home ই-বুক, উপন্যাস তারাদের ঘরবাড়ি ।। ধারাবাহিক উপন্যাস – দ্বিতীয় পর্ব ।। অলোকপর্ণা

তারাদের ঘরবাড়ি ।। ধারাবাহিক উপন্যাস – দ্বিতীয় পর্ব ।। অলোকপর্ণা

সিঁড়ির ধাপে বসে জনৈক মঞ্জুনাথের জন্য অপেক্ষা করছে ইন্দিরা। সামনেই একটা বহুতল উঠে গিয়েছে আকাশ পর্যন্ত। তার বিশ থেকে ত্রিশ তল জুড়ে রয়েছে এক বিরাট বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং। সেই হোর্ডিঙে সদ্য দাঁড়াতে শিখে একটি শিশু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। শিশুটির পায়ের তলায় দক্ষিণী ভাষায় কিছু একটা লেখা। ইন্দিরা আন্দাজ করে, লেখাটায় তাকে উড়তে শেখানো হচ্ছে। হাওয়া লেগে অনবরত বহুতল থেকে ফুলে ফেঁপে উঠছে হোর্ডিংটা, যেন একটু পরে শিশুটি সত্যিই উড়ে যাবে। এসবই দেখতে দেখতে বাড়ির সামনে একটা অটো এসে থামে। মাঝবয়সী মঞ্জুনাথ অটো থেকে নামেন। ভাঙা ভাঙা ইংলিশে ইন্দিরাকে নিয়ে তিনতলায় উঠে আসেন মঞ্জুনাথ। একটু সময় নিয়ে দরজা খুলে দেন। ইন্দিরা হলঘরে ঢোকে। সাদা ছিমছাম অ্যাপার্টমেন্ট। দুটো অভিন্ন সিঙ্গেল ঘর একে অপরের মুখোমুখি। বাথরুমের কল, বিভিন্ন স্যুইচ বোর্ড পরীক্ষা করে ইন্দিরা হলে এসে দাঁড়ায়।

মঞ্জুনাথ বলে, “খুবই ভালো ঘর, লোকেশানও দারুণ, কোথাও কোনো সমস্যা নেই। গিজারও আছে।”
ইন্দিরা চারপাশটা দেখে ভালো করে। তারপর মঞ্জুনাথের সাহায্যে এক এক করে সব জানালা খুলে দেয়। দমকে দমকে আলো ঢুকে আসে ঘরে। ইন্দিরার মুখে অল্প হাসি ফুটে মিলিয়ে যায়। সে মঞ্জুনাথকে বলে, “ভাড়া কত?”
“যা ভাড়া তার অর্ধেক আপনি দেবেন, বাকী অর্ধেক আরেকজন টেন্যান্ট দেবে”
“আরেকজন?”
“ও আচ্ছা, আপনাকে বলা হয়নি, আপনার আগে আরেকজন এসে ডানদিকের ঘরটা পছন্দ করে গেছে”
“আমি ভেবেছিলাম আপনি পুরোটাই দেখাচ্ছেন আমাকে”
“না মানে, আগের জন আপনার আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন আমায়, তাই…”
ইন্দিরা চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, বহুতলের শিশুটি তখন হাওয়ায় বেপরোয়া দুলছে।
“আর কোনো অ্যাপার্টমেন্ট খালি নেই আপনার?”
“না, আপাতত এই একটাই খালি আছে”
অফিসের ধারে কাছে গোটা ছয়েক ঘর দেখে ক্লান্ত ইন্দিরা হতাশ হয়ে বাঁদিকের ঘরের দিকে তাকায়। কি মনে হতে আরেক বার দরজা খুলে দেখে, মেঝেতে বিকেলের নরম রোদ এসে পড়ছে। অন্য কি একটা যেন মনে পড়ে ইন্দিরার, কিন্তু মনে পড়ার সাথে সাথেই তা ভুলে যায় সে।
“পরের শনিবার আমি চলে আসতে পারি এখানে?”
মঞ্জুনাথ ভাড়া সংক্রান্ত বাকিটা ইন্দিরাকে বুঝিয়ে দেয়।

 

মঞ্জুনাথ বিদায় নিতে ইন্দিরা হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করে। গোটা শহরটা যেন হাওয়ায় ভাসছে। চকচকে গাড়ির উপর চকচকে হাওয়া পিছলে পিছলে যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে যারা, তারা কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছে না, যেন চোখে চোখ পড়লেই পাথর হয়ে যাবে, গতি বন্ধ হয়ে যাবে। এখানে সবাই ছুটছে, নিজেদের থেকে কয়েকশ আলোকবর্ষ দূরে পৌঁছানোর জন্য ছুটেই চলেছে। কি মনে হতে একটা ম্যাক ডোনাল্ডসে ঢুকে পড়ে ইন্দিরা। সাধারণ মিল নিয়ে এসে বসে এক প্রান্তে, একাকী মানুষের জন্য তৈরী টেবিলে। সে ভাবে, কতটা সমব্যথী হলে কেউ একাকী মানুষের জন্য টেবিল তৈরি করে রাখতে পারে। বাইরের বেঞ্চে হলুদ জামা পরা দুঃখী জোকারবেশী ম্যাক ডোনাল্ডের দিকে চোখ চলে যায় ইন্দিরার। বছরের পর বছর একই বেঞ্চে বসে কার জন্য যেন অপেক্ষা করে চলেছে একা জোকারটা। সময়ে সময়ে বিভিন্ন মানুষ তার পাশে এসে বসছে, ছবি তুলছে হাসি মুখে, ছবি তোলা হয়ে গেলে চলেও যাচ্ছে। কেউ একবারের জন্যেও বলছে না, “আচ্ছা, তোমার গল্পটা কি?”

হঠাৎ ইন্দিরাকে চমকে দিয়ে তার পায়ের কাছে সশব্দে কারো একটা সেলফোন এসে পড়ে। ঝুঁকে পড়ে সেলফোনটা তুলতে সে দেখে ফোনের অন্ধকার ডিসপ্লের কাঁচ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে।

“কিছু মনে করবেন না, আমার বন্ধুর ফোন ওটা”

মাথা তুলে ইন্দিরা দেখে সমবয়সী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। ফোন ফেরত নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে মেয়েটা একটু দূরেই একটা টেবিলে ফিরে যায়। তাকে অনুসরণ করে ইন্দিরা দেখে মেয়েটির পাশে আরেকটা মেয়ে টেবিলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, ফোনটা সম্ভবত তারই। মিল শেষ হয়ে যেতে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ে ইন্দিরা। তার জায়গায় একা অন্য কেউ এসে বসে। ম্যাক ডোনাল্ডস থেকে বেরোতে বেরোতে ইন্দিরার চোখ আবার চলে যায় ফোনের মালিকের দিকে। মেয়েটা এখন উঠে বসেছে, তার চোখ লাল। ইন্দিরা আড়চোখে কিছুক্ষণ দেখে মেয়েটাকে। তারপর জোকারের সামনে এসে দাঁড়ায়। হলুদ জামা পরে মুখে জোর করে হাসি ঝুলিয়ে রাখা জোকারের চোখের চারপাশটা লাল রঙ করা। জোকারের পাশে বসে পড়ে ইন্দিরা, সামনে দিয়ে সময়ের বেগে মানুষ, কুকুর, গাড়ি চলে যায়। কিছুক্ষণ পর সেলফোন ভাঙা মেয়েটা তার বন্ধুর সাথে ম্যাক ডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে যায়। তাকে চলে যেতে দেখে মনে মনে ইন্দিরা জোকারকে বলে, “ওই মেয়েটার গল্পটা জানো?”

আরো একটু রাত করে হোটেলে ফেরে ইন্দিরা। বিছানায় এসে শুয়ে বাড়িতে ফোন করে সে, কয়েকবার বেজে যাওয়ার পর জ্যেঠু ধরেন ফোনটা।

“ঘর পেলি?”
“হ্যাঁ”
“কি রকম?”
“ভালোই, আলো হাওয়া ঢোকে”
“আচ্ছা, কাল থেকে তো অফিস”
“হ্যাঁ, তোমরা কেমন আছো?”
“ভালোই, যেমন থাকি”
“দাদা দরজা খুলেছিল?”
“হ্যাঁ, সেদিন রাতেই”
“খাওয়া দাওয়া করছে ঠিক মত?”
“হ্যাঁ, তুই ঘুমো এবার, অনেক রাত হল তো”

ফোন রেখে সিলিঙের হলদে ওয়াল পেপারের নকশায় চোখ রেখে শোয় ইন্দিরা। অফিস থেকে তার কদিনের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে এই হোটেলে। সিলিং জুড়ে হলদে সাদা লতা পাতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বেঁধে আটকে রেখেছে যেন। এত কাছে বছরের পর বছর ধরে পাতাগুলো এমন ভাবে আছে, যে একের থেকে অন্যকে আলাদা করা যায় না। কি করে এত কাছাকাছি থেকে যাওয়া যায়? বুকের ওপর পেতে রাখা হাতের পাতা দুটো মুখের সামনে তুলে ধরে ইন্দিরা। আঙুলে আঙুল লতায় পাতায় জড়িয়ে শক্ত করে হাতে হাত চেপে ধরে।

ইন্দিরার মনে পড়ে, রঞ্জনা বলত, “কখনো কারোর সামনে পুরোপুরি নগ্ন হবি না। মুঠো খুলবি না পুরোপুরি।”

দুইহাত অনেকক্ষণ শক্ত করে চেপে ধরে রাখে ইন্দিরা। নখে গোলাপি আভা ধরে, আঙুলগুলো ব্যথা করতে শুরু করে। একসময় হাল ছেড়ে দেয়, হাত দুটো আবার আগের মত বুকের ওপর নামিয়ে রাখে। নিজেকে নিজে ধরে রাখবে এমন আঠা কই? অন্য কারোর সামনে পুরোপুরি নগ্ন না হলে সে মানুষটাই বা কি করে ইন্দিরাকে ধরে রাখবে?

খুব বেশি চকচকে কোনো কিছুকে বাস্তব বলে মনে হয় না ইন্দিরার। অফিসের কেজো ব্যাপারগুলো সেরে ফেলতে ফেলতে তাই মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে যায় সে, চারপাশে এই যে সব ঝাঁ চকচকে টেবিল চেয়ার, কেবিন, লিফট, মানুষজন, এরা আসল তো? ইন্দিরা অবাক করে রেখে লাঞ্চব্রেক শুরু হয়ে যায়, প্রথম দিন বলে অফিস থেকে কুপন দেওয়া হয়েছে সবাইকে। প্রায় দেড়শো জনের একটা দলের সাথে ইন্দিরারও আজকে প্রথম দিন। একটা ভিড়ের সাথে সে বাইরে বেরিয়ে আসে খাবারের খোঁজে। সাজিয়ে রাখা ফোয়ারা, মাপ অনুযায়ী লালিত গাছপালার মাঝে অস্বস্তি হয় ইন্দিরার, এখানে খাপছাড়া কি কিছুই নেই? একটা রোল হাতে নিজের ভিড়টার মাঝে এসে বসে সে, টেবিলে তখন আলাপ পরিচয়ের পালা চলছে। নিজেকে পরিচিত করে ইন্দিরা খাওয়া শুরু করে। একই টেবিলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ খাচ্ছে, যে যার ইচ্ছে মত খাবার নিয়েছে কুপন দিয়ে। তাদের পোষাক আলাদা, ইংলিশ উচ্চারণ আলাদা, তাদের মুখ চোখ, দৃষ্টি সবই আলাদা একে অপরের থেকে। ইন্দিরা রোল হাতে অবাক হয়ে ভাবতে থাকে, এরা আসল কোথা থেকে, এরা যাবেই বা কোথায়… একটু দূরে আরেকটা টেবিলে চোখ চলে যায় তার, সে দেখে ভাঙা কাঁচের ফোন হাতে নিয়ে গতকাল ম্যাক ডোনাল্ডসে দেখা মেয়েটা অন্য একটা ভিড়ে বসে আছে। চোখে চোখ পড়তে ইন্দিরা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তার টেবিলে তখন ট্রেনিং সংক্রান্ত আলোচনা চলছে। ইন্দিরা জানতে পারে, সামনের এক মাস অফিস থেকে দূরে কোথাও তাদের ট্রেনিং হবে, ট্রেনিং শেষে স্থির করা হবে কাকে কোন শহরে পাঠানো হবে। আলোচনা শুনতে শুনতে ইন্দিরা খাবার শেষ করে ফেলে। টেবিলের অধিকাংশ মানুষই চায় ট্রেনিং শেষে নিজের নিজের শহরে ফিরে যেতে। ইন্দিরা কিছু ভাবতে পারে না। কোলকাতায় ফেরার মত কোনো আকর্ষণ বোধ করেনা সে, এই শহরে থেকে যাওয়ার মত কোনো কারণও তার মাথায় আসে না। নিজের ভিড়ের সাথে ইন্দিরা আবার অফিসে ফিরে আসে।

