দশটি কবিতা | তন্ময় ভট্টাচার্য

শাপগ্রস্ত

 

চুল্লির ভেতরে শুয়ে মনে পড়বে বাংলা কবিতা
এমন রোমাঞ্চকর ঘটনা জীবনে আগে ঘটেনি কখনও
যখন ঘটবে টের পাব না তবুও মুখে বাংলা কবিতা
তোমার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ ঘোচাতে আজ আগুন পেতেছি

 

আমিসঙ্গ ভালো নয়? এত বৎসরকাল শুধুই সাহস দিয়ে গেলে
কে যেন কাঁদবে কেউ কাঁদে না আমার জন্য নাটকীয় বাংলা কবিতা
চিমনি পেরোলে স্বর্গ সেখানে কবিরা থাকে দ্বারপ্রান্তে ভিখ মেগে খাব
যে নাভি পোড়ে না তার পাশে থেকো ডোমের ঘরণী

 

উৎসর্গে তোমাকেও জবাফুল, হাঁড়িকাঠ, নাদব্রহ্ম বাংলা কবিতা…

 

 


স্মৃতিচিহ্ন

 

ডুবুরি নামিয়ে ঠিক একদিন নাভি তুলে নেব।
ওরা তো মুক্তো পারে। এটুকু পারে না?
কীভাবে চিনবে তুমি কোনজন? নদীর কোটরে
অসংখ্য— থিকথিকে— পরিত্যক্ত নাভি পড়ে থাকে

 

পা দিলে হড়কে যায়— যায় বুঝি? নিজে তো নামিনি
শুনেছি এভাবে কত লোক প্রিয় নাভি খুঁজে নিতে
নেমেছে, নেমেই গেছে, সঙ্গে থেকে গেছে তারপর

 

কীভাবে চিনবে, তুমি কোনজন? আমারও স্মৃতিতে
শুধুমাত্র চটা ওঠা— শালগ্রাম— রাত্রি বেড়ে চলা—

 

 



স্থায়ী

 

(১)


নতুন প্রেমের মতো এই রোদ। গা-মাথা জ্বালিয়ে
এরপর ঠেলে দেবে সাবওয়ে, অটোস্ট্যান্ড, লাইনের দিকে
আধঘণ্টা ধরে কোনো কথা নেই আমাদের বেঁচে থাকা ছাড়া
কোথাও পৌঁছে গেলে আদৌ কি ফুরিয়েছে এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে
নতুন প্রেমের মতো এই রোদ একদিন মেঘের সকালে
শুনব পুরনোটিকে বুঝিয়েছে এর সঙ্গে কোনোদিন বেড়াতে যেও না

 


(২)


পুরনো রোদের কর্ত্রী স্বরবর্ণ ভুল করে এসে
আমাকে চিনিয়েছিল ঋ মানে বনের মধ্যে ফুটে থাকা তারা
আমি তার স্নানপর্বে আরামের আঠালো চেহারা
ভুলতে পারিনি সেই থেকে তীব্র সেঁটে আছি উঠোনের কোমলে ঋষভে
নতুন রোদের জঙ্ঘা স্থাপত্যকীর্তির নিচে কবে যে শকাব্দ লিখে দিল
ভয় হয়, এরপরও তরুণ প্রকৌশলী অনুবাদ রপ্ত করে নেবে

 


(৩)


কীভাবে কাজের মধ্যে মিশে যাচ্ছ ছুটির বিকেল
বিরক্তি হল না কিন্তু, ঘেমে যাচ্ছি বলে কিছু সুরাহা হল না
নেমে এসে দেখলাম একপ্রস্থ দাঁড়িয়েছ প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে
আরেকটি ছুঁয়ে গেছে বাগদিপাড়ার গলি, মুদির দোকানে লোকনাথ
হাঁটু মুড়ে চুপচাপ, তিনিও তো দেখছেন নতুন-পুরনো দুই রোদ
আমাকে টানছে আমি কার কাছে যাব আজও তোমার স্টপেজে থমকাই

 


(৪)


তাহলে বোঝাই গেল, শীত-পরবর্তী এই রোদ
আমার চরিত্র ধরে হ্যাঁচকা মেরেছে টেনে নিয়ে যাচ্ছে প্রকাশ্য ধাঁধায়
তোমার সঙ্গে যদি না মেলে তবুও শান্তি যেখানে জানলা খুলে যায়
তেমন ধুলোর মধ্যে পুরনো আছেন আছে রোজের বাসনধোয়া ঘর
সেখানে আমাকে দুঃখ দিতে হয় ভেঙে ভেঙে, মাইনে পিছিয়ে গেলে পর
কাল থেকে রোদ খেয়ে বেঁচে থাকব এই চুক্তি মা-বাবার মতন শোনায়

 

 


দ্বৈত

 

হরগৌরী হব আমরা। লক্ষ্মী-জনার্দন। ভাস্কর-বাসবী কিংবা মণীন্দ্র-দেবারতি। আর এসব হতে হতেই একদিন আমাদের মতো হয়ে যাব। বঁটির ধারে কেটে ফেলব যা-কিছু অতিরিক্ত। ছোট্ট একটা সংসার আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে— যার একপাশে শিউলিগাছ, অন্যদিকে কলতলা। আনাজ ফুরোতে-না-ফুরোতেই শুরু হবে উপোস দেওয়া। এত সাধারণ জীবন— ফাটলের দিকে তাকিয়ে এত অমোঘ ভেঙে পড়ার ভয়— আমরা পারব তো শেষ অবধি? দুলতে-থাকা প্রাণ আমাকে সেই লোকটার কাছে নিয়ে যাচ্ছে, সব ছেড়েছুড়ে যে একদিন পাহাড় বেছেছিল। হরগৌরী হব আমরা। লক্ষ্মী-জনার্দন। ভাস্কর-বাসবী কিংবা মণীন্দ্র-দেবারতি। আর, এসবের কিছু না হলেও, অন্ধকারে লিখে-ফেলা খানকতক উপন্যাস হব নিশ্চিত। একদিন-না-একদিন, কোনো ভূমেন গুহ ঠিকই আসবেন, দেখে নিও!

 

 


সাদা পৃষ্ঠা

 

‘এতদিন হয়ে গেল, ওসব কি মনে রাখলে চলে!’
এই বলে, বই ছেড়ে চলে গেল প্রেমের কবিতা

 

শিরোনাম একা-একা কিছুদিন চেষ্টা করেছিল
তারপর, অন্য কোনো বই দেখে, প্রতিপত্তি দেখে
যেই না এগোতে যাবে— টান পড়ে সেলাইয়ে, পাতায়

 

কবিতা, শরীরইচ্ছা, বিজ্ঞাপনে ভুল থেকে যায়

 

 


মানিয়ে নিতে নিতে

 

আমার সন্তানছাড়া এ-জীবন। পিতাজন্ম ছাড়া
আর-সব দেবে বলল। লেখার আকাশ,
দু-বেলা ভাতের ফূর্তি, দেহশান্তি, দুঃখ পেলে কোল

 

বুকের পাহাড়িপথে বেজে-ওঠা শিঙা ও মাদল
          কিছুই অদেয় নয়। এমনকি, মাঝরাত্রে
অন্য নারীর কাছে চলে যাব— এই স্বপ্নে মৃতা…

 

আমার সন্তান যেন ভালোবাসে বাংলা কবিতা!

 

 


মনোরথদ্বিতীয়া

 

চাওয়া বিনা ব্রত কী-বা, ব্রত বিনা চাওয়া কী নিলাজ
তোমার সন্তুষ্টি করি, চাঁদে দাও পুরুষ্টু লাগাম
অভাগীর কথা শুনো, হে প্রভু, হে তুলসীচন্দন—
এমন টানে যে বাস্তু ফুকারি উঠিছে হরিনাম

 

হায় খোদা, প্রতি বর্ষে এ-যাতনা কেমনে ঘুচাই
সকলি গিয়াছে ভাসি, জড়ো করি, ফির্‌ ভাসি যায়
পানিরও নিষ্পত্তি কোথা, থাবা দেখি নিশুতি প্রহর—
বনবিবি দয়া করো, শ্রীশ্রী দুর্গা, হইয়ো গো সহায়

 

যাই, কিন্তু কোথা যাই— ভিটা বিনা কী আছে নসিব
থাকি ও ভুগিয়া মরি, মরি, তবু স্বস্তি নাহি পাই
না-জানি দেবতা আল্লা কার থানে সিন্নি দিয়া বশ—
পানিতে মান্‌ষে কেন এত শত্রু এত গো লড়াই

 

কুশলে রাখিও— এই মনোবাঞ্ছা চরণে তোমার
যে-জন বাঁচাতে সিদ্ধ, মরণও লাগে না মুখে তার

 

 


অঘোরী

 

ন বৈ যাচে রাজ্যং, শুধু তোমাকে চেয়েছি, মায়াবিনী
ভেড়া করে রাখো তীর্থে, ওবেলা দিও ঘাসপাতা; বেড়া ভেঙে
চলে যেতে রোজই চাইব, ইশারা এমন করো যে ঘুরেফিরে
ওই কালো আঁখিপদ্মে ডুবিয়া মরিতে হইবে দিবানিশি

 

মরে যেতে আমি চাইছি, আমাকে বশীভূত করো, মায়াবিনী
সাপিনীর মতো জিহ্বা দুলিয়ে বোঝাও বলিরও সীমা আছে
খুঁত হয়ে গেলে লাগে না পূজায়, তোমারও ভোজ্য নই এখন
স্বভাব যেমতি মিশিয়া গিয়াছে মদ্যে মাংসে বামাচারে

 

সুতরাং উহা রটনা, তোমাকে অনুমতি দেব, মায়াবিনী
খুলে নাও যত বাণ বিঁধে আছে প্রণয়ের নামে দূর দেশে
কখনও ব্যর্থ হয় না এমন সাধনও অঘোরী ভয় পেল

 

তুমি কি শুধুই কাঁদিবে? আমারে নিষ্ঠুরতম বলিবে না?

 

 


ক্লাইমেট রিফিউজি : ২০৮০


(১)


আমরা সবাই চলে যাচ্ছি। ঘর ছেড়ে, জনপদ ছেড়ে উঁচু কোনো বাংলার দিকে চলে যাচ্ছি আমরা। পিছু ফিরলে হাইস্কুলের দোতলা। মন্দিরের চূড়া কিংবা খাঁ-খাঁ অ্যাপার্টমেন্ট। আমরা চলে যাচ্ছি। জল ঢুকে পড়ছে আমাদের স্থাবরে। অস্থাবর গিয়ে ঠেকছে শপিংমলের দরজায়। এইমাত্র পা হড়কে তলিয়ে গেল একজন। বাঁচাতে গিয়ে অন্যজন ফিরলই না আর। আমরা উঁচু বাংলায় পৌঁছোচ্ছি। পাহাড় কেটে নতুন-নতুন কলোনি। ঘাড় ফিরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি— ‘কইলকাতায় তিন পুরুষের বাস আসিলো আমাগো।’

 

(২)


আমরা কেন কবিতা লিখছি? এত বইয়ের একটাও কি নিতে পারব সঙ্গে? সিনেমার মতো দৃশ্য ধরা পড়ছে ড্রোনে। একটা বই ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গেল কুষ্টিয়ায়। একটা পাণ্ডুলিপি সিরাজগঞ্জ থেকে সটান বৈঠকখানা রোডে। ভিজে চুপচুপে, ক্রমশই ভারী হচ্ছে আমাদের কবিতা। প্যারাগ্রাফ খসাতে খসাতে, বাক্যে এসে ঠেকছে। আরেকটু ঢেউ দিলেই শব্দ। বহুদিন পর কেউ ডুবুরি নামিয়ে অক্ষর খুঁজে পাবে। সেইসব অক্ষর হাতে নিয়ে, অবাক বিস্ময়ে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বলে উঠবেন, এরা লিখতেও জানত একদিন!

 

(৩)


গঙ্গা কিংবা বঙ্গোপসাগর। ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। নৌকো নিয়ে ঘুরঘুর দিনের পর দিন। হয়তো আমাদের বাড়ির ওপরেই। কোথায় সেই নতুন দেশ? সেখানকার সীমান্তরক্ষীরা কেমন? দেখামাত্র গুলি, নাকি থাকতে-খেতে দেবে কিছুদিন? আমাদের সন্তানরা প্রচ্ছদচিত্র হয়ে উঠছে। টলটলে চোখে গল্প শুনছে কলকাতার। সেখানে মানুষ থাকত একসময়। যানজট-চিৎকার-ভিড়ে দুর্বিষহ জীবন। আমাদের সন্তানরা নৌকোর পাশে-পাশে হাঙর ঘুরতে দেখছে। সরল মনে প্রশ্ন করছে, কলকাতাও হাঙর ছিল? গিলে খেত অন্য জেলাদের?

 

 


আমি কিন্তু মহম্মদী বেগ নই

 

(১)


মুখের ওপর কিছু বলতে পারছি না, কিন্তু এইসব বিরক্তি
আমায় মীরজাফর করে তুলছে। চাইছি চক্রান্ত করে
হলেও সরিয়ে দিতে, অবিশ্বাসী চোখ নিয়ে তাকিয়ে
থাকবে অথচ কিছুই করতে পারবে না এমন মজার
একটা দিন, যখন ওরা আনন্দে চিৎকার করে উঠবে
‘গড সেভ দ্য কিং’ আর আমি খবর পাঠাব মহম্মদী
বেগের কাছে, যেন ও প্রস্তুত হয়, যেন ছুরিতে শান
দিয়ে রাখে— কেন-না যতই ফকির সাজো, তুমি যে
জুতো পাল্টাতে ভুলে যাবে এবং সেই ভুলের জন্যই
লুৎফা একদিন কাঁদবে তা আমি আগে থেকেই জানি!

 


(২)


সব পরিকল্পনামাফিক চলার পরেও আমি যে মীরজাফর হয়েই
থেকে গেলাম, তন্ময়ে ফিরতে পারলাম না, এজন্য আজ আর
কাউকে দোষ দিই না। শুধু নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে
মাঝে মাঝে ভাবি, আমি তো মহম্মদী বেগ নই, তবু কুষ্ঠ
নিয়ে বেঁচে থাকতে রাজি ছিলাম যদি তুমি একবার ফিরে
আসতে, বেইমানির যা-কিছু চিরাগ আমার মধ্যে জ্বেলে দিয়েও
একবার যদি দেখতে পেতে, আলিনগর বদলে গেছে কত…

 


তন্ময় ভট্টাচার্য

জন্ম ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৪।
কবিতার বই – দীপাবলি নাকি শবযাত্রা (২০১৮), বেইমানির যা-কিছু চিরাগ (২০১৯), বাংলার ব্রত (২০২২)।
গদ্যের বই – নিজস্ব জেলখানা ঘিরে (২০১৬), আত্মানং বিদ্ধি (২০১৭), পাঁচ দুপুরের নির্জনতা (২০১৯)।
অন্যান্য গ্রন্থ – বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে (২০১৬), না যাইয়ো যমের দুয়ার (২০২১, সম্পাদিত), দেশভাগ এবং…(২০২২, সম্পাদিত)।

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য

%d bloggers like this: