home আলাপচারিতা কবি হাসনাত শোয়েবের সঙ্গে আট কবির আলাপচারিতা ।। প্রথম পর্যায়

কবি হাসনাত শোয়েবের সঙ্গে আট কবির আলাপচারিতা ।। প্রথম পর্যায়

শিরিষের ডালপালা দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডার আয়োজন করছে। রাজীব দত্ত আর হাসান রোবায়েতের পর এবার সেই আড্ডার মধ্যমণি কবি হাসনাত শোয়েব। যিনি নিজেকে রকস্টার কবি ভাবেন। তার সেই ইমেজ ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার কবিতার ভাষা, প্রকরণ, বলবার ভঙ্গি সবই ভিন্ন। ২০১৫ সালে ‘সূর্যাস্তগামী মাছ’ বইটি প্রকাশ হবার পরেই তিনি আলোচনায় আসেন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ হয়েছে হাসনাত শোয়েবের দ্বিতীয় বই ‘ব্রায়ান অ্যাডামস ও মারমেইড বিষ্যুদবার’। বইটি নিয়ে ইতোমধ্যেই বেশ আলোচনা হচ্ছে। শোয়েব এক সময় একটি ব্যান্ডের সঙ্গে বেজ গিটার বাজাতেন। সঙ্গীত নিয়ে তার রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। স্বাভাবিকভাবেই শোয়েবের সঙ্গে আড্ডায় কবিতার পাশাপাশি সঙ্গীত নিয়েও আলাপ জমেছে। শোয়েবের সঙ্গে আড্ডায় ছিলেন কবি মোস্তফা হামেদী, হাসান রোবায়েত, রাসেল রায়হান, ফয়সাল আদনান, শিমন রায়হান, হুজাইফা মাহমুদ, ফারাহ্ সাঈদ ও রুহুল মাহফুজ জয়। আড্ডা উপভোগ করা যাক…

যীশুর সাথে এক ধরনের সম্পর্ক ফিল করি। হি ওয়াজ এ রিয়েল রকস্টার। যেমন আমি হতে চাই। সেসবই লেখায় আসতে থাকে। আমি আটকাতে পারিনি, চাইও নি।

হামেদী
আপনাকে ইদানীং ব্রায়ান অ্যাডামস্ নামে ডাকতে ইচ্ছা করে।হা হা হা ।
 
শোয়েব
ডাকেন । ব্যাপারটা খারাপ না।
 
হামেদী
ওকে। ধন্যবাদ। ডাকব মাঝেমধ্যে।যাই হোক, ‘ব্রায়ান অ্যাডামস ও মারমেইড বিষ্যুদবার’ এই রকম নাম বেছে নেওয়ার কারণ কী? সাধারণত বাংলা বই, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে এইটা একটা নতুন ব্যাপারই বটে। নাম নিয়ে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন?
 
শোয়েব
অন্য কোন নাম আসলে ঠিক করতে পারছিলাম না । তখন বইয়ের লেখা থেকে একটা নাম চুজ করে নিলাম। আর ইংরেজি নামে আমার তেমন আপত্তি নাই। অন্য কোন ভাষা হলেও সমস্যা নাই। এই নামে অনেকে একটু থমকে দাঁড়ায়। এইটা সম্ভবত নামের গিমিকের কারণে অনেকের কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। যদিও কবিতাটা মোটেই গিমিক না। অন্তত আমার কাছে।
 
হামেদী
হঠাৎ করে শুনলে নামটা অনেকের কাছে গিমিক মনে হতে পারে।এবং এটা অস্বাভাবিকও না। তবে,পুরো বইটা পড়লে এইটা মনে হবে না।বইয়ের যে মেজাজ, তার সাথে নামটা বেশ ভালোভাবেই যায়। অবশ্য শুদ্ধবাদীরা একমত নাও হতে পারেন। শুধু বইয়ের না, কবিতার নামের ক্ষেত্রেও আপনি সম্ভ্রম রক্ষা করেন নি।
 
শোয়েব
সে দায় আমার নাই, কখনো ছিলোনা। আমি মূলত যা ভালো লাগে তাই লিখি। কবিতায় কারো সম্ভ্রম রক্ষার কোন বালাই আমার নাই।
 
হামেদী
আপনার প্রথম বই ‘সূর্যাস্তগামী মাছ’-এও আপনার এই ধরনটাকে পেয়েছি। তো আপনি আরেকটা বইয়ের প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন কেন?
 
শোয়েব
প্রয়জনীয়তা বোধ করি নাই। অপ্রয়োজনীয়তাও বোধ করি নাই। আমার আরো দুইটা বই করার মতো লেখা জমে আছে। গদ্য কাউন্ট করলে চারটা হবে। হঠাৎ ডিশিসন নিলাম কনক সিরিজ বই করব। প্ররোচিত করছে জাবের, রাসেল, রোবায়েত, রাজীব দা। ব্যস করে ফেললাম। কার্যকারণ হিসেব করি নাই। কখনো যে করি তাও না।
 
হামেদী
দুইটার মধ্যে কোনও পার্থক্য ফিল করেন কিনা?
 
শোয়েব
বিশাল পার্থক্য। প্রথম পার্থক্য হচ্ছে একটার সাথে আরেকটার কোন মিল নাই। কোন পরম্পরা নাই। কিছু শব্দ বা এলিমেন্ট মিলতে পারে। আর কোন মিল আছে বলে আমার মনে হয় না।
 
হামেদী
আপনার কবিতা শিশুর বিস্ময় ও নির্জ্ঞান মনের সৃষ্টি মনে হয়। যখন যা মর্জি, তখন তাই করার মতো।
 
শোয়েব
এইটাকে কম্পলিমেন্ট হিসেবে নিলাম। এর বেশি কিছু বলে আমেজ নষ্ট করা ঠিক হবে না। হা হা হা
 
জয়
তুমি এই পথটাকে কি ভেবেচিন্তে বেছে নিছো? মানে লেখার এই ধারাটা?
 
শোয়েব
শিউর না। হয়তো ভেবেচিন্তে নিই নাই। লিখতে লিখতে এরকম হয়ে গেছে। আবার অবচেতনে একটা ভাবনা থাকলেও থাকতে পারে। কি জানি!
 
হামেদী
আপনার কবিতা আমার কাছে মনোলগ মনে হয়। সেক্ষেত্রে কনক কি আপনার দ্বিতীয় সত্তা?
 
শোয়েব
কনক নিয়ে একটা টু শব্দও আমি করব না। আপনাদের যা খুশি ভাবতে পারেন।
 
জয়
এই ব্যারিয়ার কেন?
 
শোয়েব
এইটা ব্যারিয়ার না। আমার ইচ্ছা। সবকিছু নিয়ে কথা বলতে আমি বাধ্য না।
 
জয়
কবির ইচ্ছাকে সম্মান জানাই
 
হামেদী
আপনার কবিতায় প্রচুর ক্রিশ্চান মিথোলজির ব্যবহার দেখি। এইটা কি স্রেফ ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা নাকি আপনার বেড়ে উঠার মধ্যে এর গোড়াটা আছে?
 
শোয়েব
গোড়া ঠিক না। আমার বাড়ি দেয়াং পাহাড়ের ধারের মরিয়ম আশ্রমের কাছে। সেখানে চার্চ আছে শুনতাম, কিন্তু কখনো দেখতে পারিনি। মানে শৈশবে আর কি। তখন আবছা কল্পনা করতাম নানা জিনিস। পরে বড় হয়ে গেছি। অবিকল আমার কল্পনার মতো ছিলো। আমি খুব অবাক হইছিলাম ব্যাপারটায়। এরপর অনেকদিন আমি বাইবেল পড়ি নানাভাবে। যীশুর সাথে এক ধরনের সম্পর্ক ফিল করি। হি ওয়াজ এ রিয়েল রকস্টার। যেমন আমি হতে চাই। সেসবই লেখায় আসতে থাকে। আমি আটকাতে পারিনি, চাইও নি।
 
হামেদী
কবিতাকে অনেকভাবেই দেখা হয়। একটা প্রমিনেন্ট এপ্রোচ হচ্ছে, কবি যে ভাষা নিয়ে কাজ করেন, সেই ভাষা-ভূগোলের সংস্কৃতি তথা যাপনের নির্যাস অন্বেষণ। যেটাকে বলতে পারি লোকাল টেস্ট, সেটা উৎপাদনে আপনার কবিতা কতটা সফল?
 
শোয়েব
মনে হয় তেমন একটা সফল না। আমার কবিতা আমাদের পরিচিত জগৎ থেকে একটু দূরে থাকে, সেইটা সম্ভবত আমার কবিতার দুর্বলতাও বটে, কিন্তু তা নিয়ে আমার আফসোস নাই কিংবা জোর করে বদলাতেও চাই না।
 
হামেদী
আপনার কবিতায় সিনেমার ট্রিটমেন্ট দেখতে পাই আমি। অনেক ধরনের দৃশ্য ও সংলাপ, বিভিন্ন জায়গায় ধারণকৃত শটগুলি এডিট করার সময় যেভাবে এক জায়গায় জুড়ে দেওয়া হয়, সেইরকম একটা ব্যাপার এখানে ঘটে।যেন অনেকগুলো স্লাইড পরপর যুক্ত করা হয়েছে।একটার সাথে একটার আপাত কোনো সংযোগ থাকে না। আপনার কী মনে হয়?
 
শোয়েব
হতে পারে। দ্বিমত নেই। আপনার এই অবাজার্বেশন ভালো লাগছে। নানা দৃশ্যের মাঝে আমার ভাবনা ঘুরপাক খেতে থাকে। যদিও এরকম কবিতা সম্ভবত প্রথম বইয়ে খুব বেশি পাবেন। এই বইয়ে অত আছে কি!?
 
হামেদী
এই বইয়ের গতিটা একটু বেশি। মানে প্রবাহ স্মুথ। কিন্তু ঐরকম ব্যাপার আছে।
 
শোয়েব
হা। সেইটা থাকলেও থাকতে পারে।

নিজের ভূমি ফিল করার মতো কিছু আমার ছিলো না। যেটা এখন শুনতেছি সেটাও থাকবেনা । সুতরাং লিটেরালি আমার জিয়োগ্রাফিকাল আইডিন্টিটি ক্রাইসিস থাকা খুব স্বাভাবিক। সে অর্থে আমাকে আন্তজার্তিকতাবাদীও বলতে পারো। হা হা হা।

রোবায়েত
শোয়েব, কী অবস্থা?
 
শোয়েব
সেই-ই অবস্থা। তুমি কি প্রতিশোধের মুডে আছো রোবায়েত? 
 
রোবায়েত
না না। প্রতিশোধরে আমি প্রীতিশোধ বানাইতে চাই।
 
শোয়েব
তবে তাই হোক।
 
রোবায়েত
আমি ভাবতেছি তোমার সাথে আড্ডা দেওয়াই ভালো। যাই হোক, তোমার বইটা কাউরে উৎসর্গ করো নাই ক্যান? আমারে করতে পারতা তো!
 
শোয়েব
নাহ। এখানে একটা সাইলেন্ট উৎসর্গ আছে। সেইটা এখন বলব না। পরে বলব। তবে উৎসর্গ কাউকে নিশ্চয় করছি। এইটা একটা ম্যাজিক বলতে পারো কিংবা ধাঁধা।
 
রোবায়েত
তার মানে যারে করছো সেই ভদ্রলোক জানে!
 
জয়
ভদ্রলোকটা মনে হয় ওর বাবা
আমার মনে হইছে, ওই পাতাউল্টায়েই
 
শোয়েব
হয়তো জানে, হয়তো জানেনা। তবে এইটা বাবা না এইটা নিশ্চিত। অবশ্য জয় ভাই আপনার যদি বাবা মনে হয় তবে আপনার জন্য সেটাই। কারো ওপর আমি চাপিয়ে দিতে চাই না। আমি আমারটা অন্যদিন বলব।
 
হামেদী
আপনি বইলেন না।এটা শূন্যস্থানের মতো থাক। আমরা বসিয়ে নিব যার যার মতো করে। তবে, মরার আগে ক্লু দিয়ে যাইয়েন।
 
রোবায়েত
তোমার জিয়োগ্রাফি বেশ ওভারল্যাপ করে। এইটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে একদিন আমি ম্যাপ কিনতে গেছিলাম। তো, বহুত খোঁজাখুঁজি করেও সোফিয়া লরেনকে পাইলাম না। অনেক টাকা হলে তুমি কি সোফিয়ায় যাইতে চাও?
 
শোয়েব
অবশ্যই যাইতে চাই। শুনেছি বুলগেরিয়া সুন্দর দেশ। ইদানীং বহু হিন্দি সিনেমার শূটিং সেখানে হচ্ছে। আমি সুযোগ পেলে যাব। স্কুলে বুলগেরিয়ারর লোকদের কৃপণতা নিয়ে একটা গল্প পড়ছিলাম লেখকের নাম ভুলে গেছি। কারো মনে থাকলে বইলেন।
 
হামেদী
ড.মুহম্মদ এনামুল হকের, ‘বুলগেরিয়া ভ্রমণ’ এর একটা অংশ।
 
শোয়েব
থ্যাংকস হামেদী ভাই। গল্পটা আবার পড়ে নেবো বুলগেরিয়া যাওয়ার আগে।
 
রোবায়েত
সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় পোস্টমডার্নিজমের একটা প্রভাব দেখা যায়। তোমার কবিতাও সেই রকম ঘরানার দিকে যাইতে চায় কি?
 
শোয়েব
আমি কবিতাকে ওইভাবে কোন ট্যাগ দিতে চাই না। আমি কবিতাই লিখতে চাই আমার মতো করেই। কোন ইজম লেখার তাড়না নাই।
 
রোবায়েত
কিন্তু ইজম তো ধরো হাঁ কইরা বইসা থাকে ব্ল্যাক হোলের মতন। সব কিছুরেই টানতে চায়। যদি টানেই, শেষতক তোমার টেক্সটরে তুমি কি সেদিকে পাঠাবা? মানে, উত্তরাধুনিকতার দিকে!
 
শোয়েব
নাহ। আমি পাঠাবো না। তবে কবিতা কবিতা হলে এরপরর যেখানে খুশি যেতে পারে। সেটা আমার কনসার্ন না।
 
রোবায়েত
‘কবিতা কবিতা হলে’ এইটা হইলো কবিদের ব্যবহৃত সবচে প্যারাডক্স মার্কা কথা। আপাতত এই কথায় চিড়া ভিজতেছে না। কবিতা কবিতা না হইলেও কিন্তু ইজমের মধ্যে ঢুকে যায়। সেই ক্ষেত্রে কী বলবা?
 
শোয়েব
ঢুকলে ঢুকতে পারে। সেইটা আমার চিন্তার বিষয় না। আমার যেভাবে লিখতে ভালো লাগতেছে সেভাবেই লিখব। কারো ভালো লাগলে ভালো, না লাগলে নাই। কেউ ইজম ধুয়ে পানি খেতে চাইলে খাইতে পারে, আমি খাবো না।
 
রোবায়েত
না খাওয়াই ভালো। তাও ধরো, কেউ কবিতা পইড়া বললো যে আপনার টেক্সট তো ‘পোস্টমডার্ন’ ঘরানার। তখন কেমন লাগবে তোমার?
 
শোয়েব
বললে বলতে পারে। আমার কিছুই লাগবে না সেইটা পাঠকের স্বাধীনতা। আমি নিজে বলব না সেইটা আমার স্বাধীনতা। সবাই নিজ নিজ জায়গায় সুখে থাকুক।
 
রোবায়েত
তোমার কবিতা পড়ে আমার কেন জানি কাল মনে হইলো, আমি নানান ভূগোলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বহুত কিছু দেখছি। কিন্তু যখন নিজের কাছে ফিরে আসলাম, মনে হইলো এই কবির নিজের ভূমি কই? মানে, জিয়োগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিটি ক্রাইসিস শুরু হয়। আচ্ছা ধরো, তোমার কবিতা অনুবাদ করে অন্য কোনো ভাষার লোক পড়লো সেও কি এই ক্রাইসিসে ভুগবে না?কেমন যেন কিটসের adieu the fancy cannot cheat so well এর মতো লাগে তখন।
 
শোয়েব
ভুগতে পারে। আমার দেখার অভিজ্ঞতা কম, পাঠের অভিজ্ঞতা বেশি। আমি একটা সময় কুত্তার মতো পড়ছি। সেসব আমারো কল্পনার সাথে মিশে আমার লেখা তৈরি হয়। আর একটা ব্যাপার হলো, আসলেই আমি আক্ষরিক অর্থে ভুমিহীন মানে আমার একটা বাড়ি আছে, সেইটা কখনো আমার না। আমি অন্যের বাড়িতে বড় হইছি। নিজের ভূমি ফিল করার মতো কিছু আমার ছিলো না। যেটা এখন শুনতেছি সেটাও থাকবেনা । সুতরাং লিটেরালি আমার জিয়োগ্রাফিকাল আইডিন্টিটি ক্রাইসিস থাকা খুব স্বাভাবিক। সে অর্থে আমাকে আন্তজার্তিকতাবাদীও বলতে পারো। হা হা হা।
 
রোবায়েত
তার মানে তুমি যা লিখতেছ তা আসলে অন্যের দেখা পৃথিবী। যেহেতু তুমি বলতেছ তোমার পাঠের অভিজ্ঞতা বেশি।
 
শোয়েব
নাহ। সেগুলা কেবল অনুষঙ্গ। আমার লেখা সম্পূর্ণ আমার কল্পনার জগত । কিন্তু এখন যে তাতে বাস্তবতা যোগ হচ্ছে না তা না। তাও হচ্ছে। আমি সম্ভবত অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করতে শুরু করেছি নানাভাবে। আমার বইয়েও অনেক কিছু আছে। প্রথমটাতে যা ছিলো না বললেই চলে।
 
রোবায়েত
তার মানে তুমিও সো কল্ড ‘যাপিত জীবন’কে পাত্তা দিচ্ছ?
 
শোয়েব
নাহ। দিচ্ছি না। প্রশ্নই আসে না দেয়ার। সেগুলা নিজের মতো করে আসতেছে। পাত্তা দিলে তুমি নিজেই ধরতে পারতা। আমি আমার লেখাকে নিয়ন্ত্রণ করি না। এগুলো অটো লেখা। আমার মনে হয় নিজের ক্রিয়েশনের প্রতি ক্রেজি না হলে নতুন কিছু তৈরি হয় না। আমার মনে হয় আর কি। মাত্রা ‍গুনার জন্য এবং অভিজ্ঞতা বয়ান করার জন্য আমি লিখি না।
 
রোবায়েত
‘কিন্তু এখন যে তাতে বাস্তবতা যোগ হচ্ছে না তা না। তাও হচ্ছে। আমি সম্ভবত অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করতে শুরু করেছি।’ তাইলে তোমার এই কথা কি কনফ্লিক্ট করছে না তোমার উত্তরের সাথে?
 
শোয়েব
নাহ। অভিজ্ঞতা আমি নিয়ে আনতেছি তেমন বলি নাই। বলছি আসতেছে। সেইটা বুঝতে পারতেছি। সেটা আরোপিত না।
 
রোবায়েত
ওকে। ‘যাপিত জীবন’ কবিতায় আসলে সমস্যাই বা কী? আমাদের গ্রেট কবিতাগুলোর অনেকটাই তো যাপিত জীবন নিয়েই।
 
শোয়েব
সেটাই। আমি আসলে অনেক কিছুই বলতে হয় বলে বলছি। ইন্টারভিউ ত। না বললে কেমনে! নয়লে এতসব গুনার বা শোনার টাইম কই। বলতে বলতে যা মনে আসছে বলছি।
 
রোবায়েত
ধরি, এইটা ইন্টারভিউ না। তাইলে কী কী বলতা এর উত্তরে?
 
শোয়েব
বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই দিতাম না। উড়াই দিতাম।
 
রোবায়েত
হা হা। উড়ায়া যে দিচ্ছ না সেইটা কি পাব্লিকের ভয়ে! যেমন ধরো, পাবলিক আর তোমার বই কিনলো না তোমার উপরে গোস্বা করে এমন?
 
শোয়েব
না না। পাবলিকরে ভয় পাওয়ার কি আছে। বই বিক্রি নিয়েও ভাবনা নাই। উড়িয়ে দিচ্ছি না কারণ, যখন এগুলা বলতেছি তার মানে এগুলারও এক ধরনের লজিক্যাল গ্রাউন্ড নিশ্চয় আছে আবার নাও থাকতে পারে। আর সব উড়াই দিলে তোমাদের আমার নেওয়া সাক্ষাৎকার আমার নাম দিয়ে ব্ল্যাংক পেজ আপ করতে হবে। সেটা যদি তোমরা করতে পারো আমার আপত্তি নাই।

আমার বই এখন কেমন পাঠ হচ্ছে সেটা গৌণ ব্যাপার। এইসব পঠন-পাঠন মোর পলিটিক্যাল। তারচেয়ে আমি বরং ভাবি সেই পাঠকের কথা, যে পনের-বিশ বছর পর আমার বই না পেয়ে ফটোকপি করে নিচ্ছে, যেমনটা আমি নিজে করেছি কারো কারো বই। আমার ধারণা আমরা সবাই করেছি। তাই সমকালের চেয়ে পরকালের এই ভাবনাটাই আমাকে আক্রান্ত করে হুটহাট।

রোবায়েত
ডায়ালগের ভঙ্গিমার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় ‘ব্রায়ান অ্যাডামস্’ যা নাটকে বহুল ব্যবহৃত। উৎপলকুমার বসু একবার, কবিতায় স্টেজে ওঠা নানান চরিত্রের পারফর্মের কথা বলেছিলেন। ধরো, একজন একটা কিছু বলে চলে গেল আবার আরেকজন মঞ্চে আসলো, সেও কিছু বলে গেল। এভাবে অনেক ডায়ালগ আসতে থাকে। সেইটা ঠিক প্রথাগত ডায়ালগের মতন না। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি কবিতা তখন বহুস্বর ক্যারি করে। তোমার ব্রায়ানকে কি সেই রকম মনে হয়?
 
শোয়েব
আসলে এই মুহূর্তে বইটা নিয়ে খুব বেশি কথা আমি বলতে চাচ্ছিলাম না। পাঠক নানাভাবে এটাকে ইন্টারপ্রেট করছেন। আমি কিছু বললে সেইটা ভয়াবহ ইন্টারাপ্ট হবে। আমি সেইটা চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি আমি নিজে সেরকম কিছুটা মনে করি।
 
রোবায়েত
ব্রায়ান পড়ে আমার হঠাৎ লাতিন আমেরিকার কথা মনে পড়ে। সেখানে বাইবেল, যিশু, ম্যাজিক রিয়ালিজম আসে বারবার। ব্রায়ানেও তেমন আসে। এই টেক্সট কি লাতিন আমেরিকার মেজাজ ধারণ করে আছে?
 
শোয়েব
আমি সেরমকম কিছু ভেবে লিখিনি। অবচেতনে থাকলেও থাকতে পারে। কারণ, লাতিনের ব্যাপার-স্যাপারে মজা আছে। আমি তাদের পছন্দ করি। তবে যা লিখছি আমি সেইসব খুব ফিল করি। এই সিরিজের কিছু লেখা লেখার পর আমার মনে হয়েছে আমি ঠিক এই লেখাটাই লিখতে চাচ্ছিলাম। এভাবেই। তবুও আমি বইটা নিয়ে শেষ পর্যন্ত খুশি হতে পারব কিনা জানি না। আরেকটু সময় লাগবে হয়তো বুঝে উঠতে।
 
রোবায়েত
তোমার দুইটা বই-ই টানাগদ্যে। একবার এক আড্ডায় আমাদেরই একজন সিনিয়র কবি বলেছিলেন, কোনো তরুণ কবির ২য় বইটাও যদি টানাগদ্যের হয় তবে তিনি সেইটা পড়বেন না। তোমার নিজের বক্তব্য কী এ ব্যাপারে?
 
শোয়েব
ধুর, কেউ পড়লো কি, পড়লো না সেইটা ভাবার সময় কই! যার যা ইচ্ছা পড়বেন। ওনার বরং আমার লেখা না পড়াই ভালো। অবশ্য পড়লেও পড়তে পারেন তার ব্যাপার। এতে আমার লেখার কোন ক্ষয়-বৃদ্ধি হবে না। আমার বই এখন কেমন পাঠ হচ্ছে সেটা গৌণ ব্যাপার। এইসব পঠন-পাঠন মোর পলিটিক্যাল। তারচেয়ে আমি বরং ভাবি সেই পাঠকের কথা, যে পনের-বিশ বছর পর আমার বই না পেয়ে ফটোকপি করে নিচ্ছে, যেমনটা আমি নিজে করেছি কারো কারো বই। আমার ধারণা আমরা সবাই করেছি। তাই সমকালের চেয়ে পরকালের এই ভাবনাটাই আমাকে আক্রান্ত করে হুটহাট।
 
রোবায়েত
তোমারে কখনোই ছন্দে লিখতে দেখা যায় না। এমনকি ফ্রি ভার্সেও না। এইটা কেন?
 
শোয়েব
সোজা কথায় আমার ভালো লাগে না লিখতে। আমি এভাবেই লিখতে স্বচ্ছন্দ। এটাকে কেউ আমার অক্ষমতা বললেও বলতে পারে তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।
 
রোবায়েত
বাংলা কবিতায় টানগদ্যের স্কুলটা খুব বড় নয়। আব্দুল মান্নান সৈয়দ, উৎপলকুমার বসু, সিকদার আমিনুল হক, গৌতম বসু, মজনু শাহ, জুয়েল মোস্তাফিজ,সোহেল হাসান গালিব প্রমুখ। তাদের প্রত্যেকেরই কাজ ভিন্ন রকম। এই স্কুলে ‘সূর্যাস্তগামী মাছ’ আর ‘ব্রায়ান অ্যাডামস ও মারমেইড বিষ্যুদবার’ নতুন কী সংযোজন করে?
 
শোয়েব
সেটা আমি কীভাবে বলবো? লিখবোও আমি, ব্যাখাও দিবো আমি। সেটা অত্যাচার না? তোমরাই বরং বলো কিছু আদৌ সংযোজন করলো কিনা?
 
রোবায়েত
আমি হয়ত অল্প কিছু বলতে পারি। তোমার এই কাজগুলো অনেকটাই প্রভাত চৌধুরী আর মজনু শাহ’র ঘরানার। তোমারটা আসলে ফেয়ারিটেলসের মতো। একটা অন্য জগতে নিয়ে যায়। তুমি যখন টানাগদ্যে কাজ শুরু করলে তখন যে ধরনের কাজ এই ফর্মে বাংলা কবিতায় হয়ে গেছে সেইগুলো খেয়ালে ছিল তোমার?
 
শোয়েব
ঐগুলা পড়ার উপরেই ছিলাম। তবে কারো অনুকরণ হচ্ছে কিনা না চাইলেও সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়েছে। কারণ আমি আমার কথাটাই বলতে চাচ্ছিলাম।
 
রোবায়েত
অনুকরণ অবশ্যই না। তোমার টেস্ট আমি অন্তত পড়লেই পাই।
ভাষা নিয়ে তোমাকে খুব একটা ভাবতে দেখা যায় না। তবুও তোমার একটা স্টাইল গড়ে উঠেছে। আর সেইটা হয় প্রচুর অনুষঙ্গ ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে। রক মিউজিকে যেমন প্রচুর ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করা হয় তেমন। তো, ভাষা নিয়ে নতুন কোনো কাজ নেক্সট বইয়ে আশা করতে পারি?
 
শোয়েব
আমি সেটাই চাইছিলাম। আমিই যদি না থাকি তবে কি লাভ।
আশা করতে অবশ্যই পারো। এটুকু অন্তত বলতে পারি, আমার দ্বিতীয় বই যেমন প্রথম বইয়ের রিপিটিশন হয় নাই, তেমনি আমার তৃতীয় বই আমার দ্বিতীয় বইয়ের এক্সটেনশন হবে না। নয়তো আর বই-ই হবে না।
 
রোবায়েত
তোমার টানাগদ্যে আমি একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য খেয়াল করি, সেইটা হলো গদ্যের যে শোষণ-ক্ষমতা সেইটারে তুমি ভালো ভাবেই ইউজ করতে পারো কবিতায়। গদ্যের এই ক্ষমতার জন্যই কবিতা হয়ে ওঠে বিচিত্র, বহুমুখী। এই যে ক্ষমতা তুমি অর্জন করলা সেইটা কি তোমার প্রচুর গদ্য লেখার ফল নাকি তুমি আসলে গল্পকার হইতে চাইছিলা?
 
শোয়েব
আসলেই গল্পকার হইতে চাইছি কিনা সেইটা বলা কঠিন। তবে সত্যি কথা হচ্ছে আমি যখন সদ্য ব্যর্থ রক মিউজিশিয়ান তখন আমি গল্প দিয়ে শুরু করি। শাহাদুজ্জামান এবং হাসান আজিজুল হক পড়ে তুমুল আগ্রহ নিয়ে গল্প লিখতে গিয়ে দুটি গল্প লেখার পর আমি শহীদুল জহির পড়ি। পড়ে আমার সব উলটপালট। মনে হচ্ছিল এরে অতিক্রম করতে না পারলে লিখে লাভ কি! এরপর যাই গল্প লিখি শহীদুল জহির চলে আসেন। তাই গল্প লেখা বন্ধ করে দেই। এরপর হঠাৎ কবিতা লিখতে শুরু করি। তখন সম্ভবত গল্প বলার তাড়নাটা কবিতার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। যেটা এই বইয়ে সম্ভবত অনেক বেশি এক্সপ্লোর করছে।
 
রোবায়েত
আমারও সেইটা মনে হইছে। ব্রায়ানের বেইজ লাইনটাই আসলে গল্পে। ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো। কিছুটা ফেয়ারিটেলস নিয়ে। তবে তোমার বইয়ে মানে ব্রায়ানে কিছু কিছু অতিকথনের জন্য ভাষা ক্লামজি হয়ে ওঠে। মনোটোনাসও কিছুটা।
টানাগদ্যের একটা বিরাট বেরিয়ার হইলো এই অতিকথন। এইটারে কীভাবে হ্যান্ডল করতে চাও?
 
শোয়েব
অনেকেই এগুলারে কবিতা বলতে নারাজ যেমন রাজীব দা (রাজীব দত্ত)। যদিও আমি নিজে তা মানি না।
হা অতিকথন থাকতে পারে। তবে এই বইয়ে আমি এটাই রাখতে চাচ্ছিলাম। কোন এডিটিং করতে চাচ্ছিলাম না।

কবি নরম-সরম, পায়জামা -পাঞ্জাবী পরা কেউ এই ধারণা এখানে চলমান। সেই সাথে কবিকে হতে হবে নির্মোহ, নির্লোভ, ভদ্র এরকম হাজারো এথিকসের বোঝা আমরা কবির ওপরে ছাপিয়ে আনন্দ লাভ করি। এই ধারণা মূলত জীবনানন্দজাত। জীবনানন্দ এই ক্ষতিটা করেছেন পরবর্তী কবিদের জন্য।

ফারাহ্
আরাকান সাহিত্যে পড়েছেন? কোন অনুবাদ? চট্টগ্রাম একসময় আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কিছু লিখেছেন বা লেখার ইচ্ছে আছে? কি লিখবেন?
 
শোয়েব
আরাকান সাহিত্য পড়িনি। কোনও অনুবাদও পড়িনি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কিছু লিখিনিও। লিখবো কিনা এখনো বলতে পারছি না।
 
ফারাহ্
আপনি বলেছেন, ‘কবি সিরিয়াল কিলারও হতে পারে আবার মুদি দোকানদারও’, তো আপনি হলেন ‘মনে মনে’ রকস্টার , এই কম্বিনেশন যদিও রেয়ার কিন্তু চমকপ্রদ , কী করে হলেন এমন একের ভেতর দুই ? কতটা কবি বা কতটুকুই বা রকস্টার?
 
শোয়েব
কি করে হয়ছি বলা কঠিন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে চাই যে আমি রকস্টার। কারণ আমি বিশ্বাস না করলে অন্যকে বিশ্বাস করাবো কেমনে। যদিও সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে যে, আদৌ আমি রকস্টার কিনা! আমার কবিতায় রকভাব কতটা উপস্থিত আছে সেটা ভাবাও জরুরি। জিম মরিসন যেমন রকস্টার তেমন কবিও। আমি সেরকম কিছু না। কারণ আমি একটিভলি মিউজিকের সাথে যুক্ত থাকতে পারিনি। তবে শুধু রক মিউজিক করেই কেউ রকস্টার হবে এমন ধারণাও সম্ভবত বদলানো দরকার। কবি নরম-সরম, পায়জামা পাঞ্জাবী পরা কেউ এই ধারণা এখানে চলমান। সেই সাথে কবিকে হতে হবে নির্মোহ, নির্লোভ, ভদ্র এরকম হাজারো এথিকসের বোঝা আমরা কবির ওপরে ছাপিয়ে আনন্দ লাভ করি। এই ধারণা মূলত জীবনানন্দজাত। জীবনানন্দ এই ক্ষতিটা করেছেন পরবর্তী কবিদের জন্য। তার ট্রামে চাপা পড়াকে আদর্শ হিসেবে নিয়ে আমরা এরকম চরিত্র কবির ওপর আরোপ করা শুরু করছি। এগুলো ভাঙা জরুরি। কবিতা যেমন অনেকরকম, কবিও হবে হরেকরকম। রকের সাথে কবিতার কোন যুদ্ধ নাই।
 
ফারাহ্
বিভিন্ন দেশের রাজধানী নিয়ে আপনার এতো মাথাব্যথা কেন? তাও আবার আনরিলেটেড সব ভাবনা! আপনার এই রাজধানী সিরিজের গন্তব্য কোথায়?
 
শোয়েব
এগুলো স্রেফ অনুষঙ্গ। এসবের কোন গন্তব্য নাই। আর আমার প্রায় সব ভাবনাই আনরিলেটেড। সবকিছুতে রিলেশন থাকা জরুরি মনে করি না।
 
ফারাহ্
হাসান রোবায়েত ও হাসনাত শোয়েব, বাংলা কবিতায় এই দুটি নাম নিয়ে পাঠকের বিভ্রান্তির কথা জানেন নিশ্চয়ই। শুধু কি নামেই মিল? আপনাদের দুজনের লেখায় কি কোন মিল আছে বলে মনে হয় আপনার?
 
শোয়েব
এইটা উচ্চারণের কারণে মনে হয়। আমাদের দুজনের কবিতায় কোন মিল নেই বলে আমার মনে হয়।
 
ফারাহ্
ইদানিং আপনার কবিতার শিরোনামগুলো প্রায় সবই ইংরেজিতে ! আপনার কবিতায় ইংরেজি শব্দের অতিব্যবহার করেছেন বলে মনে হয় কি কখনো ?
 
শোয়েব
করেছি। অনেক অতিব্যবহার করেছি। করতে ভালো লাগে। ইংরেজিতে শিরোনাম দিতেও আমার ভালো লাগে। ভবিষ্যতে জার্মান কিংবা ফ্রেঞ্চ অথবা অন্য কোন ভাষার শিরোনাম দিতে মন চাইলে তাও দিবো।
 
ফারাহ্
রাজনীতির ক্ষেত্রে কবিতা কী প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে ?
 
শোয়েব
হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেসব কবিতা না হয়ে স্লোগান হয়ে ওঠে বলেই সমস্যা। কবিতা কবিতা হয়ে ওঠার পর রাজনীতির ভাষা হলে আমি সমস্যা মনে করি না।
 
ফারাহ্
সাহিত্যে ‘সুরিয়ালিজম’ কি এখনো অভিনব উপাদান ? এই সময়ে , ২০১৭ তে এটা কতটা প্রাসঙ্গিক ?
 
শোয়েব
এটা মূলত কিভাবে ইউজ করছে তার ওপর নির্ভর করে। কেউ যদি প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।
 
ফারাহ্
কবি হাসনাত শোয়েব কি কোনদিন ” আমার শ্রেষ্ঠ কবিতা / গল্প সংকলন” এই জাতীয় কোন বই প্রকাশ করবেন? আসলে লেখকের ‘শ্রেষ্ঠ’ বলে সত্যি কি কোন লেখা থাকে? নাকি এটা পাঠকের জন্যে একটি চমক মাত্র?
 
শোয়েব
এগুলো প্রথমত বিক্রি কৌশল। দ্বিতীয়ত কবির যখন অনেক বই হয়ে যায় তখন এ জাতীয় সংকলনের মাধ্যমে কবির সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। এটাকে আমার খারাপ মনে হয় না। তবে আমি করব কিনা এই ক্লিশে প্রশ্নের উত্তর দিবো না।
 
ফারাহ্
বব ডিলান-এর সাহিত্যে নোবেল পাওয়াকে কীভাবে দেখছেন ? গীতিকার আদতে একজন কবি, তাই নয় কি ?
 
শোয়েব
বব ডিলানের নোবেল পাওয়া ঠিকই আছে। তবে এতে তার তেমন কোন লাভ হয় নাই। নোবেল না পেলেও ডিলান ডিলানই থাকবেন। আর ক্ষেত্র বিশেষে গীতিকার অবশ্যই কবি হতে পারেন। আর ডিলান আমার কাছে অবশ্যই একজন কবি এবং রকস্টার।

কবিতা কখনো কখনো মনে হয়, আবার কখনো মনে হুদাই কাবজাব। প্রশ্ন জাগে না কখনো। জেগেও লাভ নাই, আমি যেমন ইচ্ছা তেমনভাবেই লিখি।কারো কারো ভালো লাগে, ঐটুকুই এনাফ।

রাসেল
বইয়ের নাম এত কঠিন কেন? কবিতা তো অত কঠিন না!
 
শোয়েব
বইয়ের নামে একটা কবিতা বইয়ে আছে। সুতরাং নামও বইয়েরর অংশই। আর ব্রায়ান অ্যাডামস্ ইংরেজি নাম বলে কঠিন শোনায়। অত কঠিন আসলে না।
 
রাসেল
অনেক অনেক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বইয়ে। বাইবেলের অনেক অনুষঙ্গ। এটা বোধ হয় আগের বইয়েও ছিল। এটা ঠিক কেন? মানে এটা আমাদের এখানকার সাথে যায় না বোধ হয় ঠিক।
 
শোয়েব
শব্দে আমার কোন আপত্তি নাই। যেকোন শব্দ কবিতায় আসতে পারে। আমাদের এখানাকার সাথে যায় না এটাও ঠিক না। আমার যায়, আমি করি। যার যায় না, সে করবে না। স্থানিক সীমাব্ধতার দরকার কি?
 
রাসেল
আরেকটু অ্যাড করি সাথে। এই বইয়ের বড় ক্যারেক্টার কিন্তু কনক। সে সম্পূর্ণ এখানকার। কিন্তু কথা কিংবা চালচলনে যেন ঠিক এখানকার না। সে এমনভাবে বলছে যেন পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বসে দেখছে সে, কথা বলছে। এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? ঠিক শব্দ না কিন্তু, তার ভাবনা, কথা বলা, সব।
 
শোয়েব
দেখতে পারে তো। আমি নিজে দেখি। আমি সেল্টা ভিগোয় বসে রূপসী বাংলা দেখছি এইটা কল্পনা করতে পারি। আর দূরে গেলে অনেক কিছুই অবজেক্টিভলি দেখতে পারি। আমার এভাবে ভালো লাগে ভাবতে। আর সবকিছুতে দেশমাতৃকা থাকতে হবে কেনো?
 
রাসেল
দেশমাতৃকার বিষয় না। দূরের একটা জিনিস না দেখে ঠিক কতটা দেখা যায়? এই দেখাটা কতটা তৃপ্তিদায়ক?
 
শোয়েব
আমি পূর্ণ তৃপ্তি দিয়েই দেখি। সমস্যা হয় না তো। আর যতটা দেখা যায় ততটাই দেখি। ঐটুকু সত্য।
 
রাসেল
আচ্ছা। এবার কনকের প্রসঙ্গে আসি। এই কনক বড় নির্মোহ। আমার অমন মনে হয়। শোয়েব কতটা নির্মোহ?
এবং নির্বিকারও!
 
শোয়েব
কঠিন প্রশ্ন। কাল বলছিলাম এই প্রশ্নের উত্তর দিবো না। তবুও বলি, কনক শোয়েব না।
 
রাসেল
ওকে। কনক হয়তো শোয়েব না। কিন্তু কনক নামের এই নির্বিকার চরিত্রটার বীজ কই?
 
শোয়েব
আমি জানি না অথবা বলব না।
 
রাসেল
শোয়েব, আরোপিত আর নাজিল, আপনার কোনটা?
এই প্রশ্নটা অন্য কাউকে করতাম না। রোবায়েত আর আপনি?
সুতরাং উত্তর চাই।
 
শোয়েব
তুমি করে বলো। অস্বস্তি লাগছে। নাজিল বলব না, প্রথমত কল্পনা, এরপর ভাষা সাজিয়ে নেই। মানে কল্পনায় কিছুটা আরোপ।পুরোপুরি কল্পনাও না, আবার পুরোপুরি আরোপও না। মাঝামাঝি কিছু একটা।
 
রাসেল
কবিতার কাছে কিছু চাও কি না? চাইলে কতটা?
 
শোয়েব
কবিতার কাছে কিছুই চাই না। তার কাছে চাওয়ার কিছু নাই।
 
রাসেল
কবিতা একজন নতুন কবির কাছে কতটা চায়? আদৌ যদি চায়?
 
শোয়েব
যদি চায় আর কি, নতুন কবির কাছে সম্ভবত নতুন কবিতা চায়।
 
রাসেল
তুমি যেটা লেখো, সেটা কি আদৌ কবিতা? নতুন কিছু? কখনো নিজের কাছে এই প্রশ্ন জাগছে?
 
শোয়েব
কবিতা কখনো কখনো মনে হয়, আবার কখনো মনে হুদাই কাবজাব। প্রশ্ন জাগে না কখনো। জেগেও লাভ নাই, আমি যেমন ইচ্ছা তেমনভাবেই লিখি।কারো কারো ভালো লাগে, ঐটুকুই এনাফ।
 
রাসেল
গত পঁয়ত্রিশ বছরে নতুন কিছু কারা কারা লিখছে বলে তোমার মনে হয়?
বাংলা কবিতা অবশ্যই।
 
শোয়েব
সিকদার কি পঁয়ত্রিশে পড়ে ? এর বাইরে মজনু শাহ নতুন। অন্য কারো নাম মনে পড়ছে না যারা একেবারেই নতুন। দ্বিতীয় দশকের কেউ কেউ চেষ্টা করছেন আলাদা কিছু করার।
 
রাসেল
নাম…
 
শোয়েব
নাম হাসান রোবায়েত, রাজীব দত্ত, তোমার বিব্রত ময়ূরের কিছু কিছু জায়গায় নতুনত্ব ছিলো কিন্তু আরো এক্সপ্লোর করার সুযোগ আছে। আর কারো নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।
 
রাসেল
সিকদার থেকে বর্তমান বাংলা কবিতা কতটা এগুলো আসলে? আদৌ কি এগুলো?
 
শোয়েব
অনেক আগাইছে। ইঞ্চি মেপে কেমনে বলি!
 
রাসেল
ধরো বিঘতে?
 
শোয়েব
আগাইছে বেশ। নানা ধরনের লেখা হচ্ছে।

চলবে

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য