ছটা নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই হঠাৎ করে মন ভালো লাগে ইন্দিরার। মাথার উপর বিছিয়ে আছে চকচকে একটা নীল আকাশ, “পায়রা পিছলানো”, নিজের মনে বিড়বিড় করে সে। নিজের অজান্তেই একটা হাসি লেগে যায় তার মুখে। রাস্তায় চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আসতে সে দেখে একটু দূরে তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে একটা ছেলে, ইন্দিরার মনে হয় অফিসে অন্য কোনো এক টেবিলে তাকে যেন আজ সে দেখেছে।

ইন্দিরা অল্প হাসে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে।

“কি দেখছ আকাশে?”
“কিছুই না”, হাসিমুখে বলে ইন্দিরা।
“আজকে সারাদিনে বোধ হয় তোমায় এই প্রথম হাসতে দেখলাম”
ইন্দিরা অবাক হয়, “তুমি আমায় সারাদিন ধরে দেখেছো না কি!”
ছেলেটা হাসে, “আমি সবাইকেই দেখেছি, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে। আমার নাম রুবাঈ”
রুবাঈ… কি সুন্দর নাম, কাব্যিক! “আমি ইন্দিরা,” তারা হাঁটতে শুরু করে মেন গেটের দিকে।
ইন্দিরা জানতে চায়, “মানুষ দেখতে ভালো লাগে মানে, কি দেখো মানুষের মধ্যে?”
“অনেক কিছু, যেমন ধরো মানুষটা কি ভাবছে, মানুষটা ভিতরে ভিতরে কেমন, মানুষটার গল্পটা কি…”
ইন্দিরা দাঁড়িয়ে পড়ে।
“কি হল? দাঁড়িয়ে পড়লে যে…”
“আমি জানতাম আমিই একা মানুষের গল্প খুঁজে বেরাই”

রুবাঈ হাসিমুখে বলে, “তোমায় দেখে আমি বুঝেছিলাম সেটা, তুমিও আমার মত মানুষ দেখে বেরাচ্ছিলে, তবে আমার দেখার মধ্যে শুধুই দেখা আছে, তোমার মত খোঁজ নেই”

“খোঁজ?”

“মানুষের গল্পের, আরো ভালো ভাবে বলতে গেলে, মানুষের মধ্যের মানুষটার খোঁজ। তুমি হন্যে হয়ে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে, মানুষ খুঁজে বেরাচ্ছ। তোমার চোখ… তোমার চোখ কারোর চোখে থেমে থাকে না, সেই চোখ দিয়ে ভিতর অবধি ঢুকে পড়তে চায়, কিন্তু মুশকিল হল, বেশির ভাগ মানুষেরই চোখদুটো বন্ধ করা থাকে। খোলা চোখে তারা অন্ধের মত পথ চলে। তাই মুশকিল…”

মেন গেটের কাছে পৌঁছে যায় তারা, ইন্দিরা জিজ্ঞেস করে, “কিসের মুশকিল?”
“তোমার খোঁজ কবে শেষ হবে সেটা বুঝে পেলাম না, এটাই হল মুশকিল। আজ আসি, কাল আবার কথা হবে”
ইন্দিরাকে দাঁড় করিয়ে রেখে রুবাঈ বাসে উঠে যায়। ইন্দিরা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে বাস স্টপে।

হোটেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধে নামা দেখে ইন্দিরা। অন্ধকার যতই গাঢ় হয়, রাস্তার আলোগুলো যেন ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠতে চায়। ইন্দিরার চোখের সামনে এক এক করে দোকানের আলো জ্বলে ওঠে, একটা মোবাইলের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় সে। কি মনে হতে ভিতরে ঢুকে পড়ে।

সারি বেধে সব অ্যান্ড্রয়েড ফোন ঘুমিয়ে আছে। ইন্দিরার পকেটের ভিতরে রাখা পুরোনো মডেলের ফোনের কাছে তারা বড় বেশি রকমের স্মার্ট। গতকাল পায়ের কাছে এসে পড়া ফোনটার মতই প্রায় দেখতে একটা মডেল পছন্দ হয়ে যায় ইন্দিরার। মনে মনে হিসেব করে নিশ্চিত হয় ইন্দিরা, ফোনটা কিনলেও টিউশনি করে ব্যাঙ্কে জমিয়ে রাখা টাকা দিয়ে এই মাস চলে যাবে তার। কিছু পরে নতুন ফোনের বাক্স ব্যাগে ভরে সে হোটেলের পথ ধরে।

হোটেলে ফিরে বাথরুমে ঢোকে ইন্দিরা। হাত ধুয়ে, মুখে চোখে জল দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বেসিনের সামনে আয়নায় তার নিজের ভেজা মুখ দেখা যাচ্ছে। নিজের চোখে চোখ রাখে ইন্দিরা। তার চোখ কি এখন তার চোখ বেয়ে নিজের ভিতরে ঢুকে পড়তে চাইছে? ইন্দিরার ভিতরের মানুষটা কেমন? হ্যাঁ, নিজের কাছে সবাই সঠিক, কিন্তু আসল ইন্দিরাটা ঠিক কেমন? তিন বছর আগে হলে রঞ্জনা বলত “সহজ তাই দুর্লভ”, তিন বছর পর রঞ্জনা বলেছে, “সহজ তাই সাধারণ”। সাধারণ হতে কোনো ভয় বা বাধা নেই ইন্দিরার। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নতুন ফোন চার্জে বসায় সে। ঠিক করে, খাওয়ার পর এই ফোনেই বাড়িতে ফোন করবে একবার।

রাত বাড়তে থাকলে হাওয়া বদল শুরু হয় শহরে। অদ্ভুত এক শৈত্য চারদিক ছেয়ে ফেলে, না কুয়াশা হয়না এখানে, কারণ আর্দ্রতা নেই কাছে দূরে কোথাও। রাতের খাওয়া সেরে ইন্দিরা রাস্তায় নেমে আসে। এখন অনেকেই তার মত নৈশ ভ্রমণে বেরিয়েছে। দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আলো আধাঁরি ছায়া রাস্তার এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। গায়ে পাতলা একটা জ্যাকেট গলিয়ে ইন্দিরা হাঁটতে শুরু করে। রাস্তার আলোগুলো সাদা রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে নীচে। আলো থেকে দূরে সরে গেলে ছায়ারা গাঢ় ও লম্বা হয়ে উঠছে। আবার আলোর নীচে আসতেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর, আচ্ছা, ছায়া কি আলো ভয় পায়? একটা গলির মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে ইন্দিরা, গলির ভিতরে আলো নেই কোনো, দু একটা কুকুর গোল হয়ে শুয়ে আছে গলির মুখে। হোটেলের দিকে ফিরে আসার জন্য পা বাড়াতেই ইন্দিরা শোনে গলির ভিতরে চাপা গলায় কে যেন কথা বলছে অন্ধকারে,

“এভাবে কতদিন নীল! কতদিন এই নাটক চলবে!”
যাকে বলা হল, অর্থাৎ নীল নামের কেউ, কোনো জবাব দিল না।
ইন্দিরা আবার শুনতে পেল, “আমি এর শেষ চাই, আজই এই মুহূর্তেই!”

ফোন, ফোনে কথা বলছে কেউ, ইন্দিরা সরে এল গলির মুখ থেকে। হোটেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে নতুন কেনা ফোন বের করে বাড়ির নম্বর ডায়াল করল ইন্দিরা, এত রাতে বাবা ছাড়া আর কারোর জেগে থাকার কথা নয়।

দুবার বাজার পরই ফোন ধরল কেউ।

“হ্যালো,” উত্তরের অপেক্ষায় বলে উঠল ইন্দিরা।
“বল”
“দাদা! ঘুমোস নি এখনও?”
“না”
“কেন?”
“ঘুম আসছে না তাই, তুই এত রাতে কি করছিস?”
“হাঁটতে বেরিয়েছিলাম”
“ভালো”
“বাড়ির সবাই কেমন আছে?”
“ভালো”
“তুই?”
“ভালো”
ইন্দিরা জানে এরপর সব প্রশ্নের জবাবই একটা মাত্র শব্দে পাবে সে, হতাশ গলায় ইন্দিরা বলে, “বাকীরা কোথায়?”
“ঘুমোচ্ছে”
“আচ্ছা, আমি রাখি তাহলে, কাল আবার ফোন করব, ভালো থাকিস”
“আচ্ছা”
ফোন নামিয়ে রাখার আওয়াজটার জন্য অপেক্ষা করে ইন্দিরা, কোনো আওয়াজ আসে না ওপাশ থেকে।
“দাদা, আছিস?”
“হুম”
“কি হয়েছে?”
“জ্যেঠিমা…”
“জয়তী? কি করেছে জয়তী?”
“বিষ…”
“বিষ কি!”
“বিষ খেয়েছিল”
“মানে! এখন কেমন আছে?”
“ভালো”
“হসপিটালে নিয়ে গেছে না বাড়িতেই আছে?!”
“বাড়িতেই”
“আচ্ছা, আমি কাল সকালে আবার ফোন করব”
“আচ্ছা”
“তুই ফোন রাখ, আমি তারপর রাখবো”
ওপাশ থেকে ফোন কেটে দেওয়ার আওয়াজ পায় ইন্দিরা।

জয়তী বাড়িতে আছে মানে অবস্থা খুব একটা খারাপ হয়নি বোঝে ইন্দিরা। ফোন পকেটে ঢুকিয়ে হোটেলের দিকে হাঁটা শুরু করে ইন্দিরা। এটা প্রথমবার নয়, বাড়িতে যখনই কোনো বড় রকমের পরিবর্তন হয়েছে জয়তী প্রতিবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। পরিবর্তন… কেন এই শব্দটা মাথায় এল বুঝে পায়না ইন্দিরা। বাড়িতে পরিবর্তন বলতে সবসময় বিয়োজনই, মায়ের চলে যাওয়া, পিসির মৃত্যু আর এবার ইন্দিরার চলে যাওয়া। মায়ের চলে যাওয়ার পর না কি জয়তী তিন তলার ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল। দোতলার খোলা ছাদে এসে পড়ায় প্রাণে বেঁচে থাকলেও দীর্ঘকাল বিছানায় পড়ে থাকতে হয়েছিল তাকে, শিরদাঁড়ায় গভীর চোট ছিল তার, এসব না কি ইন্দিরার চোখের সামনেই ঘটেছিল, দাদা তাকে বলেছিল যখন সুস্থ ছিল। অথচ ইন্দিরার কিছুই মনে নেই। থাকার কথাও নয়, এ তার দেড় বছর বয়সের ঘটনা। তবে পিসির মৃত্যুর পর পাঁচ দিনের দিন যখন জয়তী দোতলার বারান্দার ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছিল তখন ইন্দিরাই প্রথম তাকে দেখে। আরো কিছু সময় পর সেদিন ইন্দিরা বাড়ি পৌঁছালে জয়তীকে আজ আবার নতুন করে ওষুধ খেতে হত না।

হোটেলের সামনে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ে ইন্দিরা। জয়তী কেন বারবার চলে যেতে চায়? কোথায় যেতে চায়! এই পৃথিবীর থেকে সেই জায়গাটা কি বেশি ভালো! ইন্দিরাও কি আবার কোনোদিন সেটা জানতে চেষ্টা করবে! হঠাৎ মাথায় আলতো ছোঁয়া পেয়ে চমকে ওঠে ইন্দিরা। উপরে তাকিয়ে গাছের ফাঁক দিয়ে কালো আকাশ ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। নীচে তাকাতে সে দেখে পায়ের কাছে এসে পড়েছে একটা ফুল, গোলাপি ফুল!

হঠাৎ করে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যায় রাস্তা দিয়ে, আর তার সাথে সাথে, ইন্দিরার মাথার উপরের, কাছের দূরের বিশাল বড় গাছগুলো থেকে রাস্তায় এসে পড়তে থাকে অসংখ্য গোলাপি ফুল! ফুলে ফুলে ঢেকে গিয়ে শিশুর মত নিষ্পাপ দেখায় রাস্তাটাকে। এই রাস্তা থেকে, এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে চায় মানুষ, অন্তত আজকে জয়তী চেয়েছে।

রাস্তা থেকে ইন্দিরা একটা গোলাপি ফুল কুড়িয়ে নেয়।


চলবে

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য