home কবিতা ‘দূরের হাওয়া’ পাণ্ডুলিপি থেকে দশটি কবিতা ।। জুয়েল মাজহার

‘দূরের হাওয়া’ পাণ্ডুলিপি থেকে দশটি কবিতা ।। জুয়েল মাজহার

*হেরমান্‌ হেসে*

।।কবি।।

একা আমি। আমারই ওপরে শুধু
রাত্রির অন্তহীন তারাপুঞ্জ করেজ্বল্‌জ্বল্‌,
ফিসফিস স্বরে এক পাষাণ-ঝরণাতার গায় জাদুগান,
কেবল আমার পানে, যে একাকী শুধুতার পানে,
ইতস্তত ঘুরে চলা মেঘেদের রঙিনছায়ারা সব, স্বপ্ন যেন,
ওইসব অবারিত গ্রামের ওপরে চলেভেসে।

নয় কোনো বাড়ি কিংবা খামারেরজমি
বনবাদাড় কিংবা কোনো মৃগয়ারজমি এই অধমের কপালে জোটেনি,
যা আছে আমার, সে তো একান্তআমার
দ্রুত নিম্নগামী আর অরণ্য-প্রচ্ছায়েঢাকা ছোটো এক নদী,
ভয়াল সমুদ্র ওই
খেলমগ্ন শিশুদের অবিরাম কিচিরমিচির,
গোপনে-মজেছে-প্রেমে সে-রকমমানুষের, সন্ধ্যাকালে একা একা,ফুঁপিয়ে কান্না আর গান।
যতো আছে দেবালয় সেসবের আমিওমালিক; আর, অতীতের
ছিল যতো অভিজাত তরুবীথি, ছিলকুঞ্জবন।
আর ওই দ্যুতিময় স্বর্গ-খিলান হবে
এ-আমার ভবিষ্য নিলয়; এর চেয়েকম কিছু নয়;
প্রায়শ আমার এ-প্রাণ তুরীয় গতিতেওই ঊর্ধ্ব পানে অভীপ্সায় ওড়ে,
আশির্বাদপুষ্টদের ভবিষ্যৎ দেখারমানসে,
কানুনের গণ্ডি পেরিয়ে যায় প্রেম; —- মানুষে মানুষে ভালোবাসা।
শুভ রূপান্তর যাদের ঘটেছে, আমিসকলেরে ফের ফিরে পাই:
চাষা, রাজা, ব্যবসায়ী, ব্যস্ত নাবিক,
বাগানের মালি ও রাখাল আমি ফিরেপাই সবারে আবার
ভবিষ্যৎ-পৃথিবীর, সকৃতজ্ঞ,উদযাপন করি উৎসব।
কবি শুধু পড়ে গেছে বাদ,
সে কেবল একা চেয়ে রয়,
মানুষের আকাঙ্ক্ষা সে বয়ে নিয়েচলে; তার
মলিন চেহারাখানি অনাগত দিন আরপৃথিবীর
লাগবে না কোনো প্রয়োজনে।
কতো ফুলমালা দিয়ে ঢেকে যায়কবির কবর,
তবু আর তাকে কারো মনেই পড়েনা।
*ডব্লিউ.বি ইয়েটস*
।।সলোমন ও ডাইনি ।।
আর সেই আরব রমণী এইমত দিলেন ঘোষণা:
বুনো সে চাঁদের নিচে কাল রাতে ঘাসের মাদুরেশুলাম যেখানে আমি সেইখানটায়
মহামতি সলোমন ছিলেন আমার বাহুডোরে
আর আমি চেঁচিয়ে উঠেছি এক আচানক আজগুবি স্বরে:
‘নয় তার, অথবা আমার’আর যার ছিল জানা
ফেরেশতার ভাষা আর পাখিসব গায় যতো সুরে
দিলেন উত্তর তিনি: ঝুঁটিঅলা এক বনমোরগের ছানা
ডেকেছিল ফুল্ল এক আপেলের ডালে
স্বর্গ থেকে আদমের পতনের তিনশত বছরেরও আগে,
আর সে ডাকেনি ফের আজতক কোনোদিন ভুলে,
আর সে এখনো ডাকবে না, তথাপি ভেবেছে,
একটা সুযোগ সেতো সম্ভাবনা হয়ে ওঠে শেষে
দুরাচার এ-আপেল এ-যাবৎ যা বয়ে এনেছে
আর এই ক্লেদাক্ত পৃথিবী যদি হতো নি:সাড় অবশেষে।
সে-মোরগ, কণ্ঠে যার নির্গত হয়েছিল অসীম সময়,

ভাবল, চাইলে আজ সে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে।

যে-প্রেমিক আছে তার চোখ এক ঊর্ণনাভের
যুৎসই বেদনাকে সে একদিন খুঁজে নিতে পারে—
হ্যাঁ, সেই চাহনি ধরে যদিওবা সব ভাবাবেগ—
পছন্দ ও সুযোগের নির্মমতা দিয়ে শেষমেষ;
দয়িত পরখ করে পলে পলে দয়িতের প্রেমের আবেগ;
আর সেই হননের যখন ফুরিয়ে আসে রেশ
সে-বাসরশয্যা আনে হয়তোবা হতাশার বেগ,
প্রত্যেকের জন্য এক বয়ে আনে কল্প-প্রতিমা
আর সে তো খুঁজে পায় খাঁটি এক প্রতিমা সেখানে;
তথাপি তখনই বটে অবলুপ্ত হয় এই ভূমা
যদিও ভিন্ন, তবু যখনইবা দুয়ে মিলে একক প্রদীপ।
যখনইবা সলতে আর তেল এরা এক হ’য়ে পোড়ে;
কাল রাতে তাই এক চাঁদ অপার্থিব
শেবাকে দিয়েছে এনে তার প্রিয় সলোমনরাজ-প্রেমডোরে।’

‘তথাপিও পৃথিবী বহাল’
‘যদি তা-ই হয়,
তোমার মোরগছানা, আমাদের নিয়ে তার ভাবনা ছিল ভুল
তবু করলো সেটাই। যেরকম হয়ে থাকে কাকের বেলায়।
হয়তো প্রতিমা এক জোরালো অতুল।
অথবা হয়তো সেটি ততোটা জোরালো মোটে নয়।’
‘রাত্রি এসেছে নেমে; কুঞ্জবনটিতে
নিষিদ্ধ পবিত্র যা– সম্পূর্ণ অরব
যতক্ষণ একটিও কুঁড়ি ঝরে না পড়ে মাটিতে,
জনমানবের চিহ্ন নেই ত্রিসীমায় কোনো
বিমর্দিত ঘাস ছাড়া, আমরা দোঁহে যেখানে করেছি নিধুবন
পলকে পলকে চাঁদ হয় আরো উন্মাতাল, বুনো
চলো ফের শুরু করি ওহে, সলোমন।’

(Solomon And The Witch – Poem by William Butler Yeats)

 

*এজরা পাউন্ড*

।।অ্যালবা।।

পার্বত্য লিলির ফ্যাকাসে ভেজা
পাতাদের মতো শান্ত-কোমল
শুয়েছিল মেয়ে আমার পাশেই ভোরবেলাতে

 

*নিজার কাব্বানি*

।। সমুদ্রগাথা ।।

তোমার চোখের সুনীল পোতাশ্রয়ে
গীতল আলোর বৃষ্টিরা উড়ে যায়,
ঝিমধরা ওই সূর্য ও পালগুলি
আঁকছে তাদের ভ্রমণ অন্তহীন।

তোমার চোখের সুনীল পোতাশ্রয়ে
খোলা আছে এক সমুদ্র-বাতাযন,
আর ওই দূরে পাখি এসে জড়ো হয়
জন্ম না-নেওয়া দ্বীপের অন্বেষণে।

তোমার চোখের নীলাভ পোতাশ্রয়ে
জুলাই মাসেই তুষারেরা ঝরে পড়ে
নীলকান্তমণি-বোঝাই তরী
সাগরের বুকে ঝাঁকে ঝাঁকে ভাসমান।

তোমার চোখের সুনীল পোতাশ্রয়ে
ছড়ানো ছিটানো আলগা পাথরে আমি
শিশুর মতোন দৌড়-ছোটাছুটি করি
বুক ভরে নিই সমুদ্রের ঘ্রাণ
আর ফিরে আসি শ্রান্তক্লান্ত পাখি।

তোমার চোখের সুনীল পোতাশ্রয়ে
রাত্রিতে সব পাথরেরা গান গায়।
কারা লুকিয়েছে কবিতা এক-হাজার
তোমার চোখের বন্ধ পুস্তকে?

যদিবা কেবল, যদিবা কেবল হতাম নাবিক,
শুধু কেউ যদি একটি নৌকা দিতো আমায়,
তোমার চোখের সুনীল পোতাশ্রয়ে
রোজ সন্ধ্যায় গুটিয়ে নিতাম আমার পাল ।

(Maritime Poem  by Nizar Qabbani)

।। জেরুসালেম ।।

কাঁদলাম আমি যতক্ষণ না শুকাল আমার চোখের জল

মোম কেঁপে কেঁপে না নেভা অব্দি প্রার্থনা করলাম
মেঝেতে ফাটল না ধরা অব্দি হাঁটু মুড়ে থাকলাম
মোহাম্মদ ও ঈসার ব্যাপারে জানতে চেয়েছি আমি
ও জেরুসালেম, তুমি নবিদের অগুরু লোবান
স্বর্গ-মর্ত্যের মাঝখানটিতে সংক্ষিপ্ততম পথ
ও জেরুসালেম, আইন-কানুনের রক্ষাদুর্গ
আঙুলপোড়া, অধোমুখ এক মনোহর শিশু তুমি
তুমি ছায়াময় মরু-উদ্যান, তোমারই পাশ দিয়ে
নবীজি যেতেন হেঁটে
তোমার পথেরা বিধুর বিষাদ
তোমার মিনারগুলি রোরুদ্য শোকে
তুমি হলে সেই অনূঢ়া তরুণী কালো আলখাল্লায়
প্রতি শনিবার ঈসা মসিহের জন্মস্থানে
বাজাও ঘণ্টা তুমি?
বড়দিন এলে শিশুদের তুমি
হরেক খেলনা দাও?
ও জেরুসালেম, বেদনার শহর
একটি বিশাল অশ্রুর ফোঁটা চোখে করে টলমল
সব ধর্মের মুক্তার-মণি তুমি
তোমার ওপরে আগ্রাসনকে কারা ঠেকাবে?
কে ধোবে তোমার রক্ত-লাগা দেয়ালগুলিকে?
কারা হেফাজত করবে তোমার ইঞ্জিল কিতাবের?
কারা উদ্ধার করবে কোরান?
কারা আগলাবে ঈসা মসিহকে?
কারা হবে আজ মানবের ত্রাতা?

ও জেরুসালেম শহর আমার

ও জেরুসালেম আমার প্রেম

লেবুগাছগুলো আগামীকালকে ভরে যাবে ফুলে ফুলে
আর জলপাই গাছগুলো হবে আনন্দে মশগুল
তোমার চোখের তারারা উঠবে নেচে
তোমার পবিত্র ছাদগুলোতে ফিরে আসবে
দেশান্তরী পায়রার দল
খেলায় খেলায় শিশুরা তোমার আবার উঠবে মেতে
এবং তোমার গোলাপি পাহাড়গুলোতে
পিতা-পুত্রেরা আবার মিলিত হবে।

শহর আমার
শান্তি আর জলপাইয়ের শহর আমার।

(Jerusalem Poem by Nizar Qabbani)

।। লণ্ঠনের চেয়ে আলোটা জরুরি ।।

লণ্ঠনের চেয়ে আলোটা জরুরি,
নোটবইটির চেয়ে ঢের বেশি কবিতা জরুরি, আর
ঠোঁটের চেয়েও অনেক জরুরি চুমু।
তোমার-আমার চেয়েও জরুরি আর
ঢের শ্রেয়তর তোমাকে লেখা আমার পত্রগুলি।
এগুলো দলিল, কেবল এগুলো
থেকেই লোকেরা করবে আবিষ্কার
তোমার রূপের মাধুরি
এবং আমার পাগলামি।

(Light Is More Important Than The Lantern- Poem by Nizar Qabbani)

 

*য়োসেফ ফ্রাইহার্‌ ফন্‌ আইখেন্‌ডর্ফ*

।। চাঁদিম রাত ।।

আকাশ নি:শব্দে যেন
পৃথিবীকে করলো চুম্বন
পুষ্পের গরিমা নিয়ে যাতে সে এখন
বুঁদ হ’য়ে তারই স্বপ্ন দ্যাখে

প্রান্তর পেরিয়ে গেল মৃদুমন্দ হাওয়া
নিজেরই মর্মের ভারে শস্যের এলানো মঞ্জরি
অরণ্য-বনানী ঘিরে খস্‌খসে ধ্বনি ও মর্মর—
রাত্রি কতো তারাভরা আর সমুজ্জ্বল

এবং আমার প্রাণ, সেতো
দিকে দিকে মেলে দিল ডানা,
কতো না নীরব দেশ পেরোল সে আপন ডানায়
যেন গেল উড়ে উড়ে আপন ঘরের ঠিকানায়।

(Night Of The Moon by Joseph Freiherr Von Eichendorff)

 

* জ্যাক প্রেভের*

।। আলিকাঁতে ।।

টেবিলের ’পর একটি কমলালেবু
গালিচার ’পর তোমার পোশাকখানি
আর তুমি শুয়ে আমারই শয্যায়;
বর্তমানের কোমল উপস্থিতি
রাত্-নিশিথের সতেজ-সজীবতা
আমার জীবন, জীবনের উষ্ণতা!

(Alicante by Jacques Prevert)

 

অনুবাদক পরিচিতি:
জুয়েল  মাজহারের  জন্ম ১৯৬২ সালে; নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানার গড়াডোবা ইউনিয়নের সাখড়া গ্রামেে। পিতা মুকদম আলী, মা বেগম নূরজাহান (সরু)। দুজনই প্রয়াত।জন্মের প্রকৃত তারিখ জানা নেই। শিক্ষাসনদে বর্ণিত সন-তারিখ সমাজের কালেকটিভ মিথ্যাচারেরনমুনা। দীর্ঘদিনের বন্ধু শিরিন সুলতানা ও পুত্র অর্ক মাজহারের সঙ্গে থাকেন ঢাকায়।

বর্তমান পেশা সাংবাদিকতা। কৈশোরে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশযাত্রা। দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন। পেটের দায়ে নানা কাজ। যৌবনের একটা বড় অংশ কেটেছে পাহাড়ে। সেভাবে বাড়ি ফেরা হয়নি আর।লেখেন মূলত কবিতা, বিচিত্র বিষয়ে প্রচুর অনুবাদও করেন।

প্রকাশিত কবিতার বই:
দর্জিঘরে একরাত: প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৩, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা । দ্বিতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১৪,  প্রকাশক শুদ্ধস্বর, ঢাকা।
মেগাস্থিনিসের হাসি: প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, বাংলা একাডেমী বইমেলা। বাঙলায়ন প্রকাশনী,ঢাকা।
দ্বিতীয় সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি ২০১৫। বাংলা একাডেমী বইমেলা। প্রকাশক শুদ্ধস্বর, ঢাকা।
দিওয়ানা জিকির: ফেব্রুয়ারি ২০১৩। বাংলা একাডেমী বইমেলা। প্রকাশক শুদ্ধস্বর, ঢাকা।

প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ:
কবিতার ট্রান্সট্রোমার: (নোবেল সাহিত্যপুরস্কারজয়ী সুইডিশ কবি টোমাস ট্রান্সট্রোমারের বাছাই করা কবিতার অনুবাদ সংকলন), প্রকাশক শুদ্ধস্বর; বাংলা একাডেমি ফেব্রুয়ারি বইমেলা, ২০১২।

সর্বশেষ গ্রন্থ:
২০০ বিশ্বকবিতার অনুবাদগ্রন্থ ‘দূরের হাওয়া’। প্রকাশক চৈতন্য প্রকাশন, সিলেট। বাংলা একাডেমি ফেব্রুয়ারি বইমেলা, ২০১৬।

 

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য