দৃশ্যশিল্পে মহামারীর দলিল ও পূর্বাভাস | সজীব সেন

­করোনাকালের এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় যদি পৃথিবীতে মহামারীর ইতিহাস পর্যলোচনা করে প্রায় একশ বছর আগে ফিরে যাই, তবে স্পেনিশ ফ্লু বা ১৯১৮-এর ফ্লু মহামারীর বিভৎসতার কথা সামনে চলে আসে। স্পেনিশ ফ্লু মহামারীটি স্থায়ী হয় ১৯১৮ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত, আর যা কেঁড়ে নেয় প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ। A/H1N1 ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট ইনফ্লুয়েঞ্জায় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ আক্রান্ত হয়। যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারী।

স্পেনিশ ফ্লু পরবর্তী আত্মপ্রতিকৃতি, শিল্পী এডোয়ার্ড মুঙ্ক, তেলরং, ১৯১৯
www.munch.emuseum.com থেকে সংগৃহিত

 ধারণা করা হয় এই ফ্লু-এর প্রার্দুভাব প্রথম শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের হাস্কেল কাউন্টি, ক্যানসাস ও নিউইয়র্ককে কেন্দ্র করে। পাশাপাশি একই সময়ে ফ্রান্সের পোর্ট সিটি ব্রিস্ট ও যুক্তরাজ্যে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মৃত্যুর হার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অস্থির সময়ে মানুষের মনোবল ধরে রাখার জন্য ফ্লু সর্ম্পকিত তথ্য, সংবাদ চেপে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু স্পেনের সংবাদমাধ্যমগুলো নিজেদের নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণে মহামারীর সর্ম্পকিত সকল সংবাদ প্রকাশ করা শুরু করে। যেখানে রাজা দ্বাদশ আলফনসোর ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে মারাত্মক অসুস্থতার খবরও ছড়িয়ে পড়ে। আর প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে সে সময় স্পেন প্রথম  ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী আক্রান্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে। মহামারীটি রাতারাতি ‘স্পেনিশ ফ্লু’ নামে পরিচিতি পেয়ে যায়। বর্তমানে কেভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের কারণে যে মহামারীর মধ্য দিয়ে সমগ্র বিশ্ব অস্বস্তিকর সময় অতিবাহিত করছে তা থেকে হয়ত ১৯১৮ সালের স্পেনিশ ফ্লু’র সময়কালের অবস্থা কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। চলমান এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের মত দৃশ্যশিল্পীরাও নিজেদের নতুন বাস্তবতায় নিজেদের মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। ঠিক তেমনি স্পেনিশ ফ্লুর সময়কালেও দৃশ্যশিল্পীদের সৃজনশীলতার প্রকাশে পরিবর্তন এসেছিল। স্পেনিশ ফ্লুর তৎকালীন বাস্তবতা, পারিপার্শ্বিক ও মনোজাগতিক পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে শিল্পীদের কাজ-কর্মে। সেই প্রেক্ষাপটে পুনঃদৃষ্টিপাত করে কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন “ How Art Movements Tried to Make Sense of the World in the Wake of the 1918 Flu Pandemic ” শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করে। প্রবন্ধটিতে লেখিকা  Anna Purna Kambhampaty স্পেনিশ ফ্লুর সময়কার খ্যাতিমান শিল্পীদের কর্মকাণ্ডকে সোজাসাপ্টাভাবে তুলে এনেছেন।  প্রবন্ধটি অনুসারে, ১৯১৮ সালের সাত ফেব্রুয়ারি অস্ট্রিয়ার ২৭ বছর বয়সী শিল্পী ইগন শিল (Egon Schiele) শেষবারের মত বিখ্যাত শিল্পী গুস্তাব ক্লিমটকে (Gustav Klimt) দেখার জন্য ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে যান। যার একদিন আগেই গুস্তাব ক্লিমট মারা গিয়েছিলেন। গুস্তাভ ক্লিমট হার্ট এটাকে মারা গিয়েছিলেন বলা হলেও ঐতিহাসিকদের মতে ক্লিমট মূলত স্পেনিশ ফ্লুতেই মারা যান।  ইগন শিল মর্গে বসেই তাঁর গুরু ক্লিমটের সর্বশেষ প্রতিকৃতি আঁকেন। প্রতিকৃতিতে মৃত ক্লিমটের যেন মৃত্যুর বিভৎসতা উঠে এসেছে।

মৃত্যুশয্যায় শায়িত গুস্তাব ক্লিমট, শিল্পী ইগন শিলা, ১৯১৮
Public domain থেকে সংগৃহিত

তার কিছুদিন পর ইগন শিল ‘পরিবার’ শিরোনামে একটি পেইন্টিং-এর কাজ শুরু করেন, যেখানে তিনি নিজেকে, নিজের স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে আঁকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পেইন্টিং শেষ করার আগেই তাঁর ছয় মাসের অন্তঃসত্তা স্ত্রী ফ্লুতে মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুর তিনদিন পরই ইগন শিলও ফ্লুতে মারা যান ।

পরিবার, শিল্পী ইগন শিল, ১৯১৮
www.belvedere.at থেকে সংগৃহিত

অপরদিকে নরওয়েজিয় শিল্পী এডোয়ার্ড মুঙ্ক এই স্পেনিশ ফ্লু থেকে মুক্তি পেয়ে যেন জীবনের নব উদ্দীপনা ফিরে পেয়েছিলেন। মুঙ্ক আত্মপ্রতিকৃতির সিরিজের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন নিজের ফ্লুতে আক্রান্ত হবার পূর্বের ও সুস্থতার পরের অবস্থা। যেখানে মুঙ্ক তাঁর অসুস্থ হওয়া থেকে সুস্থতার প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে তুলে এনেছেন। চিত্রগুলোতে মুঙ্কের নিজের মানসিক আস্থিরতা, অসুস্থতা ও  মহামারীর কারণে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হওয়ায়, সব চিত্রই আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। এই চিত্রগুলো সর্ম্পকে মুঙ্ক বলেন, “শৈশব থেকেই আমি মৃত্যু, অসুস্থতা, মানসিক সমস্য দেখে বেড়ে উঠেছি, আর তাই এসব যেন আমার নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।” অর্থাৎ বলা যেতেই পারে, পশ্চিমা শিল্পের উপর ১৯১৮ সালের ফ্লুর যে প্রভাব তারই উদাহরণ তৎকালীন সময়ে শিল কিংবা মুঙ্কের কিছু শিল্পকর্ম। বর্তমানে আমরা কোভিড-১৯ মহামারীর যে আবহের মধ্যে সময় পার করছি, তার কারণে এক শতাব্দি পূর্বেকার মহামারীতে কি ঘটেছিল তা  নিয়ে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। যদিও ১৯১৮ সালের স্পেনিশ ফ্লু-র কারণে পৃথিবী জুড়ে যে পরিবর্তন এবং সহস্র মানুষের মৃত্যুর যে ইতিহাস, তা সমসাময়িক ১ম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস দ্বারা চাপা পড়ে যায়। ১ম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতার শেষার্ধের ক্রান্তিকালে ১৯১৮ সালের ফ্লু’র ছড়িয়ে পড়ার খবর প্রাথমিকভাবে তেমন গুরুত্ব পায় নি। আর্শ্চয বিষয় এই যে ফ্লু-তে তৎকালীন ভারতবর্ষে প্রায় ৬% মানুষ মারা যায়। কিন্তু সে সময়ে টাইমস অব ইন্ডিয়াতে ছাপা হয়, “এই রোগ (স্পেনিশ ফ্লু) নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই”।

স্পেনিশ ফ্লু আক্রান্ত সময়ে আত্মপ্রতিকৃতি, শিল্পী এডোয়ার্ড মুঙ্ক, তেলরং, ১৯১৯
www.nasjonalmuseet.no থেকে সংগৃহিত

 এই সময়টাতে অনেক শিল্পীকেও যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল, যারা যুদ্ধের চেয়েও ফ্লু’র কারণে অকালে মারা যান। ফ্লু’র প্রভাবে মৃত্যু শিল্পীদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি। ইতিহাসবিদ কোরিনা কির্শের (Corinna Kirsch) মতে, যুদ্ধের সংকটের মধ্যে ফ্লু’র প্রাদুর্ভাবকে আলাদা করে দেখাটা অনেকটাই অযোক্তিক। আবার অনেকের দৃষ্টিতে ১ম বিশ্বযুদ্ধ ও ফ্লু তৎকালীন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের  (যেমন অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং নব-গঠিত কমিউনিস্ট সরকারগুলোর উত্থান) সাথে মিলেছে, তেমনি সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনও এনেছে (যেমন লিঙ্গ এবং আয়ের বৈষম্য)। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা, হতাশা ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। জনগন প্রচলিত সমাজ কাঠামো, সরকার ব্যবস্থা, নৈতিক মূল্যবোধের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। প্রতিদিনকার জীবন যেন অর্থহীন হাস্যকর হয়ে ওঠে। আর তাই এই সময় আবহের মধ্যে যে শিল্প আন্দোলনগুলো শুরু হয়েছিল তা এই হতাশাগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে এবং হতাশার বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে চায়।  শিল্প আন্দোলনগুলোর মধ্যে বিশেষত দাদা আন্দোলন (Dada movement) সে সময়ের নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা ও হতাশার বিপরীতে বেশ অনুপ্রেরণামূলক। দাদা শিল্পীরা পূর্ববর্তী শিল্পের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে শিল্পের নতুন রূপ দিতে চেয়েছিলেন। সে সময় পরিবর্তিত অবস্থায় কোলাজ মাধ্যমটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কির্শের মতে, শিল্পীরা আধুনিক যুগ এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে একপ্রকার কাঁটাছেড়া, যোগাযোগ, পুনঃর্নিমাণ বা পুনরায় সমাবেশ ঘটাতে চাইছিলেন।  ১৯২২ সালে বার্লিনে দাদা গ্রুপের অন্যতম নারী সদস্য হানা হোচ (Hannah Höch) একটি ট্রেডিশনাল র্জামান গেস্ট বইকে প্যারডি করেন। যেখানে বাড়িতে আসা অতিথিদের অভিবাদনসূচক কথার পরিবর্তে  দাদামতাদর্শের বিভিন্ন বক্তব্য, কথাবার্তা লেখা হয়। আরেক দাদা শিল্পী জর্জ গ্রস (George Grosz) ১৯১৮ সালের দিকে দ্যা ফিউরিনাল (শেষকৃত্য) নামক একটি চিত্র আঁকেন। যেখানে দেখা যায়, নানাভাবে ভাঙচুড়ের মাধ্যমে একটি ফিগারের উপর অন্য ফিগারের ওভারলেপিং হয়ে এক বিশাল মানুষের জঞ্জাল দেখানো হয়েছে। যা রাস্তার সাথে একেবেঁকে বহুদূর বিস্তৃত। রাস্তার দু’পাশে নাইটক্লাব আর বিল্ডিংগুলো যেন দেয়ালের মত আটকে রেখেছে সমগ্র জনস্রোতকে। মানুষের ভিড়ের মাঝে একটি কফিন আড়াআড়িভাবে রাখা, তার ওপর একটি কঙ্কাল বোতল থেকে কিছু একটা পান করছে। রাতের রাস্তার মাঝে মানুষের মিছিলে এক নারকীয় উপস্থাপনা। মানুষের মুখগুলো যেন মনুষ্যত্বহীন, মাদকাসক্ত, সিফিলিস (এক প্রকার যৌন রোগ) কিংবা প্লেগ আক্রান্তে বিমর্ষ। জর্জ গ্রস নিজের এই চিত্র সর্ম্পকে বলেন, “বর্তমান অবস্থায় মানবতার যে পাগলপ্রায় দশা, তার বিরুদ্ধে আমি আমার প্রতিবাদ তুলে ধরেছি”। যদিও দাদাইজমের অভিপ্রায় ছিল নিরপেক্ষবাদিতা, তারপরও কোরিনা কির্শের মতে শিল্পীদের কাজের মধ্যে ইথোপিয়ান ইম্পালস ছিল, অর্থাৎ শিল্পীরা নতুন বিশ্ব গঠনের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন এবং বিপ্লবে বিশ্বাসী ছিলেন।   আর এই আবেগের কারণেই স্থপতি ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস (Walter Gropius) ১৯১৯ সালে র্জামানির ওয়েইমারে বাউহাউস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাউহাউসের লক্ষ্য ছিল শিল্প ও ডিজাইনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা। যেখানে প্রাত্যহিক ব্যবহারিক জীবনের শিল্পচর্চায় অপ্রয়োজনীয় অলংকরণকে প্রত্যাখ্যান করতে শেখানো হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে বাউহাউসের ছাত্র মার্শেল বয়া (Marcel Breuer) যে সমস্ত র্ফানিচারের ডিজাইন করেন তাতে ফ্লু’র অভিজ্ঞতার প্রভাব রয়েছে। বাড়িঘরের ভারী ও অতিমাত্রায় অলংকৃত আসবাবপত্রের বিপরীতে বয়ার মিনিমালিস্ট ঘরানার কাঠ ও স্টিলের পাইপ দিয়ে তৈরি সাধারণ আসবাবপত্র বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ হিসেবে বলা যায় মার্শেল বয়া’র নকশাকৃত আসবাবপত্রগুলো ওজনে হালকা এবং সহজে স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায় তা সহজে জীবানুমুক্ত ও পরিষ্কার করা যায়। আটলান্টাস হাই মিউজিয়াম অব আর্টস এর ডেকোরেটিভ আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগের কিউরেটর মনিকা ওবনিস্কির (Monica Obniski) মতে, “১৯২০ এর দশকের আধুনিক স্থাপত্যে এবং নকশায় ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য ও তৎকালীন সামাজিক স্বাস্থ্যবিধির সর্ম্পকে অতিমাত্রায় গুরুত্বারোপ করা হয়”।

ওয়াসিলি চেয়ার, বি৩, বাউহাউসের ছাত্র থাকাকালীন মার্শেল বয়ার নকশাকৃত।
www.gettyimages.comথেকে সংগৃহিত

অপরদিকে যদি বিমূর্ততার কথা বলা হয় তবে বলা যেতে পারে যে, যে সমস্ত শিল্পীরা এই কঠিন বাস্তবতার বিভৎসতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা যেন বিমূর্ত চর্চার মাধ্যমে বাস্তবতা থেকে পালানোর চেষ্টা করেছেন। দ্যা মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট-এর ফটোগ্রাফি বিভাগের কিউরেটর ইনচার্চ জেফ রোজিনহিমের (Jeff Rosenheim) ভাষায়, “বিমূর্ততা সময়ের সাথে সাথে একটি মুহূর্তের ধারণা হয়ে ওঠে। তাই ১ম বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯১৮ এর ফ্লু’র কারণে বিশ্বে চলমান ভয়াবহতার সাথে বিমূর্ত, র্নিবস্তুবাদি চর্চার যোগাযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ র্মটন শেমবার্গ (Morton Schamberg) এর ক্যামেরায় ধারণকৃত ‘ছাদ থেকে দেখা’ শিরোনামের নিউইয়র্ক সিটির নির্জনতার স্থিরচিত্রের কথা বলা যেতে পারে। যেখানে দেখা যায় oblique angle বা তীর্যকভাবে ধারণ করা ছবিতে কিউবিস্ট ম্যানারে শহরের দৃশ্য, যেখানে কোন মানুষের চিহ্ন নেই, রয়েছে বিশাল নিস্তব্ধতা। দুঃখের বিষয় ফটোগ্রাফার শেমবার্গও কিন্তু ১৯১৮ সালের ফ্লুতে মারা যান।

ছাদ থেকে দেখা, র্মটন শেমবাগ, আলোকচিত্র, ১৯১৭
John C. Waddell/Ford Motor Company Collection/The Metropolitan Museum of Art থেকে সংগৃহিত

অপরদিকে মার্শল দুশাম্পের (Marcel Duchamp) ফাউন্টেন শিরোনামের শিল্পকর্মটি ১৯১৭ সালে জনসম্মুখে আসে। আমরা হয়ত অনেকেই জানি, দুশাম্প ইউরিনাল বেসিনকে উল্টো করে যে উপস্থাপনা করেন তার কারণে শিল্পের জগতে নতুন করে ভাবনার শুরু হয়। বিশেষত, কোনটি শিল্প হবে, কোনটি শিল্প হবে না তা নিয়ে বির্তকের সৃষ্টি হয়।  তবে আরেকটি বির্তক বা সংশয় শিল্প ইতিহাসবিদ মাইকেল লোবেল (Michael Lobel) কর্তৃক উপস্থাপিত হয়। আর তা হল ফাউন্টেন শির্ষক ইউরিনাল বেসিনের ওপর আর. মুট নামক ছদ্মনামের স্বাক্ষর। লোবেলের মতে আর. মুট স্বাক্ষরটি শিল্পী মার্শল দুশাম্পের না হয়ে শেমবার্গেরও হতে পারে। কিন্তু ফ্লু’র কারণে শেমবার্গের অকাল মৃত্যুতে বিষয়টির কোন সুরাহা হয় নি। আর্ট ফোরাম ডটকম-এর এক প্রবন্ধে লোবেল ১৯১৭ সালের ইউরিনাল বেসিন শিল্পকর্মটির মূল শিল্পী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, “শেমবার্গের অকালমৃত্যু শুধু তার ক্যারিয়ারকেই থামিয়ে দেয় নি বরং তার সেসময়কার কাজের সাক্ষ্য থেকেও বঞ্চিত করে। অপরদিকে মহামারীর সময়কালে ভিজুয়্যাল আর্ট সর্ম্পকিত তথ্য, খবরাখবরের সংকট সৃষ্টি হয়। সে সময় যারা ভিজুয়্যাল আর্ট নিয়ে আলোচনা ও নিয়মিত লেখালেখি করতেন তাঁরাও ঠিকমত কোন কাজ করতে পারছিলেন না। তাই মুঙ্ক যদি ফ্লু থেকে সুস্থ হয়ে তাঁর আত্মপ্রতিকৃতির কাজগুলো সর্ম্পকে না বলতেন, তাহলে ফ্লু’র সময়কালে মুঙ্কের চর্চা সর্ম্পকে আমরা হয়ত কিছুই জানতাম না।”   বর্তমানে করোনা মহামারীর যে বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, ঠিক তেমনি ১৯১৮ সালের মহামারীও ছিল সে সময়ের এমন এক বাস্তবতা যা থেকে পালানোর কোন সুযোগ ছিল না। যদিও আমরা জানি না কভিড-১৯ শিল্পচর্চায় কিংবা শিল্পের উপস্থাপনায় কি ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে, তবে ভিজুয়্যাল আর্টের যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে তা কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি।  ফটোগ্রাফাররা বিশ্বব্যাপী মেট্রোপলিটন শহরগুলোর জনমানবহীন রাস্তাঘাটের যে সমস্ত ছবি প্রকাশ করছেন তাতে যেন এই সময়ের এক ধরনের বিমর্ষ সৌন্দর্য প্রকাশিত হচ্ছে। এই ধরনের ছবিগুলো শুধু যে মহামারীকে তুলে ধরছে তা কিন্তু নয়, চলমান সময়ের মধ্যে মানুষের মানসিক অবস্থা, শূন্যতার অনুভুতি এবং সামাজিক-পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার অনুভুতিকেও প্রকাশ করে।

প্রদা-২, আন্দ্রেস গুরস্কি, আলোকচিত্র, ১৯৯৬
Courtesy the artist/Gagosian/The Metropolitan Museum of Art থেকে সংগৃহিত

১৯১৮ সালের স্পেনিশ ফ্লু’র মত করোনা ভাইরাসের মহামারীরও কিছুটা পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল দৃশ্যশিল্পের নানা মাধ্যমের চর্চায়। তাছাড়াও বলা যেতে পারে বিগত দশকগুলোতে ভোগবাদী সমাজের নেতিবাচক প্রভাব, সামাজিক কিংবা মানসিক বিচ্ছিন্নতা, স্থিরতা, একাকিত্বতা শিল্পীদের অনুসন্ধানের বিষয় হয়েছে। যেমন, জার্মান আলোকচিত্রশিল্পী আন্দ্রেস গুরস্কির (Andreas Gursk) ১৯৯৬ সালের ‘প্রদা-২’ আলোকচিত্রটির কথাই বলা যেতে পারে। যেখানে দেখা যায় জনমানুষহীন বিপনী বিতানের খালি তাক। এ যেন এক অপরিচিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সুনসান নীরবতা। কিন্তু ১৯৯৬ সালের সেই আলোকচিত্রটি যেন করোনা মহামারীর এই সময়ে খবরে প্রচারিত খালি হয়ে যাওয়া দোকানের তাকের সাথে মিলে গেল। অপরদিকে আমেরিকান অলোকচিত্রশিল্পী গ্রেগরি ক্রুইডসন (Gregory Crewdson) এর ২০০৩-২০০৮ সালের ‘গোলাপের নীচে’ (Beneath the Roses) সিরিজের আলোকচিত্রসমূহ উল্লেখ করা যেতে পারে। যেখানে দেখা যায় মোহময় ছবির ফ্রেমে উঠে এসেছিল ছোট ছোট শহরের নির্জনতার মুহূর্ত। আরেক আমেরিকান পেইন্টার এডওয়ার্ড হপার (Edward Hopper) প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একাকিত্বের যে রূপ চিত্রায়ন করেছেন ঠিক সেই ধরনের অবস্থার চিত্র যেন বর্তমান মহামারীর সময়ে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে। করোনা মহামারীর এই সময়টায় ২০১১ সালে প্রকাশিত থ্রিলার মুভি ‘কন্টেজন’ (Contagion) বেশ আলোচিত হয়েছে। স্কট জেড বার্নস (Scott Z. Burns) এর লেখা এবং স্টিভেন সোডারবার্গ (Steven Soderbergh) এর পরিচালনায় নির্মিত এই চলচিত্রটি যেন করোনা মহামারীর কাল্পনিক দৃশ্যায়ন।

‘কন্টেজন’ মুভির পোস্টার ২০১১
www.originalfilmart.com থেকে সংগৃহিত

দৃশ্যশিল্পের নানাবিধ চর্চায় অনেক কল্পনাই যেন বর্তমানে বাস্তবে পরিণত হয়েছে। বলা যেতে পারে যে ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার মধ্যে আমরা বসবাস করছি সেখানে আমাদের চর্চাসমূহের মধ্যেই আমাদের ভবিষ্যতের পূর্বাভাস বিরাজ করছে।


তথ্যসূত্র:

শেয়ার করুন

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: