home কবি নির্বাচিত ২৫ নির্বাচিত ২৫ কবিতা ।। আন্দালীব

নির্বাচিত ২৫ কবিতা ।। আন্দালীব

আজ পহেলা অক্টোবর। বাংলা ভাষার কবি আন্দালীব-এর জন্মদিন। কবির জন্মদিনে শিরিষের ডালপালার শুভেচ্ছা। পড়ুন কবির স্বনির্বাচিত ২৫টি কবিতা।

 

একটা রঙিন ফুলের পাশে

তিনি দেখছেন
একটা রঙিন ফুলের পাশে
লেখা আছে এবারের বসন্ত
বিথোভেনের সকল প্রজাপতি
চাপল্য নিয়ে উড়ে গেছে
এক অফুরান হর্ষের দিকে
তিনি দেখছেন
খানিক ঢলায়িত কোন
মালিনীর হাসি
বাগানবিলাস
আহা লাস্যের রীতিনীতি
তিনি জমিয়ে রাখছেন খুব
সবুজ প্রকোষ্ঠে
বুকপকেটের খাঁজে
তিনি তুলে নিচ্ছেন
বসন্তবেলার নুড়ি
এই বিভোর মেট্রোপলিসে
লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা দালানেরা
নুয়ে আছে কেমন এবার বসন্তে
তিনি দেখছেন
রংমশাল হাতে মানুষেরা
ছড়িয়ে পড়ছে আনাচে-কানাচে
গোলার্ধ না জেনে
তিনি দেখছেন
একটা রঙিন ফুলের পাশে
কী করে চুপচাপ বসে আছে
সংবেদনের অধীর প্রজাপতি

 

শিস বাজাচ্ছ অ্যানার্কিস্ট

শিস বাজাচ্ছ অ্যানার্কিস্ট
তুমি ফড়িঙের যৌথতা ভেঙে দিচ্ছ
প্রথাব্যঞ্জন
আমাদের বাতাসবাহিত আলাপনগুলো
এড়িয়ে চলে যাচ্ছ তুমি এত দূর
এই দ্বিধার সন্নিকট
একেকটা সন্ত্রস্ত গোলাপের কাছ থেকে
জেনে নিচ্ছ
আকাশ কতটা পাখিসঙ্কুল এ’খানে
কতটা এ’খানে প্রথার বিস্তার

তুমি শিস বাজাচ্ছ অ্যানার্কিস্ট
তাতে বিনম্র ভেঙে পড়ছে শূন্যের নগর
দ্বিধাসৌন্দর্যে

তবু নতজানু হয়ে কেউ দাঁড়াচ্ছে না
কেউ না

 

মধ্যযাম থেকে কয়েক ছত্র

১২ঃ০০
রাত বারোটায় ঘড়ির কাঁটাগুলো স্তিমিত হয়ে আসে।
সঙ্গমের চে’ বারান্দায় দাঁড়াবার ইচ্ছেরা তীব্র হয়।

১২ঃ৪২
আমার কেবলি মনে পড়ে একশৃঙ্গী হরিণের কথা।
বিরহী বনাঞ্চল, দূতাবাসের রাস্তা — যেখানে এসে আর
পথ খুঁজে পায় না বোকা পর্যটক। হায় মৃগ-নাভি!
কস্তুরী ঘ্রাণে থৈ-থৈ উপচে ওঠে রাত থেকে রাতের শহর।

০১ঃ৩৫
ঘুড়িশিকারে গেল যারা তাদের কোন উচ্চতাভীতি নেই।
দূরবর্র্তী শহরের খাঁজে তারা গচ্ছিত রেখে আসে বায়ুপ্রবাহ,
সূর্যাস্তের স্মৃতি — এ’সব মনে আসে আমার সন্তর্পণে,
আঁধারবেলায়। রাত দেড়টায়।

০২ঃ০৮
মধ্যযাম! তোমাকে লক্ষ করে শহরের অনিদ্রারোগীরা সব
ঘড়ি থেকে খুলে নিয়েছেন ঘুমের কাঁটা। বুকপকেটের খাঁজে
রেখে দিয়েছেন সেবনপ্রতীক্ষ্য ঘুমের বড়ি। অফুরান টক্সিক মদ
রেখেছেন তারা রাতের গহিনে, ম্রিয়মাণ কিছু জোনাকির সহায়তায়।

