home ই-বুক, উপন্যাস ধারাবাহিক উপন্যাস – ‘তারাদের ঘরবাড়ি’ ।। অলোকপর্ণা ।। পর্ব ১৩

ধারাবাহিক উপন্যাস – ‘তারাদের ঘরবাড়ি’ ।। অলোকপর্ণা ।। পর্ব ১৩

                                 তারাদের ঘরবাড়ি – ১৩

 

চলে যাওয়ার আগে থমকে দাঁড়ায় পিকলু। কিন্তু পিছু ফেরে না। ইন্দিরা দেখে কাঁচের দরজা দিয়ে দূরের দিকে সরে যাচ্ছে পিকলু বা মৈত্রেয় চৌধুরী। ধীর পায়ে এয়ারপোর্ট লাগোয়া বাস স্ট্যান্ডে ফিরে আসে ইন্দিরা। ঘড়িতে যখন সাতটা বেজে আট মিনিট, তাকে নিয়ে একটা কেআইএএস বাস শহরের দিকে ফিরতে শুরু করে।

“মানুষ কি কোনোকিছুর জন্যই… তৈরি থাকে?”

“মানে?” এয়ারপোর্ট আসার পথে পাশে বসা পিকলুর দিকে তাকিয়েছিল ইন্দিরা।

“মানুষ জন্মাচ্ছে,… মরে যাচ্ছে, বড় হচ্ছে, চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে, দাঁত পড়ছে, দাঁত উঠছে,- শরীর তৈরি সবসময়,… মন? কখনো তৈরি নয়। কক্ষনো তৈরি না। মন তৈরি হয় রানটাইমে, প্রসেসটা… প্রসেসটা চলাকালীন।”

“সবসময় তা নাও হতে পারে, হতে পারে মন কখনোই তৈরি হলো না, আর একটা জীবন কেটে গেল”

“হতে পারে… হতেই পারে, হচ্ছে, হচ্ছে তো…”

ইন্দিরা বলে, “চল, আমরা এসে গেছি।”

এরপর পিকলু আর কোনো কথা বলেনি। কাঁচের দরজা পার করে দূরের দিকে সরে গেছে।

বাসের জানালা দিয়ে ইন্দিরা বাইরে তাকায়, বাইরে সাজানো-গোছানো পথ, সর্পিল। মানুষের যাতায়াত সহজ করে দেওয়ার জন্য অন্ধকার টানেল ছড়িয়ে গেছে হাওয়াশহরের চারদিকে।

 

 

ক্লাসে ঢুকতে ইন্দিরা টের পায় আজ যেন বাকিরা একটু বেশিই চুপচাপ। তাকে ঢুকতে দেখে রুবাঈ হাতছানি দিয়ে ডাকে, কাছে আসতে ইন্দিরার কানে কানে ফিসফিস করে সে বলে, “সবার কাছে একেক করে ফোন আসছে, প্রজেক্ট অ্যালোকেট করা হচ্ছে”

“একেক করে মানে?”

“অ্যালফাবেটিকালি”

“আনন্দী…?”

“ওর কাছেই ফোন এসেছে এখন, কিছু একটা নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে, বাইরে দেখলে না ওকে?”

“কই না তো…” ইন্দিরা কাঁচের দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়, কিছু চোখে পড়ে না। সে জিজ্ঞেস করে, “হিরণ আসেনি?”

“না, কি কাজ আছে ওর ব্যাংকে, তাই দেরি হবে”

“ওর অ্যালোকেশান?”

“মেইল করে দিয়েছে আরজিএম-কে, তারা বলেছে অসুবিধা নেই, ও এলে কথা হবে,”

“আচ্ছা”, ইন্দিরা আবার বাইরের দিকে তাকায়।

“তোমার দাদা কটায় পৌঁছাবেন?”

“এগারোটা নাগাদ বাড়ি ঢুকে যাওয়া উচিৎ”

ইন্দিরা দেখে আনন্দী ক্লাসরুমে ঢুকছে, তার মুখ লাল হয়ে আছে, ফোনটা সে চিন্ময়ী সেলভাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে রুবাঈয়ের পাশে এসে বসে পড়ে, রুবাঈ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আনন্দী বলে, “I cannot believe it! এই শহর! এই শহরে আরো এক বছর!”

রুবাঈ আর ইন্দিরা পরস্পরের দিকে তাকায়, রুবাঈ বলে, “তোমার ভালো লাগে না শহরটা?”

“না”

“কেন?” ইন্দিরা জিজ্ঞেস করে।

“There is no reason to like this city!” বলেই আনন্দী চুপ হয়ে যায়।

রুবাঈ বলে, “হ্যাঁ মানছি এখানকার কালচার, খাবার সবই উত্তর ভারতের থেকে একদম আলাদা, কিন্তু শহর হিসেবে এটা কি খুবই খারাপ?”

আনন্দী কিছু একটা বলতে মুখ খোলে, কিন্তু ইন্দিরা তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কোনো কারণ ছাড়া কি কোথাও থেকে যেতে নেই?”

আনন্দী আরো কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। আর সাথে সাথে চিন্ময়ীর হাত থেকে ফোন ইন্দিরার হাতে চলে আসে।

অপর প্রান্ত থেকে মহিলা কণ্ঠ জানতে চান, “We have few options for you, তার মধ্যে কোলকাতা তোমার ফার্স্ট প্রেফারেন্স, তাই তো?”

“অন্য কি অপশন আছে আপনার হাতে?” ক্লাসের বাইরে চলে আসে ইন্দিরা।

“পুনে, চেন্নাই আর এই শহর, তুমি কোলকাতা যেতে চাও না?”

“I would like to spend more time in this city”… with this city, মনে মনে বলে ইন্দিরা।

“Ok, great then! তোমাদের অ্যাসেসমেন্ট কাল, পরশু I hope you will be able to report to your manager regarding your first assignment.”

ফোনটা লাবণ্যা যশরাজের হাতে তুলে দিয়ে ইন্দিরা সিটে এসে বসে।

রুবাঈ জিজ্ঞেস করে, “কবে ফিরছো?”

ব্যাগ থেকে নোটবুক বের করতে করতে ইন্দিরা টের পায় আনন্দীও তার দিকে তাকিয়ে আছে, ইন্দিরা বলে, “ফিরছি না।”

“ওরা অপশন দেয়নি, না?” আনন্দী জানতে চায়।

ইন্দিরা বলে, “না। দেয়নি।” প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য ইন্দিরা বলে, “বাই দা ওয়ে, কি একটা অ্যাসেসমেন্টের কথা শুনলাম, কি সেটা?”

“তুমি জানো না?!” রুবাঈ অবাক হয়ে যায়।

“সত্যিই জানো না?” আনন্দীর চোখে খানিক সন্দেহ।

“না…” ভয়ে ভয়ে ইন্দিরা জবাব দেয়।

“মাই গড, সেই কবে থেকে ট্রেনার বলে চলেছেন এক কথা, তোমার মন কোথায় থাকে!” হিরণের গলা শুনে ইন্দিরা দেখে সে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের সামনে।

“প্রজেক্ট পেলে?” রুবাঈ জিজ্ঞেস করে হিরণকে।

“হ্যাঁ, এখানেই… অন্য কোনো অপশনই দিল না বেহেনচোধগুলো…”

“আস্তে হিরণ!” রুবাঈ কোনো রকমে হিরণকে চুপ করায়।

“Whatever…” হিরণ ইন্দিরার দিকে ফেরে, বলে, “আমাদের এতদিন যা যা পড়া হয়েছে তার উপরে ফাইনাল এক্সাম হবে কালকে, now don’t you say যে তোমার পড়াও হয়নি”

ইন্দিরা অসহায় দৃষ্টিতে হিরণ রুবাঈ আর আনন্দীর দিকে তাকায়, বলে, “এতে ফেল করলে কি হবে?”

 

 

ইন্দিরাকে ঘিরে হলঘরের মেঝেতে বসেছে রুবাঈ, আনন্দী আর হিরণ। মক টেস্ট পেপার নিয়ে তারা একেক করে প্রশ্ন করছে ইন্দিরাকে। এবং ইন্দিরা তার কোনো জবাবই দিতে পারছে না। একটা সময় পর ইন্দিরার মাথা ধরে আসে।

তবু রুবাঈরা তাকে জোর করে বসিয়ে রাখে।

আরো কিছুক্ষণ পর যখন সবাই বুঝতে পারে যে আজ অবধি ইন্দিরার কানে এক বর্ণও লেকচার এসে পৌঁছায়নি, ইন্দিরা হাল ছেড়ে দিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। সিলিংয়ে চোখ রেখে সে বিড়বিড় করে বলে, “আমি জানি আমি ফেল করতে চলেছি…”

মুখ ফেরাতে সে দেখে রুবাঈ আর হিরণ মাথায় হাত রেখে বসে আছে।

আনন্দী বলে, “তাই বলে একেবারে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না”

হিরণ বলে, “আর সময় কোথায়! ও একবর্ণও জানে না!”

রুবাঈ বলে, “কিছু তো একটা করতে হবে!”

আনন্দী বলে, “আমি দেখছি কি করা যায়”

ইন্দিরা বলে, “আমি চিটিং করবো না”

হিরণ বলে, “করার উপায়ও নেই, ওরা তোমার কম্পিউটার স্ক্রিন লক করে রাখবে, শুধু এক্সাম উইন্ডোটুকু সক্রিয় থাকবে”

রুবাঈ বলে, “কোনো রকমে ত্রিশটা নম্বর যদি তুলতে পারো আর কিছু ভাবতে হবে না”

ইন্দিরা ভেবে পায় না সেটুকুও কি করে সম্ভব হবে। সে বলে, “আমার মাথা কাজ করছে না”

“দাঁড়াও কফি ব্রেক নেওয়া যাক একটু”, হিরণ উঠে কিচেনে চলে যায়।

রুবাঈয়ের ফোন বেজে উঠতে সে বারান্দায় চলে যায়।

ইন্দিরা দেখে আনন্দী খাতায় কিছু একটা নোট নিচ্ছে।

সকালের কথা মনে পড়ে যায় ইন্দিরার, “কারণ”… আনন্দীর কাছে এই শহরে থেকে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। ইন্দিরা তাহলে কি কারণে হাওয়াশহরে থেকে যেতে চাইছে? নাকি তার ফিরে যাওয়ার আর কোনো কারণ নেই বলে সে কোথাও যাচ্ছে না? ইন্দিরা উঠে বসে।

আনন্দীকে জিজ্ঞেস করে, “যদি ফেল করি সত্যিই চাকরীটা চলে যাবে?”

“তাই তো বলেছেন ট্রেনার”

ইন্দিরা টের পায় তার কপালে ঘাম জমছে।

“তুমি চিন্তা কোরো না। শুধু খুব মন দিয়ে পড়ো, আমি তোমার জন্যই নোট তৈরি করছি”

“লাগবে না”, মুখ ফসকে বলে ফেলে ইন্দিরা।

আনন্দী লেখা থামিয়ে দেয়, “লাগবে না মানে?! তুমি পাস করতে চাও না?”

“চাই”

“তাহলে? কেন বলছ যে নোটস লাগবে না?”

“অকারণে। সবকিছুর কারণ থাকা প্রয়োজনীয় নয়।”, নিজের কানকে বিশ্বাস হয় না ইন্দিরার, কথাটা শেষ হতে না হতেই প্রায় পালিয়ে আসার মত উঠে কিচেনে চলে আসে সে।

 

ইন্দিরা দেখে গ্যাসে দুধ ফুটতে দিয়ে হিরণ কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে, সে জিজ্ঞাসা করে, “কিছু চাই?”

“হ্যাঁ, কফি পাউচ খুঁজে পাচ্ছি না…”

ড্রয়ার থেকে কফির পাউচ বের করে হিরণের হাতে তুলে দেয় ইন্দিরা।

“থ্যাঙ্কস”, কাঁচি দিয়ে পাউচ কেটে দুধে মেশাতে থাকে হিরণ।

কফির গুঁড়োগুলোকে দুধের ফেনার উপরে আটকে যেতে দেখে ইন্দিরা। সে বলে, “সেদিন আমার ওভাবে রিঅ্যাক্ট করাটা উচিৎ হয়নি…”

“কবে?” চামচে করে কাপে চিনি ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করে হিরণ।

“হোলির দিন… যখন তুমি আমায় উপরে ডেকে নিয়ে যেতে এসেছিলে, I’m sorry”

“এই নাও”, ইন্দিরার হাতে একটা কাপ তুলে দিয়ে হিরণ বলে, “It’s ok, I know what happened in that morning”

“কি করে জানলে?”

“আনন্দী আমায় বলেছে”, বাকি কাপগুলো ট্রে-তে তুলে নিয়ে হিরণ বলে, “চলো, আবার বসা যাক”

কিচেন থেকে বেরোতে গিয়েও হিরণ থেমে যায়, বলে, “সত্যি বলতে, সেদিনের পর আমি ভেবেছিলাম আর কখনো তোমার সাথে কথাই বলব না। কিন্তু তারপর আনন্দী আমাকে বুঝিয়েছে, বলেছে কখনো কখনো অন্য মানুষকে স্বার্থপর মনে হতেই পারে, কিন্তু everyone has their own reason, own version of the story, and Indira, তোমার ভার্সনটা শুনে আমার আর রাগ হয়নি, বরং মন খারাপ করেছে, আমিও সরি, সেদিন না বুঝে তোমাকে রূঢ় কথাগুলো বলার জন্য।”

 

রাত ন’টা নাগাদ হিরণ আর রুবাঈ চলে যায়। ইন্দিরাকে বসিয়ে রেখে আনন্দী একটা মাঝারি মাপের বাঁধাকপি হাতে কিচেনে ঢুকে পড়ে। স্টাডি ম্যাটেরিয়ালের পাতা ওলটাতে ওলটাতে ইন্দিরা খেয়াল করে কিচেন থেকে সাধারণত যেমন আওয়াজ আসে, তেমন কোনো আওয়াজ আসছে না। ধীর পায়ে ইন্দিরা উঠে এসে কিচেনের দরজায় দাঁড়ায়। সে দেখে কিচেনের জানালা দিয়ে আনন্দী বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে।

“সব ঠিক আছে তো?”

আনন্দী চমকে ওঠে, ইন্দিরাকে দেখে বলে, “হ্যাঁ, ঠিক থাকবে না কেন?” বাঁধাকপিটাকে মাঝখান থেকে কেটে ফেলে আনন্দী।

ইন্দিরা বলে, “এমনিই বললাম,”

ছুঁড়ি হাতে থেমে যায় আনন্দী, বলে, “তুমি কম কথার মানুষ, যারা কথা কম বলে, তারা এমনি এমনি কিছু বলে না”

“তোমায় দেখে মনে হল তাই বললাম”

আনন্দী হাত থেকে ছুঁড়ি নামিয়ে রাখা ইন্দিরার দিকে ফিরে দাঁড়ায়, “আমায় দেখে কি মনে হল?”

ইন্দিরা ঘাবড়ে যায়, আনন্দীর নজর আবার যেন বদলে গেছে, ইন্দিরা বলে, “অন্যদিন… অন্যদিনের থেকে আলাদা”

আনন্দী আরো কিছুক্ষণ ইন্দিরার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার ছুঁড়ি হাতে বাঁধাকপি কাটতে শুরু করে। কিচেনের দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে ইন্দিরা। বুঝতে পারে না তার কি করা উচিৎ, সে বলে, “Why do you want to leave?”

হাতের কাজ থামিয়ে দিয়ে আনন্দী আবার ঘুরে দাঁড়ায়, “Can you give me a reason, any reason to stay?”

ইন্দিরার মনে হয়, আনন্দীর হাতের ছুঁড়িটা যেন তার গলার কাছে চেপে ধরা, মুখ থেকে একটুও আওয়াজ বের হয় না ইন্দিরার। কিছুক্ষণ পর আনন্দী আবার নিজের কাজ করতে শুরু করলে দেহে বল পায় ইন্দিরা।

“I had options”, সে বলে।

“কিসের?”

“কোলকাতা ফিরে যাওয়ার”

আনন্দী চুপ করে থাকে।

ইন্দিরা বলে, “কিন্তু আমি আছি।”

“কতদিন?” আনন্দী জানতে চায়।

“যতদিন প্রয়োজন।” ইন্দিরা বলে।

 

 

খাওয়ার পর ইন্দিরা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সেলফোন বের করে দেখে কোনো নোটিফিকেশন এসেছে কিনা। তারপর বাড়ির নম্বর ডায়াল করে। ওপাশ থেকে জ্যেঠুর গলা শোনা যায়, “তোর দাদা আবার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে”

“এখানে এসে তো সব ঠিকই ছিল”

“দরজাটা খোলা রেখেছে এটাই অনেক, যাই হোক ছাড়, তোর অফিস ঠিক চলছে তো?”

অফিসের প্রসঙ্গ উঠতে একটা ভয় ইন্দিরার পিঠ বেয়ে উঠে আসে, সে মুখে বলে, “হ্যাঁ ঠিক আছে, আমরা আজকে প্রজেক্ট পেলাম, আমি কনজিউমার প্রডাক্টস- এ”

“ভালো, খুব ভালো, মন দিয়ে কাজ করতে হবে, বুঝলি”

“হুম”, ইন্দিরা আর কিছু বলতে পারে না। ভয়ে তার গায়ে শিহরণ লেগে যায়। ফোন কেটে দিয়ে ঘরে ফিরে এসে সে আনন্দীর ঘরের দরজায় নক করে। আনন্দী দরজা খুলে দিতে ইন্দিরা বলে, “তোমার নোটগুলো কি তৈরি আছে?”

 

গত ঘন্টা তিনেক আনন্দীর সামনে বসে আছে ইন্দিরা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আনন্দী তাকে এসডিএলসি বুঝিয়ে চলেছে। কিন্তু তার এক বর্ণও ইন্দিরার কানে পৌঁছচ্ছে না। কারণ গত তিন ঘণ্টা ধরে প্রতিটা মুহূর্তে ইন্দিরা আনন্দীকে দেখে চলেছে। প্রথম প্রথম সে অনেকবার চেষ্টা করেছে আনন্দীর কথা মন দিয়ে শোনার, কিন্তু তার চোখ কিছুতেই সরছে না। আনন্দীর উজ্জ্বল চোখ, কনীনিকার নড়াচড়া, কিছু একটা বোঝাতে পারার সম্ভাবনায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা চোখের তারা- নরম, উন্নত, অথচ সুচাগ্র নয় এমন নাক, বিষয়ের গভীরে ঢুকে পড়ার উত্তেজনায় মাঝে মাঝে ফুলে ওঠা নাকের পাটা- আর অনবরত কথা বলে চলা পুরুষ্টু গোলাপি ঠোঁট, বিষয়টাকে আরো ভালো করে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ ভাবতে বসে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরা স্ফীত অধরোষ্ঠ- ফ্যানের হাওয়ায় আনন্দীর মুখে এসে পড়ে বিরক্ত করে যাওয়া চুল,- এসবের থেকে কিছুতেই ইন্দিরা নিজেকে দূরে সরাতে পারছে না।

একটা সময় হঠাৎ ইন্দিরার ইচ্ছে করে, একহাতে আনন্দীর মুখের উপরে এসে পড়া চুলগুলো আলতো করে কানের পিছনে সরিয়ে দিতে। ইন্দিরা অবাক হয়ে যায়। ইন্দিরা নিজেকে সংযত করে। আনন্দীর কথায় মন দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আবার তার উজ্জ্বল চোখের তারায় সে আটকে যায়। একটা গভীর শ্বাস ফেলে ইন্দিরা বলে, “বাকীটা আমি নিজে পড়ে নিচ্ছি, অনেক রাত হলও, কাল অ্যাসেসমেন্ট, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।”

 

নিজের ঘরে ফিরে এসে ইন্দিরা টেবিলে বসে, স্টাডি ম্যাটেরিয়ালের পাতা ওলটাতে থাকে। রাত বড়ো হতে হতে একটা সময় ভোর হয়ে যায়। ঠান্ডা হাওয়া এসে ঝাপটা মারে ইন্দিরার জানালায়। ইন্দিরা বাইরে তাকিয়ে দেখে আলো ফুটছে। আজ অ্যাসেসমেন্ট।

(চলবে)



১২তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য