিষয়টা স্পর্শকাতর—কনফার্ম না হয়ে আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার প্রশ্নই আসে না!” বলি আমি।

উত্তেজিত কণ্ঠে তার প্রতিবাদ—“যতই জানুন, যেভাবেই জানুন, আপনি বলতে পারেন না এভাবে!”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার আর্ত হয়ে ওঠে, “কিন্তু কিভাবে জানলেন! হাও ক্যান ইট বি পসিবল! আমি কমপ্লেইন করব আপনার বিরুদ্ধে।”

বলি, “সে না হয় করবেন, এখন চা নেন, ঠাণ্ডা হচ্ছে।”

আমার গায়ে চা ছুঁড়ে মারে সে।

“কার ফোন, দেখি আমি!”— আধশোয়া অধিকারে ধেয়ে আসে মারিয়া।

বলি, “রবার্ট ব্রুস, বাল্যবন্ধু আমার।”

“এত রাতে কী চায় সে?”

“নিউইয়র্কে থাকে ও, ওর ওখানে তো এখন বিকেল।” বলি আমি।

“ফোন বন্ধ করো! আদর করো আমারে!”— কাঁইকুঁই করতে থাকে সে।

 

চার.

একটা ফনিক্স সাইকেলের পেছনের সিটে বসে বড় হয়ে যাই আমি। জ্বর ছিল খুব, টানা সাতদিন লাগে আমার বড় হতে। বিষু কাকার সাইকেলটা চলতে থাকে অবিরাম বৃষ্টি আর ব্যাঙের বর্ষণ পেছনে ফেলে। আমার একহাতে মেলে রাখা ছাতার ডাণ্ডা ধরা থাকত, অন্য হাতে বিষু কাকার ক্রম পিচ্ছিল শিশ্ন (ডাণ্ডা?)। কাকা বলত, “জ্বর কত রে?” আমি কিছু বলতাম হয়ত জবাবে, আজ আর মনে নেই। “নিখিল হোমিওঘরে নিয়ে যাব তোকে, দুই শিশি বড়ি পেটে পড়লে জ্বর নেমে যাবে”—বিষু কাকার পিঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা কথাগুলো শুনতে থাকতাম ঘুম ঘুম জ্বরের ভেতর বড় হতে হতে। “উপর-নিচ করতে থাক, জোরে জোরে কর!” আমি জোরে জোরে উপর-নিচ করতাম। সাইকেলটাও কেমন অদ্ভুত দুলতে দুলতে চলতে থাকত। হঠাৎ কোনো হাট বাজার লোকালয় চলে আসলেই কাকা হাত সরিয়ে দিত। আমি প্যান্টের পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ঘষতে থাকতাম। অস্বস্তিকর ওই পিচ্ছিল হাত মেলে ধরতাম মন্থর বৃষ্টিতে।

 

“ক্লান্ত লাগে বাবু?” শুধায় তনু।

বলি, “তোর নামটাই এমন যে এতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকা যায়!”

“ধ্যাৎ, মুখে রুচি আসছে? একটা কমলা খাবি এখন?” জিজ্ঞেস করে।

আমি মধ্যজ্বরের ঘোরাক্রান্ত নিমপাতায় এলিয়ে পড়তে পড়তে জানতে চাই, “জীবনানন্দ কমলা খেত?”

প্রশ্রয় করে হাসে ও, জানায়, “খেত! সুজাতাকেও অর্ধেকটা দিত!”

“তাহলে আয় ফিফটি-ফিফটি মারি একটা!” উচ্ছ্বসিত প্রস্তাব আমার।

“হি হি, আমি তো সন্ধ্যা থেকেই খাচ্ছি, তোর জন্য আনা প্রায় সব কমলাই আমার পেটে।”

বালিশ ছেড়ে উঠতে উঠতে বলি, “কার যেন পেটের মধ্যে কান পাতলে ব্যাঙের ডাক শোনা যেত।”

“ভেবে দেখ তাহলে, কতজনের পেটে তুই কান পেতেছিস!”—কৃত্রিম ঘুষি দিতে দিতে বলে তনু।

“তাতে কী! সিজারে কাটা পেট তো আমার একটাই, তোরটা!” কামিজের ওপর তনুর পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলি।

হাত সরিয়ে দিয়ে মারতে আসে, “ওই! তোর মুখে লাগাম নাই?”

জানতে চাই, “তোর মেয়ে কই?”

“ঘুমায় ওই ঘরে।”

সাবধান করে দিই আমি, “দেখিস, বিষু কাকার সাইকেলে যেন না ওঠে!”

বিব্রত তনু কপালে হাত রাখে আমার।

 

পাঁচ.

রবার্ট ব্রুসের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের মিনিট দশেকের মধ্যেই ও আমার নখ উপড়ে নেয়। তীব্র যন্ত্রণায় কোঁকড়াতে থাকি আমি। অদ্ভুত এক নৈপুণ্য ছিল ওর, পেপসির ওপেনার দিয়ে মানব সম্প্রদায়ের নখ উপড়ে নেয়া। আর এক্ষেত্রে তার চয়েজ যেহেতু পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল— দৌড়ে পালানোরও কোনো সুযোগ ছিল না। প্রতিদিন বিকালে অন্তত একটা করে বোতাম চিবাতে হতো ওকে, আর, কারো কলার চেপে ধরেই সেটা তাকে সংগ্রহ করতে হতো। আমার শার্টের সবগুলো বোতামই ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। পুরান ঢাকার দুর্দান্ত গুণ্ডা রবার্ট ব্রুস—তার বোন ন্যান্সি, ভালোবেসে একবিকেল কেঁদেছিল আমার জন্য। ফলে উপড়ানো নখ হাতে একসন্ধ্যা কান ধরে উঠবস করতে হয় আমাকে। তারপর আর কোনোদিনই ন্যান্সি আমার সামনে এসে কাঁধের জামা সরিয়ে নেয়নি। জোর করে ব্রা’র ফিতা কিংবা ধবধবে দুধের অংশবিশেষ দেখাতে চায়নি। এছাড়া অপরাধবোধের আর কোনো প্রকাশ্য লক্ষণ কখনোই দেখিনি ওর মধ্যে। কিন্তু আমাদের দেখা হতো, ক্যাম্পাসে, লাইব্রেরিতে—এ পাড়ায়, সে পাড়ায়, এমনকি শীতকালেও, টকো কুয়াশার একটা জলপাই গাছের নিচে আমরা পরস্পরবিরোধী হেঁটে যেতাম। অপরাধবোধে ঢেকে যাওয়া একজোড়া ধবধবে স্তনের শুশ্রুষায় ধীরে ধীরে সেরে ওঠে আমার অর্ধেক উপড়ানো নখ।

“রবার্টের সাথে পরে বন্ধুত্ব হলো কিভাবে? গল্পটা রবার্টের নাকি ন্যান্সির!” চুইংগামের বাবল ফোলাতে ফোলাতে ঊষসী বলে।

অবাক হয়ে যাই আমি, বলি, “রবার্টের সাথে পরে বন্ধুত্ব হয় নাকি আমার!”

চুইংগাম ফেলে আমার কলার চেপে ধরে, “হনুমানের বাচ্চা, আপনি না বলেন আমেরিকা থেকে রবার্টের ফোন আসে! আপনার না বাল্যবন্ধু?”

“আরে না! বাল্যবন্ধু হতে যাবে কেন?” কলার ফ্রি করতে করতে বলি।

উত্তেজিত হয়ে ঊষসী জানতে চায়, “তাহলে কী বলে আসছিলেন এতদিন! কে ফোন করত আপনাকে!”

নির্বিকার কণ্ঠে বলি, “অন্যকেউ করত নিশ্চয়ই। পৃথিবীতে পর্যাপ্ত রবার্ট মজুদ আছে। তাদের মধ্যথেকে কেউ করে থাকবে, এই রবার্ট আমার বাল্যবন্ধু না, আমি শিওর।”

“আপনি আসলে একটা সাইকো, বুঝলেন? আপনাকে পুলিশে দেয়া দরকার!”

প্রসঙ্গ ফিরে পেয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠি, “হ্যাঁ হ্যাঁ! আমার বাল্যবন্ধু রবার্ট পুলিশ! নিউইয়র্কে থাকে, এফবিআইয়ে, ও তো মাঝেমাঝে ফোন করে আমাকে।”

“মাতলামির আর জায়গা পাচ্ছেন না, নাকি?”

শুনে হাসি, বলি, “শোনো উষী, আমাকে মেরে ফেলতে চাইলে সেটা করো, আমার তো আপত্তি নেই! যুক্তি দিয়ে খোঁটা দিও না প্লিজ, ভুল ধরার চেষ্টা করো না, মানুষকে তার গল্প বলতে দাও, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে থামিয়ে দিও না।”

রাগে ক্ষোভে কাঁপতে থাকে সে, সোয়েটার গায়ে নিতে নিতে বেরিয়ে পড়তে পড়তে, এবং একইরকম কাঁপতে কাঁপতে বলতে থাকে, “মাইরি বলছি, আমার সাথে আর কোনো ধরনের যোগাযোগের চেষ্টা করলে ঠ্যাং ভেঙে দেব আপনার, লন্ডনে বাঙালি কম্যুনিটিতে বাবার প্রভাব সম্পর্কে জানেন আশা করি, ভালো থাকবেন।”

কণ্ঠে ভীতপ্রবাসীর সিরিয়াসনেস ফুটিয়ে তুলে বলি, “যত্নে থেকো তুমি, যোগাযোগ করব না আর।”

 

ছয়.

বিলোনীয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষে কোমর পানির একটা নদী বয়ে যাচ্ছিল, দুইপাশে বাঁশঝাড়। নদীদৈর্ঘ্য হতাশাজনক—পায়ে হেঁটে সবমিলে দশ কদম সাইজ হবে নদীটা। এপারে বাংলাদেশ, ওইপারে ভারতের আমজাদনগর। একই বাতাসে দুই দেশের পতাকা উড়ছিল, সেই উড়ননৃত্যের ঢেউ আর ভাঁজগুলোও বরাবর। বাতাস থেমে গেলে মধ্যদুপুরে বিশ্রামরত দুইটা দেশকে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকা জমজ বলে মনে হয়েছিল। নদীতে অবশ্য দুই দেশের মানুষকেই যুগপৎ গোসল ও স্নান করতে দেখা যাচ্ছিল। স্থানীয় গাইড সোহাগ বলছিল, “ওই গোসল পর্যন্তই। তারপর যার-যার দেশ, যার-যার ঘরে তার-তার ফিরে যাওয়া।” আমি ভাবছিলাম, নদীর এইপার আর সেইপারের কোনো প্রেমিক প্রেমিকার কথা—কেউই তারা একে অন্যের দেশে ঢুকতে পারে না, মধ্যদুপুরের নদীটাই শুধু ঠিকানা।

“সত্যিই ওরকম কোনো জুটিকে জানতেন আপনি?” মগ্ন ঊষসী জানতে চায়।

বলি, “জানাকে সবসময় সত্যি দিয়ে পেতে চাও কেন, অজানার সত্যি হবার দায় আছে, জানা তো মিথ্যাও হতে পারে।”

“হেয়ালি করবেন না তো প্লিজ! বিরক্ত লাগে।”

বলি, “জানতাম, এবং এখনো জানি, নদী তো কতরকমেরই হতে পারে!”

এবার ঊষসীও হাসে, বলে, “যেমন লন্ডনও একটা নদী, মধ্যদুপুরের ঠিকানা, ঠিক?”

“ঠিক!” এক শতে এক শ’ পায় ও।

“যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নিজেই যে আসলা আবার?”

“হুঁম এলাম, আসতে হলো।” অন্যমনষ্ক লাগে ওকে।

চমকে উঠে বলে, “জানেন!”

“কী?” আমিও জানতে চেয়ে চেয়ে অস্থির যেন!

দশ কদম চুপ করে থেকে বলে, “কিছু না।”

প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, “আপনার নখগুলো আর আঙুলগুলো খুব সুন্দর।”

“তাও ভালো যে ন্যান্সির ভাই আপনার হাতের নখ উপড়ায়নি!”—বিলীন হতে হতে বলতে থাকে ঊষসী।

 

সাত.

দেখার মতো ছিল সেই ঝড়ের দাপট। অবশ্য ঝড় বলতে যদি শুধু বাতাসটাকে আলাদা করি, তবেই। কেননা ঝড়ের ওই বৃষ্টিটাকে বেদম ব্যক্তিত্বহীন মনে হচ্ছিল। বাতাসের তাড়া খেতে খেতে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া ওই বৃষ্টিপতন প্রকাশ্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছিল। যেন পুত্রের সামনে বেত্রাঘাতপ্রাপ্ত বিব্রত পিতার সকরুণ এঁকেবেঁকে যাওয়া। দেখলাম একটা বনমোরগও আশ্রয় নিয়েছে শ্মশানখলায়, ঝড়ের প্রাথমিক আক্রমণেই সে তার পালক লণ্ডভণ্ড করে বসেছে। আর সেজন্যই কিনা কে জানে, দ্রুতলয়ে ক-ক-ক-ক-ক-ক করে কাকে যেন অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছিল। হাততালি দিতেই চোরের মতো গলা ফিরিয়ে এদিক তাকায় একবার, পরক্ষণেই আবার ঝড়অভিমুখে ক-ক-ক-ক-ক-ক করতে থাকে। সন্ধ্যার আগে শুরু হওয়া সেই ঝড় রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসকে মিউট করে একটা নিবিড় বৃষ্টিপতনে রূপান্তরিত হয়। আধভাঙা ভৌতিক ওই শ্মশানখলায় আটকে থাকি আমি, আর একটা বনমোরগ। অন্ধকার হতেই তীব্র অশরীরী কিছুর অস্তিত্ব টের পেতে আরম্ভ করি। মোরগটার কাছে গিয়ে সাহস সঞ্চয়ের চেষ্টা করলেই বিরক্তি প্রকাশ করে দূরত্ব বাড়ায় সে। আমি কিছু শুকনা লাকড়ির ওপর চুপচাপ বসে থাকি। একসময় বেআব্রু নারী শরীর কল্পনা করে করে ভয় তাড়ানোর ট্রাই করি। কিন্তু কোনো রেসপন্স পাই না, হাতবদল করতে করতে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করে যাই।

 

“মেয়েকে স্কুলে দিয়ে এলি?” ঘরে ঢুকতে থাকা তনুর প্রতি আমার প্রশ্ন।

“হ্যাঁ।” মাথা নাড়ে তনু।

বলি, “ওর বাপ চাচারা কেউ খোঁজ নেয় না? দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে নাকি?”

“হাহ! দেখ, ডিভোর্সের পর ওই লোকটা আর আমার স্বামী না, ওর ভাইরাও কেউ আর দেবর-ভাসুর না আমার। কিন্তু ওদের পিতৃত্ব আর চাচাত্ব তুইও কেমন স্বীকার করে নিলি!” দার্শনিক মন্থরতায় বলে তনু।

বলি “অবশ্যই তাদের বাবাত্ব আর চাচাত্ব বহাল থাকবে।”

“কেন?” জানতে চায় সে।

ব্যাখ্যা দিই, “সম্পর্ক সংক্রামক ব্যাপার, বিচ্ছেদ তো আর সংক্রামক না। তোর আর তোর ওই লোকটার সম্পর্ক ভেঙে গেলেও সেই লোক ততক্ষণ পর্যন্ত তোর মেয়ের বাপ, যতক্ষণ সে বেঁচে আছে। এমনকি মরে গেলেও সে তোর মেয়ের বাপ, মরহুম বাপ।”

“এহ! কোন না কোন রাতে কতক্ষণ কী না কী করল, তাতেই এত মালিকানা! তুই তো দেখি ঘোর পুরুষতান্ত্রিক রে!”

“পুরুষতান্ত্রিক না, পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষত্ব দুর্বল আইডিয়া, পিতৃত্ব ঐতিহ্যমণ্ডিত এবং আভিজাত্যময়! এর একটা আলাদা ভঙ্গি আছে, চাইলেই সহজে উপড়ে নেয়া যায় না।”

“থাক আর সুপারিশ গাইতে হবে না। আর কতদিন পড়ে থাকবি এখানে? সুস্থ হয়েছিস, এবার বিদায় হ। ডিভোর্সিদের নিয়ে এমনিতেই কত গল্প, তার ওপর আবার তুই জুটে বসে আছিস!” রাগতহাস্যমুখে বলে যায় তনু।

ব্যথারভানে বলি, “ছিঃ এভাবে বলতে পারলি, তুই না আমার বাচপান কি ইছামতি!”

সে বলে, “ভাগ! পরীক্ষামূলক পেমিকা-কাম কাজিনের কাছ থেকে জীবনভর সুবিধা নিয়ে যাবি সেটা হবে না। সেই কোন শ্মশানঘাট থেকে শুরু করেছিস—কত্ত বড় সাহস! আমাকে কল্পনা করে কিনা শতভাগ সাফল্যের মাস্টারবেশন!”

 

আট.

পরপর অনেকগুলো লালমাটির গ্রাম। বর্ষাকাদায় এখানে ওখানে দেঁবে যায় মানুষজন। ভাটপাড়া থেকে উদ্ধারকারী দল ছুটে এসে টেনে তোলে ওদের। আমার খালাতো ভাই মানিক সেই উদ্ধারকারী দলের প্রধান। নানা ধরনের সংগঠন আর নতুন সব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকে সে। লালমাটির গ্রামগুলোতে ওর খুব প্রভাব ছিল। সবাই ওকে ভালোবাসত, আর স্বপ্ন দেখত মেয়ের জামাই বানাবে। অদ্ভুত একটা স্বেচ্ছাসেবী মন ছিল মানিকের। পরের জন্য কিছু করতে পারাই একমাত্র আরাধ্য ছিল ওর। সকাল থেকে সন্ধ্যা, যেকোন সময় এলাকাবাসির যেকোন প্রয়োজনে ছুটে যেত। এই বাড়িতে যৌতুকের বিয়ে থামানো তো, ওই বাড়িতে তাৎক্ষণিক খাদ্যের যোগান, দুই বাড়ির ঝগড়া বিবাদের মীমাংসাসহ হেন সামাজিক তৎপরতা ছিল না যেখানে নিজেকে জড়াত না মানিক। আর গ্রামবাসিও চাইত, মেনে নিত মানিকের সিদ্ধান্ত ও মধ্যস্থতা। এক শীতে ভাটপাড়ায় বেড়াতে গিয়ে বহুদিন ধরে শুনে আসা এসব গল্পের সত্যতা প্রত্যক্ষ করি। আমায় খুব স্নেহ করত মানিক ভাই। ততদিনে সে গ্রামডাক্তার হয়ে গেছে। খালা-খালুসহ দূরের আরেক গ্রামে আমরা মানিক ভাইয়ের জন্য পাত্রী দেখতে গিয়েছিলাম। পাত্রী রুপাভাবীর সঙ্গে অনেকদিন থেকেই মানিক ভাইয়ের সম্পর্ক। কী এক মেলা চলছিল রুপাভাবীদের গ্রামে, সন্ধ্যার আগে আমরা মেলা দেখতে গিয়েছিলাম। মানিক ভাই, রুপাভাবী আর আমি। সন্ধ্যা হতেই মেলার ভিড়ে আমি ওদের হারিয়ে ফেলি। অনেকগুলো বেলুন বাঁশি আর গোটা তিন নাগরদোলার ঘুরন্ত আর্তনাদে ফুরায়মান সন্ধ্যাটা অলীক এক অলিভ আওয়ারে রূপ নেয়। একটা পুতুল সন্দেশের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কেঁদে ফেলি। রুপাভাবীর জন্য মনটা হু-হু করে ওঠে।

 

“কী ডেঞ্জারাস! দ্যান?” মারিয়া উঠে বসে।

বলি, “সে রাতেই মানিক ভাই খুন হলেন।”

“মানে! তুমি খুন করলে, ওই রুপাভাবীর জন্য?” বিস্মিত হা খুলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে সে।

দ্রুতলয়ে মাথা নেড়ে বলি, “না না, ধুর! আমি না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মানিক ভাইকে খুন করায়, কারণ, মানিক ভাইয়ের জনপ্রিয়তা এলাকায় তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছিল।” “আহারে!” আফসোস করে মারিয়া।

বলি, “হুঁম, মানিক ভাইকে ভয় পেত সবাই, ওর ব্যক্তিত্বের সামনে ম্লান হয়ে থাকত বাকিরা। ওকে সরানো ওদের রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল।”

“তোমার তো খুব সুবিধা হয়েছিল, না?” জিজ্ঞেস করে সে।

ইঙ্গিত বুঝতে পেয়ে হাসি, বলি, “রুপাভাবী? পরেরদিনই সুইসাইড করে তো!”

“আর দেখা হয়নি?”

“ফেরার সময় সদর উপজেলা বাসস্ট্যান্ডে, ওখানকার স্থানীয় পত্রিকায় নিউজ হয়েছিল। নিউজের সঙ্গে ওদের দুজনের ছবি ছাপা হয়েছিল।”

বাকরুদ্ধ মারিয়া, ঘরজুড়ে নিঃসীম এক নৈঃশব্দ্য।

বলি, “মেলার সন্ধ্যার মতোই ঈর্ষা হয় আমার, ওদের পাশাপাশি ছবি দেখে।”

“হোয়াট!” ঘেন্নায় ফেটে পড়া চিৎকার দেয়।

“হুঁম, পত্রিকাটা ছিঁড়ে ফেলি আমি, বাসের জানলা দিয়ে।”

 

নয়.

মোস্তফারা কোনো কারণে ডিস্টার্বড ছিল, আর বসে ছিল কলেজ মাঠে, অস্তায়মান সূর্যের নিচে, গোল হয়ে। মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে চয়ন একটা নাম্বার ডায়াল করে দেয়। হতাশ কণ্ঠে জানায়, একে নাকি কিছুতেই সাইজে আনা যাচ্ছে না। আমি অবশ্য প্রথম এসএমএসেরই রিপ্লাই পাই। ছিলাম ট্রেনের ছাদে, শুয়ে। আর অপেক্ষা করছিলাম। মিনিট পাঁচ পরে ওর রিপ্লাই, ‘আমিও উড়ন্ত মরণকে বড় করে দেখি’। সেই থেকে শুরু, তারপর চিঠি আসত, একটাই চিঠি। তাতে লেখা থাকত ‘বাবাকে খুব মনে পড়ছে, তোমাকেও। আমাদের ছেলের নাম যদি আমার বাবার নামে রাখি, তোমার আপত্তি নেই তো? এক্ষুণি বের হতে হবে। তোমাকে কবে দেখব? যত্নে থেকো’। একটা তাবিজের ঠোলের ভেতর চিঠিটা ঢুকিয়ে রাখি, তারপর মোম এটে দিই, গলায় ঝুলাই। তার কয়েকদিন পরই মামুনের সঙ্গে প্রথমবার ব্রোথেলে যাই। হ্যান্ডশেক করেই নাজমা জানতে চায় আমি নার্ভাস কিনা, এটাই প্রথম কিনা ইত্যাদি। তারপর জবাবের অপেক্ষা না করেই বিবস্ত্র হয় সে, বলে ‘বখশিস দিস, করাইয়া দিব তোরে’। বলেই আমার শার্টের বোতামে হাত রাখে, জিজ্ঞেস করে, ‘কিসের তাবিজ এটা, স্বপ্নদোষ সারাইয়ের?’ তারপর হাসতে থাকে, সেই হাসি নানা ইকোতে কানে আসে। কাঁদতে শুরু করি। যতই কাঁদি, নাজমা শুধু হাসে। জিজ্ঞেস করে, ‘কিসের তাবিজ এটা, স্বপ্নদোষ হয় তোর? হি হি হি।’

 

তাকিয়ে দেখি মার্গার কাঁদছে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে ধাক্কা দিই ওকে,

“আরে ওই! কান্দো কেন?”

ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, “তুমি ওই ডাইনিটাকে একটা ঘুষি মারতে পারলা না?”

“হা হা হা” অট্টহাসি আমি, বলি, “না না, ওটা ওদের এলাকা, সিনক্রিয়েট করলেই ঝামেলা হতো।”

ফোঁপাতে ফোঁপাতেই বলে, “পরে কী হলো, ওর সাথে করতে হলো তোমাকে?”

“উঁহু, করতে হয়নি কিছু, পরে ও সহজভাবে গল্প করে আমার সাথে। বুঝতে পেরেছিল, সব।”

“তোমার বয়স তখন সতের?” নিশ্চিত হতে আবার জিগ্যেস করে।

“হ্যাঁ, সতের।”

“আর ওর?” মার্গারের জিজ্ঞাসা।

“ওর মানে কার, নাজমার নাকি জেসমিনের?” শুধাই।

“আরে বাল, জেসমিনের!”

“কুড়ি।”

“তোমাদের দেখা হয়েছিল কখনো?”

“আমাদের দেখা হতে পারত।”

“তারমানে হয়নাই!”

“ওরে বাপস! বিরাট খুশি মনে হচ্ছে?”

“আরে না, আমার নিজেরই তো জেসমিনকে দেখতে ইচ্ছে করছে… ওই দেখো, সাপ!”

প্রসঙ্গপতনের দিকে তাকাই। “সাপ তো থাকেই”—বলি আমি।

মার্গারের দাবি, “কিন্তু এ সাপটা অন্যরকম! চুরি করে মানুষের কথা শুনে ফেলা সাপ এটা।”

সাপটার দিকে ভালো করে তাকাই, জানতে চাই, “কিভাবে নিশ্চিত হলে?”

“দেখেই বোঝা যায়।”

ইন্টারফেয়ার করে মাঝি, বলে, “আই থিঙ্ক এটা গুতুম সাপ।”

মার্গার শীতলক্ষ্যার হাওয়ায় উড়তে থাকা ওর চুল বাঁধার ট্রাই করতে করতে বলল, “আমারও সেরকমই ধারণা!”

“গুতুম, এটা আবার কোন ধরনের সাপ?”

বলল, “আছে আছে, গল্প চুরি করা নিয়েই তাদের কাজ কারবার!

 

দশ.

একটা সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকায় নিজেকে দেখতে পেতাম স্বপ্নে। আর ঘাড় শিরশির করা বাতাসে টের পেতাম পেছনে হেঁটে বেড়াচ্ছে সেই মেক্সিকান সীমান্তরক্ষী। স্বপ্নটা এখান থেকেই শুরু হতো, কিন্তু এর আগে কী হচ্ছিল সেসবও নিকটস্মৃতি হিসেবে হাজির থাকত স্বপ্নে। যেমন, কিভাবে আমাদের ধরে নিয়ে আসা হয়েছে, কেন আমরা অবৈধভাবে ঢুকতে চেয়েছি মেক্সিকোয় ইত্যাদি। এ পর্যায়ে সবসময় পেছন থেকে গুলি করে আমাদের দুইজন লোককে মেরে ফেলা হতো। এদেরমধ্যে একজন হলো শুভাশিস হয়, এবং আরেকজন হলো শুভাশিস নয়। শুভাশিস নয় মারা যাওয়ামাত্রই কাত হয়ে শুয়ে পড়ত, আর মুহূর্তেই ওর জ্যাকেটের পকেট থেকে বেরিয়ে আসত খয়েরি রক্ত। আমি দীর্ঘদিন একই স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্নের মধ্যেই নিশ্চিত হই যে, মাথায় রিভলবার তাক করার আগেই গোঙানির তীব্রতায় ঘুম ভেঙে বেরিয়ে আসব আমি। আর তাই, পায়চারিরত মেক্সিকান সীমান্তরক্ষীর সামনে দাঁড়িয়েই ভাবতাম—একটা গোঙাতে থাকা জেগে ওঠায় নিজেকে দেখতে পাব স্বপ্নে। আর ঘাড় শিরশির করা বাতাসে টের পাব পেছনে হেঁটে বেড়াচ্ছে সেই নাইজেরিয়ান বিড়ালটা। স্বপ্নটা এখান থেকেই শুরু হবে, কিন্তু এর আগে কী হচ্ছিল সেসবও নিকটস্মৃতি হিসেবে হাজির থাকবে স্বপ্নে। যেমন, কিভাবে বিড়ালটাকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে, কেন আমি অবৈধভাবে বিড়ালটাকে ঢোকাতে চেয়েছি কম্বলে ইত্যাদি।

 

“ম্যাও?” জানতে চায় রুশাই।

মাথা নেড়ে সায় দিই আমি।

“মাথা নাড়াও?”

“হুঁ।”

“কিন্তু আমার ওয়েবক্যাম নষ্ট, আমরা অডিও কলে তাশা!” শুধরে দেয় রুশাই।”

প্রস্তুত হয়ে বলি, “ও! ম্যাও তো বটেই!”

হাসতে থাকে রুশাই, সত্যি করে জানতে চায়, “মার্গারকে টেক্সট করতেছো মোবাইলে, রাইট?”

“উঁহু।” অস্বীকার করি আমি।

“তাহলে! মনোযোগ নাই কেন?” জানতে চায় সে।

বলি, “আচ্ছা রুশাই, মারিয়া যদি হঠাৎ এসে বলে সে গ্রেগন্যান্ট! কী করব তখন?”

“তনুর বাসায় গিয়ে আশ্রয় নিবা।”

“হুঁ, ঠিক আছে।” মেনে নিই। এবং প্রস্তাব দিই, “বাচ্চাটার নাম রাখব তারু!”

লাথি মেরে আমাকে খাট থেকে ফেলে দেয়া হবে, রেগে গিয়ে রুশাই বলে।

“কিন্তু বিশ্বাস করো রুশাই, ঊষসীর সাথে সত্যিই আমার কোনো ধরনের সম্পর্ক নাই।” জোর দিয়ে বলি।

“অধরনটাই একটা ধরন হয়ে থাক? ধরন তো খুবই লিমিটেড ব্যাপার, তাই না?”

অন্যমনষ্ক লাগে। বলি, “ম্যাঁওম্যাঁও মাম্পাই তুরা!”

তাতে রুশাই বলল, “আয় রে তাশা, তোরে কুড়ায়ে নিয়ে আসি!”

“আচ্ছা।” আমিও ঠোঁট বাঁকিয়ে বললাম।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য