০২ঃ১৫
এ’পর্যায়ে ফশ্ করে এক কাঠি সিগারেট ধরানো যায়; সহজেই,
নিথর আমার ঘুমের বারান্দায়।

০২ঃ৩৭
অসফল সঙ্গমের শোক বুকে চেপে ঘুমিয়ে পড়েছে যারা
অনিদ্রারোগীর আকুলতা এর চে’ বেশি কিছু আর নয়।
ফ্রিজিয়াম! ওহ্ ফ্রিজিয়াম!
মরফিয়াসের চোখের গভীরে দেখি নিস্তরঙ্গ আমার শহরখানি ডুবে যায়।

 

মিরর মিরর

ফিরেছি পারদের দেশে,
খুনোখুনি আর ক্লিন্ন পৃথিবীর
যুদ্ধোত্তর সব ট্রেঞ্চ ভালবেসে।
মানুষের চামড়ায় মোড়ানো
শোক বই পড়ে জেনেছি –
জগতে তুমিই সুন্দর,
বাকী সব উৎকট, মিথ্যে।

ওই কীটদুষ্ট গাছের ছায়ায়
পড়ে আছে যত ইচ্ছেচালিত যান
অশ্বশক্তির অপচয় রোধ করে –
তারা জানেনি খর গ্র্যাভিটির টানে
কী উলম্ব চলেছে জগত
আজ রসাতলের দিকে!

ওই সুতীব্র ভোর্টেক্স বেয়ে
নেমে যেতে-যেতে ভাবি
জগতে তুমিই সুন্দর, বিম্বিত
ধ্বংসের পরাবৃত্তে।

 

ভিয়োলা

কতটা রোদের দেশ থেকে মিহিন
জেগে ওঠে কুয়াশা! তোমার ম্লান ত্বক, বিমর্ষ ভূ-গোল,
আমার এই বিহন-বিহন বেলা।
এইসব নিথর অরণ্যানী মূলত নীল দেয়াল এক,
হায় প্রমিত সুন্দর! যার পাশে বসে তৈরি হয়
বেদনার সাঁকো, দীর্ঘশ্বাস, প্রসূন ছায়ার খেলা।

কুয়াশায় ডুবে গেলে তাবৎ বনানী,
পৃথিবীর সমস্ত জানালায় জেগে থাকে ভুল দৃশ্য,
শীতঋতু, আর একটা মেপল কাঠের বেহালা।

 

হাওয়ালেখ

১.
নিরর্থের দিকে যাও। চিনে নাও, তোমার সমাধিতে কারা এসে
ঠুকে যায় হাওয়ার ফলক।

২.
ঘোর লাগে প্রপেলারে। কার গায়ে জেগে থাকে ওই মেরুন
রাত্রিবাস? দ্যাখো মানুষপুতুল, লৌহকারখানা থেকে উঠে আসে
কেমন সুগ্রীব বিমানের ঝাঁক! আমাদের আশ্চর্য অ্যারোড্রোমগুলো
ডানা ভাঙার আর্তনাদে ভরে ওঠে। মানুষ জেনে গেছে পতনের
শব্দ মূলত জাগতিক সংকেত এক পুনরায় জেগে ওঠার। ফলে
বাতাসের গান বাজে, তরঙ্গ লিখে রাখে আয়নোস্ফিয়ার।

৩.
ফুটেছে হাওয়ার ফুল। নীল আমব্রেলা। অসুখের দিকে রাত্রি
সরে গেছে। গ্রন্থ-মলাটের নিচে বয়ে গেছে রক্তাল্পতা। আমরা তো
দেখিনি আজও প্রসূন-সভ্যতা, আইসিস, দেখিনি নতমুখী ফুল।
গ্রন্থ’সরণির পাশে কী করে শুয়ে থাকে নশ্বরতা! হায় মুদ্রারাক্ষসের দল,
তোমাদের কাছে জমা রাখি আয়ুর ভ্রমর, সুখ্যাতি, আত্মখুনের বারতা।

৪.
এ’ বৈধব্যে পুড়ে যাক মেঘ। হাওয়ার বারতা। তুমি প্রাচীন পুস্তক
নিয়ে কথা বল, যার ভাষা অস্পষ্ট। প্যাপিরাস হে, দিকে-দিকে
কার এত গোপন সংকেত আসে! বিদূষিকার লণ্ঠনে লেগে থাকে
নির্জ্ঞান, প্রবুদ্ধ শহরের আলো। মহাচৈতন্যের মাঝখানে নিশ্চেতন
যেই দেবদারু গাছ আছে, অনুবাদে তারাও সক্ষম। তারা জানে
পৃথিবীর প্রাচীন পুস্তক সব মেলে ধরা আছে বিদূষিকার দিকে।
যার তৃতীয় নয়নে বিদ্ধ তীর। যার করপুটে অতীতের লিখনরীতি হাসে।

৫.
শেষমেষ গ্যাসোলিনই সত্য, গতিনির্ভর এই পৃথিবীতে আর
রাষ্ট্রনায়কেরা পিস্তলেরো। ফলে বুদ্ধি ব্যতীত আর হারাবার
কিছু নেই। আজ পৃথিবীর ম্যাপ নিয়ে মেতে আছে কারা?
উজবুক না কোন রাজর্ষী? কার নাম লেখা আছে গ্যালিলির
সমুদ্রতটে? সে সত্য সযতনে লুকিয়ে রাখে আজ লৌহ,
আকরিকের পাখি।

৬.
নেমে যাই ধীরে, এই অষ্পষ্ট গানের মাঝে। দেখি ফুটে আছে
ধূম্রস্বর, লহরী। গাগরি ছলকে ওঠে, গমকে গমকে। ভাঙে ক্রম,
শ্রুতিবিশ্ব। পদপ্রান্তে নেমে আসে সমুদ্র সোপান। অবরোহ গান
বাজে ইথারে-ইথারে, আজ গীতনির্যাস। পুষ্পরথ চেপে কারা
চলে যায় দূরে? তারা জানে প্রস্থান আসলে হাওয়ার কারসাজি,
হাহাকার মূলত বনমর্মর।

৭.
উড়ে যাও ধ্বস্ত কাগজের প্লেন, এই বিজন ফরেস্ট, এই ব্যাকুল
সাব-আরবান দৃশ্য পেরিয়ে। যত দূর দেখ আজ চিৎপ্রকর্ষ, শঙ্কার
বিপরীতে জেগে থাকা রোদ। ছায়ার কাঠামো, বিটপ আর ছিন্ন
পত্রালী। কর্পূরের মত উবে যাওয়া উড্ডয়নপথ, তারও তো
বিয়োগচিহ্ন থাকে, যার দিকে চেয়ে ন্যুব্জ হয় কাগজের প্লেন,
তার ব্যথাতুর ডানা গুটিয়ে আসে।

৮.
কে থাকে আগুনপাহাড়ে – সে’ প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি আজও।
শুধু দূর দিকে চেয়ে মনোলিথখানি মৃদু হেসেছে। বাতাসে উড়েছে
ভলক্যানোর ছাই; ভস্মাধার পরিপূর্ণ হয়েছে। জেগে উঠেছে ওই
আকরিকের পাখি, যার আগুনে-ডানায় চেপে উভচরেরা মৃত্যুর
সীমানা পেরিয়েছে। অনতিদূরেই ধসে পরেছে পাথরের সেতু।
ফলে চিরপ্রশ্ন হয়ে দূরে আগুনপাহাড় শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছে।

৯.
ওঠো আজ, অনাবিষ্কারে চলো। স্তূপাকার পড়ে আছে যেখানে
জংধরা জাহাজের শব। উদ্গার শেষে ফিরে আসা যুদ্ধাস্ত্রের গায়ে
লেগে আছে আজও বহু যুদ্ধের তাপ, বহু স্খলনের চিহ্ন। আর যত
ওই ধাতব আকাশ, যতটা আলকালির সমুদ্র – তুমি লিখে রাখো
খাতায়, চিরকূটে; সেই সব মুছে যাবে। স্ফুলিঙ্গ রবে শুধু, অগ্নিকু-
রবে। যত কামারশালার গান, হাপরের শব্দ চিরকাল রয়ে যাবে
হৃদয়ে আমার।

১০.
কিংখাবে রাখো প্রেম। বিরহ তোমার। আজ রণক্ষেত্রের দিকে
উড়ে যায় চূর্ণ চকিত গান যত; তারা জানে ধাতু নিগ্রহ,
জানে হাপরের ছল কতোটা ধরে রাখে যুযুৎসা আমার।
যদি হননের রাত আসে, যদি ক্রূর হাসে আকরিকের ফলা;
তবে স্থানু হও, আর নতজানু হও। বৃশ্চিকসূর্যের নিচে
আজো কারা গান গায় এমন পেগান?

 

গার্হস্থ্য ফুলের দেশ

সশব্দে ফোটে ফুল। এই হিম রাত্রির লনে,
আকাশবিহারী। হাওয়া আসে যথেচ্ছ;
ঘনীভূত কম্পোস্টের দিকে
এসে হেলে পড়ে কুঞ্জ-লতা, কেয়ারি।

আজ লাঞ্ছিত ক্রিসেনথিমাম
কী দারুণ জেগে থাকে
ওই গার্হস্থ্য ফুলের দেশে! রাহু চলে খুব,
হাওয়া বয়। ছিন্ন পাপড়ির আবরণে
গহন ঘুমোয় কোরক,
পৃথিবীর যত বসন্ত-বিপর্যয়।

 

কেউ এসে চলে গেছে

কেউ এসে চলে গেছে
ওপরের ঘরে
নির্লিপ্ত চাবিসারাইয়ের লোক
একটা পাখি শুধু অস্পষ্ট
রোদের কার্নিশে বসে আছে

বিবদমান স্কুলবালকের দল
যাদের বচসা সমস্ত
ইকো হয়ে ফিরে গেছে দেয়ালে দেয়ালে
আর সিঁড়ি ঘরে তখন
কেউ এসে চলে গেছে … কেউ এসে
খুব সন্তর্পণে

কাঠের দরোজায়
একটা দীর্ঘ ছিটকিনির সংশ্লেষ ভুলে
বিষণ্ন বালকের দল
নতমুখে রাস্তা পেরিয়ে চলে গেছে
এমন অনতিদূর
ডানা ফেলে উড়ে গেছে মোহন
কার্নিশের পাখি

চাবিসারাইয়ের লোকটা
রাস্তা হেঁটে-হেঁটে রিনিকিঝিনিকি
ম্যাজিক বাজাচ্ছে
ম্যাজিক বাজাচ্ছে

 

বাসে লেখা কবিতা

(আপ)

দেখো মানিকগঞ্জের আকাশ কী নীল
দেখো রৌদ্রোজ্জ্বল গাড়ি
কেমন সেতু-পারাপারে রত
তিনজন বোটানির ছাত্রী
বাস থেকে নেমে গেলে
ম্লান হল চতুর্পাশ
মাইলপোস্টগুলো হল বিরহের সারি

(ডাউন )

নৈশ নৈশ পথ
রুবিনা আক্তার
তোমার সিঁথির মত সরল
শুয়ে আছে আরিচার মহাসড়ক
ভ্রমণজনিত ক্লান্তি

নাকফুল
আমি দেখি তারার বিস্তার
বিরহসুন্দর চাঁদের দিকভ্রান্তি

 

বেবিসিটার মহিলার চোখ

আমি তার বাহুপাশে খুব মোলায়েম ঢলে পড়ব।
উদ্বাহু ব্যাকপেইনের ভেতর আমার শাণিত বৃশ্চিকগুলো
হেসে উঠবে যখন।

আমি ঐ বেবিসিটার মহিলার স্নেহার্দ্র চোখ থেকে
অফুরান বর্ষা ঋতু খুলে নেব। তার বাহুলগ্ন
দৃশ্যাবলিতে গোপনে সংযুক্ত হব এসে।

স্পর্শাকাক্সক্ষী শিশুর মত অনু’খণ তার বাহু-পাশে ঘুরে-ঘুরে
একদিন আমিও খুব ক্লান্ত ঘুমিয়ে যাব।

 

জলে

নৌবিদ্যা ভুলে আমি নিজস্ব কফিন
ভাসিয়ে দিচ্ছি স্থিরতম জলে,
দৃষ্টির ঔদাস্য থেকে প্রণয়ের গান মুছে দিয়ে
তবুও তো মাস্তুল জাগে
এমন ছিন্ন রাতে!

আমার শবদেহ পৃথিবীর নদীগুলোয়
ভেসে-ভেসে
একদিন ঠিক বেহুলাকে চিনে নেবে
মিথভাঙা আন্তরিক আঁধারে।

 

কাকলী স্কুলের মেয়েরা

আমার একটাও পাখি নেই। ফলে স্বভাবতই
আমার কোন চিঠি আসে না। তবু টিফিন সময়ে
বালিকা বিষয়ক নানা বিভ্রমের কথা ভাবি।
আহা প্রস্ফুটন! ডুঁকরে ওঠা ডাকবাক্সগুলোর শোক
আমাকে ভীষণ দখল করতে আসে। আমার নিজস্ব
ঘন্টাধ্বনির ভেতরে যেন হারিয়ে গেছে সেইসব
প্রার্থিত পাখিদের ঠোঁট, ফলন্ত ডাকবাক্স আর
আপাতঅসীম সমস্ত পথ। স্থবির ক্লাসরুমে বসে আমি
আজো ভুলে যাওয়া ঘাসফুলের প্রাথমিক রংটা ভাবি।

 

ট্রিগার হ্যাপি

এত কেন ঘোড়া দাবড়াচ্ছো হে তর্কবাগীশ? তোমার দিকেই
চেয়ে আছে যখন আগ্নেয়াস্ত্র সুন্দর! ওই টোটাবন্দুক হাতে
যারা শিকার করছে খরগোশ, ঘন-ঘন নিশানা পাল্টাচ্ছে;
তারা ছড়াচ্ছে কপট ত্রাস। স্যাংচুয়ারিতে নির্মম শুরু হচ্ছে
মৃগয়াপর্ব। কিছু দেখলেই লোকে বলছে – ফায়ার!

 

মদের দোকানের নিচে

মদের দোকানের নিচে সমবেত হতে হতে আমরা ভাবি
মেঘ সঞ্চিত হতে কতটা আর সময় নেয়! হ্যাংওভার থেকে
যখন খুলে আসে দিক্ভ্রান্তি, নৈর্ঋত বালকের দ্বিধা।
নাচের স্কুল থেকে সার বেঁধে বেরিয়ে আসে অসংখ্য
প্রমিত যন্ত্রের ময়ূর। বিদীর্ণ পেখম সবার! মদের দোকানের
পাশে জর্জর একটা বাল্বের ফিলামেন্ট জ্বলে, ধীরে।
ফলে মাথাপিছু প্রতিজনের ছায়া তৈরি হয়। সেইখানে
আমরা নিচু স্বরে কথা বলি, হাসি। সমুদ্রের ঢেউ এসে
আমাদের পায়ে লাগে। দৃষ্টি ও চুম্বন বিনিময় শেষে
বায়ুপ্রবাহের মত আমরা দশ দিকে চলে যাই।

 

জাহাজডুবির পর

জাহাজডুবির পর আমাদের মনে পড়ে বিকল কম্পাস, সূর্যঘড়ি আর
পলিনেশীয় বালকের দিন। যাদের জানা ছিল, এ’ যাত্রা পৌছোঁনো
হবে না আর রুটিফলের দেশ, নারকেল বীথি, সোমত্ত নারীদের জঙ্ঘা!
এ’ যাত্রা অজস্র হীরক ফলবে আমাদের বিমর্ষ জাহাজের পাশে।
আর স্পর্শ হবে অসম্ভব। এইসব দূরগামী নাবিকের আঙুল থেকে
হারিয়ে যাবে স্পর্শদাগ, প্রণয়। খালাসিরা হারাবে সোনালি মাউথ অর্গ্যান,
ব্যাঞ্জো। সমুদ্রের অতিকায় মন্থন বলে — জাহাজডুবির কথা মাস্তুল জানে
সব থেকে আগে, তারপরে আঁধার, সূর্যের অপস্রিয়মাণ আলো।
সহনক্ষমতা বস্তুত এক ঝিনুকেরই খোল, আর ভেসে থাকা
মৃত্যুন্মুখ জাহাজের চেয়ে ভাল।

 

আমার অসুখ হলে

আমার অসুখ হলে কেউ জানে না
প্রতিবার কী আনন্দে কেঁপে ওঠে মধ্যহ্রদ।
বালকেরা ঢিল ছোড়ে, হল্লা করে খুব।
আমার অসুখ হলে বৃত্তাকারে
কুচকাওয়াজ করে কারা!
ট্রাম্পেট বাজায়, আর ক্ল্যারিনেট।

আমার অসুখ হলে কেউ জানে না
একটা টি-ব্যাগ
কী ঝলমলে আলো ছড়ায়!

 

পাতাল শহরের ম্যাপ

অরণ্যগহীন
এইখানে এলে বৃক্ষের নাম ভুলে যাই
ভুলি বায়ুবেগ, উত্তুঙ্গ জিরাফের হাড়
করতলে রাখি রত্নপাহাড়, ধুলোর জীবনী

কারা যেন ছিড়ে ফেলেছে আজ
পাতাল-শহরের ম্যাপ!
অবসন্ন পড়ে আছে ঘুমের সরণি।

কোজাগর চাঁদ জেগে আছে এইসব
বলিষ্ঠ বৃক্ষের পাশে
জিরাফের উচ্চতা থেকে লাফিয়ে নামছে
ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার,
স্প্রিংয়ের রমণী।

 

ভৈরব

ব্রিজ থেকে নেমে এল অন্ধ ট্রাক
পাখিরা ধ্যানস্থ হল
আমাদের সামনে জেগে উঠল
এক ক্ষমাহীন টোল প্লাজা
মেঘের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে
কেউ কেউ সিগারেট খেল

বৃংহণ তুলে দূরে চলে গেলে অন্ধ ট্রাক
সিগারেট ফেলে যার যার মত মানুষেরা
পাখি ও টোলঘরের মুখোমুখি হল

 

সমুদ্র সংকেত

তারপর একদিন শামুক গুটিয়ে গেল
চুলের ফিতের মত পথটুকু কিছুতেই
শেষ হল না আর —
ফলে তোমাকে দেখানো হল না সমুদ্র,
বালিয়াড়ি, দিকচিহ্নের প্রপঞ্চ।
তোমাকে দেখানো হল না আর
নবম মেঘের ওপর কতটা
ঢলায়মান রাত্রি! এই লুম্পেন কুয়াশা
চিরে ফিরে যাওয়া আসলে কতটা অসম্ভব।

 

ডুব

বর্তুল পৃথিবীর সমুদ্রপারে আমি আজও সেই
জাহাজের মাস্তুল গুনি। জলরেখা থেকে এশিয়ার
সব নৌযান ফিরিয়ে দিই, আহা বাণিজ্যবায়ু!
তোমার চোখের গভীরে ওই ধ্বস্ত সূর্য ডোবে।
রেঙ্গুন থেকে আসে বিষণ্ন তারার আলো।
অমরতা ডাকে। পৃথিবীর ছাত থেকে
চন্দ্রাহত মানুষেরা একে-একে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়।

 

নিবিষ্ট ঘূর্ণির কাছে

তাকে দেখা গেল না আর কোন মানমন্দির থেকে। জন্মান্ধ
টেলিস্কোপের ভুল ভাঙলো। দূর গ্রহাণুপুঞ্জ আর নক্ষত্রের মাঝে
মিশে আছে যেই মুখ, সে কী কসমিক বেদনা, না কোন ভ্রান্তি
অপার? এক দিশেহারা উল্কার পিছে ছুটে হারিয়েছি তার মুখ,
ধ্রুবতা। স্পন্দ্যমান ওই আলোকরেখার পর যত দূর বিস্তৃত
হৈম অন্ধকার, সেইখানে জ্বলে বৈদুর্য্য, অয়োস্কান্ত, ধিকিধিকি
জ্যোতির্বিজ্ঞান। কোনও একদিন নিবিষ্ট ঘূর্ণির কাছে জানতে
চেয়েছি, জগতের সব রহস্য কেন অতল। সব রঙ রক্ত-অরোরা?
হারিয়ে যাওয়া মানুষের মুখ কী কারণে অমন নক্ষত্রসংকাশ।

 

