home ই-বুক, ভিনদেশি সাহিত্য আমার পড়ালেখা – ভিএস নাইপল ।। চতুর্থ পর্ব ।। ভাষান্তর: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

আমার পড়ালেখা – ভিএস নাইপল ।। চতুর্থ পর্ব ।। ভাষান্তর: মূর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল

কনরাড এবং এই উপন্যাসের (আন্ডার ওয়েস্টার্ন আইজ) লেখক (কনরাডের বন্ধু) দু’জনের মতেই প্রতিটা গল্পের ভেতর শিক্ষামূলক কোন নীতি আবিষ্কার করা প্রয়োজন। আমি নিজেও এই একই মনোভাব পোষণ করি। আগেই বলেছি লেখালেখির শুরুতে ব্যাপারটা আমি নিজেও জানতাম না। কনরাডের মতো এই একই মনোভাব আমার ভেতর গড়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছে আমার পড়া রামায়ন, ঈশপ, অ্যান্ডারসন এবং আমার ব্যক্তিগত সাহিত্য সংকলন (এমনকী মো’পাসা এবং ও হেনরির লেখাও)। কনরাডের সাথে যখন এইচ. জি ওয়েলসের পরিচয় হয় তখন কনরাডের গল্প বলার ঢং সম্পর্কে ওয়েলসের ধারণা পুরোপুরি ইতিবাচক ছিল না। ওয়েলসের অভিযোগ ছিল, কনরাড কাহিনী সোজাসুজি না বলে অতিরিক্ত শব্দের ব্যবহার করে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে গল্প বলেন। প্রত্যুত্তরে কনরাড প্রশ্ন করেছিলেন, “ প্রিয় ওয়েলস, লাভ অ্যান্ড মিস্টার লুইশাম কী নিয়ে লেখা হয়েছে? জেন অস্টিনের সব রচনায় আসলে কী বলা হয়েছে? সমগ্র সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্যটাই বা কী?”

আশ্চর্যজনকভাবে মাধ্যমিক স্কুলে সাহিত্যের প্রতি আমার মনোভাব কনরাডের ঐ প্রশ্নগুলোর সাথে হুবহু মিলে যায়। পরবর্তী অনেকগুলো বছর আমার মনোভাব ঠিক ঐরকমই ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা তখন আমি খুলে বলার সাহস করতে পারিনি। আমার মনে হতো এসব কথা বলার অধিকার আমার নেই। পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমি সাহিত্য বোঝার মতো উপযুক্ত পাঠক হয়ে উঠতে পারিনি।  সেই বয়সে ইংল্যান্ডে আমার সাতটি বছর কেটে গেছে। তার  মাঝে চার বছর কেটেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি তথা ইউরোপিয়ান গল্প বোঝার জন্য যে সামান্য সামাজিক  ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান প্রয়োজন হয়, সেটা  আমি  ততোদিনে অর্জন করে ফেলেছি। আমি নিজেও তখন লেখালেখি শুরু করে দিয়েছি। ফলে, সাহিত্য রচনাকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার ক্ষমতাও আমার জন্মেছে। তার আগ পর্যন্ত আমি লেখার ধরনের গুনাগুন বিচার না করে, কিছু না বুঝে অন্ধের মতো কেবল পড়ে যেতাম। তখনো আমার জানা ছিল না যে কীভাবে বানানো গল্পকে যাচাই করতে হয়।

মাধ্যমিক স্কুলে থাকাকালীন সময়ে আমার ব্যাক্তিগত সাহিত্য সংকলনে কিছু অবশ্যম্ভাবী রচনা যুক্ত করতে হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে তখনকার সামাজিক পরিবেশ নিয়ে আমার বাবার লেখা রচনাগুলোই আমার সবচেয়ে পরিচিত আর প্রিয় লেখা ছিল। ওগুলো লিখতে  বাবার কী পরিমাণ পরিশ্রম হয়েছে তা আমি কাছ থেকে দেখেছি। ঐ লেখাগুলো আমাকে বিশ্বজগত সম্পর্কে মজবুত কিছু ধারণা দিয়েছিল। বাবার ওসব রচনা না পড়লে নিজেদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস সম্পর্কে আমার কিছুই জানা হতো না। বাবার রচনা ছাড়াও আমার এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের কারণে আরও তিনটি রচনা আমার সাহিত্য সংকলনে স্থান পায়। এগুলোর মধ্যে প্রথম হচ্ছে টারটাফ যেটা আমার কাছে ভীতিকর এক রূপকথার মতো মনে হয়েছিল। দ্বিতীয়টি ছিল সাইরানো ডি বারজেরাক যা কীনা মানুষের গভীরতম অনুভূতিকে নাড়া দিতে পারার মতো শক্তিশালী। শেষটি ছিল ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে প্রথমবারের মতো দ্রুত গতি ও শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে রচিত স্প্যানিশ পিকারেস্ক  গল্প লাজারিলো ডি টরমেস। এর মধ্যে শেষের রচনাটিই আমাকে এমন এক জগতে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়, যার সাথে আমার পূর্বপরিচিত জগতের মিল ছিল।

এই হলো আমার ব্যক্তিগত সাহিত্য সংকলনের বর্ণনা। ত্রিনিদাদ দ্বীপের শিক্ষাজীবনে এগুলোই আমি পড়েছি। নিজেকে তখনও আমি সত্যিকার অর্থে পাঠক হিসেবে ভাবতে পারতাম না। বই পড়তে পড়তে নিজেকে হারিয়ে বইয়ের জগতে ডুবে যাবার ক্ষমতা আমার কখনোই ছিল না। বাবার মতোই আমি একটা বইয়ের টুকরো টুকরো কিছু অংশ পড়তে পছন্দ করতাম। স্কুলে যে রচনা আমাকে লিখতে হতো সেগুলোর ভেতর কোন নতুনত্ব ছিল না। মূখস্থ বিদ্যা দিয়েই ওগুলো আমি লিখতাম। বাবার লেখা গল্পের উদাহরণ ছাড়া লেখালেখি করার মতো নিরেট গল্প আমার মাথায় অসতো না। তারপরও নিজেকে আমি লেখক ভাবতেই পছন্দ করতাম।

সে সময়ে লেখক হওয়াটা আমার সত্যিকারের লক্ষ্য ছিলো না। বরং ওটা ছিল আমার আত্মমর্যাদাবোধ, মুক্তির স্বপ্ন আর মহান সামজিক মর্যাদা অর্জনের একটা উপায় মাত্র। বংশের মধ্যে আমাদের পরিবার তথা আমার জীবন সবসময়ই ছিলো শিকড়হীন। আমার বাবা এতিম না হলেও ছেলেবেলা থেকেই এক প্রকার গৃহহীন ছিলেন। আর সেজন্যই আমরা স্বনির্ভর হতে পেরেছিলাম। সাংবাদিক হিসেবে বাবা যৎসামান্যই বেতন পেতেন। কয়েকটা বছর আমাদের নিদারুণ অর্থনৈতিক সংকটে কেটেছে; এমনকী মাথা গোঁজার ভালোমতো একটা ঠাঁইও ছিল না।  স্কুলে আমি বেশ ভাল ছাত্র ছিলাম। তারপরও রাস্তাঘাটে চলার সময় নিজেদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে আমি কুণ্ঠিত হতাম। অবাক ব্যাপার হলো যে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবার পরে যখন আমারা ভালো একটা বাড়িতে উঠে গেলাম, তখনও আমি মনে মনে শঙ্কিত থাকতাম। সামাজিক অবস্থান নিয়ে এই পরিচিত অনুভূতি আমাকে সবসময় অস্থির করে রাখতো।

 

৪.

 

ঔপনিবেশিক সরকার প্রতি বছর ত্রিনিদাদ দ্বীপের সব উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে চারটি বৃত্তি প্রদান করতো। ভাষা, আধুনিক পাঠ, বিজ্ঞান আর গণিত বিষয়ে সমস্ত স্কুলের ভেতর সেরা ছাত্রদের মধ্যে থেকে চারজনকে এই বৃত্তি দেয়া হতো। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইংল্যান্ড থেকে আমাদের দ্বীপে পাঠানো হতো। আবার উত্তরপত্রগুলোও নিরীক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে ফেরত যেতো। বৃত্তির টাকার পরিমাণ নিয়ে ঔপনিবেশিক সরকার কোন কার্পণ্য করতো না। তাদের বৃত্তি দেবার উদ্দেশ্যই ছিল মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। বৃত্তিধারী ছাত্রছাত্রীরা বৃটিশ সাম্রাজ্যের যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি খরচে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো। সরকার সাত বছর ধরে তাদের সমস্ত খরচ বহন করতো। বছরের পর বছর ধরে মুখস্থ বিদ্যা অর্জন করে এই বৃত্তি  জিতে নিতে আমার যে পরিশ্রম হয়েছে তা এখন চিন্তা করতেও কষ্ট হয়।  শেষ পর্যন্ত যখন বৃত্তিটা পেলাম তখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে অক্সফোর্ড থেকে ইংরেজিতে তিন বছরের কোর্সটা করবো। কোর্সের বিষয় সম্পর্কে আমার খুব সামান্যই জ্ঞান ছিল। মূলত দ্বীপের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের জগতটাকে দেখার সুযোগ কাজে লাগাবার উদ্দেশ্যেই কোর্সটা নিয়েছিলাম। তাছাড়া, নিজের ইচ্ছাটাকে পূরণ করতে অর্থাৎ লেখক হবার জন্যও এই বিষয়ে পড়াশোনা করাটাকেই উত্তম মনে করেছিলাম।

লেখক হওয়া বলতে তখন আমি বুঝতাম উপন্যাস আর গল্প লেখা। আমার সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতা আর বাবার  উদাহরণ দেখে দেখে আমার কাছে এটাই লেখক হবার স্বাভাবিক পন্থা মনে হতো। অবাক ব্যাপার হলো গদ্য লেখক হবার এই ধারণাটিকে আমি কখনো প্রশ্নের সম্মুখীন করিনি। অথচ বলতে গেলে ব্যাপারটা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক ছিল। কারণ, ছেলেবেলা থেকে আমি আর দশটা বাচ্চার মতো কখনো গল্প বানাতে পারতাম না। স্কুলের মুখস্থবিদ্যা অর্জনের সময়টাতে আমার কল্পনার পুরো ক্ষমতাটুকু বই পড়াতে নয়, বরং সিনেমা দেখাতে খরচ হয়েছে। কখনো কখনো লেখক হিসেবে নিজের ক্ষমতার ঝুলিটাকে শূন্য ভেবে ভয় পেতাম- আর তখন যেন কোন এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস রেখে নিজেকে আমি সান্ত্বনা দিতাম। ভাবতাম অবশ্যই এই শূন্যতা একদিন পূরণ হয়ে যাবে, বইয়ের পর বই লিখে যাবো আমি।



চলবে



তৃতীয় পর্ব

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য

টি মন্তব্য