পাড়ি

এমন ডিসেম্বরে রেতঃপাতের শোক জেগে ওঠে আমার।
হাওয়ায় হাওয়ায় সাদা পৃষ্ঠাগুলো উড়ে যায়। অপরূপ
হয়ে উঠবার সমস্ত সম্ভাবনা ডিঙিয়ে বিষণœতায় যখন
ডুবে গিয়েছিল আমাদের বিবিধ পানপাত্রের হাতল,
দূর থেকে ভেসে আসছিল বিগত শিকারের দৃশ্যাবলি
আর চারিদিকের তামাম হনন।

আমার হননেচ্ছা … হায়! তামাদি পড়ে আছে দিকচিহ্নহীন
কোথাকার কোন এক লোহার সিন্দুকে! আমি তো বস্তুত
শিশ্নহীন কামুক। শরবিহীন এক তীরন্দাজের বোধকে
সাথে করে পেরিয়ে গিয়েছি এ’যাবৎকালের সকল তৃণভূমি।
আমার রেতঃপাতের শোক কাটে নাই তবু।

আমি কী সহজ হারিয়ে ফেলেছি যা ছিল আমার
সমস্ত কৌপীন, মেধার কলম, সবুজ লেখার অফুরান কালি।
আমি প্রকৃতই হারিয়ে ফেলেছি সম্ভোগের তাবৎ কৌশল,
এমনকি ছল করবার যৎসামান্য পন্থা প্রকরণ স’বি!

 

স্বপ্নের কথা

কাউকে বলিনি স্বপ্নের কথা। ধেয়ে আসা হারপুনের কথা।
তবু সকলেই জানে তরঙ্গ বিলাপ। জানে এ মোহন মৃত্যুবাণ
রচনা করেছে কারা। আজ মারী ও রাহুগ্রস্ত জাহাজের চিৎকারে
ভরে আছে বন্দর, সমুদ্রপারের রূপকথা। আজ পিঙ্গলাকাশ
থেকে নেমে আসা আলোয় প- হল সব হাঙরের ভোজসভা।
এই নিয়ে কৌতুকে মেতে আছে দুখী মারমেইড আর নিরানন্দ
সমুদ্রচিলেরা।

 

মন্দ্রধ্বনির বাঘ

বনমর্মর থেমে গেলে ঐ শোনা যায়
শরবিদ্ধ হরিণ জাগে উপত্যকায়
কেন ত্রস্ত জগত আজ মর্মবিধুর
গানে মগ্ন হয়েছে নিশ্চুপ ইশারায়
ফোটে বৃন্দময়ূর ফোটে বৃন্দপলাশ
স্বরবৃত্ত ভেঙে নামে ব্যাধের তরাস
এই মুর্চ্ছিত পল শেষে জানবে সে কী
কোন টঙ্কারে কেঁপে ওঠে তার নিঃশ্বাস
আজ সৌরপতন জুড়ে শরশয্যার
ব্যথাক্লিষ্ট আভাস বেদনা-শৃংগার
কিছু বর্তুলাকার কিছু সামন্তরিক
বাকি বৃক্ষরাজি শালপ্রাংশু আকার
রোষতপ্ত হাওয়া ঐ চোখের তারায়
নামে মন্দ্রধ্বনির বাঘ মন্থরতায়

 

তার ঘুমন্ত মুখের দিকে

তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালে মনে হয়
ঘড়িদেরও একটা নিজস্ব গান আছে।
সময়ের চরকায় লেখা আছে আমাদের
নিবিড় বেদনার বোধ, ঘূর্ণনের কৃৎকৌশল।

তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালে মনে হয়
সাইকেল হারানো বিজন বালকেরা
শোকাবহ দাঁড়িয়েছে এসে
এক মৌন পাহাড়ের নিচে। সময়ের পারদে
লেখা আছে কত-শত নদীর প্রবাহন!

তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালে মনে হয়
আহত ঘড়ির কাঁটায় লেগে আছে রোদ্দুর,
হাওয়ার সান্দ্রতা, সুবৃহৎ টোটেম বৃক্ষরাজির গুণাগুণ।

 

anda
আন্দালীব
জন্ম: ১ অক্টোবর ১৯৭৮। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বৃশ্চিকসূর্যের নিচে (২০১৬), টোটেম সংগীত (২০১১), ফ্রস্টেড গ্লাসের ওইপাশে (২০০৮)। বর্তমানে ঢাকায় একটি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য